অমলাশংকর (২৭ জুন ১৯১৯-২৪ জুলাই ২০২০) বিশ্বখ্যাত ভারতীয় নৃত্যের বাঙালি নৃত্যশিল্পী। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের স্ত্রী, আনন্দশংকর ও মমতাশংকরের মা এবং রবিশঙ্করের ভ্রাতৃজায়া। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই নৃত্য শিল্পী অমলা নন্দী ১৯১৯ সালের ২৭ জুন তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার (যা বর্তমানে জেলা) বাটাজোড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অমলা নন্দী বাটাজোড় গ্রামের পাঠশালায় দ্বারকনাথ সিকদারের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। পরবর্তীতে তিনি খুলনা ও কোলকাতা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৪১ সালে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পাশ করেন।
অমলার প্রতিভার বিকাশ ঘটে তাঁর কৈশোর থেকেই। ১৯৩১ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি অংশগ্রহণ করেন প্যারিসের ইন্টারন্যাশনাল কলোনিয়াল এগজিবিশনে। ওই সময়েই উদয়শঙ্কর পরিবারের সঙ্গে তাঁর আলাপ। তখনও ফ্রক পরতেন শিল্পী। দূরদর্শনে বহু পুরনো একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘তাঁর স্বামী, কিংবদন্তি নৃত্যগুরু উদয় শঙ্করের সঙ্গে যখন তাঁর আলাপ হয়, তখনও তিনি ফ্রক-পরিহিতা।’ অমলার বাবা অক্ষয় নন্দী কলকাতার একজন নামী গয়না ব্যবসায়ী ছিলেন৷ ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে অমলা তাঁর বাবার সাথে প্যারিসে গিয়েছিলেন৷ সেখানে সে সময় পারফর্ম করতে গিয়েছিলেন উদয়শঙ্করও। জীবনটাই বদলে গেল কিশোরী অমলার ।
তার কিছুদিন পরেই তিনি উদয়শঙ্করের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। দীর্ঘ এক বছর ইউরোপ সফর শেষে অমলা কোলকাতা ফিরে নৃত্য চর্চায় নিমগ্ন হন। এ সময় তিনি উদয়শঙ্কর ও কথাকলির নৃত্যগুরু শঙ্করণ নামবুদ্রির কাছে নৃত্যের তালিম নিতে থাকেন। পরবর্তীতে আলমোড়ায় ইন্ডিয়ান কালচার সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে অমলা এখানে এসে যোগদেন। এখানে তাঁর নৃত্য চর্চার সাথে সাথে চলতে থাকে চিত্রকলার চর্চা। শিক্ষা সমাপ্ত করে অমলাশঙ্কর স্বামী উদয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর নৃত্য দলের প্রধান নৃত্যশিল্পী হিসেবে বেরিয়ে পড়লেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সেই সময়কার অনুষ্ঠান গুলোতে তাঁর অসাধারণ নৃত্য কলাকৌশল যে সৌন্দর্যময় স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতো, তা দর্শকের হৃদয়ে আজও অম্লান হয়ে আছে। বিদেশে থাকার সময়েই একদিন রাতে হঠাৎই তাঁর ঘরে এসে বিয়ের প্রস্তাব দেন উদয়শঙ্কর এবং সেই কথার আকস্মিকতায় কেঁদে ফেলেছিলেন ১৯ বছরের তরুণী অমলা। বিয়ে হয় ১৯৪২ সালে। সেই বছরই ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করে তাঁদের প্রথম সন্তান আনন্দশঙ্কর। আর কন্যা মমতাশঙ্করের জন্ম হয় ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে।

গত শতাব্দীর চারের দশক থেকেই উদয়শঙ্কর ও অমলাশঙ্কর জুটি হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী-দম্পতিদের অন্যতম।
নৃত্যশিল্পী অমলা শঙ্করের আর একটি বিশেষ শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর অঙ্কিত চিত্রকলার মাধ্যমে। বিশেষ করে কোলকাতা ইডেন গার্ডেনের উন্মুক্ত মঞ্চে উদয়শঙ্করের ‘লর্ডবুদ্ধ’ রঙ্গিন ছায়ানৃত্যে তাঁর অংকিত সুন্দর সুন্দর স্লাইডগুলো দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল এবং পরবর্তীতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সামান্য ক্ষতি’ নৃত্যনাট্যেও তাঁর আঁকা স্লাইডগুলোও ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী সমগ্র জীবন নৃত্য সাধনা করে ‘উদয়শঙ্কর ইন্ডিয়া কালচার সেন্টার’— এ নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে নৃত্যকলার প্রসারে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।
তাছাড়াও অমলা শঙ্কর চলচ্চিত্রেও খ্যাতির স্বাক্ষর রাখেন। তিনি “কল্পনা (১৯৪৮)” ছবিতে অভিনয় করে অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দেন। ছবিটি রচনা, সহ-প্রযোজনা, পরিচালনা করেছিলেন উদয়শঙ্কর, যিনি ছবিতেও উপস্থিত ছিলেন। অমলা, উমার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে উদয়শঙ্করের মৃত্যু হলে অমলাশঙ্কর স্বামীর নৃত্যধারাকে বহমান রাখেন পুত্র আনন্দশঙ্কর ও কন্যা মমতাশঙ্করকে নিয়ে।
অমলা শঙ্কর তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন প্রচুর সম্মান। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কারে। ১৯৯১ সালে ভারত সরকারের কাছ থেকে ভারতের অন্যতম উচ্চ সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেন। দিল্লীতে এক রাষ্ট্রীয় স্বাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরমন তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেন। তাছাড়াও নৃত্যর জন্যই ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার লাভ করেন।
২০২০ সালের ২৪ জুলাই শুক্রবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে বয়স ছিল ১০১ বছর। পরবর্তী সময়ে তাঁদের নৃত্যের ধারা বয়ে নিয়ে চলেছেন কন্যা মমতাশঙ্কর এবং পুত্রবধূ তনুশ্রীশঙ্কর।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অনুবাদক ও কবি। লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।