“আমাদের কর্ম ও সংস্কারের আবর্জনা দিনে দিনে দিনে জমে উঠে চারিদিকে একটা বেড়া তৈরি করে তোলে। …..মাঝে মাঝে বেড়া ভেঙে বৃহৎ জগৎটাকে দেখে এলে বুঝতে পারি আমাদের জন্মভূমিটা কত বড়— জেলখানাতে আমাদের জন্ম নয়।”—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।।
এই বাংলাতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বেলাভূমি আছে যেখানে ছুটির আমেজ গায়ে মেখে কিছু ঘন্টার মধ্যে পৌঁছনো যায়। সমুদ্র, নদী, ঝর্না, জঙ্গল, শস্য-শ্যামল গ্রাম—প্রকৃতি যেন উজাড় করে সাজিয়ে তুলেছে এই বঙ্গভূমিকে। বেড়াতে যাওয়ার তেমনি ঠিকানার সন্ধান রইলো আজকের প্রচ্ছদে।

বগুরান জলপাই : নিরিবিলি সমুদ্র সৈকত, ঝাউবনের সারি, পাখির কোলাহল, লাল কাঁকড়াদের বেলাভূমি বগুরান জলপাই। কোলাহলমুক্ত বিচ আর দূষণমুক্ত পরিবেশ এখানকার প্রধান আকর্ষণ। সাদা বালির ফাঁকে ফাঁকে এতো লাল কাঁকড়ার আনাগোনা যে পায়ের আওয়াজে এদের পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। দীঘার মতো সমুদ্রের ঢেউ বড়ো নয় কিন্তু জোয়ারের সময় ঠান্ডা জলে সৈকত ভাসিয়ে দেয়। সূর্যোদয়ের দৃশ্য বা গোধূলি লগ্নে সমুদ্রের জলে অস্তমিত সূর্যের প্রতিফলন অপরূপ করে তোলে চারিদিক। ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে মেঠো পথে সমুদ্র দেখতে যাওয়ার অনুভূতি অনাবিল আনন্দ দিয়ে যায়।

কলকাতা থেকে ১৬৫ কিমি দূরে বঙ্গোপসাগরের তীরে এই সৈকত। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি থেকে মাত্র ৩০ মিনিটে চলে আসা যায়। এখান থেকেই দেখতে যেতে পারেন কপালকুণ্ডলা মন্দির ও শিবমন্দির। বগুরান জলপাই তে থাকার ঠিকানা একটি হোটেল- সাগর নিরালায়। প্রকৃতির সঙ্গে একাকীত্ব অনুভব করতে চাইলে আসতে পারেন এখানে।
বাঁকিপুট : ঘন ঝাউ, ইউক্যালিপটাস, পাম আর নারকেল গাছে ঘেরা জঙ্গল ধরে নিরিবিলি সি-বিচে হাঁটতে চাইলে প্রকৃতই ‘ভার্জিন বিচ’এই বাঁকিপুট। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল বাঁধের কাছাকাছি চলে আসে আর ভাটায় চলে যায় অনেক দূর। অবশ্য সে সময় কাদামাখা বালিতে দেখা মেলে লাল কাঁকড়ার ভরা সংসার। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে নৈসর্গিক আনন্দে ভরে ওঠে মন। একদিকে নির্জনতা আর অন্যদিকে সমুদ্রগর্জনের বৈপরীত্য মাঝে নিজেকে উপলব্ধি করার সেরা গন্তব্যস্থল বাঁকিপুট। সড়ক পথে হাওড়া থেকে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে বাঁকিপুট।

সমুদ্র ছাড়া এখানে রয়েছে ৯৬ ফুট লম্বা দারিয়াপুর লাইট হাউস। নবরূপে সাজিয়ে বাঁকিপুটকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত এই বাতিঘর। নির্জন সমুদ্র সৈকত এবং চারপাশে মাইল ধরে জলের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হতে উপরে উঠুন। এটি প্রতিদিন বিকাল ৩.০০টা থেকে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয়।

এখানে আপনি কপালকুণ্ডলা মন্দিরেও যেতে পারেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিধন্য স্থান। এছাড়া, পেটুয়াঘাট ফিশিংহারবার বাঁকিপুট সমুদ্র সৈকতের কাছে একটি মনোরম মাছ ধরার বন্দর। এখানে রসুলপুর নদী বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে এবং মিলনস্থলটি ক্যানভাসের চিত্রের মতো দেখায়। চাইলে আপনি সারিবদ্ধ মাছভর্তি ট্রলার থেকে টাটকা মাছ কিনতে পারবেন। রসুলপুরের উল্টোদিকে খেজুরির হিজলি— পর্তুগিজদের প্রথম বানিজ্যকুঠি।

জুনপুট : বাঁকিপুট থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জুনপুট। এখানে সমুদ্র বেশ শান্ত। সারি সারি নারকেল, পাম, ইউক্যালিপটাস আর ঝাউ গাছ সাজানো অঞ্চল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মৎস্য গবেষণাগার এবং মৎস্য দপ্তরের একটি মিউজিয়াম আছে এখানে। একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাবার অন্যতম ডেস্টিনেসন জুনপুট। থাকার জন্য রয়েছে গেস্ট হাউস।
মনচাষা : বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের প্রবণতা, নগরকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, শহুরে জীবনধারার হ্যাঙওভার থেকে মুক্তি পেতে আসতে পারেন কলকাতা থেকে মাত্র দেড়শ কিমি দূরে পূর্ব মেদিনীপুরের পাউসি গ্রামে মনচাষা ইকো ট্যুরিজিম রিসর্টে। গ্রামবাংলার লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। ফুলগাছের অভ্যর্থনা, টলমলে ঝিলের জল, পুকুরের মাঝখান দিয়ে মোরামের পথে হেঁটে চলে আসুন মাটির দাওয়া, খড়ের চালের রিসর্টে। চারিদিকে উড়ে বেড়ায় বক আর মাছরাঙার দল। ভুরিভোজের ব্যবস্থাও আছে এখানে। গ্রামবাংলার ধাঁচে মাটির পাত্রে কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় টাটকা সব্জী আর মাছের নানান পদ— কলমি শাক, ঘন্ট, চচ্চড়ি… থেকে আরম্ভ করে মেদিনীপুরের বিখ্যাত গয়না বড়ি ভাজা।

এখানকার গ্রামের মানুষের হাতের তৈরি মাদুর, তাঁত, পুতুল, ব্যাগ, গয়নাবড়ি, ঘর সাজানোর নানান শিল্পের নিদর্শন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘নব্যনকশী’। মনচাষার সংস্কৃতির প্ল্যাটফর্মে পাবেন ছৌ নাচ, রায়বেঁশে নাচ, বাউল দরবেশের গান। গ্রামবাংলার নিজস্ব রূপ উপভোগ করতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন মনচাষায়।
শঙ্করপুর : বিস্তীর্ণ সাগরবেলা আর সবুজ ম্যানগ্রোভের ঠাসবুনোট জঙ্গলের সৌন্দর্য শঙ্করপুরের অন্যতম আকর্ষণ। দিঘার ভিড় এড়াতে অনেকেই চলে আসেন এখানে। স্নান করার জন্য সমুদ্রও এখানে নিরাপদ। সমুদ্রের মুক্ত বাতাসে শ্বেতশুভ্র ফেনা লুটিয়ে পরে বালিয়ারির বুকে। কলকাতা থেকে চার ঘন্টা ড্রাইভ করলেই পৌঁছে যাবেন শঙ্করপুর।

ভাটার সময় সমুদ্র অনেকটাই সরে যায় কিন্তু সেই সময় সমুদ্র সৈকত এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে খুব বেশি দূরে যাওয়া উচিত নয় অন্যথায় জোয়ার শুরু হলে ফিরে যেতে পারবেন না। সমুদ্র সৈকতে মরা মাছ পরে থাকার জন্য অধিকাংশ সময় এগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। বেলাভূমি ধরে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকলে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন মন্দারমনি। তবে সমুদ্র সৈকতে গাড়ি চালানো ঠিক নয়, চোরাবালির ফাঁদে পড়লে উদ্ধার মুশকিল।
ট্রলার আর জেলের নৌকায় পেয়ে যাবেন চিংড়ি, কাঁকড়া, নানান ধরনের মাছ। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে ফিশারী বিভাগের গেস্ট হাউস, বেনিফিশের নিয়ন্ত্রণাধীনে হোটেল।
শহরের কোলাহল থেকে দু-চার দিনের জন্য নির্জনতা আর অথৈ জলের আহ্বান উপভোগ করতে চাইলে কাছাকাছি ঘুরে আসতে পারেন জায়গাগুলি।
Source : adapted from various journals and resources.
Bhalo idea for Short tour
ধন্যবাদ।
Page Four – বেশ ভাল পত্রিকা। বিভিন্ন স্বাদের তথ্য সমৃদ্ধ। প্রথম পড়লাম – তাকিয়ে থাকব নতুন তথ্য’র জন্য।
ধন্যবাদ????
ভালো লাগল।
ধন্যবাদ।
সুন্দর।
ধন্যবাদ????
ভ্রমণ পিপাসুদের মনোরম তথ্য, চিত্তাকর্ষক রচনা, ভীষণ ভালো লাগলো
ধন্যবাদ????
ভ্রমনসুখের সন্ধানে যারা থাকেন তাদের কাছে
এই ছবি সহ বৃত্তান্ত ভীষণ ভালোলাগবে।চমৎকার