শুধু বাঙালি কেন এ রাজ্যের যে কোনো মানুষের খাদ্য তালিকায় আলু এমন ভাবে মিশে আছে যে আলু ছাড়া ভাবা যায়না। বিরিয়ানী থেকে শুরু করে ফুচকা, টিকিয়া, চপ কোনোটাই আলু ছাড়া হয় না। দেশি বিদেশি কর্পোরেট সংস্থা প্যাকেটজাত আলুর চিপ্স বিজ্ঞাপন দিয়ে দেদার ব্যবসা চালাচ্ছে, কিন্তু আলুচাষীরা আত্মহত্যার পথেই মুক্তি খুঁজছেন। প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে ব্যবসায়ী সংগঠনের ধর্মঘট উঠে যাওয়ার পরেও খুচরো বাজারে জ্যোতি আলুর দাম কেজি প্রতি ৩৫+টাকা এবং চন্দ্রমুখী আলুর দাম ৪০+। শাক-সবজির দামবৃদ্ধি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী গত ৯ জুলাই নবান্নের বৈঠকে আলুর দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ রাজ্যের আলু এবং পেঁয়াজ অন্য রাজ্য বা পড়শি দেশে পাঠানো বন্ধ করতেও নির্দেশ দিয়েছিলেন। পুলিশ মাঠে নেমে আলু বোঝাই লরি আটকাতে শুরু করলে পাইকারি আলু ব্যবসায়ীদের সংগঠন ধর্মঘট করে। হিমঘর থেকে আলু বের হওয়া বন্ধ হয়। জোগানে ঘাটতি পড়তেই আলুর দাম কেজিতে ৪০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
এখন গোটা রাজ্যের সব জেলাতেই কমবেশি আলু চাষ হয়। আমাদের রাজ্যে পোখরাজ, জ্যোতি, চন্দ্রমুখী, সুপার সিক্স, কে ২২ এবং পেপসি আলু চাষ হয়। আলুচাষ করতে গেলে দোঁয়াশ মাটিওয়ালা জমি, বীজ, জল ছাড়াও বিঘা প্রতি চাষে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার দরকার পড়ে। এত পুঁজি লাগে বলেই কৃষক বাধ্য হয়ে ঋণ নেয়। এই ঋণ মহাজনের কাছ থেকে দাদন, সোনা বন্ধক দিয়ে ধার, সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০% হারে সুদ নিয়ে চাষ করে। এক বিঘা আলু চাষ করে বাজার মূল্য মেলে ২ হাজার টাকা। তার মধ্যে জমির আল জুড়তে খরচ ৫০০ টাকা। ইউরিয়া এক প্যাকেট ৩৯০ টাকা। দশ ছাব্বিশ চার বস্তা ৭ হাজার দুশো টাকা। আলু বীজ কাটতে চারটে মুনিষের মজুরি ১০০০ টাকা, সার ছিটাতে দুজন মুনিষের খরচ ৫০০ টাকা। আলু বসাতে ৮ জন মুনিষ লাগে, তাদের মজুরি ২০০০ টাকা। বীজ ৬০০০ টাকা (১ বিঘা জমি চাষ করতে ৫ প্যাকেট বীজ লাগে, ১ প্যাকেটের দাম ৫০ কেজি)। জলের জন্য খরচ ১৫০০ টাকা (রিভার পাম্প থাকলে ), শ্যালো থেকে নিলে ৩ হাজার টাকা (আলু চাষের জন্য জমিতে ৬-৭ বার পাম্প দিতে হয়)। ভুঁই কোপাতে ১০ জন মুনিষ লাগে, খরচ আড়াই হাজার টাকা। কানি মারতে (মাটি সাজাতে) মুনিষ খরচ পনেরোশো টাকা। কীটনাশক ২ হাজার টাকা ।
চাষীরা যে ফসলের দাম পায়না তার কারণ, সরকারি ঋণ মাঝারি ও গরিব চাষীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পায় না, বাধ্য হয় দাদন, মহাজনী সুদের উপর নির্ভর করতে। সেই সুযোগে ব্যবসাদার, সুদের কারবারি, মহাজনরা চড়া সুদে, চক্রবৃদ্ধি হারে কিংবা তার কাছে আলু বিক্রি করবে এই শর্তে ঋণ দেয়। এইসব মহাজন, সুদের কারবারিদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের অশুভ আঁতাত বহুকাল ধরে, যারা আলুর মতো ফসলের বাজারও নিয়ন্ত্রণ করে। একটা অদৃশ্য খেলা চলে আসছে, ফসল ওঠার ঠিক আগেই বাজার নেমে যায় আর ফসল ব্যবসাদারদের কাছে চলে গেলেই দাম চড়ে যায়। কৃষক বাধ্য হয়েই ফসল বিক্রি করে, অল্প সংখ্যক বড় কৃষক কোল্ড স্টোরেজগুলিতে আলু রাখতে পারে। ওদিকে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ মেটাতে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আলু বিক্রি করে ধার শুধতে হয় তা নাহলে মহাজন, ব্যবসায়ীদের হাতেই ফসল তুলে দিতে হয় যাতে পরের বছর চাষের আগে ঋণ, দাদন পাওয়া যায়। মাঠ ভরতি আলুর ছত্রাক মারতে দরকার হয় Dithane M-45, আরেকটি ইফকো কোম্পানির সার NPK 10-26-26। আগে Dithane M-45-এর দাম ছিল ২৭০ টাকা কেজি। এখন ৫১০ থেকে ৫২০ টাকা টাকা কেজি। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী NPK 10-26-26 সারের দাম ১,৪০০ টাকা কেজি। কিন্তু সরকার পরিচালিত যে কোনো কৃষি সমবায় সমিতি থেকে কিনতে হয় ১,৭১০ টাকা কেজি দামে। অনেকসময় সমবায় সমিতিতেও এই সার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে সারের দোকান থেকে কিনতে হয়। এই সার প্রয়োগে আলুতে ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের মাত্রা সঠিক হয় এবং আলুর কোনো রোগ হওয়ার ভয় থাকে না। ফলে এই সার না কিনে উপায়ও নেই।
এক বিঘা জমিতে আলু চাষের শুরুতেই অন্তত এক ঘন্টা ট্র্যাক্টর দিয়ে মাটি চষতে হয়। এক ঘন্টার ট্র্যাক্টর ভাড়া ১,২০০ টাকা। এরপর আলুর বীজ, দাম — এক বস্তা ২,৮০০ টাকা। প্রতি বিঘেতে পাঁচ বস্তা বীজ ফেললে মেরেকেটে ৭০-৮০ বস্তা আলু ওঠে। এক বিঘে চাষ করার জন্য প্রথমে ১৪ হাজার টাকার বীজ, তারপর NPK 10-26-26 ও Dithane M-45; খরচ ৭,৫০০ টাকা। এরপর বিদ্যুৎ বিল বছরে লাগে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। তার মানে এক বিঘে জমিতে আলু চাষ করতে ২৮ হাজার টাকা খরচ। এই টাকা খরচের পর ৭০ থেকে ৮০ বস্তা আলু মহাজনের কাছে বেঁচে খুব বেশি হলে আসবে ২৫০ টাকা বস্তা। তার মানে হাতে পাওয়া টাকায় ধারই শোধ হয়না, আলু চাষ করে নিজের ঘরে খাওয়ার আলুটুকু পর্যন্ত থাকে না। তাহলে আর আলু চাষ কেন? চাষ তো করতেই হবে কারণ, জমি, মাটি আর ঘাম ছাড়া ওঁদের যে কোনো সম্বল ওঁদের নেই। হিমঘরে আলু রাখার সঠিক পরিকাঠামো নেই। মহাজনরা কৃষকদের বাজারে আলু পাঠানোর খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক সময় অনেক আলু পচে যায়। তাই কৃষক অনেক কম দামে খুচরো হিসাবে মহাজনদের আলু বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কৃষকদের ঘরে আগে যেখানে গোটা বছরে এক বিঘে জমি চষে ১৪-১৫ কুইন্টাল আলু থাকত, এখন সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮-৯ কুইন্টালে। বাজারে আলুর দাম উঠছে নামছে, আড়তদার, হিমঘরের মালিক, ভিন রাজ্য থেকে আসা আলু, এ রাজ্য থেকে ভিন রাজ্য বা বাংলাদেশে চলে যাওয়া আলু ইত্যাদির বাজার অর্থনীতির জটিল হিসাবের মধ্যে পড়ে গিয়ে কৃষক আরও অসহায়। চাষ করেও ফসল বা টাকা কোনোটাই তাঁদের হাতে নেই। তাহলে যাচ্ছে কাদের হাতে? বস্তুতপক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝখানে যারা রয়েছেন সেই আড়তদার, বন্ডের ফাটকা কারবারি, ছোট-বড় কোম্পানিই লুটে নিচ্ছেন ফায়দা।