সেটা দ্বাপর যুগের কথা। বাল্যসখা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে বৃন্দাবন থেকে সুদূর দ্বারকায় এসেছেন সুদামা। দরিদ্র ব্রাহ্মণ প্রিয়তম সখার জন্য কাপড়ের পুটুলিতে বেঁধে এনেছেন তিনমুঠো তণ্ডুল (চালভাজা)। সেই তণ্ডুল পরম তৃপ্তিতে গ্রহণ করলেন অন্তর্যামী কৃষ্ণ। সুদামা তাঁর দারিদ্রের কথা প্রিয়তম সখাকে বলতে পারলেন না। কৃষ্ণের অজানা কিছু নয়। সুদামা ফিরে এলেন বৃন্দাবনে। কিন্তু একী! কোথায় তাঁর পর্ণকুটির! সেখানে যে এক সুরম্য বাসগৃহ। আর সেই বাসগৃহে রয়েছেন স্ত্রী বসুন্ধরা ও সন্তানরা। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিতেই সুদামার দারিদ্র দূর করে তাঁকে উপহারস্বরূপ অঢেল সম্পদ দান করেন কৃষ্ণ।
কেবলমাত্র হালখাতা বা সোনা কেনার উৎসব নয় অক্ষয় তৃতীয়া। এই বিশেষ দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস। যার শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। অক্ষয় তৃতীয়া হল চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। অক্ষয় শব্দের অর্থ হল যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না এমন। এই পুণ্য তিথিতেই সত্যযুগের সূচনা হয়েছিল। বৈদিক বিশ্বাসানুসারে এই পবিত্র তিথিতে কোন শুভকার্য সম্পন্ন হলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাস এই বিখ্যাত তিথিটি হল সব কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এই একুশ শতকের হাইটেকের যুগেও বেড়েই চলেছে এই স্মরণীয় উৎসব অক্ষয় তৃতীয়া।

মহারাজ যুধিষ্ঠির একদিন ধর্মকথার আলোচনায় বসে মহামুনি শতানিকের কাছে জল দান করার মাহাত্ম্য সম্বন্ধে শুনতে চাইলেন। শতানিক তখন বললেন, প্রাচীনকালে একজন ভয়ানক নিষ্ঠুর প্রকৃতির ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর যেমন ছিল রাগ, তেমনি তাঁর কটুকথা বলার অভ্যাস ছিল। একদিন দুপুরবেলায় এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর বাড়িতে এসে উপস্থিত। ক্ষিদে-তেষ্টায় সেই ব্রাহ্মণ খুব কাতর হয়ে তাঁকে অন্ন ও সামান্য জল দিয়ে প্রাণ বাঁচাবার অনুরোধ করলেন। এই কথা শুনে সেই কটুভাষী ব্রাহ্মণ রেগে আগুন হয়ে অনেক কটুকথা বলে তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন। ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁর সামনে থেকে চলেগেলেন। এই সময় সেই ব্রাহ্মণের স্ত্রী দূর থেকে এই ঘটনা দেখে মনে মনে খুবই আঘাত পেলেন। তিনি ছুটে এসে তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘তুমি কি ধরণের নিষ্ঠুর মানুষ, ক্ষিদে-তেষ্টায় কাতর এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে দেখে তোমার একটুও দয়া হল না’।
এই কথা বলে ব্রাহ্মণের স্ত্রী নিজে সেই ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণকে ডেকে এনে অন্ন ও জল দিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট করলেন। কালক্রমে সেই কটুভাষী ব্রাহ্মণের মৃত্যু হল। যমের দূতেরা খুব কষ্ট দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেল ধর্মরাজ যমের দুয়ারে। তখন ব্রাহ্মণ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে যমদূতদের কাছে তৃষ্ণা নিবারনের জন্য একটু জল প্রর্থনা করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি ক্ষিদে-তেষ্টায় বড় কষ্ট পাচ্ছি, তোমরা একটু জল দিয়ে আমার প্রাণ বাঁচাও”। যমদূতরা বললেন, মনে করে দ্যাখো, সেই ক্ষুধায় কাতর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে তুমি কী রকম অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে— আজ তোমাকে তার প্রতিফল ভোগ করতে হবে’। একথা বলে যমদূতেরা তাঁকে ধর্মরাজের সামনে এনে হাজির করলেন। যমরাজ তাঁকে দেখে বললেন, ‘এ কাকে তোমরা আমার কাছে এনেছো? এর স্ত্রী অক্ষয় তৃতীয়া-র দিনে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে অন্ন ও জল দান করে পরিতুষ্ট করেছিলেন। আর সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কে ছিলেন জান? স্বয়ং নারায়ণ! যাও একে বিষ্ণুদূতদের কাছে দিয়ে আসো’। এই ব্রতগল্পের মূল্যবোধের আবেদন আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক।
ব্রিটিশ শাসনের সময়েও দেশ জুড়ে সমাদরে পালিত হতো অক্ষয় তৃতীয়া। মনে করা হতো যে এই বিশেষ দিনে স্নানের পরে ব্রাহ্মণকে দান করলে নাকি অক্ষয় পুণ্য অর্জন করা যায়। সেই ধারণা থেকে বহু কৃপন মানুষও উপুড় হয়ে দান ধ্যান করতেন। যদিও নাস্তিকদের মতে এটা ব্রাহ্মণ্যবাদ। পাপ-পূণ্যের লোভ দেখিয়ে সাধারণের থেকে দানের সামগ্রী আদায় করার কৌশল ব্রাহ্মণদের।
অক্ষয় তৃতীয়া বাঙালির পঞ্জিকায় একটা বিশেষ দিন রূপে অনেক কাল থেকেই জায়গা পেয়েছে৷ অনেক শুভ কাজ করার জন্য বাঙালি বেছে নিত এই দিনটাকে৷ তা ছাড়া পয়লা বৈশাখের পাশাপাশি বাঙালির একাংশ হালখাতার অনুষ্ঠান করে থাকে এই অক্ষয় তৃতীয়াতেই৷ শুভদিন হলেও তেমন ভাবে সোনা কেনার রেওয়াজ ছিল না যেটা ইদানিং বেড়ে যেতে দেখা গিয়েছে৷ মূলত দক্ষিণ ভারত থেকে এই অভ্যাসটি আমদানি হচ্ছে বাংলায় বলে মনে করা হয়৷ এই দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দেওয়া নানা রকম ‘অফার’ প্রলুব্ধ করছে অনেককেই৷ এদিকে হিন্দি বলয়ে এইদিনের উৎসব আখা তীজ নামে পরিচিত।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চন্দনযাত্রা, স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, ঝুলনযাত্রা, রাসযাত্রা— অনেকগুলি যাত্রার বা উৎসবের বিধান আছে। তার মধ্যে এই অক্ষয় তৃতীয়াতে চন্দনযাত্রা অন্যতম মহোৎসবরূপে পরিগণিত হয়। শ্রীজগন্নাথক্ষেত্র পুরীতে একুশ দিন ব্যাপী চন্দনযাত্রা উৎসবের শুরু এদিন থেকেই। নীলাচলে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর বিশ্ববিখ্যাত রথের কাজ শুরু হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে। ‘ভবিষ্যপুরাণে’ অনুসারে এই তিথিতে কেউ যদি জলদান করেন তবে তার অক্ষয় পুণ্যলাভ হবে। এ প্রসঙ্গে গবেষকরা বলে থাকেন, গ্রীষ্মকালে চারদিকে রোদের প্রখরতায় মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। এই প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে মুক্তি পেতে হলে চাই সর্বজীবের তৃষ্ণা নিবারণ। দ্রুত বর্ষাকে আবাহন জানানোর জন্যই অক্ষয় তৃতীয়া উৎসবের সার্থকতা।
ভগীরথের কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে কলুষনাশিনী, ত্রিভুবনতারিণী ভগবতীগঙ্গার মর্ত্যে অবতরণ হয়েছিল এই অক্ষয় তৃতীয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে। তাই শাস্ত্রে উল্লেখ আছে এই তিথিতে শিব, গঙ্গা, কৈলাস, হিমালয় ও ভগীরথের পুজো করার। ভীষ্মজননী জাহ্নবী স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল গমন করায় ত্রিপথগামিনীরূপে কথিতা। স্বর্গে তাই তাঁর নাম মন্দাকিনী, মধ্যে তিনি গঙ্গা আর পাতালে তাঁর নাম ভোগবতী। আদি শঙ্করাচার্যদেব তাঁর কালজয়ী ‘গঙ্গাস্তোত্রে’ লিখেছেন, ‘ভাগিরথি সুখদায়িনী মাতস্তব জল— মহিমা নিগমে খ্যাতঃ। নাহং জানে তব মহিমানং, ত্রাহি কৃপাময়ী মামজ্ঞানম্।’ এছাড়া কুবেরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে অতুলৈশ্বর্য দান করেছিলেন এই শুভদিনে। কুবেরের এই লক্ষ্মী লাভ হয়েছিল বলে এদিন ‘বৈভব লক্ষ্মী’-র পূজা হয় । কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী— এই চারধাম যাত্রা শুরু হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়। প্রতি বছরের মতো এবারেও গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী দু-টি মন্দির খুলবে অক্ষয় তৃতীয়ার পবিত্র দিনটিতে। কেদারনাথ এবং বদ্রীনাথ মন্দির সাধারণত সেদিনই খোলে। দশমহাবিদ্যার অন্যতমা মহাদেবী ধূমাবতীর আবির্ভাব অক্ষয় তৃতীয়ায়। ধূমাবতীদেবীর মূর্তির বর্ণনা তন্ত্রশাস্ত্রে লিখিত আছে।
সূত্র : অন্তর্জাল