২০১১ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার সংগ্রামপুরে, ২০১৩–তে বীরভূমের তারাপীঠে, ২০১৫–তে মেদিনীপুরের ময়নায়, ২০১৭ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং ও বারুইপুরে বিভিন্ন গ্রামে, ২০১৮ সালে ফের নদীয়ার শান্তিপুরে বিষমদে একাধিক মৃত্যুর পরও যে আমাদের টনক নড়েনি, রাজ্য প্রশাসন যে কোনও শিক্ষাই নেয়নি, মদ বন্ধের কোনও উদ্যোগই নেয়নি, বর্ধমান জেলার বিষমদ কাণ্ড সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল৷ তা নাহলে সংগ্রামপুরে বিষমদে ১৭৩ জনের মৃত্যু, তারাপীঠে ২৫ জনের মৃত্যু বা তার পরেও বিভিন্ন জেলার নানা নানা জায়গায় একই ঘটনায় এতগুলি মানুষের মৃত্যু ঘটলো কিভাবে।
মৃত্যু মিছিলের মতো দু্র্ভাগ্যজনক ঘটনা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। অথচ সেই কলঙ্কজনক ছবিটাই বার বার ফিরে আসে কখনও শান্তিপুরে, কখনও মগরাহাটে এবং বিভিন্ন গ্রামে চোলাই মদের রমরমা কারবার চলে। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা যার নেপথ্যে পুলিশকেই দেখতে পায়। তাদের অভিযোগ, মাসোহারার বিনিময়ে পুলিশ এলাকায় চোলাই ভাটিতে মদত দেয়। আর চোলাইয়ের ঠেকের বাড়বাড়ন্তে তিল তিল করে শেষ হয়ে যায় এক একটা পরিবার। কী আশ্চর্য এক একটি বিপর্যয়ে একাধিক মৃত্যু, পারিবারিক বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার কিছুদিন পরই আবার চোলাইয়ের কারবার রমরম করে চলতে থাকে। তার মানে অত বড় দুর্ঘটনা আমাদের কোনও শিক্ষাই দেয় না, আমরা সতর্ক হই না, পুনরাবৃত্তি না ঘটতে দেওয়ার জন্য যে সব পদক্ষেপ করা দরকার, যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, তার কিছুই বস্তুতপক্ষে কার্যকরি হয়না। যেটা হয় সেটা সাময়িকভাবে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’।
তার মানে প্রশাসনিকস্তরে যে সব পদক্ষেপ করা হল— যেমন এলাকার মহিলারা ভাটিগুলিতে অগ্নিসংযোগ করলেন, নারী-পুরুষ মিলিত হয়ে এলাকার মদের ভাটিগুলি ভাঙচুর করলেন, এক পুলিশ কর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হল, আবগারি দফতরের এক জন ওসিকে সাসপেন্ড করা হল, দুই-তিনজন সার্কেল ইনস্পেক্টর থেকে শুরু করে রাজ্যের শীর্ষ পুলিশ কর্তারা মুখ্যমন্ত্রীর ধমক খেলেন, মৃতদের পরিবারগুলিকে একটা আর্থিক সহায়তার অঙ্ক দেওয়ার বন্দোবস্ত হল— এসবই আসলে সাময়িকভাবে ধামাচাপা দেওয়া? প্রতিটি ঘটনাতেই চোলাই কারবারিদের দু–একজনকে গ্রেপ্তার হয়। তারপরও নতুন নতুন ভাটি গড়ে ওঠে। রমরমিয়ে ওঠে চোলাই মদের ব্যবসা। পাশাপাশি সরকারি মদের জোগান বাড়াতে সমস্ত বিলিতি মদ ও বার–রেস্তোরাঁতে দিশি মদ বিক্রির অনুমতি দিয়েছে৷ সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

সরকারি সমীক্ষাতেই দেখা গিয়েছে, পথদুর্ঘটনার একটা বড় কারণ মদ্যপান৷ হাইকোর্টকে যে কারণে বলতে হচ্ছে, জাতীয় সড়কের ৫০০ মিটারের মধ্যে মদের দোকান থাকা চলবে না৷ নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ইত্যাদির ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে অপরাধীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মদ্য পান করে থাকে৷ ধারাবাহিক মদ্যপানে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা থেকে যে মৃত্যুও ঘটে সেকথা সাধারণ মানুষও আজ ভাল করেই জানে৷ এসব জেনে বুঝেও কেন এতবড় একটা ক্ষতিকর কাজের জন্য ঢালাও ছাড়পত্র দেওয়া?
সস্তার ভেজাল মদে যাঁরা মারা যান, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিনমজুর৷ কেউ ভ্যান চালান, কেউ ইটভাটায় কাজ করেন৷ তাঁদের ঘরে অভাব অনটন লেগেই থাকে৷ সারা দিন খাটা খাটুনি অথবা যথেষ্ট পরিমান কাজ হাতে নেই, সংসার চালানোর পর্যাপ্ত টাকা পয়সা হাতে নেই। বাস্তব জীবনের এই সব অভাব অভিযোগকে মন থেকে সরিয়ে রাখতেই এঁরা সারা দিনের রোজগার থেকে মদ পান করেন৷ মদের নেশা যাতে বেশ জমাট হয় তার জন্য মদ ব্যবসায়ীরা ইথাইল অ্যালকোহলের সঙ্গে মিথাইল অ্যালকোহল মিশিয়ে থাকেন। কিন্তু যখনই মিশ্রনের মাত্রা বেড়ে যায় তখনই সেই মদ বিষমদে পরিণত হয়৷ তাহলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই মৃত্যু ফাঁদ কার সৌজন্যে তৈরি হল? আর এজন্য এ জমানা ও জমানার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। ২০০০ সালেও যাদের জমানা ছিল সে সময় নদিয়ার কৃষ্ণনগরে বিষমদে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷ তার পর ২০০৯ সালেও তমলুকের রামতারকে বিষমদে মৃত্যু হয়েছিল ৪৮ জনের৷ রাজ্যপাট বদলেছে৷ কিন্তু চোলাই মদনীতি কি বদলেছে? বিষমদে মৃত্যুমিছিল তো চলছে৷
বর্ধমানের বিষমদ কাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে জানতে পারা গিয়েছে যে, নিহত বা গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিরা যে সমস্ত জায়গা থেকে মদ কিনেছিলেন তার কোনটিরই লাইসেন্স নেই। সে মদ এল কোথা থেকে? খাবারের দোকান থেকে। তারমানে মদ খাবারের দোকান থেকেও বিক্রি হয়। আবগারি দফতর পুলিশ সবই রয়েছে অথচ শহরের বুকে একাধিক জায়গায় বেআইনিভাবে মদ বিক্রি হচ্ছে। হোটেল থেকে বিকোচ্ছে দেদার দেশি মদ। পুলিশ কি করছেন? ঘটনার পর আপাতত বেআইনি মদের দোকানগুলিকে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বর্ধমান জেলা পুলিশ প্রশাসন।