সারা বছর যত তিথি আছে তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা শুভ ও পবিত্র তিথি হল বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি অর্থাৎ অক্ষয় তৃতীয়া তিথি। পুরান মতে অক্ষয় তৃতীয়া থেকেই সত্যযুগ ও ত্রেতা যুগের সূচনা হয়।এই অক্ষয় তৃতীয়াতেই দ্বাপর যুগের অবসান হয়ে কলিযুগের সূচনা হয়েছিল। এই দিন থেকেই এক যুগের অবসান হয় অন্য যুগের সূচনা হয় বলে অক্ষয় তৃতীয়াকে ‘যুগাধি তিথি’ও বলা হয়।
অক্ষয় তৃতীয়া পড়েছে আজ অর্থাৎ ১০ মে, শুক্রবার ভোর ৪টে ১৭ মিনিটে শুরু হয়ে চলবে ১১ মে, ২০২৪ শনিবার রাত ২টো ৫০ মিনিট পর্যন্ত। অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ সময় থাকবে ১০ মে সকালে ৫টা ৪৯ মিনিট থেকে রাত ১২টা ২৩ মিনিটে। অক্ষয় শব্দটির অর্থ যার কোনো ক্ষয় নেই, তাই এই বিশেষ দিনে প্রচলিত বিশ্বাস বলে, যে কাজেই হাত দেবেন, তাতেই সাফল্য লাভ করবেন।
অক্ষয় তৃতীয়া দিনটির বিশেষ কিছু ধর্মীয় মাহাত্ম্য রয়েছে। যেমন —
পুরাকালে এই বিশেষ দিনে গঙ্গাদেবী ভগবান শঙ্করকে মাথায় নিয়ে অবতরণ করেছিলেন মর্ত্যে। গঙ্গাকে পথ দেখাতে সাগরে মিলন ঘটেছিলেন ভগীরথ। বিশ্বাস করা হয় গঙ্গা থেকে জোয়ারের জল পূর্ণঘটে এনে ঘরে বা ব্যবসাক্ষেত্রে ছেটানো অক্ষয় তৃতীয়ার দিন মঙ্গলজনক। এই পুণ্যতিথির গঙ্গাজল সার্বিক দুর্ভোগ মুক্তি ঘটায়।
অক্ষয় তৃতীয়া পুণ্যদিনে ভগবান শংকরের আরাধনা করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন কুবের ও লক্ষীদেবী। মতান্তরে এই তিথিতেই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করে ধনসম্পদ লাভ করেছিলেন কুবের। এই দিনে কুবেরদেবকে দেব লোকের অধিপতি নির্বাচন করা হয়, তাই অক্ষয় তৃতীয়া কুবের দেবের পূজা করলে সংসারের সুখ ও সমৃদ্ধি আসে। শাস্ত্র মতে এই দিনে গরিব ও অসহায়দের মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র ওষুধ বিতরণ করলেও তার শুভ প্রভাবে সম্পদ লাভ করা সম্ভব হয়।
বদ্রীনারায়ণ থেকে ১ কিলোমিটার দূরে মানা গ্রামের ব্যাসগুহায় বসে বিশাল বুদ্ধি ব্যাসদেব শ্রুতিলিখনকারী গণেশজিকে সঙ্গে নিয়ে অক্ষয় তৃতীয়ার পবিত্র দিনে শুরু করেছিলেন লক্ষ শ্লোক মহাভারত রচনা।
ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার হলেন পরশুরাম।এই দিনটি পরশুরামের জন্মতিথি হিসেবে বিখ্যাত।
পুরাকালে রাজা যুধিষ্ঠির অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে পেয়েছিলেন অক্ষয় পাত্র। এই পাত্রের সাহায্যে রাজা সারা রাজ্যের সমস্ত দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষদের ক্ষুধা নিবারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কৌরব রাজসভায় রথি মহারথীদের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করেছিলেন দুঃশাসন। কিন্তু সে চেষ্টা বিফল হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়। পাঞ্চালির সেই লজ্জা নিবারণ দিনটি ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। লোক বিশ্বাস অক্ষয় তৃতীয়ায় দিন দেহত্যাগ করলে তার অক্ষয় স্বর্গলাভ হয়।
উত্তরাখণ্ডের কেদার-বদ্রি যমুনেত্রী ও গঙ্গোত্রীতে প্রতিবছর ৬ মাস মন্দির বন্ধ থাকার পর দ্বার উন্মোচিত হয় এই তিথিতে। মন্দির বন্ধ হয় ভাতৃদ্বিতীয়ায়। ছ-মাস আগে জ্বালিয়ে রাখা গর্ভমন্দিরের অক্ষয় দীপের দর্শন মেলে জ্বলন্ত অবস্থায়। পুরাকালে এই তিথিতে শুরু হয়েছিল সত্যযুগ।
জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এক বছর টানা উপবাসের পর উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন এই পবিত্র তিথিতে। সেদিন তিনি পান করেছিলেন আখের রস।
এই দিনটি আখা তিজ নামে পরিচিত।
কৃষক ও লোকশিল্পের কারিগররা অক্ষয় তৃতীয়া ব্রত পালন করেন। রজসংক্রান্তি ব্রতের আগে এই ব্রত পালন করা হয়। এই ব্রতের বিশেষত্ব হল এই দিন প্রথম বীজ বপন করা হয় অর্থাৎ এই দিন কর্ষণের শুরু। এই দিন থেকেই জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা রথের চাকা তৈরি শুরু হয়। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষে তৃতীয়াতে এই ব্রত পালিত হয় এই দিন ভাগ্য দেবীলক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে পূজা প্রার্থনা করা হয় এই দিনটিকে একটি শুভদিন। শুভদিনে বাড়ি তৈরি, হালখাতা, পুষ্করিনি বা কূপ খনন শুরু করা হয়।
অক্ষয় তৃতীয়া ব্রতে শ্রীবিষ্ণু ও লক্ষীদেবীর পূজা করতে হয়। এই পুজো শালগ্রাম শিলায়, বিষ্ণু মূর্তিতে, ঘটে বা জলে করা হয়। স্ত্রীপুরুষ সকলেই এই ব্রত করতে পারেন।
ব্রত পালনের প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো নতুন কাপড়, কলসী, যব, ভুজ্জি, তালপাতার পাখা ও গামছা। প্রথমে যব দিয়ে লক্ষ্মী-নারায়ণ পূজা করতে হয়। তারপর ভুজ্জি, জলভরা কলসী, তালপাতার পাখা, গামছা বা নতুন কাপড় ব্রাহ্মণকে প্রদান করতে হয়।
ব্রতের শেষে তিনজন সধবাকে শাঁখা সিঁদুর আলতা দান করতে হয়। এই ব্রত সারাজীবন পালন করতে পারলে ভালো হয় তবে অনেকেই তিন বছর চার বছর আট বছর বা ১২ বছর পালন করেন এই তিথিতে ব্রত পালনের পর বিষ্ণুসহস্ত্রনাম, শ্রীসুক্তম পাঠ করলে বলা হয় ইচ্ছা পূরণ ঘটে। বহুদিন ধরে অসুস্থ যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা অক্ষয় তৃতীয়ায় রামরক্ষা স্তোত্র পাঠ করবেন।
শাস্ত্র বলে অক্ষয় তৃতীয়ার পূণ্যলগ্নে সোনা কিনলে ঘরে আসে সুখ ও শান্তি। পরিবারের আর্থিক ভিত মজবুত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস এইদিন সোনা কিনলে সোনা অক্ষয় হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেকেই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন সোনাকেনেন। এ বছর কলকাতায় প্রতি ১০ গ্রাম হলমার্ক গয়না সোনার দাম প্রায় ৭০ হাজার টাকার আশেপাশে। সন্তান বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে অবশ্যই হলমার্ক যুক্ত গয়না কিনবেন। প্রয়োজনে বিক্রি করবার সময় হলমার্ক যুক্ত হলে এদের রিসেল ভ্যালু ভালো পাওয়া যায়। হীরে বা গ্রহরত্ন কিনলে তার বৈধ সার্টিফিকেট অবশ্যই চেয়ে নেবেন।
শুধু সোনা নয়, রুপো বা হীরের গয়নাও কেনার জন্য এটি উপযুক্ত সময়। এছাড়া অনেকেই গাড়ি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এয়ারকন্ডিশন, রেফ্রিজারেটর, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, আসবাবপত্র, ঘর সাজানোর জিনিস, কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেস, বিভিন্ন অ্যাকসেসরিস এসব কিনে থাকেন।
এই দিনে দুই চাকা বা চার চাকার বাহন কেনার রীতি অনেক দিনের। প্রি বুকিং করে অনেকেই এই দিনটিতে ডেলিভারি নেন। এখন তো সহজ শর্তে অল্প সুদে কারলোন দিতে মুখিয়ে আছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক। এই সুযোগে প্রয়োজনে আপনি আপনার পথ চলার সঙ্গীটিকে এই দিন কিনতে পারেন। এখন তো নতুন জেনারেশনের পছন্দ পরিবেশ বান্ধব, পকেট সাশ্রয়ী ইলেকট্রিক বাইক ইলেকট্রিক স্কুটি। তবে গাড়ি কেনার আগে টেস্ট ড্রাইভ মাস্ট এবং সমস্ত কাগজপত্র খুটিয়ে দেখে নেবেন।
প্রতিটি উৎসবে পেছনে ভাবের মাহাত্ম্য আছে। ভাবশূন্য অন্তঃকরণে পালনকারী উৎসব যন্ত্রবৎ হয়ে ওঠে, ফলে মানব জীবনে জড়ত্বের সঞ্চার হয়। গতানুগতিক পরম্পরায় প্রাপ্ত ও না বুঝে উৎসবগুলি পালন করলে তাতে কোন কাজ হয় না। পরিণামে সময়,শক্তি ও অর্থের অপব্যয়। তাই ভাবপূর্ণ অন্তঃকরণে সদবুদ্ধির দ্বারা যদি এই ব্রতকথা বা উৎসব গুলি পালন করা যায় তাহলে এগুলি জীবনকে আনন্দময় করে তুলবে আর জীবনে নিরাশাকে দূর করে নতুন আশার সঞ্চার করবে।
অনেক কিছু জানতে পারলাম।
তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ।