| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আমার কালী : লিখছেন শুভাপ্রসন্ন

Reporter
শুভাপ্রসন্ন / ১০৯৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

তিনি কালী। তিনি শ্যামা। তিনি ভয়ঙ্কর সুন্দর। এ রূপ-প্রতীক যাঁরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁরা মহাশিল্পী। পৃথিবীর প্রাচীনতম এই ভাস্কররূপ মনে হয় সহস্র বছরের নানা বিবর্তনে শিল্পভাস্কর্যের নানা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা পেরিয়ে এখনও আধুনিকতম।

হিন্দু বা শাক্ত বিশ্বাসে নয়— একজন, যিনি রসিক কিংবা সরল, সাধারণ মানুষের কাছেও এ মূর্তি বিস্ময় সঞ্চার করে। খুব ছেলেবেলায় আমাদের পাড়ার কালীপুজোর মণ্ডপের স্মৃতি মনে আছে— সেই স্মৃতি নিয়ে প্রতি বছর কালীপুজোর সময়ে একবার অন্তত উঁকি দিই সেই মণ্ডপে।

সালটা ঠিক মনে নেই। উনিশশো তিপান্ন কী চুয়ান্ন হবে। প্রয়াত নিতাই পাল গড়েছিলেন সেই প্রতিমা। কলেজ রো-র মোড়ের পুজোমণ্ডপ। পুজোর আগের দিন খুব উঁচু মঞ্চ তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের উপরে ধবধবে সাদা আলুলায়িত শিব। গা বেয়ে পাহাড়ি ময়াল সাপ। তাঁর শরীরের সেই ধাতব তামাটে রং, চাকা চাকা দাগ আর তাঁর শরীরের উপরে দণ্ডায়মান জিভকাটা কালী। কী সুন্দর তাঁর রূপ! তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল।

সেদিন পুজো উদ্বোধনের অনুষ্ঠান হবে। প্রতিমার একটু নীচে পাহাড়ের উচ্চতায় সেই মঞ্চ। সরোদ বাজাবেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান। সঙ্গে রবিশঙ্কর, বাহাদুর খান। তবলায় যত দূর মনে পড়ে, ছিলেন কানাই বসু। আয়োজকদের অন্যতম ছিলেন আলী আহমেদ খান। সানাইয়া আহমেদ খান থাকতেন আমাদের পাড়ায়। বেশ রাত করে শুরু হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান। ওই বয়সে রাত্রে বেরনোর অনুমতি ছিল না। তবে, কালীপুজোর ছুতোয় চলে গিয়েছিলাম; হয়তো কারও সঙ্গে। আমার বাজনা শোনার তো সুযোগ ছিল না— দেখেছিলাম মাত্র। তারই আবছা স্মৃতি।

আলোয় প্রতিমার মুখ উজ্জ্বল। তাঁর পায়ের কাছে আর মঞ্চের মাঝখানে সেই সব ওস্তাদেরা। সেই স্মৃতি বিমূর্ত হয়ে ধরা দেয়— সংস্কৃতি, শিল্প, দর্শন ভাবনায়। সেই সব মানুষেরা কালীমা-র ভক্ত ছিলেন, হয়তো বাঙালি বলেই।

বাঙালিদের কালীভক্তির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। বাঙালি যেখানেই প্রতিষ্ঠা করেছেন কালী মন্দির। কালী পুজোর আয়োজন করেছেন। নানা রূপে, নানা ভাবে। শ্মশান থেকে লোকালয়ে, বারোয়ারি থেকে গৃহস্থের আলয়ে তাঁর পুজো। নানা উপচারে পূজিত তিনি। কখনও লৌকিক মতে, কখনও বা তান্ত্রিক পদ্ধতিতে। নানা প্রাচীন মন্দির-দেবালয়-কালীক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে এই বাংলায়। অসংখ্য সাধক, সিদ্ধ পুরুষ তাঁর সাধনা করেছেন মাতৃরূপে, চিণ্ময়ীরূপে।

কত পুরাণ কাহিনী তাঁকে নিয়ে। মহারাজ দক্ষের কনিষ্ঠা কন্যা সতী নিজেই পতি হিসেবে বরণ করেছিলেন মহাদেব শিবকে। কোনও এক যজ্ঞস্থলে মহাদেব দক্ষপ্রজাপতিকে প্রণাম জানাননি। তাই, দক্ষ নিজেকে অপমানিত বোধ করেছিলেন। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরের যজ্ঞে শিবকে আর আমন্ত্রণ জানাননি। অথচ, সেই যজ্ঞে ত্রিলোকের সকলেই আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। নারদমুণির কাছে সতী জেনেছিলেন সেই মহাযজ্ঞের মহা সমারোহের কথা। কিন্তু এই যজ্ঞ-অনুষ্ঠান যে তাঁর পতি মহাদেবকে অপমান করার অভিলাষেই আয়োজিত, তা ভেবে ভীষণ দুঃখ পেলেন সতী। তিনি স্থির করলেন কৈলাস থেকে পিতার কাছে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করবেন। তাঁর ধারণা, পিতা হয়তো তাঁর আদরের কন্যার কথা রাখবেন এবং ওই মহাযজ্ঞে তাঁদের যোগ্য আমন্ত্রণ জানাবেন। কিন্তু কৈলাসপতি শিব কিছুতেই সম্মত হলেন না। সতী দেবীও নানা অনুনয়ে স্বামীকে রাজি করানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর বাসনা পিত্রালয়ে যাওয়ার এবং তাঁর পিতা দক্ষকে সব কিছু জানিয়ে, বুঝিয়ে তাঁর মন গলানোর। তবু, শিব অনড় রইলেন। উপরন্তু, নানা ভাবে সতকে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বোঝাতে লাগলেন— আমরা কৈলাসে মহাসুখে আছি, যজ্ঞভাগে আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই। আর, আমার তো মা-অপমান নেই, কাজেই কো কোথায় আমায় আমন্ত্রণ করল কি না, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যজ্ঞের আমন্ত্রণ হলে তোমায় ছেড়ে আমায় থাকতে হয়, এজন্য এই বাল যে, কোথাও আর যেতে হবে না। এ ছাড়া আমি জানি যে তোমার পিতা তোমার কথা রাখবেন না। আর, আমার বিষয়ে তোমার কাছে অনেক গালমন্দ করবেন। তা তুমি হয়তো সহ্য করতে পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কোনও ভাবেই শিবকে রাজি করাতে না পেরে ক্রমশ সতীর অভিমান ক্রোধে রূপান্তরিত হতে লাগল। মনে হল, যেন সেই রোষাগ্নি দিয়ে তিনি ত্রিজগৎ পুড়িয়ে দেবেন। শিব তখন সতীর ভয়ঙ্কর রূপ দেখতে লাগলেন— সমস্ত দিকেই দেবীর নানা রূপ দেখা দিলে লাগল। এইভাবেই দশমহাবিদ্যা বা কালীর দশ রূপ কল্পিত। যা পুরাণে প্রতীকে বর্ণিত আছে।

ইে রূপের প্রথমটি মহাকালের শক্তিদায়িনী মহাশক্তি কাল। এ রকম পুরাণকথার পাশাপাশি এই সংহার রূপের তাৎপর্য বা তত্ত্বব্যাখ্যা হল এই যে, অহঙ্কারে উন্মত্ত দক্ষ কাল-কে বঞ্চনা করলেন। কাল অর্থাৎ, মহাকাল-রূপ শিব-শঙ্কর। দক্ষ কর্মশক্তির প্রতীক। কর্মশক্তি বা যজ্ঞশক্তি দিয়ে কাল-কে জয় করা যায়। আবার, কাজ করলেই হয় শক্তির সঞ্চার। কিন্তু কালহীন শক্তি বা ঈশ্বরহীন কর্মই দক্ষযজ্ঞ। কাল বা মহেশ্বরের সঙ্গে প্রকৃতির বা শক্তির বিচ্ছেদ তাই নিস্ফলা। ব্রহ্মাণ্ডের যত কিছু গুণ-ক্রিয়া, সবই তাঁর লীলা। তিনি শিবের বুকে কালী রূপে সৃষ্টি-রহস্য প্রকাশ করেছেন। শিব শবের মতো নিস্ক্রিয় ভাবে পড়ে আছেন। আর শব রূপী শিবের উপরে কালী সংহারে সক্রিয় ভাবে নৃত্যরতা। শিব চৈতন্যের প্রতিমূর্তি। তাই তিনি স্বচ্ছ, নির্মল, সাদা। মহামায়া একক শক্তিতে প্রকাশিত হতে পারেন না। তিনি চৈতন্যের সাহায্যেই প্রকাশ পেতে পারেন। তিনি চৈতন্যের সাহায্যেই প্রকাশ পেতে পারেন। তিনি চৈতন্যের কাছে ঘোর অন্ধকারের মতো কালো। মহাদেব বা শিব-শিব আর মহামায়ার দিগম্বর বেশের তাৎপর্য এই যে, তাঁরা সর্বব্যাপী। তাঁদের কোনও বস্তু দিয়ে ঢাকা যায় না। কালীর উলঙ্গিনী রূপ এই জন্যই যে, তিনিই একমাত্র অদ্বিতীয় রূপ। তাঁর অতিরিক্ত কেউ নয়। তিনিই সর্বস্বরূপা। অন্যভাবে, তাঁর চতুর্দিকেই অম্বর। এজন্য কালীমায়ের অন্য নাম দিগম্বরী। মনপ্রকৃতির রূপকল্প থেকে তাঁর চতুর্ভুজকে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ দিক হিসেবে ধরা হয়।

কালো রঙের ব্যাখ্যা নানা ভাবে বর্তমান। প্রথমত, কালো রং সর্বগ্রাসী। সমস্ত রং মিশে কালো রঙের সৃষ্টি। আবার অজ্ঞানতার বর্ণও কালো। যিনি মনের সমস্ত অজ্ঞতা, মালিন্য, হিংসা, দ্বেষ, শঠতা, প্রবঞ্চনা, কাম, ক্রোধ, কুচিন্তা, কুধারণাকে গ্রাস করে নেন, তিনি কালী। কালো বর্ণ তাঁর।

তাঁর ত্রিনেত্র বা জ্ঞানচক্ষু, যা দিয়ে তিনি অন্তর্জগৎ দেখতে পান। তিনি অসি হাতে অসুরের যুদ্ধে প্রবত্ত হলেন, রক্ত পান করলেন। এও এক রূপক। মানুষের মধ্যে যে কাম, ক্রোধ, শঠতা, হিংসা প্রভৃতি নানা ধরনের মনোবৃত্তি রয়েছে এবং যে মনোবৃত্তির কারণে মানুষ অস্থির; নানা দুঃখ-শোকে জর্জরিত— তিনি সেই সব অসুর প্রবৃত্তিকে নিধন করতেই অসি ধারণ করেছেন। একটি অসুর বধের পর তার রক্ত থেকে জন্ম নেয় শত শত অসুর শক্তি। অর্থাৎ, অসংখ্য ভোগ-পিপাসা। তারই প্রতীক রূপে তিনি কালো, রক্তপিপাসু, সংহারিণী।

তাঁর দেহ ঘিরে আছে মুণ্ডমালা। ছিন্ন দেহ তাঁর কটিবন্ধে। মানুষ যেমন বিষয় উপভোগ করেও বিষয়াসক্তি ছাড়তে পারে না; সর্বদাই সেই বিষয়কে তার আভরণ করে রাখে, পরিবেষ্টিত থাকে ভোগ্য বিষয়ের মধ্যেই, ঠিক তেমনই তিনি সেই ভোগরূপে রক্তমাংসে সজ্জিত হয়ে সংহার মূর্তিতে বিরাজ করছেন। এই ঘোর কালো ছিন্নমুণ্ডধারিণী মাতৃরূপ আবার জিভ কেটেছেন লজ্জায়। জ্ঞানরূপ শিবের স্পর্শে যেন তাঁর চেতনা অবস্থা ফিরে পেয়েছেন। অজ্ঞান বা পাপবিদ্ধ বহির্মুখী মন স্বামী শিব বা পরমাত্মার কাছে ভয়ে লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে লজ্জায় কামড় দিয়েছেন নিজের জিভে।

১৯৮৬ সালে জার্মান সাহিত্যিক, শিল্পী গুন্টার গ্রাস যখন কলকাতা ও তার শহরতলি ঘুরে বেড়াচ্ছেন— বস্তিতে শ্মশানে, রাজপথে, হাসপাতালে, ধাপার মাঠ থেকে সর্বত্র, তখন প্রতিদিন তিনি এই উলঙ্গ শহর দেকে রাত্রে কিংবা ভোরে তাঁর দিনপঞ্জি লিখতেন। একটা বড় খাতায় সেই লেখা ভরিয়ে তুলতেন অসংখ্য ছবিতে। দুর্গত কলকাতার ছবিতে। তাঁর ছবির বিষয় হত কখনও পথের ঘুঁটেকুড়ুনি, কখনও বা পথের পাশে পড়ে থাকা ঢালাই পাইপের ভেতরে অসংখ্য মানুষের জীবনযাপন। সর্বত্র বর্জ্য পদার্থে ভরা শহর। বর্ষায় নর্দমার জলে ভরা। কুণ্ডলিত কালো ধোঁয়ায় চারদিক বিভীষিকা মনে হত তাঁর। এক অন্য রকম মন নিয়ে তিনি এসেছিলেন কলকাতায়। হয়তো কলকাতার গভীরে যেতে পারেননি গ্রাস। হয়তো এই শহরের দৈন্যদশা, আতঙ্ক আর মরচে-ধরা খোলসে আটকে পড়েছিলেন তিনি। স্থূল, স্থাবর ব্রোঞ্জমূর্তি থেকে তাঁদের মানবিক রূপ উপলব্ধি করতে পারেননি। কলকাতার ছবি টুকরো টুকরো হয়ে লেকা আর স্কেচে আটকে রয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতায়। স্বপ্ন থমকে গেছে বাস্তবের ক্রুর আঘাতে।

জার্মানি থেকে গ্রাস উড়ে এসেছিলেন তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের পরম্পরা অনুসরণ করেই। কিন্তু, কাব্য বা উপন্যাস কিছুই হয়নি। মনে আছে সেই অমাবস্যার রাত্রির কথা। প্রতি বছরের মতো লেকটাউনে পারিবারিক কালীপুজোর আয়োজন। সে বছর সঙ্গী অতিথি গুন্টার গ্রাস। সকাল থেকেই আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। মেতেছেন কালীপুজোর আয়োজনে, সাজসরঞ্জামে। কৌতূহল তাঁর অপরিসীম। গভীর রাতে প্রজ্জ্বলিত হোমশিখা আর ধূপ-ধুনোয় ভরে ওঠা দেবীমূর্তির চারপাশ থেকে কালো ত্রিনয়নী লাল রক্ত জিভকাটা ভাস্বরমূর্তি আমাদের চোখের সামনে এক অদ্ভুত অবর্ণনীয় রূপ হয়ে দেখা দিচ্ছিল। গুন্টার গ্রাস নিথর, অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করছিলেন তা। ফিরে গিয়ে কলকাতার ডায়েরিটির নামকরণ করেছিলেন— ‘জিভ কাটো লজ্জায়’। নামকরণের পিছনে কোনও হিন্দু, শাক্ত বা কালীমাহাত্ম্যের পাঠ নিতে হয়নি তাঁকে। আমরা পুরাণে দেবীবর্ণনায় বা কালীতত্ত্বে যে বর্ণনা পাই, তারই যেন অদ্ভুত মিল তাঁর নামকরণে, বিষয়ে।

পূজিত প্রতিমার লজ্জিত রূপক যেন কলকাতার প্রতীক। বিদেশি শিল্পী-সাহিত্যিকের চোখে কলকাতার নগ্নতা-হাহাকার-ক্লীবতা-গ্লানি-শঠতা যেন কালীমায়ের রূপকে ধরা দিয়েছে। তিনি জিভ কেটেছেন তাঁর শিবরূপ চেতনার স্পর্শে। যেমন ভাবে মানবিক চেতনা লজ্জিত করে, ক্ষুব্ধ করে সমস্ত অমানবিকতা, অনাচার, ভাঁড়ামো দেখে।

মা কালী তাই এক তাৎপর্যময় রূপ। একাধারে জগৎসংসার আর দেহ, আত্মগত মনের এক প্রতিমা তিনি। মূর্ত-বিমূর্ত বাস্তব, পরাবাস্তব ধ্যান ও দর্শনের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি তাঁর অবয়বে। হিন্দু পুরাণে দেবদেবীর এই কল্পনা বাস্তব-অবাস্তব চিন্তার বা বিতর্কের বিষয় নয়। ধর্মবিশ্বাসে দেখা কিংবা ধর্মহীন বা নাস্তিক ভাবে দেখা— এসবের বিতর্কে না গিয়ে যদি কোনও শিল্পীর কল্পনায় সৃষ্ট রূপ ভেবে দেখা হয়, তা হলেও এসব রূপ-কল্পনা শুধু বিস্ময়ের নয়, অত্যন্ত আধুনিক মনেও, তার অর্থবহ তাৎপর্য দেহ-মন-বুদ্ধিকে আকৃষ্ট করবে।

কালো, কালী, কলকাতা মনে হয় কোনও বিচ্ছিন্ন শব্দ নয়। এ শহরের পত্তন ও তার আদি ইতিহাস, চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে আছে কালীমাহাত্ম্য বা কালো মাহাত্ম্য। এ শহরের আকর্ষণও তাই রহস্যময়, অর্থবহ, হয়তো বিমূর্তও। কালীরূপ বর্ণনার সঙ্গে কিংবা কালো রঙের রসায়ন বিশ্লেষণের মতো এ শহরও সব বর্ণকে গ্রাস করে ফেলেছে। একাধারে সব অনাচার, অত্যাচার, বিশৃঙ্খলা, অনটনের প্রতিমা প্রতীক কালীর মতো। অথচ, তিনিই এই অজ্ঞানতার মারক। তিনিই অভয়ধাত্রী। এ শহর যেন কালো। সে মানবজাতিকে সচেতন করে দিচ্ছে। কালীর জিভকাটা লজ্জা বিকর্ষণ ঘটায় না। আমরা আকর্ষিত হই। মানবমনের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষা, লোভ, যা থেকে লোলুপতা, হিংসার হিংস্র রূপ উত্থিত হয়, তা থেকে যাতে বিরত হতে পারি। লজ্জায় যেন আমাদের চৈতন্য প্রকাশ পায়। কালিমা-মুক্ত শিব-স্বামীর স্পর্শই আমাদের থামতে বলে। এ যেন শহরেরই মূর্ত প্রতীক। বাঙালি জাতি সমাজ ইতিহাসের অনুসন্ধান করলেই আমরা দেখতে পাই বন্যা, মহামারী, নিপীড়নের ধারাবাহিকতা। যা কখনও প্রাকৃতিক, কখনও রাজনৈতিক। কিন্তু ঘটে চলেছেন। তারই মধ্যে আমরা টিকে আছি।

তাই আমাদের কাছে কালীমাহাত্ম্য, কালীতত্ত্ব বা এই পুরাণ-কল্পিত রূপক এত অর্থবহ। তাই বাঙালি মননে কালী যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত। বাঙালি সর্বত্রই তাঁর আরাধ্য বিগ্রহকে প্রতিষ্ঠা করেছেন কী গভীর অথচ সারল্যে ভরপুর ছন্দে-সুরে কবি-সাধক রামপ্রসাদ গান রচনা করেছেন, যা বাঙালি মননের সঙ্গী। যেখানে প্রাচীন বা আধুনিক ভাবনা আসে না। আধুনিক চিন্তকও উদ্দীপিত হন। সেই কালো রূপের বর্ণনায় সাধক শিল্পীর চোখে গেয়ে উঠেছেন রামপ্রসাদ— ‘কালো রূপ অনেক আছে, এ বড় আশ্চর্য কালো। (যাঁরে) হৃদ মাঝারে রাখলে পরে হৃদয়পদ্ম করো আলো।। নামে কালী রূপে কালী, কালো হতেও অধিক কালো। (ও রূপ) যে দেখেছে, সেই মজেছে অন্য রূপ লাগে না ভাল।।’ আবার, ‘ডুব দে রে মন কালী বলে হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে, রত্নাকর নয় শূন্য কখন, দু’চার ডুবে ধন না পেলে।’

সেই রত্নের সন্ধান চাই আমরা সবাই। সে রত্ন হিংসা দেয় না, অশান্ত করে না। ধনী হওয়ার, ঐশ্বর্যশালী হওয়ার আকুতি মায়ের কাছে যেখানে বিবেক-বুদ্ধি-জ্ঞান-ঐশ্বর্যে ধনী হওয়া যায়। তিনিই আবার মায়ের কাছে অভিযোগ করছেন— ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।’ আবার অভিযোগ, ‘মা আমায় ঘুরাবি কত? কলুর চোখ-ঢাকা বলদের মতো।।’ এই বাস্তব ছবি থেকে ভাবের ছবিতে নিয়ে গিয়ে বলছেন, ‘ভবের গাছে বেঁধে দিয়ে মা, পাক দিয়েছে অবিরত। তুমি কি দোষে করিলে আমায় ছ’টা কলুর অনুগত।।’ (ছটি কলু অর্থাৎ, ষড় রিপু)

এই কলুরূপ রিপুই আমাদের অবিরত তাড়িত করে। মানুষে-মানুষে মদমত্ততার লড়াই চলে এই রিপুর চাপেই। এখানে স্থান-কালের প্রভেদ নেই। আধুনিকতার কোনও বিতর্ক নেই। সেই ভাবধারা থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর স্বাভাবিক সারল্যে বেদ-বেদান্ত বা পৃথিবীর সব ধর্মের সারৎসার অবলীলায় বলেছেন মানুষের কাছে। যা প্রাজ্ঞ কিংবা অজ্ঞ, সকলের কাছেই সহজে গ্রহণীয়। কোনও বিশেষ বাকচাতুর্যে তৎসম অনুসরণে নয়— জীবনদর্শন যে কত সাবলীল তা সেই কালীসাধক শ্রীরামরকৃষ্ণের ‘কথামৃত’ থেকেই জানা যায়।

তাই তখন, বাংলার নবজাগরণ কালে, সে সময়ে শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী মনীষীরা ছুটে যেতেন তাঁর কাছে একটু সহজ-শান্ত, শান্তির আশ্রয়ের সন্ধানে। তাঁরই ভাবশিষ্য, যুক্তিবাদী সমাজ-সংস্কারক, আধুনিক বিশ্বের বীর্যবান যৌবনের প্রতীক স্বামী বিবেকানন্দ সেই কালীসাধকের সংস্পর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে পৃথিবীর কাছে ঘোষণা করেছিলেন ভারতাত্মার সংস্কৃতি-ধর্ম-তাৎপর্য-তত্ত্ব আর সর্বোপরি বিশ্বশক্তির উৎস শিবশক্তির কথা। যা সব মানুষের অন্তরে বিরাজিত, তাকে জাগানোর কথা। বিবেকানন্দ-দীক্ষিত ভগিনী নিবেদিতা প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের নানা বুদ্ধিজীবী, সৃষ্টিশীল মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাঁর ওজস্বিতায়। কালীপ্রতিমার রূপের মুগ্ধতায় অভিভূত তিনি মাতৃরূপা কালীর অসাধারণ বর্ণনা লিখেছেন ছন্দে। পৃথিবীর নানা প্রকৃতিপ্রেমী কবির কবিতার সঙ্গে তিনি মায়ের রূপ মিলিয়েছেন।

মনে পড়ছে, শিশুকালে খেলাচ্ছলে গড়েছিলাম কালীপ্রতিমা। সে সরল সময়ে মূর্তি গড়ার প্রেরণা এসেছিল স্বাভাবিক ভাবে, হয়তো সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই। তারপর, আবার তারুণ্যের শেষে সেই চিন-ভারত যুদ্ধের বছরে পাড়ার ক্লাবের পুজোয় কালীমূর্তি গড়েছিলাম। সেই পরিশ্রম-মূল্যের সামান্য টাকা প্রতিরক্ষা তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হয়নি আজও। ধর্মান্ধতা, শক্তির মদমত্ততা, অহঙ্কারী উন্মাদনা, শোষণ এখনও মুছে যায়নি এ পৃথিবী থেকে।

তাই মাকালী আজও উদ্ভাসিত আমাদের কাছে। তিনি জিভ কেটে লজ্জার ভঙ্গিতে প্রকাশিত হন সর্বদাই। আমরা লজ্জিত হই— এই হাহাকার, এই নির্লজ্জ, শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে শিবরূপ চৈতন্যের আমরা স্পর্শ চাই।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev