| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অ্যালিস মুনরো এ সময়ের চেকভ কিংবা রবীন্দ্রনাথ : সাইফুর রহমান

Reporter
সাইফুর রহমান / ৫৯৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২১

২০০১ কিংবা ২০০২ সালের কথা। আমি তখন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র। ক্লাসের ফাঁকে একটু বিরতি পেলেই ছুটে যেতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই সিটি সেন্টারে ক্যাপিটাল বুক হাউস নামক একটি পুরনো বইয়ের দোকানে। বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক পুরনো। ক্যাপিটাল বুক হাউসের শক্ত বাঁধাইয়ের বাদামি ও কালো মলাটযুক্ত বইগুলো আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। যদিও ছাত্র অবস্থায় বই কেনার সামর্থ্য ছিল খুবই সীমিত। তারপরও বাবার পাঠানো হাতখরচের অধিকাংশ কড়ি ব্যয় হতো বই কিনে। ওই বইয়ের দোকানে যাতায়াতের ফলে কালক্রমে বই দোকানির সঙ্গে আমার পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। বই দোকানি একজন প্রৌঢ়া, পূর্ব ইউরোপীয়, সম্ভবত চেক কিংবা পোলিস দেশীয় হবেন। নাম ত্রেস্তা, পোশাকি নামটি হয়তো আরো বড়ো ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে সেটি মনে পড়ছে না। হাড়-কাঁপানো শীতের এক ক্রিসমাসে তার কাছ থেকে সুন্দর র্যাপিং করা কাগজে মোড়া একটি বই উপহার পেলাম। ত্রেস্তা আমাকে বলল—‘উপহারটি এবারকার ক্রিসমাসে তোমার জন্য হবে একটি শ্রেষ্ঠ উপহার’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে এসে র্যাপিং পেপারের মোড়ক খুলতেই দেখলাম বাদামি রঙের শক্ত বাঁধাইয়ে অ্যালিস মুনরোর ‘ড্যান্স অব দ্য হ্যাপি শেডস’ নামের ছোটগল্পের একটি পুরনো বই। আজ বলতে দ্বিধা নেই, এর আগে অ্যালিস মুনরোর নাম আমি কখনো শুনিনি। সে রাতেই বুকে বালিশ চেপে পড়লাম তাঁর একটি ছোটগল্প, নাম ‘রেড ড্রেস’ বাংলায় যার অর্থ ‘লাল জামা’। আমাকে স্বীকার করতেই হয়, গল্পটি ছিল এককথায় অসাধারণ। তাঁর গল্প প্রসঙ্গে পরে আসছি, এখন একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই।

অ্যালিস মুনরোর জন্ম ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই কানাডার অন্টারিওর ইউংহ্যামে। বাবা রবার্ট এরিক লেইডল ছিলেন একজন খামার ব্যবসায়ী। মা অ্যানি ক্লার্ক লেইডল ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মুনরো ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওতে দুই বছরের বৃত্তি পেয়ে সাংবাদিকতা ও ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনাকালীন তাঁর লেখালেখিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৫০ সালে তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয় ‘ডাইমেনশনস অব হ্যাপি শ্যাডো’ নামে।

অ্যালিস মুনরো বিয়ে করেন ১৯৫১ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি কাজ করেছেন রেস্তোরাঁর ওয়েটার হিসেবে, তামাক চাষের শ্রমিক হয়ে, কিংবা খণ্ডকালীন গ্রন্থাগারের কেরানির পদে। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া নামক শহরে স্বামী-স্ত্রী মিলে খুললেন বইয়ের দোকান ‘মুনরো বুকস’। দোকানটি এই নামে আজও বহাল আছে। মুনরো ১৯৬৮ সালে ৩৭ বছর বয়সে তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ‘ড্যান্স অব হ্যাপি শেডস’ প্রকাশের পরপরই চারদিকে হইচই পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পেয়ে যান কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার গভর্নর জেনারেলস অ্যাওয়ার্ড। এরপর মুনরোর পথচলা আর থেমে থাকেনি। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘লাইভস অব গার্লস অ্যান্ড উইমেন’। গড়ে প্রতি চার বছর পরপর প্রকাশিত হয় তাঁর একটি করে গল্প সংকলন। অ্যালিস মুনরো ম্যান বুকার, কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজসহ বিশ্বের প্রায় সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন। ২০১৩ সালে এসে মুনরো জয় করলেন এ সময়ের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। শুধু ছোটগল্প লিখে নোবেল পাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে এই প্রথমবার ঘটল। এটা যেন সেই শ্রুতকীর্তি সাহিত্যিকদের জয়—যাঁরা সর্বপ্রথম ছোটগল্পের জন্ম দিয়েছিলেন। ছোটগল্পের ইতিহাস ঊনবিংশ শতাব্দীর। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মুনরোর হাতে এর সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জুটল। সাহিত্যের ইতিহাসে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগেই ছোটগল্প বৈচিত্র্যে ও গভীরতায় এক মহিমান্বিত স্থান অর্জন করে নিয়েছিল। আমেরিকায় ওয়াশিংটন আর্ভিং (১৭৮৩-১৮৫৯), অগাস্টাস বি লংস্ট্রিট (১৭৯০-১৮৬৪), ন্যাথানিয়েল হোথ্রন (১৮০৪-১৮৬৪) এঁদের হাতেই ছোটগল্প রূপটির নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। আর এর পরিণতি লাভ করে অ্যাডগার অ্যালান পো’র (১৮০৯-১৮৪৯) হাতে। তবে ইংরেজি ছোটগল্পকে উত্কর্ষতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ফরাসি গল্পকার মোপাঁসার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন আমেরিকান গল্পকার ও’ হেনরি (১৮৬২-১৯১০)। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন—‘ছোট গল্পের জন্ম আমেরিকায় হইলেও তথাকার সাহিত্যে ইহা তেমন স্ফূর্তিলাভ করে নাই। প্রথম শ্রেণীর ছোট গল্প লেখকের সংখ্যা আমেরিকায় অধিক নহে। বরঞ্চ ইংরাজি সাহিত্যে ইহার সমধিক বিকাশ দৃষ্ট হয় আর সম্পূর্ণ বিকাশ ফরাসি সাহিত্যে। ইংরাজি ছোট গল্প ঘটনাপ্রধান। ফরাসি ছোট গল্পে রসের প্রাধান্য পরস্ফুিট।’

এবার একটু বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প সম্পর্কে দুটি কথা বলতে হয়। যেহেতু উপরোক্ত ছোটগল্পকারদের রচনার ভাষা ইংরেজি, অনুমান করা যেতে পারে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ছোটগল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রাথমিক পর্ব শুরু হয়। বাঙালি লেখকরাও কেউ কেউ এঁদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। কবি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অ্যাডগার অ্যাল্যন পোর ভক্ত ছিলেন। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় যিনি নিজেই একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার, তিনি একসময় লিখেছিলেন, ‘উপন্যাসের মতো ছোট গল্প জিনিসটাকেও আমরা পশ্চিম হইতে বঙ্গ সাহিত্যে আমদানি করিয়াছি।’

নোবেলজয়ী অ্যালিস মুনরোর লেখার আখ্যানবস্তু ও আঙ্গিক নিয়ে। কি আঙ্গিকে তাঁর গল্পগুলো বৃক্ষের ডালপালার মতো শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে একটি অমোঘ নিয়তির দিকে ধাবিত হয়ে এর পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছাত? পাঠকদের একটি বিষয় জানিয়ে রাখছি যে, অ্যালিস মুনরোর গল্পগুলোতে প্লট মুখ্য নয়। এটি একটি সেকেন্ডারি বিষয়। সাধারণ কথায় বলতে হয় যে, মুনরোর গল্পে কোনো গল্প নেই—অর্থাত্ কোনো চমকপ্রদ উপসংহার নেই। যেমন, আমেরিকার ছোটগল্পকার অ্যাডগার অ্যালান পো, ও’ হেনরি কিংবা ফরাসি সাহিত্যিক মোপাঁসার গল্পে অতি বিশদভাবে এই কাঠামো অনুসরণ করা হতো যে, জীবনের সত্য প্রতিফলন ঘটতেই হবে ছোটগল্পে এমনটিই চেয়েছিলেন ছোটগল্পের স্রষ্টারা। আখ্যান বস্তু হয় হোক সাধারণ তবু তাতে থাকতে হবে কোনো জোড়ালো নাটকীয় উন্মেষের সম্ভাবনা। তার তথ্যমূলক উপাদানগুলোতে থাকা চাই একটি একাগ্র অভিনিবেশ, এক সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং সেই গল্পে থাকবে এক উপসংহার যা শুধু তরান্বিতই হবে না, পারলে সেটি হবে চরম লোমহর্ষক ও অসাধারণ চমকপ্রদ। কিন্তু মুনরোর গল্পে মানুষের সাদামাটা জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের ওপর আলো ফেলে দেখানো হয় যে, যে বিষয়গুলো অবজ্ঞা করে কিংবা না দেখার ভান করে সম্পূর্ণ যাপিত জীবনটির শেষ পর্যায়ে এসে দেখে যে, অতীতের সেই মুহূর্তগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘দ্য বিয়ার কেম অভার দ্য মাউন্টেন’ গল্পে লেখিকা সেই যাপিত জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলো তাঁর লেখনীর আঁচড়ে চিত্রিত করেছেন। বিশ্বের গল্পপাঠক মুগ্ধতায় ও বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল যে, দৈনন্দিন জীবন যাপনে যেসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের দিকে আমরা সাধারণত কোনো দৃষ্টিই দেইনি। সাদা চোখে যা আমাদের নজরেই পড়ে না, মুনরো তা-ই আমাদের সামনে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে তুলে এনেছেন আমাদের দৃষ্টিতে, একেবারে সামনে। আমরা তখন অবাক হয়ে উপলব্ধি করি—আমরা তাহলে এরকম! এভাবে আমরা জীবনযাপন করছি! মুনরোর অন্য আরেকটি গল্প ‘লাল জামা’র আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা করব লেখার একেবারে শেষে। তবে এ মুহূর্তে চেকভ ও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কারণ মুনরোর ছোটগল্পে এ দুজন লেখকের লেখার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। আন্তন চেকভের ছোটগল্প সৃষ্টির বেশ কিছুকাল আগে মহামতি লেখক দস্তয়েভস্কি বলেছিলেন—রাশিয়ার সমস্ত গল্প বেরিয়ে এসেছে গোগলের কোটের পকেট থেকে। গোগল ও অ্যালান পোর জন্ম একই সালে অর্থাত্ ১৮০৯-এ এবং গোগলকেও দেখি অ্যালান পোর মতো হ্যালুসিনেশন, বাস্তব ও স্বপ্নের বিভ্রান্তিকর জটাজাল বিষয়গুলো তার গল্পের আঙ্গিক হয়ে উঠে আসতে। ইমপ্র্রেশনিস্ট শৈলীতে গল্প লেখার নিরীক্ষা দিয়ে আবির্ভূত হন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রবণতাকে তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। রুশ সাহিত্যের ছোটগল্প আন্তন চেকভের মতো তাঁর কাছেও বিশেষভাবে ঋণী। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, দস্তয়েভস্কির ‘ভূতলবাসী’ আর তলস্তয়ের ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ সত্যিকার অর্থেই বেরিয়ে এসেছে গোগলের কোটের দুই পকেট থেকে।

উপরোক্ত সাহিত্যিকদের হাতে রুশ কথাসাহিত্য যখন একটা সিরিয়াস ও ধ্রুপদী মেজাজ লাভ করেছে, যখন গল্প বলতে একটি পরিপূর্ণ আখ্যান বোঝায়। যার থাকবে একটি সূচনা, মধ্যভাগ ও পরিণতিপূর্ণ সমাপ্তি—ঠিক সেই সময়ে রুশ সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে আন্তন চেকভের (১৮৬০-১৯০৪)। তিনি তাঁর লেখনীতে রুশ গল্প পাঠকদের একেবারে চমকে দিলেন। তিনি নিয়ে এলেন এমন গল্প, যার মধ্যে ঘটনার ঘনঘটা নেই, নেই নিটোল কোনো কাহিনিও। পরিবর্তে তিনি পাঠকদের সামনে হাজির করলেন ছবি, ডিটেইল, হালকা মেজাজে সূক্ষ্ম রসাত্মক ভাষায় ফুটিয়ে তোলা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের খুঁটিনাটি চিত্র। তাদের চলাফেরা, কথা বলা, কিংবা পারস্পরিক আচরণের ছবি। আর এজন্য এ সময়ের অনেক সাহিত্যিক যোদ্ধা সহসাই মুনরোকে চেকভের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে আমি চেকভ ও মুনরোর উভয়ের ছোটগল্প পর্যালোচনা করে এতটুকু বলতে পারি যে, মুনরো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের খুঁটিনাটি চিত্র চেকভের চেয়ে আরো নিপুণ, সূক্ষ্ম ও সার্থকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। মুনরো তাঁর গল্পের উপাদান আহরণ করেন তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে, বিশেষ করে কানাডার অন্টারিও অঞ্চলে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই তাঁর লেখায় উপজীব্য হয়ে উঠে আসে। এদিক থেকে তাঁর লেখার সাযুজ্য মেলে আমেরিকার বিখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে। ফকনারও তাঁর গল্পের রসদ আহরণ করতেন তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা থেকে। অন্যদিকে চেকভ ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৫ এই দুটি বছর প্রচুর লিখেছেন মূলত টাকার জন্যই। আর তাঁর গল্পের সাজসরঞ্জামের জোগান হতো বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে গল্পের আইডিয়া কিনে। প্রতিটি আইডিয়ার জন্য চেকভকে ব্যয় করতে হতো ১০ কোপেক আর কাহিনির জন্য ২০ কোপেক। তবে যে যা-ই বলুক, তাঁর গল্প লেখার প্রেরণা ও ভিত্তি গড়ে উঠেছিল তাঁর মা ইভগেনিয়ার কাছ থেকে। কারণ তাঁর মা চমত্কার গল্প বলতে পারতেন। ঠিক যেমন মাইকেল মধুসূদনের প্রেরণা ও

উত্সাহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর মায়ের কাছ থেকে শোনা মহাভারত ও রামায়ণের গল্পগুলো। মার্কেজের যেমন তাঁর দাদিমার কাছ থেকে গল্প শুনে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, চেকভের চেয়েও মুনরোর ছোটগল্পের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ গল্প লেখা শুরু করেন ১৮৯১ সাল নাগাদ। ততদিনে এডগার অ্যালান পো, ও’ হেনরি কিংবা ফরাসি লেখক মোপাঁসা পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত ছোটগল্পকার হিসেবে বিশেষ খ্যাতি পেয়ে গেছেন। প্রভাত কুমারের কথা অনুযায়ী বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প বিষয়টি পশ্চিম হতে আমদানি হলেও রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডিত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে—গল্পের সেই চিরাচরিত প্রথাগত চমকপ্রদ উপসংহারের প্রথায় না গিয়ে তিনি নিজস্ব স্বকীয়তায় মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তাঁর ছোটগল্পে অসম্ভব সার্থকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ঠিক যেমনি এ সময়ের অ্যালিস মুনরোর লেখায় সেই প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। মুনরোর গল্পের সঙ্গে সাদৃশ্য মেলে রবীন্দ্রনাথের ‘পোষ্ট মাষ্টার’, ‘একরাত্রি’ কিংবা ‘কাবুলিওয়ালা’সহ আরো বহু গল্প। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ মোপাঁসা কিংবা ও’ হেনরির লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে এ কথা আমরা জানি যে, তিনি অ্যালান পোর লেখার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এঁদের কেউই ছোটগল্পে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।

লেখাটি শেষ করছি অ্যালিস মুনরোর ‘লাল জামা’ সম্পর্কে আলোচনার মধ্য দিয়ে। এই গল্পটিতে গল্পের কথক উত্তম পুরুষে তার কিশোরী জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলে যাচ্ছেন, নদীতে প্রবাহিত জলের ধারার মতো। এখানে মা-মেয়ের ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে দারুণভাবে। গল্পে মা তার মেয়ের জন্য একটি লাল ভেলভেটের জামা তৈরি করেছেন। কারণ আসন্ন একটি বলড্যান্সের অনুষ্ঠানে তার মেয়েটি সেই লাল জামা পরে সে খুঁজে নেবে একজন ছেলে বন্ধু এবং এরপর তারা একে অপরের সঙ্গে নাচবে। গল্পে মা বেশ আনন্দিত ও উদ্বেলিত যে, তার মেয়ে জীবনে এই প্রথম ছেলে বন্ধু খুঁজে নিতে যাচ্ছে (পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এটাই সাধারণ রীতি) কিন্তু গল্পের কথক মায়ের এই আচরণে খুশি হতে পারে না। মা যখন তার চারপাশে ঘুর ঘুর করে তখন সে বিব্রতবোধ করে। মায়ের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস যেন সে অনুভব করতে পারে। হিল জুতা পরে তার মা যখন হাঁটে তখন তার পায়ের নীল রগ ফুটে ওঠে। সে বর্ণনাও বাদ যায় না গল্প থেকে। এছাড়া গল্পে কথকের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী লনির সঙ্গে সে চুরি করে কীভাবে সিগারেট ফুঁকে কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লিখিত প্রবন্ধ পড়ে, কীভাবে এবোরশন করতে হয় কিংবা ছেলেদের কীভাবে পরিতৃপ্ত করতে হয় ইত্যাদি। গল্প পড়ে মনে হয় মুনরো যেন নিজের কৈশোরের কথা বলছেন নির্বিঘ্নে। তাঁর ঋতুময়ী হয়ে ওঠার কথাও বাদ যায় না— অসাবধানতাবশত তার স্কার্টে ছোপ ছোপ রক্ত লেগে থাকে। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যে দিনটিতে ডেলভেটের লাল জামাটি পরে নাচের অনুষ্ঠানে যায় একটি ছেলে বন্ধু খুঁজতে। সেখানে তার পরিচয় ঘটে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে নাম মেরি ফরচুন।

মেরি ফরচুন গল্পের কথককে পরামর্শ দেয় যে, ছেলেদের মুখাপেক্ষী না হতে। এখানে কথকও সে কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ে। কিন্তু গল্পের কথকের ভাগ্যে কোনো ছেলে জোটে না, অথচ তার বান্ধবী লনি ইতোমধ্যে একটি ছেলে জুটিয়ে বলড্যান্স অনুষ্ঠানটিতে নাচা শুরু করেছে। কোনো ছেলে বন্ধু জোটাতে না পেরে কথক যখন সেই স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই একটি ছেলে এগিয়ে এসে বলে— ‘নাচবে আমার সঙ্গে’ গল্পের কথক মেরি ফরচুনের উপদেশ পরামর্শ ভুলে এগিয়ে যায় ছেলেটির সঙ্গে নাচতে। দূর থেকে মেরি ফরচুনের সঙ্গে চোখাচোখি হলে কথক তার চোখ সরিয়ে নেয় লজ্জায়। মানুষের দ্বৈতসত্তার চরম পরস্ফুিটন ঘটে এ গল্পটিতে। বাদ বাকিটুকু পাঠকরা পড়ে নেবেন নিশ্চয়ই। আমি চিরায়ত সাহিত্যের সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছি মুনরোর গল্পে। আমি মনে করি, চিরায়ত কিংবা ক্ল্যাসিক সেসব গল্পগুলোকেই বলা যেতে পারে, যা প্রথম পাঠে যেটুকু আনন্দ দেয়, দ্বিতীয়বার পাঠে তার চেয়ে অধিকতর আনন্দ দেয়। তৃতীয়বারে তার চেয়েও একটু বেশি। অ্যালিস মুনরোর গল্প ঠিক সেরকম—বার বার পড়তে ইচ্ছে হয়। সেই অর্থে তিনি একজন সমকালীন সার্থক ক্ল্যাসিকার।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev