গতকাল, সোমবার যা ছিল জল্পনার স্তরে, মঙ্গলবার সকালেই তা স্পষ্ট হয়ে গেল — কেন্দ্রীয় সরকার শে-কজ করেছে রাজ্যের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। যদিও আলাপন আজ, ১ জুন ২০২১ আর রাজ্যের মুখ্যসচিব পদে নেই, তাহলেও এই শো-কজ মুখ্যসচিবকেই, কেননা চিঠিটির তারিখ বসানো হয়েছে ৩১ মে ২০২১। আর এই কারণ দর্শানোর চিঠির সঙ্গেই শুরু হতে চলেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক তথা আইনি লড়াই, যার পরিণতির সঙ্গে আমাদের দেশের গণতন্ত্রের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। বিষয়টায় যাওয়ার আগে একনজরে গত দিন কুড়ির ঘটনাক্রম দেখে নেওয়া যেতে পারে।
১০ মে — আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাকরির মেয়াদ ছিল ৩১ মে ২০২১ পর্যন্ত। ওইদিনই তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। রাজ্য কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব করে, বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে আরও তিন মাস তাঁর পদে থেকে কাজ করতে দেওয়া হোক।
২৪ মে — দিন পনেরো অপেক্ষা করে ২৪ মে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দেয় কেন্দ্র। এর অর্থ হলো, রাজ্যের মুখ্যসচিব হিসেবেই ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন আলাপন।
২৬ মে – রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় আছড়ে পড়ে সাইক্লোন ‘ইয়াস’। অনেকগুলি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ের কয়েকদিন আগে থাকতেই মুখ্যমন্ত্রী নিজে সমস্ত ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেন।
২৭ মে — রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন, বাড়িঘর ভেঙে গেছে বিশাল সংখ্যক মানুষের। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত করেন, পরদিন, ২৮ মে তিনি অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে বেরোবেন। এইদিনই জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীও ওই ২৮ তারিখেই ঝড় বিধ্বস্ত ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ পরিদর্শন করবেন আকাশপথে। আরও জানা যায়, ২৮ তারিখেই প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের কলাইকুন্ডায় বন্যাজনিত পরিস্থিতি নিয়ে মিটিং করবেন। কিন্তু খবর আসতে থাকে, এই মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট অফিসররা ছাড়াও থাকবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, দেবশ্রী চৌধুরি, রাজ্যপাল জগদীপ ধনখর এবং অদ্ভুত ভাবে রাজ্যে বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি এমএলএ শুভেন্দু অধিকারী। এই জায়গাটাতেই বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে। অপ্রাসঙ্গিক ভাবে শুভেন্দুর উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে বিজেপি এমএলএ-র উপস্থিতি প্রচলিত সব পদ্ধতি ও বিধির পরিপন্থী বলে মনে করতে থাকেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন।
২৮ মে — এদিন সকাল থেকেই ঝড়-বন্য বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রীও ওড়িশা পরিদর্শন করে পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকার উপর দিয়ে উড়ে কলাইকুন্ডায় নামেন। সেখানে সভাস্থলে আগে উল্লিখিত ব্যক্তিরা ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার চান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাতে সাড়া না দেওয়ায় সভাস্থলে যান মুখ্যমন্ত্রী, সঙ্গে ছিলেন মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কিত বিবরণ সহ ২০ হাজার কোটি টাকার দাবিপত্র তুলে দেন। এর পরে মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিব দিঘায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে যান। হঠাৎই খবর আসে, মুখ্যসচিবকে কেন্দ্রীয় কাজে যোগ দিতে নির্দেশ পাঠিয়েছে কেন্দ্র। নির্দেশে বলা হয়েছে, ৩১ মে সকাল দশটার মধ্যে আলাপন যেন কেন্দ্রের কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রকে যোগ দেন। কেন্দ্রের এহেন একতরফা আচরণে বিস্মিত হয়ে যায় সংসশ্লিষ্ট মহল।
২৯ মে — মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন করে কেন্দ্রকে অনুরোধ করেন, আলাপনের সম্পর্কে বদলির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে। কিন্তু কেন্দ্র অনড় থাকে।
৩১ মে — এই দিনটি রাজ্যের ইতিহাসে দারুণ ঘটনাবহুল দিন। এদিন সকালেই মুখ্যমন্ত্রী পাঁচ পৃষ্ঠার চিঠি লেখেন প্রধানমন্ত্রীকে, অনুরোধ করেন, আলাপনের উপর নির্দেশ প্রত্যাহার করতে। সেই সঙ্গে কলাইকুন্ডা মিটিংয়ের উল্লেখও করেন তিনি। কিন্তু কেন্দ্র কিছুই করে না। এই অবস্থায় আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণ না করে অবসর নিয়ে নেন। তাঁকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা পদে তিন বছরের জন্য নিয়োগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা নিজে এই সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান। বিকেলের দিকে কেন্দ্রীয় সরকার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দ্বিতীয় চিঠি পাঠিয়ে বলে, পরের দিন, ১ জুন তিনি যেন কেন্দ্রের কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রকে যোগ দেন। অবসর নিয়ে নেওয়ার পরে এহেন চিঠি পাঠানো আইনসম্মত কি-না, তা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। এইদিনই খবর ছড়াতে থাকে, কেন্দ্র আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে শো-কজ করেছে, কিন্তু তেমন কোনো চিঠির হদিশ এ দিন পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, ৩১ মে তারিখেই শো-কজ চিটিও দিয়েছে কেন্দ্র। তাই সব মিলিয়ে এইদিন মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি পাঠান এবং কেন্দ্র আলাপনকে দু’টি চিঠি পাঠায়।

১ জুন — আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের প্রধান উপদেষ্টা হন। এদিন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া তৃতীয় চিঠির (৩১ মে তারিখের শো-কজ চিঠি) বয়ান সামনে আসে, যেখানে কারণ দর্শানোর কথা বলা হয়েছে। তিনদিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে তাঁকে। চিঠিতে লেখা হয়েছে,
“Now therefore, Shri Alapan Bandyapadhyay, Chief Secretary, Government of West Bengal is hereby called upon to explain in writing to this ministry within a period of 3 (three) days, as to why action should not be taken against him under Section 51 of the Disaster Management Act, 2005 for the aforesaid violation under the Disaster Management Act, 2005.”
অভিযোগের মূল বিষয় হলো, কেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর ডাকা মিটিংয়ে হাজির হননি।
নানা প্রশ্ন
রাজ্যের মুখ্যসচিব মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করেন। মুখ্যমন্ত্রী যখন তাঁর বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে মুখ্যসচিবকে যেতে বলেছেন, তখন সে কাজের বা অন্য কোনো কাজ না করার জন্য শো-কজ করা যায় কি? রাজ্যের ক্যাডার আইএএস অফিসাররা কার কথা শুনবেন, রাজ্য সরকারের না কেন্দ্রের? বন্যা-দুর্যোগের পরিস্থিতিতে সময়ের সংক্ষেপ করতে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সভায় যান, কিন্তু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান। এহেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও কি প্রোটোকল বড় করে দেখতে হবে, যদি প্রোটোকলে কোনো সামান্য খুঁটিনাটি ত্রুটিও দেখা যায়? প্রশ্ন উঠছে, এখন তো আলাপন অবসর নিয়ে নিয়েছেন, এখন কি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব? এমন গুচ্ছ গুচ্ছ প্রশ্ন উঠছে সারা দেশ জুড়ে। এই বিতর্কের একটা পরিণতি দরকার। ঠিক হওয়া দরকার, রাজ্যে কর্মরত অফিসাররা রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে চলবেন, না-কি কেন্দ্রের অঙ্গুলিহেলনে? আইন জগতের অনেকেই কিন্তু বলছেন, মামলা আদালতে গড়ালে সেটা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আইনি যুদ্ধে কেন্দ্রের খুব একটা সুবিধা হবার সম্ভাবনা যে কম, সেটাও মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞই।