খ্রিস্টপূর্ব অন্তত আটশো/ হাজার বছর আগে একটি প্রাচীন ব্রাহ্মণ গ্রন্থে একটি সাংঘাতিক কথা আছে: ভিক্ষা করতে গেলে তুমি লজ্জা জয় করার অভ্যাস তৈরি করতে পারবে— অহ্রীর্ভূত্বা ভিক্ষতে৷
তার মানে, মান-অপমান, জয়-পরাজয়, সুখ-দুঃখ- এই দ্বন্দ্বগুলির ওপরে ওঠাটা আত্মীকৃত হতে থাকে এই ভিক্ষার অভ্যাসে৷ তাই আমি সন্ন্যাসী যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি ভিখারি হতে চাই— বলেছিলেন কবলভোজী দশনামী সম্প্রদায়ের এক সাধু৷ ছোটবেলায় আমাদের বাড়ি ভিক্ষা করতে এসেছিলেন তিনি। হৃৎকমলে আজও তাঁর ছবি উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আঁধার হল— আমার পিতাঠাকুর ভিখারিকে রাত্রের খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, তিনি খেলেন না, বললেন- না, দিনে এক বারই ওই কবলগ্রাস, আর না৷ পিতাঠাকুর তাঁর জন্য বহির্বাটীর কাছারি ঘরে শোয়ার জায়গা করে দিলেন, তিনি সেখানে শুলেন না৷ বললেন এই দাওয়ায় এসে মাটিতে বসেছি, এখানেই শুয়ে পড়লাম৷ তিনি আমাদের ঘরের বারান্দায় যেখানে পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন, সেই মাটির বারান্দায় পরম সুখে শুয়ে পড়লেন মাটি থেকে পা দু’টি তুলে, কাঁধের পোটলাটি মাথায় দিয়ে৷
পরের দিন সকাল হতে ভিখারিকে আর দেখা গেল না৷ এদিক ওদিক খোঁজাও হল৷ কোথাও নেই ভিখারি৷ আমার বাবা মা’কে রাগত স্বরে বললেন— ‘আরও চিক্কুর দ্যাও, অতিথি বস্যা গ্যালো৷’ আমার মা বললেন— ‘যদি আমার চিক্কুরেই যায়্যা থাকে, তালে তোমার ভিহারির অহম্ আছে এহনো, তার অপমান হোচ্ছে৷ আমার মনে হয় সে যায় নাই, আমি চিন্যা গেছি ওঁয়ারে৷’
আমার মায়ের বাক্য সত্য করে ভিখারি ন’টা নাগাদ আমার মায়ের ভোগরান্নার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল- মা ভিক্ষা এনেছি৷ আমার মা গলা শুনেই সব বুঝেছেন৷ তিনি মুখ না ফিরিয়েই বললেন— যা এনেছ পাঁচ ভাই ভাগ করে নাও৷ ভিখারি হা-হা করে হেসে বলল— আমি আর চার ভাইয়ের অপেক্ষা কচ্ছি মা গো৷ কিন্তু তোমার দ্রৌপদী ভাগ হয়েই আছে— এই দ্যাখো না চাল, ডাল, তরকারী, শাক, এমনকী একটি কাঁচা আমও আছে৷ তুমি নিজেই আজ বাড়ির সকলের জন্য রসুই করবে৷
স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুর সেটা কত প্রিয় ব্যঞ্জন ছিল যে, সার্বভৌম ভট্টাচার্য তাঁর জন্য জগন্নাথের উত্তম মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা করলেও ‘প্রভু কহে, মোরে দেহ লাফ্রা-ব্যঞ্জনে৷ পীঠাপানা দেহ তুমি ইঁহা সবাকারে৷’
সে দিন ভিখারির আনা ভিক্ষার চালে-ডালে খিচুড়ি আর লাফরার প্রসাদ বাড়ির সবার ভাগে জুটল; সবার এতটাই তৃপ্তি হল যে, আমার মা বললেন- খিচুড়ি আর লাবড়া আমি আগেও অনেক রেঁধেছি, কিন্ত্ত কারও এত তৃপ্তি হয়নি গো, ভিখারি! তোমার ভিক্ষার স্বাদই আলাদা৷ ভিখারি বলল- এটা ভিক্ষান্নের স্বাদ যতখানি, তার থেকে অনেক বেশি তোমার অল্পে খুশি হওয়ার স্বাদ, মা জননী!
আমার মা একটু পেঁচিয়ে বললেন- সে তো তোমার তৃপ্তি দেখেই বুঝলাম, সাধু! তুমি গত কাল এক বার এই গেরস্তের ঘরে এক দলা ভাত খেয়েছ৷ আজকে ভিক্ষে করে এনে সে ভাত ফিরিয়ে দিলে তুমি৷ দশনামী সম্প্রদায়ের বলিষ্ঠ সাধুটি এ বার সটান সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে বিনতি জানিয়ে আমার মাকে বলল— তোমার কাছে ধরা পড়ে গেছি, মা জননী! কিন্ত্ত আজ পর্যন্ত ধরা পড়িনি কোথাও৷ দ্যাখো মা! এটা আমাদের একটা ভাবনার মধ্যেই থাকে— ভিখারি হয়ে গেরস্তের ঘরে থালা গাড়তে নেই বেশি৷
সকলের অবস্থা সমান নয়, সকলের মনও সমান নয়, তা ছাড়া জীবনের হাজার যন্ত্রণা এবং হাজারও চাওয়ার বিষয় তাকে জর্জরিত-কুটিল করে তোলে৷ তেমন একটা ঘরে অতিথি হলে মনে হয় যেন অন্ন-ঋণ হয়ে গেল, তখন ভিক্ষা করে এনে খানিক দিয়ে-থুয়ে বাঁচি৷
আমার মা বললেন— তুমি তো বাপু, খাও এক গ্রাস, তার মধ্যে আবার অন্ন-ঋণ হয়ে যাচ্ছে, বাড়াবাড়ি কথা বোলো না৷
ভিখারি বলল— ঋণটা কিন্ত্ত কতটা তোমার বাড়িতে খাচ্ছি, এটার ওপরে নির্ভর করে না, নির্ভর করে ভিখারিকে তুমি কী চোখে দেখছ, তার ওপর, কী ভাবে তুমি তাকে দিচ্ছ তার ওপর৷ একটা গেরেমভারী উপনিষদের কথা আছে— মানুষকে, অতিথিকে যেটুকু দেবে, সেটা শ্রদ্ধার সঙ্গে দিও, আর শ্রদ্ধা যদি না থাকে তা হলে দিও না— শ্রদ্ধয়া দেয়ম্৷ অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম্৷ গৃহস্থ ভিখারিকে ভিক্ষে দিচ্ছে, অতিথিকে খাওয়াচ্ছে, তার মধ্যে শ্রদ্ধা আছে কি না বুঝবে কী করে৷ উপনিষদ বলেছে— যেটা দিচ্ছ, তার মধ্যে শ্রী থাকে অর্থাৎ ছিরি-ছাঁদ থাকে একটু, হেলায় দিয়ে ধন্য করার ভাব যেন না থাকে৷
তোমার দেবার মধ্যে যেন লজ্জা থাকে একটু, অভিমান-অহংকার যেন তোমার দেওয়ার ইচ্ছেটাকে আক্রান্ত না করে; তোমার দেওয়ার মধ্যে যেন ভয় থাকে একটু, দিয়ে যদি তোমার অনুতাপ হয়, অতিথিকে খাওয়ানোর পরে যদি মনে হয় যে, লোকটাকে ফালতু খাওয়ালাম, তা হলে অন্যায় পাপ হয়, সেই পাপের ভয়টা যেন থাকে একটুও— শ্রিয়া দেয়ম্৷ হ্রিয়া দেয়ম্৷ ভিয়া দেয়ম্৷ এতগুলো কথা বলার পরে উপনিষদ বলল— সংবিদা দেয়ম্৷ অর্থাৎ কি না খাওয়ানো বা দান করা প্রাথমিক কাজটা হল- যাকে তুমি খাওয়াচ্ছ বা দান করছ, তার সঙ্গে তোমার আত্মীয়তা তৈরি করা৷
ভিখারি শেষ কথায় বলল— এই যে শ্রী, লজ্জা, ভয় এবং আত্মবোধ, এগুলি সবই কিন্ত্ত ওই প্রথম শ্রদ্ধা কথাটার অনুপান৷ শ্রদ্ধার সঙ্গে দিলে এগুলি সব আপনিই তার মধ্যে আসে৷ আর এই শ্রদ্ধাটা যদি না থাকে তা হলে ঔপনিষদিকের সার্বিক বারণ- তার চেয়ে কাউকে কিছু দিও না বরং, কাউকে খাইয়ো না বরং ‘অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম্’৷
ভিখারির সেই কথাটি আজও ভুলিনি।
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়, এ কি নিছক শব্দের খেলা?