বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইতালীয় কথাসাহিত্যে স্বনামধন্য ছিলেন আলবার্তো মোরাভিয়া। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলি আধুনিক যৌনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্ববাদের বিষয়গুলি অন্বেষণ করেছে। ‘উওম্যান অফ রোম’ তাঁর লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘রোমান টেলস’ গল্পগ্রন্থ। সেই গ্রন্থের একটি বিখ্যাত গল্প ‘রেইন ইন মে’।
মে মাসের বৃষ্টিতে প্রবল দাবদাহের হাত থেকে নিষ্কৃতি পায় মানুষ। এই গল্পের সূচনা ও সমাপ্তি হবে গ্রীষ্মপ্রধান মে মাসের বর্ষাধারায়। নায়কের জবানীতেই গল্পের সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হলো।
নায়ক বলছেন :
মে মাসের অঝোর বৃষ্টিধারায় রোমের মন্টিমারিও অঞ্চলের এক সরাইখানায় এসে পৌঁছলাম। মালিক আন্তনিও তোচ্চি আমাকে খাওয়া দাওয়ার বিনিময়ে ওয়েটারের চাকরি দিলো। ভাবলাম এক পরিবারের আশ্রয় মিললো, কিন্তু পরে দেখলাম এ তো আশ্রয় নয় নরকবাস।
বাপ, মা ও মেয়ে তিনজনে মিলে সরাইখানা চালায়। বাপ আন্তনিওর সাপের মতো চোখ, বিশাল চেহারা আর জঘন্য মেজাজ। মেয়ে ডার্সি রূঢ়ভাষিনী, বাপের মতোই অভদ্র ব্যবহার কিন্তু সে রূপবতী, চলনের ঠমকে সে যেন প্রতিপদেই ঘোষণা করে — এ দুনিয়া আমার। কেবল মা-ই এদের মধ্যে শান্ত মেজাজের, মনে হয় আধপাগল।
পুরোন ভাঙা বাড়িতে সরাইখানার বড় খাবারঘর আর গাছপালার মাঝে টেবিল পাতা। গ্রীষ্মকালে রোমের লোকেরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এই বাগানে বসে মদ খেত। এখান থেকে সামনে রোমের সামগ্রিক দৃশ্য দেখা যায়, যা ছিলো সকলের পছন্দ।
কাজের চাপে আমার হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। তবে শীতে বা বর্ষার সময় খরিদ্দার কম থাকে, অবসর বেশি। সেই অবসরে গোলমাল বাঁধত সবচেয়ে বেশি।
বাপ ও মেয়ে পরস্পরকে এতটাই ঘৃণা করতো এতটাই, যে হত্যা করতে পারলে খুশি হতো।
মেয়ে আয় বাড়ানোর জন্য বাগানে একটি নাচের মঞ্চ তৈরি করে ও বাড়িটাকে আধুনিক ঢঙের রেস্তোরাঁয় পরিণত করতে চাইতো। বাপ কিছুতেই রাজি হতোনা। শুরু হতো তর্ক আর ঝগড়া। বাপ চুলের মুঠি ধরে ঘুষি মারত মেয়েকে। মা দু-জনকে ছাড়াবার চেষ্টা করতো কিন্তু নিঃশব্দে হাসতো। সে এক অসহ্য নারকীয় অবস্থা।

আলবার্তো মোরাভিয়া
আমি অনেক দিন আগেই কাজ ছেড়ে চলে যেতাম কিন্তু পারছিলাম না ডার্সির জন্য। ভালবেসে ফেলেছিলাম। ডার্সি বুঝতো সবটাই। যদিও সে রক্তমাংসের জৈবিক ভালোবাসাটাই তার কাছে সব। যেদিন আমি প্রথম এখানে আসি, সে রাতেই সে আমার ঘরে এসেছিল। আমাকে ঘুম থেকে তুলে যৌন সম্ভোগের রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছিল। সেখান থেকেই সম্পর্কের সূত্রপাত কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গোপন।
আমি লোকটা সহজে রাগী না কিন্তু যদি কেউ খোঁচাতে থাকে তখন রাগে আমার ফর্সা মুখ লাল হয়ে যেতো। ডার্সি এটা বুঝতে পেরেছিল আর তাই তার বাবার বিরুদ্ধে আমাকে প্রায়ই খোঁচাতো।
একদিন ডার্সি বললো, সে আর আমি মিলে যদি এখানে আধুনিক ঢঙের একটা রেস্তোরাঁ খুলি, তাহলে আয় বাড়বে। কিন্তু যতদিন বাপ বেঁচে আছে, আমরা বিয়ে করি বা না করি কিছুই করা যাবে না। এই অবস্থায় বাপকে খুন করা দরকার। সে আমাকে আর ভাবনার অবকাশ দিল না, প্রথম রাতের মতো এই মতলব হঠাৎ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলো।
পরদিন আমি তাকে বললাম, এটা ভুল হচ্ছে, এটা অন্যায়। শুনে সে আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করা বন্ধ করে দিলো।
আবার এলো মে মাস। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলো। একদিন, বাপ মেয়ের তুমুল ঝগড়া লাগলো। বাপ মেয়েকে মারতে লাগলো। আমি বাধা দিতে গেলে বুড়োর সঙ্গে আমার ঝগড়া বেধে গেল। উত্তেজনায় এক পাত্র মদ বুড়োর মুখে ছুঁড়ে মারলাম। রাগের চোটে ডার্সির মতলবে সম্মতি জানালাম।
ডার্সি পরিকল্পনা ঠিক করলো। মাটির নীচে ‘সেলার’ — মদের ভাঁড়ার। রোজ সকালে বুড়ো সেখান থেকে মদ নিয়ে আসে খরিদ্দারদের জন্য।
ডার্সি বললো, — “যখন বুড়ো ‘সেলারে’ ঝুঁকে পরে মদের বাক্স থেকে মদ নেবে, ঠিক সেই সময় আগুন উস্কে দেওয়ার রড দিয়ে তুমি বুড়োর মাথা ফাটিয়ে ফেলবে।” আমার মনের সকল ভয় ডার্সি ফুৎকারে উড়িয়ে দিলো। পুরুষকে লোভ দেখিয়ে নিজের কার্য সিদ্ধি করতে ডার্সি সিদ্ধহস্ত।
অবশেষে এলো সেই সকাল! বৃষ্টি হচ্ছে। আন্তনিও আর
ডার্সি ‘সেলারে’ নেমে যাচ্ছে। ডার্সি নেমে যাওয়ায় আগে ইঙ্গিত দিয়ে গেলো। তার মা সব দেখলো, বুঝলাম সব বুঝেছে কিন্তু মুখে কিছু বলছে না। আমি লোহার রড হাতে নীচে নামার জন্য পা বাড়িয়েছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিজতে ভিজতে বাইরে থেকে এল এক গাড়োয়ান। এসেই সাহায্যের জন্য আমাকে অনুরোধ করলো। আমি রডটা হাতে করে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে এলাম। তার পাথর ভরা গাড়িটা কাদায় বসে গেছে, ঘোড়াটা টানতে পারছে না। আমি রডটা বাগানের দরজার খুঁটির মাথায় রেখে গাড়ির চাকা কাদা থেকে বের করার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুজনেই গাড়িটা ঠেলতে পারলাম না। রুক্ষদর্শন গাড়োয়ান ক্রুদ্ধ হয়ে ঘোড়াকে চাবুক মারতে লাগলো। ঘোড়াটা কিছুতেই এগোতে পারলো না। ক্রুদ্ধ গাড়োয়ান এবার লোহার ছুঁচলো রডটা হাতে নিলো। আমি বারণ করতে যাচ্ছিলাম, পারলাম না। ওটা দিয়েই তো কিছুক্ষণ আগে বুড়োকে খুন করতে যাচ্ছিলাম আমি।
মনে হলো, আমার সমস্ত ক্রোধ গাড়োয়ানের উপর বর্তেছে। হতভাগ্য দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত বঞ্চিত ক্রুদ্ধ গাড়োয়ান সেই রডটা দিয়ে ঘোড়ার মাথায় সজোরে আঘাত করলো। দু-চোখ বন্ধ করলাম।
যখন চোখ খুললাম, দেখি রক্তাক্ত হয়ে ঘোড়াটা কাদায় পরে আছে। ঘোড়াটা দু-বার পা ছুঁড়ে থেমে গেলো। হাতের রডটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিবৃত্ত হলো হত্যাকারী গাড়োয়ান। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করলাম সামনের দিকে। বড় রাস্তায় পৌঁছে সেন্ট্রাল রোমগামী ট্রামে লাফিয়ে উঠে পড়লাম। শেষবারের মতো পিছু ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম বৃষ্টিতে আবছা সরাইখানার সাইনবোর্ড।
একটি সাধারণ লালসা হিংসার গল্প কিভাবে মহত্তর ব্যঞ্জনায় উপনীত হতে পারে, তারই উৎকৃষ্ট নিদর্শন এই গল্প। অরাজকতার কারণে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি। গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্ত এসেছে একবারে শেষে। অপ্রত্যাশিত মোচড় দিয়ে জীবানানুরাগী শিল্পী গল্পের দিক ঘুরিয়েছেন। এখানে মানবিক প্রকৃতির যে আলেখ্য অংকিত হয়েছে, তার ফলশ্রুতি উত্তেজনা নয়, আত্মসচেতন বিশ্লেষণ। এই চেতনার আলোয় গল্পের নায়ক আত্মবিশ্লেষণ করে সমূহ বিনষ্ট থেকে রক্ষা পেয়েছে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : “কালের পুত্তলিকা” — অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়।
ধন্যবাদ পেজ ফোর সুন্দর উপস্থাপনার জন্য।
ভীষণ ভালোলাগা পরিবেশন*
Besh onnorokhom.onno dhacher lekha.choluk kolom????
খুব ভালো লাগল
Bhalo
সকলকে জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।