“ক্লাসিক্যাল মিউজিক না বুঝলেও চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুনবি, দেখবি কোথাও একটা ভালো লাগার রেশ তৈরি হচ্ছে। তোকে কে বলেছে রাগ বুঝতে হবে?”… একথা আমায় বলেছিলেন আশীষ চট্টোপাধ্যায়, যিনি আনন্দবাজার পত্রিকার একজন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীত ও বাজনার সমালোচক ছিলেন। ছবি তোলা ছাড়া ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের নক্ষত্রপ্রতীম শিল্পীদের সুরের গভীরতা বোঝার মত জ্ঞান আমার ছিলো না, আজও নেই।
শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরগুলো সাধারণত রাতে শুরু হয়ে ভোর রাত পর্যন্ত হয়। আমি তখন আনন্দবাজারের টিকে থাকার লড়াই করছি। সারাদিন যা ছবি হলো তো হলো…রাতেও আমি অফিসে থেকে যেতাম। যদি কোনো ইনসিডেন্ট ঘটে তাহলে কভার করতে পারবো। এরকমই একদিন অফিসে বসে আছি, তখন বোধহয় ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স চলছিল কলকাতায়। আশীষদা আমায় বললেন, “চল ডোভার লেন যাচ্ছি। গান শোনাও হবে। তোর ছবিও তোলা হয়ে যাবে।”
আমি বললাম, “পাগল, আমি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের কিচ্ছু বুঝিনা। সারারাত মশা তাড়াবো নাকি? ও তুমি যাও।”
উপরের কথাগুলো আশীষদা তখন আমায় বলেছিলেন। একজন অসাধারণ মানুষ আশীষদা। আমায় ধরে ধরে শিল্পীদের কাছে নিয়ে যেতেন। কত গল্প শোনাতেন। ওর কথায় গল্পতেই কি বুঝেছিলাম কি জানি তারপর কলকাতায় যখনই কোনো শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান হতো, মাঝেমধ্যেই আমি ঢুঁ দিতাম। ধীরে ধীরে একটা ভালোলাগা তৈরি হয়ে গিয়ে একসময় নিয়মিত শ্রোতা হয়ে গেলাম। আর ওই সূত্রেই ভারতীয় রাগ সংগীতের দিকপালদের সঙ্গে আমার পরিচয় ও হৃদ্যতা।
আপনারা অনেকেই জানবেন, কলকাতায় একসময় ক্লাসিক্যাল সংগীতের অনুষ্ঠান হতো নিয়মিত। আলী আকবর খাঁ, বিলায়েত খাঁ, বিসমিল্লাহ খাঁ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ জাকির হোসেন, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, আমজাদ আলী খাঁ, শিবকুমার শর্মার মত তাবড় তাবড় শিল্পীরা আসতেন। সংগীতপ্রেমী মানুষরা মুখিয়ে থাকতো ওনাদের অনুষ্ঠান দেখার জন্য।
এরকমই একবার ২০০২ সালে বিলায়েত খাঁ ৭৫ বছরের জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেব কলকাতার টাউন হলে সরোদ বাজিয়েছিলেন। জলসাঘর আয়োজক সংগঠন এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিলেন। এটা বলতে বাধা নেই সেই সময় কলকাতায় এই প্রতিষ্ঠানটির (জলসাঘর) প্রোগ্রাম করার জন্যই ভারতবর্ষের রাগ সঙ্গীতের মহান শিল্পীদের, কলকাতাবাসীরা বাজনা সঙ্গীত দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর একটি ছিলো ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স। শীতকালে কলকাতার শৈল্পিক মানুষদের কাছে অন্যতম আনন্দের এই সংগীত সন্মেলন দেশের মধ্যে সেরা ছিলো। বর্তমানে আগেকার মতন জৌলুস হারালেও এখনও টিমটিম করে টিকে আছে।
এখানে একটু নিজের গান গাই… হাওড়া সালকিয়া বামুনগাছি রেল কোয়ার্টারে থাকার সময় আমি গিটার বাজাতাম। বন্ধুরা পেছনে লাগতো খুব। একবার হাওড়ার জেলার এক প্রতিযোগিতায় অষ্টম হয়েছিলাম ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ রবীন্দ্রসংগীতটি গিটারে বাজিয়ে। কলেজ জীবনে ৫৯, বিবেকানন্দ রোডে থাকার সময় বন্ধু সুপ্রিয় হালদারের বোন সোমাকে গিটারটা দিয়ে দিই।
উফফফ কি দুঃসাহস আমার আলোচনা শুরু করেছিলাম দুজন মহান শিল্পী আলী আকবর ও বিলায়েত খাঁ নিয়ে… ঢুকে পড়লাম আমার টুং টুং গিটারে। কিছু মনে করবেন না আমার এটাই দোষ। সফলতার ভান্ডার শূন্য থেকে গেলেও জীবনে অনেককিছুই হাতড়ে বেড়িয়েছি। যাক এসব কথা।
কলকাতার টাউন হলে সেদিন বিলায়েত খাঁ সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। আলী আকবর বিলায়েত খাঁয়ের চেয়ে ছ’বছরের বড় ছিল। টাউন হলের বাজনা শেষে বিলায়েত খাঁ স্টেজের দিকে এগিয়ে নিচ থেকে আলী আকবরের দিকে হাত বাড়ালেন। খাঁ সাহেবও উপর থেকে বিলায়েত খাঁয়ের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলেন।
ছবি হিসেবে খুব সাধারণ একটা ছবি। ফ্ল্যাশ না লাগানোর ফলে মঞ্চের আলোতেই খুব দ্রুত তোলা। যার ফলে ছবির টেকনিক্যাল দোষ রয়েছে। কিন্তু একই ফ্রেমে সরোদ এবং সেতারের এই দুই মহান শিল্পীর ছবিটি আমার কাছে একটা বিরাট সম্পদ। শুধু আমার কাছে নয় তাঁদের কাছেও এই ছবি দেখাটা খুবই আনন্দের যাঁরা এই দুই কিংবদন্তী শিল্পীদের বাজনায় একাত্ম হয়ে যান।
এই দু’জন শিল্পীর সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত স্তরে খুবই যোগাযোগ ছিল যখন সাদা বাড়ির কালো গ্রিলে (আনন্দবাজার পত্রিকা) কলকাতার পাতায় ছবি তুলতাম। যোগাযোগের মাত্রা এতটাই হয়েছিল যে, কলকাতায় ওনাদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান হলেও শিষ্যদের দিয়ে এনারা আমায় ডেকে পাঠাতেন।
আমার এই পরিচয়ের কথা অনেকেই জানতেন। একবার কবি জয় গোস্বামী কলামন্দিরে বিলায়েত খাঁ’র অনুষ্ঠানের কোন টিকিট না পেয়ে আমায় বলেছিল,” অশোক আমায় একটু বিলায়েত সাহেবের বাজনা শোনাতে পারবে? শুনেছি তোমার সঙ্গে ওনার খুব পরিচয় আছে। তাছাড়া তুমি চেষ্টা করলে পারবে।”
আমি বলেছিলাম, “পারবো।”
অনুষ্ঠানে তিন দিন আগে বিলায়েত খাঁ সাহেবকে সরাসরি বলি, “বাংলার বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী আপনার বাজনা শুনতে চায়।”
উনি বলেছিলেন, “জরুর। লে আইয়ে।”
কলামন্দিরে কবি জয় গোস্বামীকে নিয়ে একেবারে সামনের সারিতে বসিয়ে দিয়েছিলাম। জয় গোস্বামী তখন ব্যক্তিগতভাবে অনেক কৃতজ্ঞতা জানালেও আমি যেটা এখনো ভুলতে পারিনা, দেশ পত্রিকায় বিলায়েত খাঁয়ের উপর একটা লেখায় জয় গোস্বামী, “আমাদের ফটোগ্রাফার অশোক মজুমদার”…. বলে এই সব কথা লিখেও ছিলেন। এই নিখাদ সারল্যের জন্যই বোধহয় শিল্পী বুদ্ধিজীবিরা সমাজে এতো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। যদিও ইদানিং এদেরও সহজ ভাবনার সমাজচ্যুতি ঘটছে।
যাইহোক, এই দু’জন শিল্পীকে নিয়ে আমি কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় অনেক রকম ছবি করেছি। এই শিল্পীরা মুখের উপর আমার আবদার না করেননি। সেই সময় না ভাবলেও জীবনের শেষ ইনিংসে দাঁড়িয়ে এই ছবিগুলো দেখলে আমার মনে অক্সিজেন আসে।
গঙ্গার পাড়ে মর্নিং ওয়ার্ক করা, নৌকোয়, রিক্সায় বেড়ানো, মন্দির, মসজিদ, গাড়ি সারানো, বাজার করা, ফুচকা, চানা খাওয়া, মাজারের বাইরে অর্থ দান করা, সেলুনে চুল কাটা — এরকম বহু ছবি আমি সেইসময় বিভিন্ন শিল্পীদের তুলেছি। সারাদিন জোঁকের মত আমি ওনাদের সঙ্গে লেগে থাকতাম।
আমি ওনাদের যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি, কথা বলেছি… তার চেয়ে বেশি শিষ্যদের মুখে অনেক গল্প শুনেছি। সেইসব গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগতো। আলী আকবর খাঁ কথা কম বললেও বিলায়েত খাঁ বেশ মজার মজার কথা বলতন। আমার সৌভাগ্য এই শিল্পীরা কলকাতায় এলেই আমি ওনাদের শিষ্যদের মত যেতাম, বসে থাকতাম, গল্প শুনতাম।
জীবনে প্রচুর নামীদামী সেলিব্রিটিদের সঙ্গে মিশে আজ এটুকু বলতে পারি… চিত্র সাংবাদিকরা ইনসিডেন্ট ছাড়া শিল্পী, আর্টিস্ট, অভিনেতাদের মত বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের সাথে মেলামেশায় আপনাকে যদি ওরা পছন্দ করে, চেনে… তাহলেই ওনারা আপনার ছবি তোলার আবদার পূরণ করবেন। আর এখানে মনে রাখতে হবে ক্যামেরা ছাড়াও শিল্পীদের সাথে মেলামেশা করতে হবে। এমনি সাধারণ ফ্যানের মত।
অস্বীকার করবো না আনন্দবাজারের তৎকালীন এডিটর অভিক সরকারের কথা মতন এক্সিকিউটিভ এডিটর সুমন চট্টোপাধ্যায় আমায় কলকাতার পাতার বিশেষ ছবি তোলার ভার দিয়েছিলেন। আমিও আদা জল খেয়ে দিন রাত পরে থাকতাম সাত কলম এমন কি আট কলম হাফপাতা জুড়ে ছবির জন্য।
তবে আমি এতটাই মূর্খ চিত্র সাংবাদিক ছিলাম যে সেইসব ছবি যত্ন করে আর্কাইভে রাখার কথা আমার মনে হয় নি। কিন্তু আমি যত ছবি তুলেছি আনন্দবাজারের জন্য তা ভালো মন্দ যাই হোক সবটাই সংরক্ষিত আছে আনন্দবাজার আর্কাইভে। তাই এটুকু জানি আমার ছবি তোলার সম্পদ আমার কাছে না থাকলেও সাদা বাড়ির কালোগ্রিলে (আনন্দবাজার পত্রিকা) সরকার বাড়ির সম্পত্তি হয়ে ফটো লাইব্রেরীতে গোছানো আছে। কোনোদিন তার একটা প্রিন্টও আমি পাবো না।
আসলে সেই সময় সাদা কালো ক্যামেরায় আমার মতো বহু চিত্র সাংবাদিকদেরও কিন্তু একই অবস্থা। আমাদের মাথার উপর গাইড করার মত কোনও গুরুজন বা দাদাদের পাইনি। আমি, অমিত, দিলীপ, ভাস্কর, সোমনাথ, অশোক চন্দ্র, রাজিব, দেবাশীষ লিস্টে অনেকেই আছে… যারা শুধু ছবি তুলেই যেত। এখন বুঝতে পারি সেগুলো ডকুমেন্টেশন আর্কাইভ করে রাখা কত জরুরি ছিল।
শুনেছি আনন্দবাজার লাইব্রেরীতে অশোক মজুমদার নামে একটা ফোল্ডারে আমার সব ছবি, লেখা নাকি রাখা আছে। কিন্তু সেসব দেখার কোনো উপায় আজ আর নেই। তাই দুঃখ নেই… কিন্তু মনে একটা ইচ্ছে আছে। তাই যখন আমি সত্যিকারের মারা যাবো যদিও এসবে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু আপনাদের তো অনেকেরই এরকম বিশ্বাস রয়েছে। সেইটা যদি মৃত্যুর পর সত্যি হয় তখন আমি ভূত হয়ে আনন্দবাজারের ওই ফটো লাইব্রেরীতে ঢুকে প্রতিদিন অনেকটা করে সময় কাটাবো। নেগেটিভগুলো দেখবো। পুরনো কাগজের কাটিংগুলো নাড়াচাড়া করবো। প্রথম পাতায় ছাপা ছবিগুলো দেখে খুব আনন্দ পাবো। খুব ইচ্ছে হয় জানেন ছবিগুলো দেখার।
আজ এটুকুই। গত দশ দিন ধরে কাজের চাপে এই ছবিটা হাতের কাছে পেয়ে আজ সকালেই কোনরকমে দায়সারা ভাবে ছবির গল্পটা আপনাদের বললাম। জানি গল্প তেমন কিছু নয়। কিন্তু এই দুই কিংবদন্তী শিল্পীদের যাঁরা জানেন তাঁরাই বুঝবেন এ ছবির মূল্য! তাই ছবিটা দেখুন। অনুভব করুন ভারতবর্ষের মুকুটে গৌরবোজ্জ্বল পালক এঁরা এনেছেন। গোটা বিশ্ব সমাদর করে এই ভারতরত্নদের। জীবনে বহু না পাওয়ার মাঝে এইসব মানুষের সান্নিধ্য লাভ করে আমি ধন্য।
অশোক মজুমদার, ১০.০৬.২০২৩