ঘুংঘুর সালদা খাল খনন পরিকল্পনায় আমি একবার একটা মজার চাকরী পেয়েছিলাম। কাজটা ছিল একজন গেজ রীডারের। যে দু’টি ড্রেজার এই খনন পরিকল্পনায় কাজ করতে এসেছিল, আমি ছিলাম তাদের সাহায্যকারী। আমি আজ পর্যন্ত পেটের দায়ে যেসব পেশা গ্রহণ করেছি, সংবাদপত্রের প্রুফরীডার থেকে শুরু করে ড্রেজার ডিভিশনের গেজরীডার পর্যন্ত, এর মধ্যে ঐ সময়টাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ। একটানা নদীতে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। আমি সারাদিন একটা ড্রেজারের ক্রু-কেবিনে একঘেঁয়ে ভয়াবহ ধাতব শব্দের মধ্যে কত অনায়াসেই না ঘুমিয়ে পড়তাম। আর সারারাত একটা ছোট নৌকা নিয়ে খননরত ড্রেজারগুলো থেকে দেড়শো গজ দূরে পুতে রাখা রেখাঙ্কিত কাঠের গেজের ওপর গাঙের জোয়ারভাটা লক্ষ্য করতাম। আমার হাতে থাকতো ওয়াটার লেভেলের সঠিক হিসাব রাখার খাতা আর পেন্সিল। একটা টর্চ লাইটও থাকতো। কারণ অমাবস্যায় মাঝে-মধ্যে গেজের কাষ্ঠদন্ডটি খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হতো।
আমার হিসাবের ওপরই মোটামুটিভাবে জোয়ার-ভাটায় ড্রেজারের কোদাল ওঠানামা করতো। আমি ওয়াটার লেভেলের হিসাবের একটা স্লিপ ড্রেজার মাস্টার অথবা সুখানির হাতে তুলে দিয়ে আমার খাতায় তাদের সই নিতাম। সেই হিসাব ধরে ড্রেজারের ঘূর্ণায়মান কোদালটি হয় সরাসরি কাদার ভেতর আট-ন-ইঞ্চি বসে যেতো অথবা গভীর কাদার ভেতর থেকে তা কয়েক ইঞ্চি উঠে আসতো। এসব কাজের জন্য আমার একটি ডিঙি নৌকাও ছিল। নৌকাটা অবশ্য ড্রেজার ডিভিশনের ভাড়া করা। ড্রেজারের লোকজন যখন ডাঙায় নামতো কিংবা পারের হাট-বাজার থেকে সওদা করে ড্রেজারে ফিরতো তখন পারাপারের জন্য ডিঙিটার দরকার। তাছাড়া আছে পানির রিডিং নেয়া। সারাদিনের মধ্যে দু’বার আর অন্তত রাতে দু’বার আমি পানির ওঠাপড়া লক্ষ্য করতাম। সন্দেহ নেই আমার জন্য কাজটা ছিল ভারি মজার।
এ ধরনের একটা চাকরীর নিয়োগপত্র পেয়ে আমি প্রথমে হতভম্ভ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন ইন্টারভিউ দিতে যাই, আমার ধারণার ত্রি-সীমার মধ্যে চাকরীটা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখিনি। স্কীমের ডাইরেক্টর ইন্টারভিউর সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি এদেশের নদ-নদীগুলো সম্বন্ধে কি জানেন?’
আমি যখন জানালাম যে, ভাটি অঞ্চলের প্রায় সব নদীই আমার চেনাজানা। তাছাড়া নানা উপলক্ষে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা থেকে শুরু করে তিতাস, আড়িয়ল খাঁ, ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা প্রায় সব নদীতেই আমার কোনো না কোনো সময়ে সাঁতার কাটা থেকে শুরু করে স্নানাহারেরও সুযোগ হয়েছে, তখন তিনি আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি আসুন।’ আমি কামরা থেকে পথে নেমে ভাবলাম, এসব চাকরিবাকরি আমার হবে না। আমি রাতের গাড়ীতেই কুমিল্লা থেকে আমার বাড়ী অর্থাৎ আখাউড়ায় ফিরে এলাম। সাধারণত এসব ইন্টারভিউর পর আমার মনে কোন উদ্বেগ থাকে না। আমি একবারও ভাবি না যে নিয়োগপত্রটি দৈবাৎ আমি পেয়েও যেতে পারি। অন্যান্যবারের মত এবারও আমার মধ্যে কোন প্রস্তুতি ছিল না। তাই এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটি যখন আমি হাতে পেলাম, একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলে বোধ হল। মাইনা যেমনই হোক, তবুও আমি একটা কাজ পেয়েছি এটাই ছিল আমার কাছে মস্ত বড়ো ঘটনা। আমি বাঁধাছাদা করে পরের দিনই নবীনগর রওনা হলাম।
আমি যখন আমার কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছি তখন ভোরবেলা। নদীর পারের গ্রামগুলো থেকে সমানে কুত্তার চিৎকার আর মোরগের বাক শোনা যাচ্ছিল। মাঠের কাজে কিষাণদের চলাফেরা সবে শুরু হয়েছে। আমি লঞ্চ থেকে নেমে একজন চাষামত লোককে জিজ্ঞেস করলাম, নদীতে কোনো মাটি কাটার জাহাজ এসেছে কিনা। লোকটি জানালো যে, এসেছে। এ ধরনের জাহাজ এসেছে আগের দিন সন্ধ্যায়। দু’টি জাহাজ তারা দেখেছে তিতাসের মোহনায়। আমি বুঝলাম ড্রেজার দু’টি এখন আছে যেখানে মোহনা থেকে তিতাস নদীটি বেশ প্রবলবেগে কিছু জলধারা নিয়ে আলাদা হয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সঙ্গমস্থলে। গতকাল ড্রেজার দু’টি সম্ভবত সেখানেই এসে অপেক্ষা করছে। আমি লোকটিকে সালাম জানিয়ে ড্রেজারের দিকে রওনা হলাম।
এসে দেখলাম, ড্রেজার নদীর মাঝামাঝি আছে। পাশাপাশি ভাসছে। আমি দূর থেকে বুঝলাম, ড্রেজারের কর্মচারীরা এখনও কেউ জাগেনি। সম্ভবত গত সন্ধ্যায় নোঙর সাজাতে ওদের অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে এখনও কারো ঘুম ভাঙেনি। আমি এখন কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একবার ভাবলাম নবীনগর বাজারে গিয়ে নাস্তাপানি করে আসি। কিন্তু মুশকিল হলো আমার স্যুটকেসটা ছিল ভীষণ ভারি। তাছাড়া বিছানাপত্র কোথায় রেখে যাব? লঞ্চঘাট থেকে নবীনগর বাজারটি কমপক্ষে মাইল দেড়েক দূরে। এতদূর লটবহর নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে বেশ অসুবিধা। যদিও এসব অঞ্চল আমার একেবারে অপরিচিত নয়। তবুও এখন এই ভোরবেলায়, যখন পথেঘাটে কোনো লোকজন নেই। এমনকি নদীতে একটা নৌকাও দেখছি না, বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়লাম। একবার ভাবলাম চিৎকার করে ড্রেজারের লোকজনদের ডাকলে কেমন হয়। কিন্তু এই ভোর ছটায় নির্জন নদীপারের চিৎকার সেখানে পৌঁছুবে বলে মনে হলো না। আমি অবশেষে আমার স্যুটকেসের ওপর বেডরোলটা রেখে তার ওপর বসে সিগ্রেট ধরালাম।
এভাবে কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না। হঠাৎ নদীর কিনারা ধরে একটি লোককে আসতে দেখে আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। লোকটা নবীনগরের দিক থেকে আমার দিকে আসছিল। দীর্ঘকায় সুঠাম পুরুষ। হাঁটার মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব লক্ষ্য করলাম। আগন্তুক আমার সামনে এসে দাঁড়ালে দেখলাম, আমি তাকে যতটা লম্বা ভেবেছিলাম, সে তার চেয়েও দীর্ঘকায় এবং দশাসই মানুষ। গায়ের রং কালো। নীল হাফ শার্ট এবং কালো ঢোলা প্যান্ট। জুতাজোড়া অপরিচ্ছন্ন ও ভারি। হাতের কব্জি মোটা, কর্মঠ লোকের মত। বাঁ হাতে বড়ো ডায়ালের ঘড়ি। নাকটা একটু মোটা হলেও, টুথব্রাসের মত করে ছাঁটা গোঁফজোড়ার ওপর তেমন খারাপ লাগছে না। আঙুলের ফাঁকে রাখা সিগ্রেটে একটা আরামের টান দিয়ে লোকটা এসে আমার পাশে দাঁড়ালো, ‘ওব যাবেন?’
‘নাওটাও নেই যাবো কিভাবে? আমি অবশ্য ওপারে যাবে। যাবো অই ড্রোজারে।’ বললাম আমি।
মানুষটা আমার কথা শুনে বেশ একটু কৌতূহলী হলো মনে হলো, ‘ড্রেজারে? কোন ড্রেজারে? কার কাছে?’
‘আমি নদী খোঁড়ার কাজে এসেছি।’
‘ও আপনি আমাদের গেজরীডার সাহেব! বুঝেছি। সকালের লঞ্চে এলেন? ভালোই হলো, কাল আমরা নবীনগর বাজার ঘাট থেকে কাজ শুরু করবো। আপনার জন্যই ড্রেজার মাস্টার বসে আছে। পানি মাপ ছাড়া কোদাল নামানো যায় না।’ বলল লোকটা।
‘আপনিও ড্রেজারে কাজ করেন?’
‘আমার নাম, সুখানি হাফিজ। ঐ যে বড়ো ড্রেজারটা, আত্রাই নাম। আমি চালাই।’ হাসলো লোকটা। হাসিতে পরিচ্ছন্ন আত্মপ্রত্যয়।
‘ভালোই হলো। আপনার সাথে কথা হয়ে গেল। আপনিও বুঝি লঞ্চে এলেন?’
‘না আমি ড্রেজারেই এসেছি। পরশু নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে কাল সন্ধ্যায় নোঙর বেঁধেছি এখানে।’
‘তবে এত সকালে কোথেকে?’ আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
সুখানি একটু মুচকি হাসলো। বললো, ‘বুঝলেন না, আমরা গাঙ পানির মানুষ। হাট-বাজারের কাছে এলেই শরীরটা টনটন করে। বাজারে একটু রাত কাটিয়ে এলাম।’ বলে হাসতে লাগলো সুখানি।
তার কথার ইঙ্গিতটুকু আঁচ করে আমিও হাসলাম। প্রথম পরিচয়েই লোকটার অন্তরঙ্গ হওয়ার ভঙ্গী দেখে আমার ভালো লাগলো। এদের সঙ্গেই আমার কাজ করতে হবে। থাকতে হবে। বিশেষ করে সুখানির সাথে। আমি প্রসঙ্গ পাল্টে দেয়ার জন্য বললাম, ‘সবি তো বুঝলাম। এখন ঐ ড্রেজারে গিয়ে উঠবো কি করে?”
‘দাঁড়ান, একটু চিল্লাতে হবে।’ বলে সুখানি তার দু’টি হাতের পাতা শাঁক বাজাবার মত গোল করে ঠোঁটের ওপর রেখে চিৎকার করে ডাকলো, ‘এই খা-লা-সী। সুখানির একটা ডাকেই ফল হলো। দেখলাম আত্রাই ড্রেজারের সাথে বাঁধা একটা ছোট্ট বোটের দড়ি খুলছে একজন মানুষ। আমি খুশী হয়ে সুখানিকে বললাম, ‘ঐ যে, আসছে।’ ‘আসবে না, ওর বাপ আসবে।’
সুখানি হাফিজ পরিতুষ্টির হাসিতে তার চেহারাটা উদ্ভাসিত করে আমার দিকে এক প্যাকেট সিগ্রেট মেলে ধরলো। আমি বললাম, আমার কাছে সিগ্ৰেটতো আছে।
‘আরে খান না একটা।”
সুখানির গলায় এক ধরনের আন্তরিকতার টান। আমি খুশী হয়ে একটা সিগ্রেট তুলে নিয়ে ধরালাম। ততক্ষণে ছোট নৌকাটা পারে এসে ভিড়লো। একটা অল্প বয়স্ক জোয়ান লোক নাওটা বেয়ে এনেছে। তার চোখেমুখে এখনও ঘুম লেগে আছে-দেখলেই বোঝা যায়। তবুও সে সুখানির দিকে মুখ তুলে বিনয়ীর মত হাসলো, ‘ওঠেন ওস্তাদ।’
সুখানী গম্ভীর হয়ে বললো, ‘তোর ঘুমের বিমার আর গেলনা মন্তাজ। কোন সময় ফজর হয়েছে। ডাকতে ডাকতে গলা ফাটিয়ে ফেললেও তোদের উঠতে মন চায় না।’ ‘কাল সারারাত তো ওস্তাদ আমাদের সজাগ কাটলো। ফজরের দিকে শুয়েছি।’
অপরাধীর মত বললো মন্তাজ। সুখানি তাকে ধমক দিলো, ‘ফজরে শুয়েছো, নবাবজাদা তাতে কী হয়েছে! নিয়ম তো পাঁচটায় উঠে বালতির পানি মেরে ডেক সাফ করা। সুখান মোছা। কোদালের কাদা ছাড়ানো। স্টাফের চা-নাস্তা বানানো। তুই ব্যাটা একটা ভালুক। আমি যখন খালাসীর কাম করতাম তখন ফজরের নামাজের আগে উঠে ডেক ধোয়া থেকে শুরু করে চা-বানানো পর্যন্ত নামাজের আগেই খতম। ড্রেজার মাস্টার বলতো, শালা হাফিজ হলো গিয়ে জিনের বাচ্চা।”
মন্তাজ সুখানির তম্বিগুলো মাথা নুইয়ে শুনে গেল। তার চেহারা দেখে মনে হলো, এই গালমন্দগুলো তার তেমন খারাপ লাগছে না। মুখটা মন্তাজের অপরাধীর মত হলেও বেশ হাসি হাসি।
আমি সুখানির পেছনে পেছনে বোটে উঠতে উঠতে বললাম, ‘ড্রেজারে তো জাহাজের মতন মাল ওঠানামার ব্যাপার নেই। এখানে খালাসী কেন?”
হাফিজ প্রথমে আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে বোটে উঠে বসলো। তারপর ধীরে সুস্থে আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তরটা বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বললো, ‘ড্রেজারের কোদাল পানির ভেতর নামলে যে পাইপ দিয়ে কাদাপানি বেরিয়ে আসে সে পাইপের মুখ থাকে পারের ওপর। এই পাইপ ফিট করতে, কাদামাটি যাতে নদীর তীর গড়িয়ে নদীর ভেতর ফের নেমে আসতে না পারে সেজন্যে শক্ত করে মাটির বাঁধ দেয়া দরকার। তাছাড়া স্টাফের রান্নাবান্না, বাজারসদাই ইত্যাদি কাজের জন্য ড্রেজার ডিভিশন প্রতিটি ড্রেজারে দু’চারজন লোক দেয়। আমরা এদের খালাসীই বলি। একই বেতন। একই ধারার কাম। আমি একসময় খালাসী হয়ে জয়েন করে সাত বছর খেটেছি। আমার কোন আলসেমি ছিল না। আর দেখুন রীডার সাব, এই শালা মন্তাজটা অতবড় গতর, শালা কেবল ঘুমের কোলবালিশ। ব্যাটা তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীর মধ্যে কেউ সুখানি হতে পারবে না।’ সুখানির খিস্তিতে মন্তাজ একটুও ঘামলো না। মুখমণ্ডলে বিনীত গোলামের মত হাসিভাবটি বজায় রেখেই বললো, ‘আপনি ওস্তাদ এই আত্রাই ড্রেজারে থাকলে কোন শালায় আমার সুখানি হওন ঠেকায়।”
বলেই হুট করে হাফিজের পায়ে একটা কদমবুসী করে ফেললো। সুখানি হেসে বললো, ‘দেখলেন তো ব্যাটা কেমন উদবেড়ালের মত চালাক।”
আমরা ড্রেজারে এসে বুঝলাম ড্রেজার মাস্টার বা অন্যান্য ক্রুরা এখনও জাগেনি। ড্রেজারের লোহার খোলে পা রাখা মাত্রই গ্রীজ আর তেল মেশানো ইস্পাতের গন্ধ এসে আমার নাকে লাগলো। সামনের দু’টি ক্রু-কেবিন ছাড়া ড্রেজারের পুরো অভ্যন্তর ভাগটাই যন্ত্রপাতি আর মেশিন ইত্যাদিতে ঠাসা। এর পূর্বে আর কোনোদিন ড্রেজারে ওঠার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এর ভেতর মানুষজনের বসবাসের নিশ্চয়ই অনেক জায়গা আছে। আসলে দু’টি কেবিন ছাড়া সবটাই বিশালকায় ইঞ্জিন। ঠিক ইঞ্জিনের মধ্যভাগ থেকে অতিকায় ইস্পাতের পাইপ চলে গেছে পেছনের দিকে। এই পাইপই শেষ পর্যন্ত নদীর জলরেখা ছাড়িয়ে তীরের ওপর উঠে যায়। এই অতিকায় সুড়ঙ্গ দিয়েই ঘুরন্ত কোদালের আলোড়িত কাদাপানি দ্রুতবেগে নদীর ভরাট মধ্যভাগ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। বোট থেকে মন্তাজ আমার মালপত্র বাঁ পাশের ক্রু-কেবিনের প্রবেশ পথের একদিকে রাখলো। আর সুখানি নেমে গেল নিচে। মন্তাজ বললো, ‘বসুন রীডার সাব। আমি চা করে নিয়ে আসি।”
আমি স্যুটকেসের ওপর রাখা আমার বেডরোলটায় আলতোভাবে বসে নদীর পূর্বপারের দিকে তাকালাম। এতক্ষণে সূর্য উঠে এসেছে। দূরে সবুজ গ্রামরেখার ওপর সূর্যকে মনে হলো তপ্ত তন্দুরের হঠাৎ খুলে যাওয়া মুখের মত। নদীর তীরে গরু-বাছুরের সাথে সাথে দু’একটা মানুষের আনাগোনা। আমি পাশের ড্রেজারটির ভেতর দিয়ে সবকিছু দেখছিলাম। সেখানেও এখন পর্যন্ত কেউ জেগেছে বলে মনে হলো না। আমাকে দু’টি ড্রেজারের গেজরীডার হিসাবেই কাজ করতে হবে। নতুন কাজকর্ম অর্থাৎ পেশা সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা না থাকলেও, দারুণ উদ্দীপনা বোধ করছিলাম। এই ড্রেজারটির নাম আত্রাই। আর সামনে অর্থাৎ আত্রাইয়ের পূর্বদিকে ভাসছে বালেশ্বর।
মন্তাজ একটা বিরাটকায় কেতলি আর গোটা চারেক বড় মগ নিয়ে এসে হাজির হলো। কেতলির নলটা একটা নেকড়া দিয়ে বন্ধ। সে আমাকে ক্রু-কেবিনের দিকে ঢুকতে ইঙ্গিত করে বললো, ‘আসুন বড় ওস্তাদের সাথে বসে চা খাবেন।’
আমি মন্তাজের কথামত তার পিছু পিছু কেবিনে ঢুকলাম। কেবিন বলতে যেমন গালভরা একটা নাবিকদের কামরা বোঝা যায় ড্রেজারের ক্রু-কেবিন আসলে তেমন কিছু নয়। আসলে একটা লোহার দমবন্ধ করা খাঁচামাত্র। ডানপাশে রেলগাড়ির কামরার মত ওপরে নিচে দু’টি মাঝারি সাইজের ইস্পাতের পাত। বাঁদিকের ওপরটা খালি। কিন্তু নিচেও একটা অনুরূপ পাত। এর ওপরে গোটানো কম্বলের বিছানা রাখা আছে। একটা বিছানায় একজন বৃদ্ধ, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি। নামাজের ভঙ্গিতে বসে তসবিহ ঘোরাচ্ছেন। পাশের বিছানায় সুখানি হাফিজ। সে এতক্ষণে প্যান্ট-জুতো ইত্যাদি ছেড়ে পরনে শুধু আন্ডারওয়্যার রেখে আরাম করে বৃদ্ধ লোকটির সাথে আলাপ করছিল। মন্তাজের পেছনে আমাকে ঢুকতে দেখে বললো, ‘রীডার সাব আসুন। ইনি আমাদের ড্রেজার মাস্টার আজিজ মিয়া ওস্তাদ।’ আমি বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে সালাম বললাম। ড্রেজার মাস্টার কোনো কথা না বলে মাথা নুইয়ে আমার সালামের জবাব দিয়ে তসবীহ টিপতে লাগলেন।
“আমি আপনার কথা মাস্টারকে বলেছি। আমরা গেজরীডারকে আমাদের সাথে ড্রেজারে থাকতে দিই না। তারা ভাড়া করা ডিঙিতে থেকে আমাদের সাথে কাজ করে। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি এ লাইনে নতুন লোক। ডিঙিফিঙিতে থেকে অভ্যেস নেই। আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন, খাবেন।’ বললো সুখানি।
আমি খুশী হয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানালাম। যদিও আমার অর্ধেক জীবন কেটেছে নদীতে, নৌকায়। তবুও এ প্রস্তাব আমি ফেলে দিতে পারি না। কারণ আমি জানি এ অঞ্চলে ছোটো ডিঙি নৌকায় কঞ্জুষ মাঝির সাথে বসবাস, বাজার, রান্নাবান্না ইত্যাদি কেমন বিড়ম্বনা। আমি আমার অভিজ্ঞতার কথা একদম চেপে গিয়ে ড্রেজার মাস্টারের দিকে তাকালাম। আজিজ মিয়া তসবিহ রেখে মোনাজাত করছেন। মোনাজাত শেষে তিনি আমার নাম জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘আমার নাম শওকত।’
‘বাড়ী?’ ‘আখাউড়ায়।’
‘আখাউড়া তো কাছেই।’
আমি বললাম, ‘হাঁ কাছেই। এখান থেকে বিশ-বাইশ মাইলের মধ্যে।’
‘তবে আর কি, মাঝে মধ্যে ঘুরে আসতে পারবেন। প্রতি হপ্তায় বৌ-বাচ্চা দেখে আসতে পারবেন।’
বলে বৃদ্ধ সৌম্য হাসিতে কম্পমান কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বুলাতে লাগলেন। আমি বললাম, ‘না মাস্টার, আমার বউটা নেই। হপ্তায় হপ্তায় আমার বাড়ী যেতে হবে না। আগামী বর্ষা পর্যন্ত আমি নদীতেই থাকবো। কোথাও যাবো না।’
মনে হলো আমার কথায় বৃদ্ধ তেমন প্রসন্ন হলেন না। তিনি আড়চোখে সুখানির দিকে তাকালেন। দেখলাম আমার কথায় সুখানি ডগমগ করছে। চেহারায় একটা খুশীর আবহাওয়া। আমি ব্যাপারটা ঠিকমত আন্দাজ করার আগেই সুখানি মাস্টারের দিকে ফিরে বললো, ‘মাস্টার, আমার সাথেই বনবে ভালো।’
মাস্টার সুখানির কথার কোনো জবাব না দিয়ে মন্তাজের বাড়িয়ে দেয়া চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিলেন। মন্তাজ আমাকে আর সুখানিকে দু’মগ চা দিল। চমৎকার চা। সুন্দর গন্ধে ক্রু-কেবিন ম ম করতে লাগলো। আমি মন্তাজকে খুশী করার জন্য বললাম, ‘বাহ, খালাসী তো মজাদার চা বানায়।’মন্তাজ খুশীতে গলে গিয়ে মাথা নত করলো। খালাসীর লাজুকতা দেখে ড্রেজার মাস্টারও হাসলেন, ‘কোদালকাটা বোয়াল এই ব্যাটা আরো ভালো রাঁধে। দোষের মধ্যে শুধু এই দোজখীর সাগরেদ।’
বলে তিনি সুখানির দিকে ইঙ্গিত করলেন।
মাস্টারের কথায় সুখানি শব্দ করে হাসলো। বললো, ‘এই গাঙে মনে হয় বহুত কালি বোয়াল আছে। একদিন তোর বোয়াল ভাজা রীডার সাবেরে খাইয়ে দে মন্তাজ।’
মন্তাজ খুশীতে ঘাড় কাত করলো। যদিও আমি কোদালকাটা মাছ ভাজার তাৎপর্য তখনও জানতাম না। তবে পরে অবশ্য মন্তাজের এই মজাদার রান্নার ভক্ত না হয়ে পারিনি। বিষয়টা হলো নদীতে ড্রেজিংয়ের সময় ড্রেজারের কোদাল যখন দ্রুতবেগে নদীর গভীর তলদেশে আবর্তিত হতে থাকে তখন মাঝে মধ্যে বোয়াল মাছের ঝাঁক ঘোলা পানিতে ছোটো মাছ শিকারের লোভে, ঘূর্ণায়মান কোদালের ধারালো চক্রের আওতায় পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে কাদা পানির পাইপের ভিতর দিয়ে তীরের ওপর মাটির ডেলার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। খালাসী মন্তাজ কাদার ভেতর থেকে মাছের সেই বিক্ষিপ্ত অংশগুলো তুলে এনে ধুয়ে পরিস্কার করে ভালো করে মশলা মাখিয়ে রাঁধে। ভালো করে ধুয়ে সাফ করলেও এতে মাটির গন্ধ থেকেই যায়। মন্তাজ আবার এর মধ্যে এমনভাবে মরিচ মাখায় ঝালের চোটে মাছের চর্বি বালিকাদা একাকার হয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত ধরনের স্বাদের সৃষ্টি হয়। ড্রেজারে এ ধরনের খাদ্যের খুব আদর। পরে অবশ্য আমিও এ ধরনের খাদ্যের সমঝদার হয়েছিলাম। চা খেতে খেতে ঠিক হল যে আমি আর সুখানি ডান দিকের কেবিনে থাকবো। আর বাম দিকের কেবিনে থাকবেন ড্রেজার মাস্টার আর মন্তাজ। মন্তাজ দেখলাম এই ব্যবস্থায় তেমন খুশী হলো না। তার পক্ষপাত সুখানির দিকে। সে অবশ্য অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ড্রেজার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমি তো মাস্টার সাব সুখানি ওস্তাদের কামে বিরাম দিই, সুখানের কাজকাম শিখি, আমার তেনার সাথে থাকলেই ভালো হতো।’
মন্তাজের মাথা চুলকানোর দিকে তাকিয়ে সুখানি হাফিজ বাঁকাহাসি হেসে বললো, ‘হায় আল্লাহ। ভালো মানুষের সাথে কেউ বাস করতে চায় না এই দুনিয়ায়। তা না হলে ফিরিস্তার মত মানুষ রেখে মন্তাজের মত উল্লুকও কিনা আমার মত পাপীর সাথেই থাকবার চায়। এই ব্যাটা, তোকে মাস্টার ওস্তাদের সাথেই থাকতে হবে। নেক ব মুরুব্বীর ফাইফরমাস খেটে বেহেস্তে যাবি।”
‘বেহেস্ত চাই না। সুখানি হতে চাই।’
হনুমানের ভঙ্গিতে হাতজোড় করে উঠে দাঁড়ালো মন্তাজ। তার কথায় ড্রেজার মাস্টারসহ সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো মন্তাজ ড্রেজার মাস্টারের কেবিনেই থাকবে। কারণ ঘুংঘুর সালদা খাল খনন স্কীমে আছে আগামী ভরবর্ষা পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জ গিয়ে থামতে হবে। মাত্র দু’টি ড্রেজার একশো গজ আগু-পিছে থেকে এই স্কীমে কাজ করে যাবে। সুখান ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্যেও কেউ বিশ্রাম পাবে না। ড্রেজার মাস্টার, সুখানি ও সুখানের শিক্ষানবীস খালাসী মন্তাজ পরপর একটানা কাজ করে যাবে। ঠিক হলো আগামীকাল দিনের বেলাটা সুখানি হাফিজ ডেজার আত্রাইকে স্কীম পয়েন্টে রেডি করবে। মন্তাজ পাইপ বাঁধে তুলবে। আর বাঁধ বাঁধার কাজে সাহায্য করবে স্কীমের লেবার কন্ট্রাক্টরের লোকেরা। রাতের প্রথম দ্বিতীয় প্রহর থেকে ড্রেজার মাস্টার নিজে সুখান ধরে ড্রেজিং শুরু করবেন। তিনি ভোর পাঁচটায় সুখান ছাড়বেন। মাত্র এক ঘন্টার বিরতির পর হাফিজ সুখানি আবার সুখান ধরবে। দুপুরে খাওয়ার সময়টায় মন্তাজকে একঘন্টার জন্য সুখান দেয়া হবে। খাওয়ার পর আবার হাফিজ সুখানি ড্রেজিং চালাবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। তারপর আবার দু’ঘন্টা বিরতি। খাওয়া-দাওয়ার পর এক ঘন্টা মন্তাজের হাতে থাকবে সুখান। রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ডেজার মাস্টার। সকাল, দুপুর, রাতের মধ্যভাগে আমাকে পানির জোয়ার ভাটার রিডিং নিয়ে সুখানে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে জানাতে হবে। আমার রিপোর্টের ওপর কোদাল ওঠা-নামা করবে। ড্রেজার মাস্টার বললো, আগামীকাল সকালেই আমাকে একটা ডিঙি নৌকা কমপক্ষে ছ’মাসের জন্য ভাড়া নিতে হবে যাতে গেজরীডিং এবং একই সঙ্গে পারাপার ও হাট-বাজারে যাওয়াআসা চলে। আমি মাস্টারের কথায় সায় দিয়ে সুখানি হাফিজকে অনুসরণ করে ডানদিকের কেবিনে এসে বিছানা পাতলাম।
ড্রেজিং শুরু হয়েছে আজ এক সপ্তাহ। এর ভেতর সুখানি হাফিজের সাথে পরিচয় গাঢ়তর হয়েছে। পাশাপাশি বাঙ্কের বিছানায় দু’জন রাত কাটাই। রাত কাটানো কথাটা ঠিক নয়। কারণ সারাদিন সুখানি সুখান ঘোরায়। সন্ধ্যার দিকে কিছুক্ষণের জন্য সে কেবিনে বিশ্রাম নিতে আসে। মন্তাজ রাতের খাওয়ার জন্য না ডাকা পর্যন্ত সে বিনা বাক্যব্যয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। খাওয়ার পর আরও ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে সে রাত কাটাতে নবীনগর বাজারের দিকে রওনা দেয়। ভোর ছ’টায় ফিরে এসে চা-নাস্তার জন্য মন্তাজকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে। মন্তাজ বিনয়ীর মত চায়ের মগ বাড়িয়ে দিয়ে বোকার মত হাসে, ‘রাতটা কেমন কাটলো ওস্তাদের? মালটা কেমন ছিল, লাল গ্রীজের মত পিছলা…..’
‘এই হারামজাদা চুপ কর। লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেবো, শালা উল্লুক কাঁহাকা। এই ব্যাটা মুরুব্বী দেখে না।” বলে আড় চোখে একবার ড্রেজার মাস্টারের দিকে তাকায় এবং আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ টেপে। আমি ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিরপেক্ষ “হাসিতে নিরুপায় ভাব দেখাই। ড্রেজার মাস্টারও মৃদু হাসে, ‘পাপ যেদিন ধরবে সুখানি তোমাকে, সেদিন সারা গতর পচে যাবে। শুধরাবার অষুধ থাকবে না। গতরের বাহাদুরি একদিন আমারও ছিল।’
আল মাহমুদের গল্প
‘ছিল নাকি মাস্টার! তখন বুঝি নদী ছেড়ে গঞ্জের গলিতে কোদাল নামাতেন?’ সুখানির কথায় ড্রেজার মাস্টার না হেসে পারেন না। বলেন, ‘ছাড়ো মিয়া এসব খারাপ নেশা, বৌ-বাচ্চার দিকে নজর দাও। পশ্চিম দিকে আছাড় খেয়ে পড়ো। মানুষের যৌবন বড় কম। বড়ই কম।’
একদিন সকাল ৮টার দিকে গেজের রিডিং নিয়ে আমি ড্রেজার মাস্টারকে রিপোর্ট করতে গেলে দেখলাম সুখানপয়েন্টে মাস্টার বা সুখানির বদলে মন্তাজ ড্রেজিং করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হলো মন্তাজ, ওস্তাদরা কই?’
‘মাস্টার সাব কেবিনে আছে। আর এখন পর্যন্ত সুখানি ওস্তাদ ফেরেনি। মনে হয় বাজারের গলিতে গতরাতে বেদম বোতল টেনে মেয়ে মানুষ নিয়ে বেহুঁশ হয়ে আছে। কেউ গিয়ে ধরে নিয়ে না এলে কয়েকদিন আসবে না।’
সুখান ঘোরাতে ঘোরাতে বেশ রস করে জবাব দিল মন্তাজ। আমি দেখলাম ড্রেজিংয়ের কাজ যতই পরিশ্রমসাধ্য হোক না কেন মন্তাজের এতে কোন ক্লান্তি নেই। তার সমস্ত স্বপ্ন সে সুখানি হবে।
আমি বললাম, ‘বল কি! সুখানি না এলে এখনকার পানির রিপোর্ট আমি কাকে দেবো, জোয়ার তো চার ফুট নেমে গেছে। কোদাল তো টানতে হবে। তুমি পারবে?”
‘না সাব। আমার দ্বারা একাজটা হবে না। আমি এখনও কোদাল কমাতে বাড়াতে সাহস পাই না। আপনি বরং মাস্টারকে বলুন। আমি তো এপ্রেন্টিস, খালাসি।’
আমার দিকে না ফিরেই জবাব দিল মন্তাজ। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি না হয় ড্রেজার মাস্টারকেই রিপোর্ট করছি। কিন্তু হাফিজের একটা খোঁজ নিতে হবে না! সে সকালেও ফিরলো না?’
‘কোনো চিন্তা করবেন না রীডার সাব। সুখানি ওস্তাদের কামাইয়ের কথা আমরা সবাই জানি। গঞ্জের কাছে গেলেই তার গতর টন টন করে। লোকটা আর মানুষ থাকে না। লোহার মানুষের সাথে কাজ করতে এসেছেন। আস্তে ধীরে সব বুঝবেন। আপনি এখন মাস্টার সাহেবের কাছে গিয়ে ভাটার রিপোর্ট দিন। তিনি হুইল-কোদাল ঠিক করে দিয়ে যাবেন।’
আমি বললাম, ‘এরকম কেন হয় মন্তাজ, সুখানির তো শুনেছি বৌ-বাচ্চা আছে। ঘর-সংসার আছে।’
‘সবই আছে। সংসারের দিকে টানও আছে। কিন্তু ঐ যে ড্রেজারের ভিতর গ্রীজমাখা লোহার বড়ো ডান্ডাটা মেশিনের ভেতর যাওয়া-আসা করছে দেখতে পাচ্ছেন ড্রেজারের মানুষ এসব দেখতে দেখতে, কোদালের ওঠা-নামা, পিস্টন পাইপ গ্রীজ দেখতে দেখতে আর মানুষ থাকে না। লোহার ডান্ডা, পিস্টন আর কাদাভরা বিশাল পাইপ হয়ে যায়। বুঝলেন! আর তা না হতে পারলে ড্রেজার মাস্টারের মত ফিরিস্তা হয়ে তসবীহ টেপে। মাঝামাঝি কোনো পথ নেই।’ বলে মন্তাজ হাসতে লাগলো।
আমি বললাম, ‘তোমারও এ দোষ আছে নাকি!’ ‘আমার তো সুখানি না হওয়া পর্যন্ত হাটে-বাজারে যাওয়ার নিয়ম বা ছুটি নেই। আগামী বছরের মধ্যে আমার প্রমোশন চাই। বুঝলেন?
‘বুঝলাম। তবে তো তোমার বড়ো কষ্ট।’
আমার কথায় মন্তাজ জোরে হেসে উঠলো। যদিও তার হাসি মেশিনের গম্ভীর গর্জনের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। তবুও একটা পরিশ্রমী কামুক মানুষের কালো মুখের ঝকঝকে দাঁতের সারি দেখতে পেয়ে আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
সারারাত মন্তাজ কাজ করে সকালে আমাকে আর ড্রেজার মাস্টার আজিজ মিয়াকে ঘুম থেকে তুলে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। সুখানি তখনও ফেরেনি। আমি চা খেতে খেতে মাস্টারকে বললাম, ‘আজ দিনের বেলা তো ওস্তাদ আপনি সুখান ধরবেন। এখন মন্তাজকে সুখানির তালাশে একটু বাজারে পাঠালে হয় না? মানুষটা যে গায়েব হয়ে গেল।’ আমার কথায় মাস্টার চিন্তান্বিত মুখে হাসলেও, বুঝলাম তারও হাফিজের প্রতি একটা টান আছে। বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি সকালের রিডিংটা আমাকে রিপোর্ট করে মন্তাজকে নিয়ে বাজারে ঘুরে আসুন।’
মাস্টারের কথায় মন্তাজ দেখলাম মহাখুশী। বললো, ‘আপনি মাস্টার সত্যিই ফিরিস্তা। আমি আজ পর্যন্ত ড্রেজারে এসেছি তক কেউ একবার বাজারে পাঠায়নি। ওস্তাদকে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবো।’
আমি ও মন্তাজ সকাল দশটায় নবীনগর বাজারে একটা চায়ের দোকানে এসে বসলাম। চা খেয়ে মন্তাজ আমাকে বসিয়ে গেলো সুখানির খোঁজে। আমাকে সে সঙ্গে নিতে নারাজ। তার ধারণা আমার মত লোকের ঐসব খারাপ পাড়ায় যাওয়া উচিত নয়। আমিও তাকে পীড়াপীড়ি না করে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বললাম। ঘন্টা দেড়েক পরে মন্তাজ ফিরে এসে বললো, ‘চলুন, ওস্তাদ আপনাকে ডাকছে।’
‘কোথায় ?”
‘ঐ যে কাঠালি বটগাছটা আছে, তার পেছনের বস্তিতে।’
‘ওখানে যাওয়া আমার ঠিক হবে?”
‘ওস্তাদতো বললো, আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে।’
আমিও আর জোর না দেখিয়ে বললাম, ‘চলো।’
আমি মন্তাজের পেছন পেছন গেলাম। বটগাছটার নিচেই কতকগুলো ঘর। অধিকাংশ টিনের। কোনো কোনো ঘর থেকে ভাঙা গলায় মেয়েদের হারমোনিয়ামে গলা সাধার শব্দ আসছে। আর হাসি মস্করার সাথে অশ্লীল গালিগালাজ। পাশের পানের দোকানে দাঁড়ানো একটা ছিপছিপে কালো মেয়ে পানের পিক ফেলার ভঙ্গি করে মন্তাজকে কি যেন বললো। মন্তাজ হাসলো কিন্তু জবাব দিল না।
আমরা পাড়ার শেষ মাথায় একটা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। মন্তাজ দরজায় ধাক্কা দিলে ভেতর থেকে সুখানির গলা শোনা গেলো, ‘কে?’ ‘আমি ওস্তাদ। রীডার সাবকে নিয়ে এসেছি।’ দরজা খুলে গেলো। দেখলাম সুখানি একটা বদনা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, ‘আসুন।’
আমি ভেতরে গেলাম। সুখানি মন্তাজকে বললো, ‘তুই চলে যা। মাস্টারের কাজে গিয়ে হাত লাগা। রীডার সাব একটু পরে যাবেন, আর আমি যাবো আগামীকাল। মাস্টারকে আমার সালাম বলিস আর বলিস এখানে একজনের খুব জ্বর।’
মন্তাজ একবার ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো। সামনের চৌকিতে বুক পর্যন্ত কাপড়ঢাকা দিয়ে বেশ স্বাস্থ্যবতী একটা মেয়ে শুয়ে আছে। চিত হয়ে থাকায় বালিশের ওপর তার ভেজা চুল একটা পেতে রাখা বালতির ভেতর তলা পর্যন্ত উপচে পড়েছে। চুল বেশ ঘন এবং কোঁকড়ানো। বুক দু’টি বড় পেয়ালার মত ভারি বলে বোধ হলো। চোখ নিমীলিত। একবার বোধহয় ঘরের ভিতর আমার পা রাখার সাথে সাথে চোখজোড়া মেলেছিল। আবার মুদে ফেলেছে। সম্ভবত সুখানি এতক্ষণ এর মাথাতেই পানির ধারা দিচ্ছিলো। মেয়েটার চেহারা একটু ফ্যাকাশে। ঠোঁট জোড়া পুরো, মাংসল। ঠোঁটের ওপর পান খাওয়ার চিহ্ন আছে। কালসিটে। বুক থেকে পা পর্যন্ত একটা কাঁথায় শরীর ঢাকা থাকলেও এর শারীরিক সামর্থ্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নাভীর নিচের দিকের অংশ এমনভাবে ভাঁজে চিহ্নিত আছে প্রথমেই সেদিকে নজর পড়ে। মন্তাজকে চৌকির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুখানি ধমক দিল, ‘দাঁড়িয়ে কি দেখছিস? এক্ষুণি পালা।’
মন্তাজ দাঁত বের করে হেসে একবার আমার দিকে তাকিয়েই পালিয়ে গেলো। আমি বললাম, “কি হয়েছে ওস্তাদ?’
‘জ্বর হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে আমি এর ঘরেই আসতাম। বড় ভালো মেয়ে। দু’দিন ধরে জ্বর হয়েছে। এখানে বাড়িউলিটুলি নেই। এ অবস্থায় কোন মানুষকে কেউ ফেলে যেতে পারে ?”
আমি অবাক হলেও কিছু বললাম না। ঘরের ভেতর শোয়ার চৌকিটি ছাড়া আর কোনো বসার ব্যবস্থা নেই। একটা ছোট টেবিলের ওপর পিতলের ফুলদানী। বাসি ফুল নেতিয়ে আছে ফুলদানীতে। ফুলদানীটার পাশে সুখানির ব্যাগ ও টর্চলাইট। কিছু রেজকি ও সিগারেটের অনেকগুলো খালি প্যাকেট ছড়ানো। আমি একটা বসার জায়গা খুঁজছিলাম। সুখানি বললো, ‘চৌকিতেই বসুন।’
আমি দ্বিধা না করে চৌকিতে বসে মেয়েটির কপালে হাত দিলাম। চোখ মেলে তাকালো মেয়েটি। বুঝলাম এখন গায়ে জ্বর নেই। কপালটি বরং ঠান্ডাই মনে হলো। বললাম, ‘জ্বর নেই। মাথাটা মুছিয়ে দিলে হয়। তাড়াতাড়ি করুন, ঠান্ডা লেগে যাবে।’
আমার কথায় সুখানি মাথায় পানি ঢালা বন্ধ করে দিয়ে একটা ছোটো গামছায় মেয়েটার মাথা ও মুখ মুছিয়ে দিতে গেলো। মেয়েটি আবার চোখ মেললো। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, ‘তোমার জ্বর ছেড়েছে। কি নাম তোমার?’ আমার কথা ঠিকমতো বুঝতে পেরেছে কিনা বোঝা গেলো না। তবে তার ঠোঁট নড়লো। আমি তার কথা অস্পষ্টতার জন্যে ধরতে না পারায় সুখানির দিকে তাকালাম। সুখানি বললো, ‘হুসনা।’
সুখানির গলায় আবেগ ও স্নেহের আভাস। আমার মনে হলো যত কম দিনের পরিচয়ই হোক সুখানি বোধহয় মেয়েটির সাথে জড়িয়ে গেছে। আমি বললাম, ‘ড্রেজিংয়ের কাজকামে কামাই দিয়ে এখানে পড়ে থাকলে সরকারী চাকরী থাকে?”
সুখানি চকিতভাবে আমার পানে দেখলো। বললো, ‘আজ রাতেই ড্রেজারে ফিরবো। দেখুন না রীডার সাব কেমন মুস্কিলে পড়েছি। এসেছিলাম মজা লুটতে। এখন কেমন বিপদে পড়েছি। খারাপ হলেও মানুষতো।’
আমাদের কথার ফাঁকে হুসনা বিছানায় উঠে বসলো। আমি ওকে সাহায্য করতে গিয়ে বালিশটা ওর পিঠের দিকে গুঁজে দিলাম। মেয়েটি আমার দিকে ফিরলো। চোখে মমতার রক্তাভা। বললো, ‘নিয়ে যান এই রাক্ষসটাকে। আট ন’দিনে আমাকে শুষে খেয়েছে। মানুষ নয় লোহা।’
সুখানি হাসলো, ‘আপনি চলে যান রীডার সাব। আমি আগামী কাল সকালে ড্রেজারে ফিরবো।’ আমি সুখানির কথায় উঠলাম। পেছনে হুসনার সাথে সুখানির কথা কাটাকাটি শুনতে পেলাম, ‘তুমিও যাও। আমাকে তো খেয়ে ফেলেছো। আর কি খাবে? মেয়েমানুষের হাড্ডি খাবে?”
‘তোকে ভালোবাসি। তোকে বিয়ে করবো।”
‘রাখো তোমার বিয়েশাদী। ভাগো।”
একদিন পর সুখানি ফিরে এলো। ড্রেজার মাস্টার তাকে খুব বকাঝকা করলেন। চাকুরির ভয় দেখালেন। দেখলাম সুখানি গম্ভীর মুখে সব সহ্য করলো। একটি কথারও জবাব না দিয়ে পানির জোয়ার ভাটার চার্টটা দেখে সুখানের পাটাতনে দাঁড়িয়ে হেন্ডেল ধরলো। মুখে একটা নির্বিকার ভাব। আমি গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘হুসনা কেমন আছে ওস্তাদ?’
‘ভালো হয়েছে।’
‘আর যাবেন না ওর কাছে?’
‘না।’
‘কেন?’
‘কাল থেকে আমরা এখানে থাকবো না। সামনে সিদ্ধিরগঞ্জ ঘাটে গিয়ে আবার ড্রেজিং হবে।’ বললো সুখানি।
আমারও ব্যাপারটা হঠাৎ স্মরণ হলো। আমরা যে ডান তীর ধরে খনন করছি তা রাতেই শেষ হয়ে যাবে। সামনে নদী গভীর। এখানে ডান তীর আর কাটতে হবে না। বামপাশে ড্রেজার বালেশ্বর আরও দিন দশেক কাটবে। আত্রাই যাবে সিদ্ধিরগঞ্জ ঘাটে। আমি বললাম, ‘হুসনাকে আপনি ভালোবাসেন?’
‘না।’ ‘কেন ?’
‘সিদ্ধিরগঞ্জ বাজারে আরও খানকিদের পাড়া আছে।’ ‘হুসনা কিন্তু আপনাকে ভালোবাসে।’
‘কি করে বুঝলেন?’
‘আপনার প্রতি তার ঘৃণা দেখে।’ বললাম আমি।
সুখানি অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথা বললো না। আমি দেখলাম ভয়ানক বেগে হাফিজ সুখানের স্টিয়ারিং ঘুড়িয়ে তুমুল আলোড়ন তুলে ড্রেজিং করছে। ড্রেজার মাষ্টার দূর থেকে একবার হাফিজকে দেখে মৃদু হেসে কেবিনে চলে গেলেন। মনে হচ্ছে নিচে নদীর ভেতর ভূমিকম্প উঠেছে। আর একটা মানুষ তার লোহার বাসরঘর নিয়ে একবার ঢেউয়ের ওপর লাফিয়ে উঠেই আবার দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার মুখের কাছে মুখ এনে সুখানি বললো, ‘কাটা নদীতে কোদাল ফেরে না, চলুন সিদ্ধিরগঞ্জ।’
আমি বললাম, ‘হুসনাকে নিয়ে আসুন। আপনিতো ওকে বিয়ে করবেন বলেছিলেন।’ ‘ও, আপনি সেদিন সবি শুনেছেন?”
‘মেয়েটি দেখতে সুন্দর। স্বাস্থ্যবতী।’
‘আমি ওকে চাইনা। আমার মাটিকাটা এখানে শেষ। সামনে সালদা নদী, আমি সেখানে কাটবো।’ বললো সুখানি।
‘আমি বুঝতে পারলাম না হুসনার সাথে সালদা নদীর কি সম্পর্ক। আমি বললাম, ‘আমি তো নদীর কথা বলছি না। নবীনগর বাজারের মেয়েটির কথা বলছি। যার জ্বর হয়েছিল বলে আপনি মাথায় পানির ধারা দিয়েছিলেন। বিয়ের কথা বলেছিলেন।’
‘আমিও তাই বলছি। তিতাসে আমার কোদালের কাম শেষ। আমি সালদা নদীতে কোদাল নামাবো। এখানে আর তল পাই না, দেখছেন না?”
এতক্ষণ বাতাসের ধাক্কায় সুখানির মুখের কথা উড়ে যাচ্ছিল দেখে কানটা তার মুখের কাছে আনতে গিয়ে বুঝলাম নাকে দিশি মদের গন্ধ লাগছে। আমি একটু পিছিয়ে এসে দাঁড়ালাম। ভীষণ শব্দ করে নদী তোলপাড় করছে। জল যে এমন ব্যাকুল ঘূর্ণিপাক তুলতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। আমি পেছনের দিকে তাকালাম। পেছনে বিশাল ইস্পাতের পিচ্ছিল পিস্টনের দন্ডটি দ্রুততালে ইঞ্জিনের নির্দিষ্ট গহ্বরে আসা-যাওয়া করছে। আর ওপর থেকে মন্তাজ সেখানে একটি নলের সাহায্যে লাল গ্রীজ চাপ দিয়ে দিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। আমি দেখলাম কম্পমান ড্রেজারের লৌহ কাঠামোর মধ্যে কাউকেই আর মানুষের মত মনে হচ্ছে না। সকলেই যেন ঘূর্ণায়মান কোদাল। সুখানিকে মনে হলো একটা ইস্পাতের উত্তপ্ত থামের মত। আমি নিরুপায়ভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষে আমার ডিঙি নৌকাটির খোঁজ করতে সিঁড়ির দিকে নেমে গেলাম। এখন ভর জোয়ারের সময় পানির রিডিং না নিলে কোদাল আর কাদার তল পাবে না।