মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে হঠাৎ দিল্লিতে বদলির নির্দেশকে মোদী সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতি ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। আইনগত ভাবে এই প্রক্রিয়ার ত্রুটি বিচ্যুতির থেকেও ঘটনার সময়োপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, মুখ্যসচিব কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকরি করেন। কেন্দ্রই আধিকারিকদের রাজ্যে কাজ করার জন্য অনুমতি দেন। কিন্তু মুখ্যসচিব যে রাজ্যে আধিকারিকের দায়িত্ব পালন করছেন, সে রাজ্যের সুবিধা অসুবিধাকে বেশি গরুত্ব দিতেই হয়।
এই মুহুর্তে ভয়াবহ করোনার সঙ্কটজনক পরিস্থিতি, একই সঙ্গে ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে পরিস্থিতি আরও জটিল। সবার আগে তো সেই পরিস্থিতির কথা বিবেচ্য। কিন্তু সেই বিবেচনা যখন প্রাধান্য পেলনা তখন এই কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রতিহিংসার রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য মুখ্যসচিব আলাপনের অবসর নেওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আগেই মুখ্যসচিবের জন্য তিন মাস এক্সটেনশন চেয়েছিলেন। তা মঞ্জুর করে মোদী সরকার। তারপরও এক্সটেনশন পিরিয়ডে তাঁকে আচমকাই বদলির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণতই অবিবেচনামূলক কাজ।
রাজ্যের প্রাক্তন এক মুখ্যসচিব বলেছেন, ‘‘আইএএস ক্যাডার বিধি, ১৯৫৪-র বিধি (১)-এর বিধান অনুযায়ী কোনও সচিব পর্যায়ের আধিকারিক কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে যাওয়ার আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ হতেই পারে। তবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার যদি সেই আধিকারিককে অনুমোদন দেন তা হলেই কেন্দ্রীয় সরকার এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস বিধি, ১৯৫৮ সালের ধারা ১৬ (১)-এর (মৃত্যু তথা অবসরকালীন সুবিধা) বিধান অনুসারে কেন্দ্রীয় সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেবল তিন মাসের জন্য এই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। ভারতীয় সচিব পর্যায়ের আধিকারিকরা সাধারণত ৬০ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। রাজ্য সরকারের সুপারিশে ছ’মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। তিনি যদি সাধারণ ভাবে অবসর নেওয়ার তারিখে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে যোগ না দেন, তবে তিনি অবসরগ্রহণের তারিখের বাইরে সেই কাজে আর যোগ দিতে পারবেন না। কারণ তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছে কেবল মুখ্যসচিবের পদের জন্যই।’’
রাজ্যের সদ্য বিধানসভা নির্বাচনে ২০০ আসন পেয়ে বাংলা দখল করছে, এমনটাই আশা করেছিল বিজেপি। কিন্তু ফল হয়েছে একেবারেই উলটো। বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ফের বাংলার শাসন ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল। সেই ফলাফলকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। প্রতিহিংসায় তারা বাংলার সরকার তথা মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই উদ্দেশ্যেই তারা করোনা এবং ঘূর্ণিঝড় ইয়াস পরবর্তী পরিস্থিতিতে মুখ্যসচিবকে বদলির নির্দেশ দিয়েছে। যে কারণে কেবল শাসক দলই নয় বামেরাও সচিবের বদলির নির্দেশের বিরোধিতা করেছে। তাঁদের অভিযোগ, মোদি সরকার আক্রমণাত্মক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতো আচরণ করছে।
গত কয়েকদিনের প্রশাসনিক ঘটনাক্রমে চোখ রাখলে প্রতিহিংসার রূপটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার রাতে কেন্দ্রীয় সরকার চিঠি পাঠিয়ে জানায়, ১৯৮৭ ব্যাচের আইএএস অফিসার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার যোগদান কমিটি ভারত সরকারের কাজে যোগদানের অনুমোদন দিয়েছে। অবিলম্বে তাঁকে সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বলা হয়েছে ৩১ মে সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির নর্থ ব্লকে তাঁকে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে করোনা পরিস্থিতির কারণে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্যসচিবের মেয়াদ বাড়ানোর আর্জি করেছিলেন। কেন্দ্র ৩ মাসের জন্য সেই মেয়াদ বৃদ্ধিও করেছে। তারপর কেন এই সিদ্ধান্ত?
পরবর্তী ঘটনা; বিজেপির অভিযোগ কলাইকুণ্ডায় মুখ্যসচিব বা মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে যাননি। ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই মুখ্যসচিব বা স্বরাষ্ট্রসচিব, কেউই ছিলেন না। তার কয়েক ঘণ্টা পরেই আসে সেই বদলির নির্দেশ। স্বাভাবিক ভাবে এর পিছনে যে রাজনৈতিক যোগ রয়েছে সেটা ভাবাই স্বাভাবিক। ইয়াসের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাক্ষাৎ এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়েই জল্পনা শুরু হয়েছিল। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘূর্ণিঝড় ইয়াস পর্যালোচনা বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার কয়েক ঘন্টা পরই, কেন্দ্রের কর্মীবর্গ মন্ত্রক থেকে চিঠি পাঠানো হয় রাজ্যের মুখ্যসচিবকে।
তবে হ্যাঁ, বাংলার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতির জন্যই যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে ছিলেন না, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী যোগ না দেওয়ায় যে সমালোচনার ঝড় বইছে, তার যোগ্য জবাব দিয়ে এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলনেতাকে ডাকা হয়। কিন্তু তার আগের সপ্তাহে যখন প্রধানমন্ত্রী তাউটের পর প্রশাসনিক বৈঠক করতে গুজরাতে গিয়েছিলেন, তখন কেন কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতাকে ডাকা হল না? বরং যাঁদের সেই বৈঠকে থাকার কথা নয়, তাঁরা সেই বৈঠকে কেন ছিলেন? মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন, বলা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বৈঠক হবে। ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য সফরসূচি কাটছাঁট করি। আমাকে ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। আর সবসময় যে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে মুখ্যমন্ত্রীকে যেতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমি প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে আমার মুখ্যসচিবের সঙ্গে দিঘা যাই। প্রধানমন্ত্রী আমাকে পা ছুঁতে বললে বাংলার জন্য তাই করব।’
এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগেই ঘোষণা করা হয় যে ইয়াস দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়া হবে। তার পরের দিন প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘোষণা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে হার হয়েছে বলেই কি প্রতিহিংসার রাজনীতি হচ্ছে? সেই কারণেই কি মুখ্যসচিবের বদলি? মুখ্যসচিবের মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হয়েছিল। তার পরও কেন মুখ্যসচিবকে বদলি করা হল? পরে মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মমতা। প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব।
৩০ মিনিট অপেক্ষার করানোর অভিযোগ নিয়ে হইচই বেধেছে। তার জেরে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত একটি রাজ্যের মুখ্যসচিবকে দিল্লিতে টেনে আনাটা যেমন দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচয়, অন্যদিকে বাংলার মানুষকে শাস্তির দেওয়ার জন্য মোদী সরকারের ইচ্ছাকৃত ষড়যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে। তখন তো এই ঘটনার একটা উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বাংলায় গো-হারান হারের বদলা নিতে, দলবদলুদের বিজেপিতে ধরে রাখার দাওয়াই দিতে যখন সিবিআই প্রায় ছ’বছর পর মিইয়ে যাওয়া মামলার তদন্তে নামতে পারে, তখন কলাইকুন্ডার ঘটনা নিয়েই বা কেন হবে না!
ভাল লিখেছেন। যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা। ধন্যবাদ
ঘটনাটিকে বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহাংসা ছাড়া অন্য কোনও ভাবে দেখা যায় না। ২০০টা আসন আর তার বিনিময়ে সুনার
বঙ্গালের দখল নেওয়ার স্বপ্ন যখনি ঘুচেছে তখন থেকেই শুরু হয়েছে ওদের শয়তানি, কিন্তু একদিন তার চরম শাস্তি ওরা
পাবে।
বিজেপির এই প্রতি হিংসা রাজনীতি কোনো নয়া বিষয় না। এই দল সৃষ্টি থেকেই একে ওপরের মধ্যে অন্ত-গোষ্ঠী দ্বন্ধ শুরু
করেছিল।
যুক্তি শানিত ব্যাখ্যা। প্রতিহিংসার এই নগ্ন আস্ফালন দেখছে সারা দেশ।