আমার দুর্গা… আজ সকালে ঘরের দুয়ারের কাছে এসেছিলো। সকাল থেকে এলোমেলো পোশাকে সে চুলের পোকা তাড়াচ্ছিলো। ঘুম চোখে তাঁর দিকে অবাক পানে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। পথপ্রান্তে সকালের বাজার ফেরত মানুষ তাঁকে দেখে একটু দাঁড়িয়ে চলে গেল। আজ যে দশমী, বাড়িতে অনেক কাজের তাড়া!!
আমিও সকালের কাজে নেমে পড়লাম, শরীর একটু বিগড়েছে, তাই কম কম রান্না বান্না করবো আজ। কিন্তু সে উপায় কি আর আছে? বারে বারে মনে হয় যে, বাইরের লোকটা কেন এমন শুয়ে আছে? অসুস্থ কি? অগত্যা যেতেই হলো তাঁর কাছে… কি গো কি হয়েছে? উত্তরে স্পষ্ট উচ্চারণে শুনলাম সে বললো… কিছুই না, এমনি শুয়ে আছি।
বললাম, থাকো কোথায়?
এখানেই তো থাকি। দেখো নি আগে আমাকে?
না তো!! খাবে কিছু?
খুব সাবলীলভাবে বললো সে… হা খেতে তো হবেই, না হলে উঠতে যে পারবো না।।
বাড়ি ঢুকে দেখি.. আমার ঘরের লোক এক প্যাকেট বিস্কুট আর জলের বোতল নিয়ে রেডি। হাত বাড়িয়ে দিয়ে আসতে বললো।
জানলা দিয়ে তাঁর গুছিয়ে খাওয়া দেখে আর জলের আকুল পিপাসা মেটানো দেখে অসময়ে গলায় কান্না দলা পাকালো।
রুটি-আলুর তরকারি দিয়েই সকালের জলখাবারের ব্যবস্থা আজ। তিনটে রুটি কখন যেন বেশি করে ফেললাম আর পা বাড়িয়ে তাঁর কাছে আমার সামান্য খাবার, কাগজের প্লেটে করে পৌঁছেও দিলাম।

ঘরের ব্যালকনি থেকে তাঁর হাত চেটে খাওয়া আর যত্নে সাজিয়ে খাবার রাখা দেখে অঝোরে চোখের জল শুধু বেড়িয়ে গেল।
আমার দুর্গা আজ চেটেপুটে খেয়ে ১ টা রুটি আর ২ টো বিস্কুট এককোনায় সাজিয়ে রাখলো।
এবার সকালের খালি পেট আমারও তো ভরতে হবে, তাই আবার তাঁর থেকে চোখ সরিয়ে কাজে নামলাম, নিজের পেট ভরলাম। দুপুরের ভাতের হাঁড়িতে একমুঠো বেশি করে চালও নিলাম, সে যে আছে, আমার আজকের অতিথি।
কাজ গুছিয়ে জানলা দিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি সে নেই, শুধু পড়ে আছে ঐ সাজানো রুটি-বিস্কুটের অংশ।
হন্যে হয়ে খুঁজেছি তাঁকে এ গলি, সে গলি… আমার দুর্গা কি তবে দিলো রওনা ঐ কৈলাশের পথে?? আমি যে তাঁর জন্য দুপুরের অন্ন সাজিয়ে রাখলাম.. কি হবে এবার???
আপাত পুজো আচ্চা বিহীন (অনেকের কথায় নাস্তিক, তা কিন্তু নই, তবুও) আমি… আজ এই অনাহারে কৃশ মানুষটার মধ্যে আমার মা দুগ্গাকে দেখলাম… এখনও আমি পাহারাদার তাঁর ফেলে যাওয়া খাবারের…তবু যদি একটু সময় মিলতো, তাঁকে যত্ন করে তাঁর উপযোগী ঠাকুরবাড়ি (কোন হোমে) রাখতাম। কিন্তু সে যে বিসর্জনের পথ বেছে নিলো.. কোথায় আর পাবো তাকে!!
এমন করে মায়েরা হারিয়ে যায় আমাদের জীবন থেকে.. পথে পথে কত দুর্গা ঘোরে এমনই। এমন দিন যেন না আসে কারোর জীবনে.. এই টুকুই প্রার্থনা করি শুধু।
আজ এমন করেই হলো আমার দুর্গা বরণ…