বুড়িমারী বুড়িমারী
বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার পরও অনেকটা অ্যাকটিভ থাকে ভারতের সিম। সীমান্তের প্রায় এক কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত কোনো সীমান্ত থাকে না মোবাইল ফোনের টাওয়ারে। বাংলাদেশের ভেতরে সেই জায়গা ভারতই হয়ে থাকে যেন। ভিনদেশের ভেতরে স্বদেশ।
আবার বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকলেও সীমান্তের এপারে অনেকটা এলাকায় বাংলাদেশের মোবাইল ফোন অ্যাকটিভ থাকে।
ভারতের ভেতরে সেই জায়গা বাংলাদেশই হয়ে থাকে। বুড়িমারী ইমিগ্রেশন অফিসে যখন বিমলেশ, তখন কলকাতা থেকে তার মেয়ে ফোন করেছিল সে সীমান্ত পার হয়েছে কি না। অবাক হয়ে গিয়েছিল বিমলেশ। সীমান্তের এত আয়োজন আসলে আয়োজনই নয়। তাই বিমলেশ যখন বলল, সে ঢুকে গেছে ভেতরে, মেয়ে রোশনি কিছুতেই বিশ্বাস করে না। জিজ্ঞেস করে, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেল বাবা, এখনো যদি ঢুকে না থাকো, অন্ধকার হয়ে গেলে এই শীতে তোমরা কোথায় যাবে? রংপুর তো অনেক দূর শুনেছি।’
বিমলেশের সময় লেগেছিল বুঝিয়ে দিতে। তারপর বিমলেশ ফোন করে নিজ দেশে খবর দিতে থাকে বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে। তার বিস্ময় দেখে ভুবন বলে, ‘সীমান্তে এটাই হয় দাদা, সীমান্তের গায়ে তো, দুই পারে যোগাযোগ হয়ে যায় এভাবে।’
তাদের নিতে এসেছিল ভুবনের বন্ধু যারা, সবাই ছিটমহলের মানুষ। নানা গ্রামের। তাদের একজন আইনুল হক বলল, ‘দাদা, আমার ফুফু থাকে দিনহাটা, আমার একটা ইন্ডিয়ার সিম আছে, ফুফুই দিয়েছে, আমি ফুফুর সঙ্গে কথা বলি দরকারে, আর ব্যালেন্স ফুফাতো ভাই রিচার্জ করে দেয় ওখান থেকে।’
আইনুল ছিটমহল মুক্তি সমিতির সভাপতি। এই সমিতি দুই দেশ মিলিয়ে। আইনুল বেশ লম্বা। ফরসা, হাসিখুশি মানুষ। বলল, ‘মুবাইলে দেশ নেই এখেনে দাদা, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া সব সমান, নো বর্ডার।’
তারা এগোতে লাগল ইমিগ্রেশন অফিস ছেড়ে। বিমলেশের মনে হলো, খুব ভালো হতো মা বেঁচে থাকলে। মাকে সে ফোন করত বুড়িমারী থেকে। মা, আমি তোমার ছেলেবেলায় এসে গেছি, তোমাদের সেই রেলস্টেশন, মাস্টারবাবু, গুণধর, বুনো আমগাছ…মনে হচ্ছে যেন সেই জায়গা। কথা শেষ হলে সে আর ভুবন যাচ্ছে বুড়িমারী রেলস্টেশনে। ওখান থেকে করতোয়া এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে লালমনিরহাট পার হয়ে তারা নামবে কাউনিয়ার আগে তিস্তা জংশন নামের একটি স্টেশনে। এই লাইন অতি প্রাচীন। ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের এই লাইন সান্তাহার থেকে বগুড়ার দিকে গিয়ে, বগুড়া ছুঁয়ে লালমনিরহাট জংশন থেকে এসে চ্যাংড়াবাঁধা হয়ে ডুয়ারসে ঢুকে পড়ত। এখন বুড়িমারী থেকে আরম্ভ। তারা বুড়িমারীর দিকে এগোয়। আইনুল হক ও অন্যরা কেউ মোটরসাইকেলে সওয়ারি হয়ে, কেউ বা বাসে রওনা হলো নিজ নিজ গন্তব্যে। ৭৫ বছর আগের এক অপরাহ্ন থেকে গোধূলিবেলা নেমে এলো যেন বুড়িমারীর আকাশে। আচমকা সব নির্জন হয়ে গেল বিমলেশের সম্মুখে। এ অঞ্চলেই তার মায়ের ছেলেবেলা কেটেছিল। এখানেই কোনো এক নির্জন রেলস্টেশনে তার দাদামশায় নিখিলচন্দ্র ঘোষ মশায় তিন দিনের জ্বরে প্রয়াত হন। একা একা। তাঁর পরিবার তখন খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার কপোতাক্ষ নদের তীরে পৈতৃক ভিটেয়। সে ছিল ১৯৪১ সাল। সে ছিল অনন্ত বাইশে শ্রাবণের বছর। অঘ্রানের এক রাতে একা একা আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে মরে গিয়েছিলেন তিনি। সেই ছেলেবেলায় মা কত রাতে কাঁদতে কাঁদতে এই কথা শুনিয়েছে তাকে! সে ভোলেনি কিছুই।
তাদের ভ্যানরিকশায় সওয়ারি হয়েছে আরেকজন। লোকটি ভুবনের চেনা নয়। চেনা হলে ভুবন কথা বলত। ভুবন বসেছে ভ্যানরিকশার সম্মুখে। বিমলেশ পেছনে। লোকটা তার পাশে এসে বসল হাত দেখিয়ে। বিমলেশের মনে হলো, এই লোকটি তার চেনা। সীমান্ত থেকে দেখেছে। তাদের যারা স্বাগত জানাতে এসেছিল, সেই লোকগুলোর ভেতরে ছিল। বয়স বছর ৪৫। মাথায় অনেক চুল আছে মনে হয়। মাফলারে বাঁধা হলেও ধরা যায়। মোটা গোঁফ। এমন গোঁফ এখন আর দেখা যায় না। সেই ছেলেবেলায় তার ঠাকুরদা অবিনাশ বসুর ছিল ওই গোঁফ। লোকটি পরেছে একটি ধুতি আর পাঞ্জাবি। গায়ে একটি ধূসর রঙের গায়ের কাপড়। গায়ের কাপড়ের কথাটা অনেক দিন বাদে মনে পড়ল বিমলেশের। মা বলত তার কপোতাক্ষতীরের অভ্যাসে। তখন কাশ্মীরি শাল ছিল অতি মহার্ঘ। পশমের বা খাদির চাদরে শীত মানাত মানুষ। এই মানুষটির গায়ে সেই ৫০-৭৫ বছর আগের সেই মহিষা রঙের গায়ের কাপড়। ভুবন সামনের দিকে তাকিয়ে। বিমলেশ দেখছে মানুষটিকে, অদ্ভুত! চেনা মনে হয় যেন। একেকটা মুখ আছে, কিছুতেই অচেনা মনে হয় না, আপনি এখানে থাকেন, ছিটের কি?
লোকটি বলল, ‘ঠাণ্ডা কমে গেছে আজ, আপনি কলকাতা থেকে আসতেছেন স্যার?’
‘হ্যাঁ!’ বিমলেশ বলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল লোকটাকে। এখনো মোবাইল ফোনের টাওয়ার যায়নি। বিমলেশের মনে হলো, তার মেয়ে রোশনিকে ফোন করে বলে, কী অদ্ভুত লাগছেরে, মনে হচ্ছে এখানে সময় কোনো থাবা মারতে পারেনি, আমাদের এক বছর এদিকে যেন এক মিনিট, আমার পাশে একটা মানুষ, কুয়াশামোড়া, সোনার বাংলা।
কী যে বলো বাবা, তোমার বাংলাদেশ নিয়ে খুব সেন্টিমেন্ট, কিন্তু ওদেশ এখন তোমার দেশ নয়। রোশনি ঠিক এই কথা বলত।
আমার কিন্তু তা-ই মনে হচ্ছে খুকু, যা ছিল তা-ই আছে, আমারই আছে।
ভুল মনে হচ্ছে বাবা, যে কাজে গেছ, তা সেরে এসো, তোমার দেশ ইন্ডিয়া, ভারত।
বিমলেশের ভেতরে কেমন এক স্থৈর্য জন্মেছে। কী শান্ত হয়ে গেছে সে! সেই কোন ভোরে কোচবিহার স্টেশনে নেমেছে। ভুবন আসেনি সময়ে। সে রিটায়ারিং রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েছে। একটু উদ্বেগ পায়চারি করেছে। ভোর থেকে ভুবনের ফোন বন্ধ ছিল। তখন বারবার ফোন করেছিল সে। ভুবনের ফোন এলো সাড়ে ৯টা নাগাদ। এলো শিলিগুড়ি থেকে। তারপর গাড়ি ঠিক করে সীমান্তের দিকে যাত্রায় সাড়ে ১২টার ওপর হয়ে গেল। যেতে যেতে ভুবনের কথা থামে না। খুব কথা বলে সে। তার কথার ভেতর দিয়ে গোটা উত্তরবঙ্গ উঠে আসে যেন। ভুবন বলে যায় নিশিগঞ্জের এক হাড়ভাঙা মিস্ত্রি মুসুরি বৈদ্যর কথা। চ্যাংড়াবাঁধা যেতে নিশিগঞ্জ পড়ে। হাড়ভাঙা মিস্ত্রি বলল বটে ভুবন, আসলে সে এক কবিরাজ। শল্যচিকিৎসক। বিনা অস্ত্রোপচারে ভাঙা হাড় জুড়ে দিতে পারত, এমনই তার অ্যানাটমি জ্ঞান ছিল। সব শুনেছে বিমলেশ কৌতূহলভরে। এখন ভুবন চুপ। ক্লান্ত হয়েছে হয়তো। ঝিমিয়ে পড়েছে। সে তো কথা থামায় না। আর সে জানেও কম না। চেনেও কম কিছু না। এপার-ওপারের তুচ্ছ একটি বটবৃক্ষের কথাও জানে ভুবন। বলতে পারে তাকে ঘিরে কত গল্পগাথা। আর মানুষ! এই ভূমণ্ডলের সবাইকে চেনে হয়তো সে। এই যে এখন তারা বুড়িমারী রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছে, পথের ধারের অন্ধকার, টিমটিমে লো ভোল্টেজের আলো, নিঝুম বাড়ি, ঝুপড়ির মতো দোকান, আবার একটু খোলা মাঠ, অন্তহীন আবছা অন্ধকার, একটি দুটি তারার আলো, বৃহস্পতি, ধ্রুবতারা, সন্ধ্যাতারা…এসব নিয়েও ভুবন কথা বলতে পারে। আবার রাজায়-রাজায় যুদ্ধ, বাজি ধরে পাশা খেলা, তা নিয়েও। সমস্ত দিন ভুবনের সঙ্গে কয়েকবার থেকে বিমলেশ বুঝেছে, ভুবন প্রকৃতি চেনে। গাছপালা চেনে। অনেক মানুষ চেনে। তাদের নাম জানে। ইমিগ্রেশন অফিসের অফিসার থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী-সবাই তাকে চেনে। সে প্রায় সবার নাম জানে। ছিটমহল থেকে যারা এসেছিল ভুবনকে স্বাগত জানাতে, তাদের সবাই তার কাছে নামে চেনা। এ দেশ-ও দেশ ঘুরে ঘুরে এটুকু অর্জন করেছে সে। কিন্তু এখন ক্লান্ত ভুবন চুপ। তার চুপ করে থাকাই আশ্চর্যের। যে লোকটি বিমলেশের পাশে বসে আছে, তাকে ভুবন চেনে বলে মনে হলো না। তা হতেই পারে। সে কি সমস্ত ভারতের লোককে নামে চেনে, নাকি সমস্ত বাংলাদেশের মানুষকে চেনে? তার ফেসবুক আছে, তাতে তার বন্ধু কম নয়। তাই বলে বিমলেশ জিজ্ঞেস করে, ‘এদিকে খুব শীত পড়ে, তাই না।’
‘খুব, আমাদের দিকে অতটা না,’ বিড়বিড় করে বলে।
‘আপনি কি এদিকের লোক না?’
লোকটা বলল, ‘না, আমি দক্ষিণের মানুষ।’
‘এখেনে কী করতে এসেছেন?’
লোকটা বলল, ‘চাকরি, কতবার ভেবেছি ছেড়ে দেব, রেজিগনেশন নেবেই না।’
‘চাকরি ছাড়া কোনো কাজের কথা নয়।’ বিমলেশ বলে।
‘নাহ্, আমি চাকরি আর করি না, কিন্তু ফিরে যেতেও পারিনি।’ নম্র গলায় মানুষটি বলল, ‘কত দিন হয়ে গেল তা।’
‘কত বয়স আপনার?’ বিমলেশ জিজ্ঞেস করে।
মানুষটি বলল, ‘গেল সাতাশে অঘ্রান পঁয়তাল্লিশে পড়েছি, বুড়ো হয়ে গেলাম, এখনো তিনটে মেয়ের বিয়ে বাকি, ছোট ছেলের দুবছর, কী যে হবে!’
‘পঁয়তাল্লিশে কেউ বুড়ো হয় না, আই অ্যাম সিক্সটি-টু প্লাস।’
‘আজ্ঞে, প্লাস মানে, কত যোগ?’
বিমলেশ বলল, ‘তেষট্টি রানিং।’
‘ও’, কথার ধারাটা আলাদা, কিন্তু তেষট্টি! অত বছর কজনই বা বাঁচে! বিড়বিড় করে বলল লোকটা, ‘তেমন বুড়ো তো লাগছে না।’
বিমলেশের কী যেন মনে হতে লাগল। কী মনে হতে লাগল, তা বলতে পারবে না সে, কিন্তু সে কিছু একটা কল্পনা করতে চাইছিল। মায়েরা চার বোন। মা অনিতা সবার বড়। তারপর সুনীতা, বিনীতা, অজিতা। মায়ের ছোট ভাই তখন দুই, তার ছোট মামা। এখন ছিয়াত্তর। তার বড়দি, খুশি, ছোট মামার বয়সী। তখনকার দিনে মা ও মেয়ে একসঙ্গে আঁতুড়ঘরে যেত। বিমলেশ দেখল, তার মোবাইল ফোন, ভারতের সিমে টাওয়ার আসছে-যাচ্ছে। টুং করে একটা মেসেজ ঢুকল, ওয়েলকাম! অচেনা নম্বর। কে স্বাগত জানাল, বুঝতে পারল না বিমলেশ। তার এই মোবাইল ডাবল সিমের। সে বুড়িমারীতে ঢুকে একটি বাংলাদেশি সিমকার্ড ঢুকিয়ে সক্রিয় করে নিয়েছে সেই আইনুল হক মশায়কে দিয়ে। সেই সিমের টাওয়ার জেগে উঠেছে, ভারতেরটাও মোছেনি। বিমলেশ জিজ্ঞেস করল, ‘দক্ষিণে কোথায় বাড়ি?’
মানুষটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বলল, ‘অনেক দূর, খুলনা অবধি ট্রেনে যাওয়া যেত রানাঘাটের ভেতর দিয়ে, সময় কম লাগত, এখন কত সময় লাগে, থাক।’
‘সে তো পার্টিশনের আগের কথা!’ বিমলেশ অবাক হয়ে বলল।
‘হতে পারে,’ বিনবিন করে বলল লোকটা।
‘সেই লাইন তো আর নেই।’
‘এদিকে কিছুই জানা যায় না,’ লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘আপনার গ্রামের নাম?’
‘আপনি কি চিনবেন?’
‘কোন জেলা, খুলনা?’
‘হ্যাঁ, খুলনা, গেছেন?’
‘শহরে গেছি, ভৈরব, রূপসা!’
মানুষটি বলল, ‘হু, কপোতাক্ষ, বেতনা, সুপুরিঘাটা, বড়দল; আপনাকে দেখেই মনে হয় অনেক জায়গায় গেছেন।’
‘সাতক্ষীরা গেছি,’ বিমলেশ বলল।
লোকটা তাকে দেখছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে। জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’
বিমলেশ নাম বলতেই লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘বাবার নাম?’
বিমলেশ বলতে লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘নিবাস?’
কলকাতা শুনে লোকটা বলল, ‘কলকাতার আদি বাসিন্দা?’
‘না মশায়।’ বিমলেশ লোকটাকে দেখতে চাইছিল স্পষ্ট করে। কিন্তু অবয়বটি যেন অন্ধকারে মিশে যেতে যেতে ভেসে উঠছে। বিমলেশ মাথা নাড়ে। তখন লোকটি জিজ্ঞেস করে তার পিতৃপুরুষের নিবাসের কথা। অধুনা নয়, আদি নিবাস। বিমলেশ বলতে তিনি, হ্যাঁ, তিনি বললেন, ‘পৃথিবী খুব বড় নয়, তাই না?’
‘আপনি এসব জিজ্ঞেস করলেন কেন?’
‘এমনি এমনি।’
বিমলেশ বলল, ‘এখন ঢাকা থেকে খুলনার বাস আছে না।’
লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘কলকাতা থেকে কোন পথে এলেন?’
বিমলেশ বলতে তিনি বললেন, ‘আমি এ পথ চিনি না।’
‘আপনি দেশে যান না?’
‘সেই যে অঘ্রানে এলাম, তারপর আর না।’
‘অঘ্রান তো আজ বা কাল শেষ হবে।’
‘হুঁ, অঘ্রান কত বড় মাস!’
বিমলেশ বলল, ‘এদিকে আশ্বিনের শেষ থেকে ঠাণ্ডা পড়ে যায়, তাই না?’
‘হু, খুব ঠাণ্ডা, শীত চলে গেলে ওদের আবার নিয়ে আসতাম যদি বদলি না হয়।’
‘নিয়ে আসুন, শীত তো যাবেই।’
তিনি বললেন, ‘যায় কই, অনন্ত অঘ্রান নেমেছে এই দেশে, শুরু নেই, শেষ নেই, ছেলেটা বাবা বাবা করে ঝাঁপিয়ে আসে কোলের ওপর,
মাঠে-ঘাটে কুয়াশায় বারো মাসে নেমেছে অঘ্রান…’
বিমলেশ চুপ। বুক ধকধক করছে। তিনি স্তব্ধ হয়ে একই কথা উচ্চারণ করছেন, ‘মাঠে-ঘাটে কুয়াশায় বারো মাসে নেমেছে অঘ্রান…’
‘আপনি কি কবি?’ বিমলেশ জিজ্ঞেস করে ফিসফিসিয়ে।
‘কবি তো চলে গেলেন, বাইশে শ্রাবণের পরে নেমেছে অশেষ অঘ্রান, কী ভীষণ সেই জাড়, শীত আর শেষ হয় না, অথচ বাইশে ছিল কী ভয়ানক বর্ষা, বুঝিনি অনন্ত ক্রন্দনধ্বনি ঘিরেছে আমারে।’
কী অবাক করা কথা। গা শিরশির করে উঠল তার। কবে চলে গেছে ১৯৪১। বাইশে। বিমলেশের মোবাইলে মেসেজ ঢুকল।
‘আচ্ছা পরে কথা হবে, ভালো থাকুন…’ বলতে বলতে তিনি চুপ। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছেন। তারপর ভ্যান যখন স্টেশন এলাকায় ঢুকছে, তিনি বললেন, ‘জব্বার, আমি নামি, কাল দামটা নিয়ো।’ তিনি নেমে গেলেন ভ্যান থেকে। জব্বার ঘাড় না ঘুরিয়ে বলল, ‘মাস্টারবাবু তো, ঠিক আছে।’
বিমলেশ বলল, ‘এই, ভ্যানটা থামাও দেখি।’
‘কেন, কী হলো দাদা?’ ঘাড় ঘোরায় ভুবন, ‘থামাবে কেন?’
‘ইনি কে?’
‘কার কথা বলছেন দাদা?’
‘যিনি নেমে গেলেন, ও জব্বার ভাই।’
ভ্যান থামিয়ে চালক বলল, ‘মুর নাম কি জব্বার?’ মাঙ্কি টুপি মাথায় রিকশাওয়ালা বলে, ‘মুর নানার নাম জব্বার ছিল, মুর নাম সইদুল, উনি নানার নামে আমারে ডাকেন।’
‘কে নেমে গেল?’
‘উ তো মাস্টারবাবু, উ লোকের ধরন অমনি, কত রকম জানে, উনি আমার নানা বলে আমারে ভুল করেই যাবেন।’
‘কিসের মাস্টার?’ জিজ্ঞেস করে বিমলেশ।
‘তা তো জানিনে, মানুষটা ভালো,’ বলল ভ্যানওয়ালা। বলতে বলতে বুড়িমারী স্টেশনের অদূরে ভ্যান থামাল সে। তারা নেমে ভাড়া মিটিয়ে লাইন পার হয়ে খুব নিচু প্ল্যাটফর্মে গিয়ে উঠল।
দুই
করতোয়া এক্সপ্রেসে তিস্তা জংশন।
বুড়িমারী স্টেশনের বাড়ি এলা রঙের। এই স্টেশনটা পরে হয়েছে মনে হয়। ব্রিটিশ আমলের স্টেশনের লালবাড়ি তো নেই। বুড়িমারী স্টেশনের চেহারা ইস্কুলবাড়ির মতো। দেশভাগে সেই বাংলা দুয়ার রেলপথ উঠে গেছে। সেই লাইনে লালমনিরহাট জংশন থেকে শুরু হয়ে ঢুকে যেত এখনকার ইন্ডিয়ায়। তোরসা নদীর ধারে মাদারীহাট গিয়ে শেষ হতো। সাবেক জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি কোন পথে যেত? দার্জিলিং মেইল শিয়ালদা থেকে যাত্রা করে রানাঘাট, মাজদিয়া হয়ে, পোড়াদহ হয়ে পাকশী জংশন, পদ্মা পার হলো সারা ব্রিজ, হারডিং ব্রিজ দিয়ে, তারপর ঈশ্বরদী, নাটোর, সান্তাহার, সান্তাহার থেকে গাড়ি বদল করে লালমনিরহাট লাইন ভায়া বগুড়া। সান্তাহার থেকে আরেকটা লাইন পার্বতীপুর, নীলফামারী, হলদিবাড়ী হয়ে জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি। বিমলেশ এই রকম শুনছিল ভুবনের কাছে। ভুবন যেন সব জানে। ভুবনের যেন দেড় শ বছর বয়স। হারিয়ে যাওয়া সেই রেলপথে ভুবন যেন কতবার এসেছে এই দিকে। বলছে পার্বতীপুর থেকে একটা লাইন রংপুরের দিকে যেত। আরেকটা লাইন দিনাজপুর হয়ে কাটিহার। কোথায় পার্বতীপুর, কোথায় সান্তাহার…কিছুই জানে না বিমলেশ। সব অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে তাকে যেন ডাকছে-আয় আয়, আমার অন্ধকারে আয়। ভাবনায় থই মেলে না। বিমলেশ টের পায়, এরই ভেতর উত্তরবঙ্গের শীতের রাত নেমে গেছে। কিন্তু ঠাণ্ডা তেমন নেই। আচমকাই যেন শীতটা উধাও হয়ে গেছে। ভুবন বলল, ‘মেঘ হয়েছে মনে হয়।’
বিমলেশ চুপ করে আছে। সেই লোকটি কে? বিনবিন করল বিমলেশ, অনন্ত অঘ্রান নেমেছে এই দেশে আজ, মাঠে-ঘাটে কুয়াশায় বারো মাসে…কী সব বলতে বলতে নেমে গেল কুয়াশার ভেতরে যেন। কুয়াশা থেকে এসে কুয়াশায় গেল। বুকটা ভার করে দিয়ে গেল। ছেলেটা বাবা করে ছুটে আসে। ছুটে যায় স্টিমারঘাটের দিকে টলটলে পায়ে।
বিমলেশ ভাবছিল মায়ের সেই ডায়েরি দেখে নেবে কি না। ট্রেন আসতে দেরি আছে। ট্রেনের টিকিটে বাংলায় লেখা সব। বুড়িমারী হইতে কাউনিয়া। তিস্তা অবধি টিকিট দেওয়া হয় না। এক্সপ্রেস ট্রেনের স্টপেজ নেই সেখানে, কিন্তু গাড়ি দাঁড়ায়। বিমলেশ দেখল, তার ভারতীয় ফোন সজাগ। সে একা একা পায়চারি করতে থাকে। ভুবন বসে আলাপ জুড়েছে একদল চেনা মানুষের সঙ্গে। ভুবনের সব চেনা। আগের স্টেশন মাস্টার হবিবুল্লা মিদ্দে বদলি হয়ে গেছে বগুড়া শুনে সে একটু দুঃখিত হয়েছিল টিকিট কাটার সময়। এখন চা দোকানির সঙ্গে খোশগল্পে মত্ত। বিমলেশের মনে হলো মেয়ের সঙ্গে কথা বলে। নাকি সুভদ্রা, তার স্ত্রীর সঙ্গে? বিমলেশ বুঝতে পারছিল না কী করবে। দীর্ঘ এক অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে হাঁটছে সে। স্টেশনঘর ব্যতীত এখানে কোথাও কোনো আলো নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে যাত্রীরা সিমেন্টে ঢালাই বেঞ্চে ও প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। তখন একটা ফোন এলো। অচেনা নম্বর। সে ধরতেই অচেনা কিন্তু চেনা কণ্ঠস্বরের মতো গলাটা বাজল, ‘আপনি কলকাতায় কোথায় থাকেন?’
বিমলেশ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’
‘ওই যে অনন্ত অঘ্রানে এলে তুমি এই বারো মাসে…’
‘কী বলছেন, আমি বুঝতে পারছি না।’
তিনি ধরা গলায় বললেন, ‘এখন কোন দিকে যাবেন, তিস্তায় নেমে কোথায়?’
‘আপনি কে?’
‘সাবধানে যাবেন, চাদ্দিক ভালো না, বিজন বিভুঁই এই রাতে।’
তখন একটু অসহিষ্ণু হয়ে পড়ল বিমলেশ। তার যে বয়স হয়েছে, আর সেই বয়সের ছায়া পড়েছে তার ভেতরে, তা সে টের পায় কখনো কখনো, এখনো পেল, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করতে পারল না, বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘আরে ভাই, তোমাকে কি পুলিশ নিয়োগ করেছে আমাকে ওয়াচ করার জন্য? তুমি নজরে নজরে রাখছ কেন আমাকে?’
‘আমি তো একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কে আসবে জানতাম না, জামাই কলকাতার মেসবাড়িতে উঠেছে জানতাম, তার তো নবীন বয়স, নম্র, কথা বলে ধীরে ধীরে, শান্ত, কলকাতায় আমাদের কেউ ছিল না।’
‘আপনি কে?’
ফোন কেটে গেল। ভুবন ডাকছে, ‘দাদা, ট্রেন আসছে, সামনের দিকে চলুন।’ ভুবন তার নিজের ও বিমলেশের ট্রলি ব্যাগ ঠেলে নিয়ে আসছে। অন্ধকারে কু কু কু আওয়াজ নিয়ে জ্বলন্ত দুই চক্ষু রেললাইন বরাবর এগিয়ে আসছে। অন্ধকারে বসে থাকা যাত্রীরা নড়ে উঠল। একজন লালবাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিগন্যালম্যান গুণধর গুণধর। এখনো ইন্ডিয়ার সিম অ্যাকটিভ। একটা ফোন আসছে। ইন্ডিয়ায় একটা ফোন করতে পারলে ভালো হতো। তার ছোট মামা বেঁচে আছেন। সল্টলেকে বাড়ি। ছোট মামাকে ফোন করবে? উত্তরবঙ্গে সাবেক রংপুর জেলায় তাদের কে আছে? কেউ আছে বলে তো শোনেনি। সে ভুবনকে বলবে কি? তার পেছনে কি বাংলাদেশ পুলিশের চর? টিমটিমে আলো জ্বলা করতোয়া এ্ক্সপ্রেস এলো যেন ৭০-৭৫ বছর আগে থেকে। এমন গাড়ি বিমলেশ তার ছোটবেলায় দেখেছে কি? ব্রিটিশ আমলে যে গাড়িতে করে নিখিলচন্দ্র ঘোষ খুলনা থেকে উত্তরবঙ্গে এসেছিলেন, এ গাড়ি সেই গাড়ি। যে গাড়ি বিকেলের দিকে সবুজ পতাকা উড়িয়ে শেষবারের মতো পার করে কোয়ার্টারে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন নিখিলচন্দ্র ঘোষ, এ গাড়ি সেই গাড়ি? সেদিন গুণধর ছিল না, পাটগ্রামে যাত্রা শুনতে গিয়েছিল। ভেতরে অল্প অন্ধকার। খালি সিটে জানালার ধারে বসেছে বিমলেশ, বাইরে গ্রহ-তারাহীন আকাশ। মেঘে ছেয়ে গেছে সব। যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, সেই নম্বরে সে ফোন করতে চাইল। রিং হলো না। সামনে আশপাশে প্যাসেঞ্জাররা এসে বসেছে। তাদের মুখ অস্পষ্ট। ট্রেন রওনা হলো। বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল। পাটগ্রাম, কাকিনা, তুষভাণ্ডার পার হয়ে লালমনিরহাট, তিস্তা জংশনের দিকে ছুটে যেতে লাগল অন্ধকারে। বিমলেশের মোবাইল ফোনে ভেসে থাকতে থাকতে একসময় পার্টিশনের অন্ধকারে হারিয়ে গেল তার ইন্ডিয়া।
ভুবন বলল, ‘কতবার এসেছি, ঠিক এর আগের বুড়িমারী স্টেশনের মাস্টার, ছয় মাস আগেও দেখা হয়েছে, কিন্তু খুলনার লোক ছিলেন, হিন্দু, খুব ঠাণ্ডা মানুষ, কদিনের জ্বরে চলে গেছেন, স্যাড, উনি বড় ভালো লোক ছিলেন, ওঁর কথা শুনছিলাম।’
বিমলেশ অবাক হয়ে কথাটা শুনতে শুনতে বলল, ‘একটু একটু করে মনে পড়ছে।’
ভুবন বলে, ‘আপনি কি এদিকে এসেছেন আগে? বলেননি তো।’
বিমলেশ বলল, তার মায়ের ছেলেবেলা কেটেছে এ দেশে। মায়ের কথা মিলিয়ে নিচ্ছে। তা শুনে ভুবন বলল, ‘সে তো অনেক বছর আগের কথা, এই ঘটনা নভেম্বরের শেষের, ধরুন দিন কুড়ি।’
বিমলেশ চুপ করে থাকে। এখন যে বিভ্রান্তি তার ভেতরে জন্মাচ্ছে, তা দূর করতে পারত তার মা অনিতা। অনিতা বছর ছয় চলে গেছেন। ঘুমের ভেতরে। শেষ বয়সে তিনি খুব চিঠি লিখতেন। কিন্তু সেই চিঠির কোনো ঠিকানা ছিল না। শুধু ছিল প্রাপকের নাম। নিয়ে এসেছে বিমলেশ সেই ডায়েরি। কেন এনেছে জানে না। আসার সময় আচমকা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে। মেলানো যাবে মায়ের বিবরণ। বিমলেশ অন্ধকারের কথা শুনছে। ট্রেনের যাত্রীদের কথা। তারা কেউ বলছে চট্টগ্রামের দিদির কথা। বিয়ে হয়েছে হাতিয়া দ্বীপে। সেই দ্বীপ সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। দিদির নাম কী, দুলাভাইয়ের নাম কী? তখন একজন বলছে, তার আব্বু সিঙ্গাপুর যাবে যাবে করছে, তারা বলছে ইন্ডিয়া যাবে, তার খুব ইচ্ছে তাজমহল দ্যাখে আর সেলিম চিস্তির মাজারে যায়। যে বলছিল সে একটি মেয়ে। সামনের কোনো একটি সিটে বসে। যাকে বলছে সে একটি মধ্যবয়সের পুরুষ। কণ্ঠস্বরে ধরা যায়। সেই মধ্যবয়স্ক বলল, দিল্লি-আগ্রা সে গেছে, কলকাতা হয়ে শান্তিনিকেতনে মেয়েটি বলল, তার আব্বু শুধু সিঙ্গাপুর যাবে বলছে, আমাদের ঘুরিয়ে এনে নিজে যাবে ব্যাংকক…। তখন কোনো এক অন্ধকারে বসা আরেকটি কণ্ঠস্বর শুনতে পায় বিমলেশ। একজন আরেকজনকে বলছে, ‘কদিন ধরে ঘুষঘুষে জ্বর হচ্ছিল মাস্টারবাবুর, ডাক্তার দেখাবে না, নিজেই ওষুধ কিনে এনে খাচ্ছিল, আমি যাত্রা দেখে ফিরে আসি ভোরে, দেখি দরজা খোলা, উনি দরজা বন্ধও করেননি গো, তখন ঠাণ্ডা পড়ে গেছে, সারা রাত হিম ঢুকেছে ভেতরে, উনার গায়ের লেপ, তার ওপর কম্বল, হিমে সব ভিজে গেছে, জলের কলসি গড়াচ্ছে, সব জল পড়ে গেছে, উনির তেষ্টা পেয়েছিল মনে হয়।’
‘তখন হাসপাতালে নিয়ে গেলে না কেন?’
‘উনি আর নেই তখন।’
‘তারপর?’
‘উনির খুব তেষ্টা হয়েছিল মনে হয়, কিন্তু জল পায়নি।’
‘গুণধর, উনি মানুষটা ভালো ছিল।’
‘হ্যাঁ চাচা, উনি ভাবছিলেন খুলনা থেকে এসে যাবে জামাই আর ছেলে।’
‘তারা এলো?’
‘এলো, কিন্তু দেখতি পায়নি,’ কোনো এক গুণধর বলল। তখন বিমলেশ বুঝতে পারছিল, তার যে ছিটমহলযাত্রা, তা গুলিয়ে যাচ্ছে। ছিটমহল এক রাষ্ট্রহীনতার জন্ম দিয়েছে, এক দেশের ভেতরে আরেক দেশ, আসলে ছিটমহল কোনো দেশই নয়। সে এক ভাসমান গ্রহ-তারার মতো কিছু। বিমলেশের মনে হচ্ছে, সময়হীনতাও যেন রয়ে গেছে ছিটমহলযাত্রায়। না হলে সে কোন সময় থেকে কোন সময়ে প্রবেশ করছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যাত্রার মতো। সময়ঘড়ি লম্বা হয়ে গেছে, যেমন-তেমন হয়ে গেছে, সময়ের কোনো পরিমাপ করা যাচ্ছে না।
মাস্টারবাবুর কথা তার মায়ের কাছে শোনা। সে প্রায় বছর ৭০-৭৫ আগের কথা। মায়ের বিয়ের পরের কথা। মা কত রাত অবধি শোনাত সেই কথা! নিখিলচন্দ্র ছুটি শেষ করে রওনা হওয়ার আগে ধুলিহর এসেছিল মেয়ের বাড়ি। বেয়াইমশায়ের সঙ্গে একদান দাবা খেলেছিল। কিস্তিমাত করেই উঠেছিল। সেই শেষ দেখা নিখিলচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর মেয়ে অনিতার। বাবার জন্য অনেক রাত জেগে নারিকেলের নাড়ু তৈরি করেছিল মেয়ে তার শাশুড়িকে নিয়ে। কতকাল আগের কথা সব! কত যুগ আগের কথা! সব কি এখনো দৃশ্যের পর দৃশ্য রয়ে গেছে মহাশূন্যে ভেসে। সেখানে দেশ আর রাষ্ট্র কিছুই নেই। আছে শুধু অন্ধকার, আছে শুধু ব্যাপ্ত এক রাত্রি। কোথায় সেই বাংলাদেশের ভেতরে ভারতে? আসলে কিছুর ভেতরে কিছু না। একটা দেশের পেটে আরেকটা দেশ থাকে কী করে?
ভুবন বলল, ‘লালমনিরহাট এলাম, আর বেশি নয়, কয়েকটা স্টেশন।’
‘আমরা কাল কোন ছিটমহলে যাব?’
‘দশিয়ারছড়া, আমাদের মুনশির ছিট সেখান থেকে বেশি দূর না, দিনহাটা থানায় পড়ে আইনি নিয়মে, কিন্তু আসলে কোনো হাটায় নয়।’
লালমনিরহাট নিয়ে কত কথা বলত মা। লালমনিরহাট থেকে সায়েব আসত স্টেশন পরিদর্শন করতে। লম্বা, লালমুখো সায়েব। খুব রোগা। এখানে ইঞ্জিন বদল হবে। ভুবন নেমে গেল প্ল্যাটফর্মে কাকে দেখে। চেনা মানুষ, ও জব্বার ভাই, আমি ভুবন…।
বিমলেশ নিঝুম হয়ে বসে ছিল। তার সামনে-পেছনে, ডান দিকের সিটের মানুষ আবছা অন্ধকারে বসে সেই কথা বলে যাচ্ছে। হাতিয়া, জাহাজমারা, বাগেরহাট, খুলনা। পটুয়াখালীর নদীতে বহরডুবি। কুমিল্লা কেমন জায়গা, বাসাভাড়া কত হবে। কুমিল্লা বদলি হয়েছে কলেজের মাস্টারের। সিলেট জানি, কুমিল্লা জানিনে। সিলেটের লোক ভালো, বরিশালের লোক খুব শিক্ষিত। অহংকারী মনে হয় তা তো হবে। কত বড় বড় লোক বরিশালের। ভিসা পেতেই যত ঝামেলা। ইন্ডিয়ার ভিসা তো দিতেই চায় না। সিঙ্গাপুর যাওয়া সহজ। দিল্লি, আগ্রা, শান্তিনিকেতন না। মেয়েটি বলছিল, আব্বু অবশ্য ইন্ডিয়ায় যেতে চায় না, তাই এসব ভিসার কথা তোলে, শুধু বলে হংকং যাবে। মেয়েটি বলে, আম্মু বলছে সিঙ্গাপুর যাবে না, আম্মুর খালা থাকে মালদা, আম্মু যেতে চায় মালদা, আপনি গেছেন, রাজশাহী থেকে কাছে তো। গিয়েছি। রাজশাহী থেকে ঘণ্টা দুই। মালদায় গিয়ে গৌড় দেখে এসো। মালদার আম সুখ্যাত। জষ্টি মাসে যেয়ো, আমার ফুফু থাকে ইংলিশ বাজার… অন্ধকারে এসব কথা বাংলাদেশ হয়ে আসতে থাকে তার কাছে। এসব কথা নিয়ে সে ভারতের দিকে চলেছে। এই বাংলাদেশের ভেতরেই খণ্ড খণ্ড ভারত। ছিটমহল। আসলে সেই ভারতের কোনো দেশ নেই। সেই ভারত এক একা, ভুল করে ভারত হয়েছে তা। এই গভীর রাতে একা পড়ে আছে যেন এক অন্ধকার স্টেশনে। তেষ্টায় তার ছাতি ফাটছে। একটু জল দেবে কেউ?
প্রথম প্রকাশ : ঢাকা, বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২