| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আমার রবীন্দ্রনাথ : হাসান আজিজুল হক

Reporter
হাসান আজিজুল হক / ৬৫৪ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২২

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথা বলতে গেলে আমার সবসময়ই বিপদ ঘটে। আমাকে সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে কেউ যদি বলে নর্থ সি-তে একটিমাত্র নীল তিমি আছে। আপনি খুঁজে বার করে নিয়ে আসুন কিংবা আকাশে অনন্ত নক্ষত্রবীথির মধ্যে যে বিশেষ একটি নক্ষত্র আমাকে দেখিয়ে দিন। এজন্য রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা শুরু করতে গেলেই আকাশ-পাতালে হারায় কথা, আসলে বুঝতে পারি না, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কোথায় শুরু করা যেতে পারে, কিংবা কোন্ জায়গাতে শেষ করা যেতে পারে আর শেষ করে ভাবা যেতে পারে যে যা বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট, আর বলার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার সাধারণ একটা জবাব হচ্ছে পৃথিবীতে এইরকম একটি মানুষ জন্মেছিল কেন আর কি জন্য? এদিকে চিন্তা-ভাবনায় আমি রবীন্দ্রানুসারী নই। তাঁর মতন ইতিবাচকভাবে প্রকৃতিকে দেখা, মানুষকে দেখা, সভ্যতাকে দেখা, মানবতাকে অনুধাবন করা এ-সব জায়গাতেই আমার অনেক কথা আছে, সমালোচনা আছে। তারপরও বলছি তাঁর মত মানুষ আমি গোটা পৃথিবীতে খুঁজে পাই না। চিরস্মরণীয় একজন মহাকবি হোমারের কথা বলতে পারি, কিন্তু ঐ মহাকবিই- তারপরে তাঁর সম্পর্কে কিছু জানাও যায় না, বলাও যায় না। আমরা ভার্জিল, দান্তে কিংবা গয়টে বা গ্যেটের কথা তুলতে পারি। এঁরা সব উত্তুঙ্গ ব্যক্তিত্ব, বিশেষ কোনও বিবেচনায় হয়তো রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কিংবা বড় বা ছোটোর এই প্রশ্ন অবান্তর। রবীন্দ্রনাথ অন্যরকম। ইউরোপ থেকে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পার্থক্যটা অন্যরকম তো বটেই, এ-পার্থক্য মুখের কথার পার্থক্য নয়; ইতিহাসেও পার্থক্য। পার্থক্য চেতনায় যেমন তেমনই রয়েছে ধ্যান-ধারণায়। সেক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের প্রসঙ্গ আসতে পারে না, নিয়ে আসাটাও ঠিক নয়। ইউরোপের প্রেক্ষাপটে বলা যেতে পাওে গ্যেটে অতুলনীয়, কিংবা শেক্সপীয়রের মতন নাট্যকার আর হয়তো জন্মাবে না। কিংবা কেউ বলতে পারে তলস্তোয়ের মতন এমন ঔপন্যাসিক আর কোথায়! দস্তয়েভস্কির মতন লেখক চেখভের মতন গল্পকার! এই সৃজনশীল মানুষদের এককভাবে ধরতে গেলেই এঁরা অতুলনীয়।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে যখন ভাবতে যাই, তখন বিশেষ কোনো জায়গায় তাঁকে বাঁধতে পারি না। তিনি নিজের সম্পর্কে যাই বলুন না কেন; আমি বলতে পারি না, এটাই রবীন্দ্রনাথের একমাত্র পরিচয়। তিনি যখন বলেছেন আমি জন্ম-রোমান্টিক, সে কথা সত্য হতেই পারে। আবার যখন বলেন, না আমি রোমান্টিক নই, প্রায় সংশয়বাদী, আমি শেষ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাই নি। তখন মনে হয় তাঁকে কী ইউরোপিয়ান চেতনায় এগনস্টিক বলা যাবে, না এ তাঁর দুর্জ্ঞেয় ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা? এগনস্টিক হলেন এমনসব মানুষ যারা আস্তিকও নন, আবার নাস্তিকও নন। তাঁকে কি এক্সিসস্টেনশিয়ালিস্ট বলা যাবে! জীবনের সংশয় কাটে না; প্রথম দিনের সূর্য সত্তার আবির্ভাবে প্রশ্ন করেছিল, ‘কে তুমি’-মেলে না উত্তর। আবার বহু বছর পেরিয়ে দিবসের শেষে পশ্চিমসাগরতীরে সূর্য শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল-‘কে তুমি’ উত্তর মেলে না। মৃত্যুর অল্প কিছু দিন আগে এসব লেখা। সব শেষের কবিতাটিতে দেখি-তিনি লিখেছেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী। মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতে সরল জীবনে।’ এই কবিতাটি আমরা পড়েছিলাম ষষ্ঠ শ্রেণীতে । তার নিচে লেখা ছিল, ছাত্রদের এই কবিতার অর্থ জানিবার প্রয়োজন নাই। আমি এখনও অর্থ খুঁজে পাই নি। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম।’ আমি তাঁর সৃষ্টিতে জীবনের বিচিত্র জাল খুঁজে দেখেছি, আমৃত্যু যে পরম শান্তি কামনা করেছিলেন তা অনুধাবনে সচেষ্ট হয়েছি। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ক্লান্তি-ক্লেদে স্নান করে, তিনি বলছেন; ‘সমুখে শান্তি পারাবার’, ‘দিনান্তবেলায় শেষের ফসল নিলেম তরী ‘পরে’ তারপরে ‘যা কিছু নিয়ে চলি শেষ সঞ্চয়/ সুখ নয় সে, দুঃখ সে নয়, নয় সেতো কামনা/ শুনি শুধু মাঝির গান আর দাঁড়ের ধ্বনি তাহার স্বরে।’ কীভাবে যে ব্যাখ্যা করব খুঁজে পাই না। এ-কী শক্তি দেয়? এ-কী শান্তি দেয়? এ কী দর্শন দেয়? কী দেয়? এখনো পৃথিবীর কোনো কবিকে আমি জীবনে সর্বত্র প্রাসঙ্গিক এরকম কাউকে ভাবতে পারি না। সারাবিশ্ব ভরে তাঁর কবিতা কিংবা গান জীবনের যে-কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। খুঁজলেই পেয়ে যাবো ‘লিখন তোমার ধূলায় হয়েছে ধূলি।’ তারপর এক-পর্যায়ে ব্যবহার করছেন ‘আঁখরগুলি’। স্মৃতিকথার নাম দিতে যাই যদি, হারিয়ে যাওয়া আঁখরগুলি-তবে কি চলবে না?

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোথায় তাঁর কাজের ক্ষেত্র তা কিন্তু বিশেষ করে বলেন নি। আমি এখন ভাবি আচ্ছা রবীন্দ্রনাথ ভাবেন নি কী? তাঁর সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিক্ষাকেন্দ্রিক চিন্তাসমূহ যদি বিবেচনায় আনি তবে তা হয়ে যায় এক কথায় অনন্য, ছাড়িয়ে যাওয়া যায় নি। রবীন্দ্রনাথ যে জগত সৃষ্টি করেছেন, তার বাইরে যাওয়া মুস্কিল। ধর্মের সারকথায় সমর্পণের কথা আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নিজেকে নিঃস্ব করে সমর্পণ করতে পেরেছে? তিনি বলেছেন, আমি মারের সাগর পাড়ি দেব। ‘মার’ কে? ‘মার’ হল কামনা-বাসনার দেবতা-রতিদেব। পৃথিবী এসবে ভরা। আবার দেখতে পাচ্ছি মৃত্যু আসছে দিনান্ত বেলায়।

রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা কি হবে না? অবশ্যই সমালোচনা হতে পারে, হবেও। যে মত তিনি প্রকাশ করেন নি, সুপ্ত রেখেছেন তা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, আবার যে মতটি তিনি প্রকাশ করেছেন তা নিয়েও সমালোচনা হতে পারে। চাইলে বহুকিছু নিয়েই সমালোচনা করা যেতে পারে। এ-সমালোচনাগুলো আমার কাছে অবান্তর মনে হয় এ-কারণে যে, রবীন্দ্রনাথ যা-ই হোন না কেন সবটুকু যদি মানুষ ছাড়া তিনি অন্য কোনো কিছু হতেন তবে আমাদের কাছে তাঁর কোনও মূল্য থাকত না। সেজন্যই সত্যি কথা বলতে কি, আমি প্রলুব্ধ হই বুঝতে যে মানুষ কি একা জন্মায়? সারা জীবনব্যাপী তার কী একেবারেই কারো সঙ্গে যোগাযোগ হয় না? তার দেহের মধ্যে যে মন বা আত্মা শত চেষ্টাতেও কারো সঙ্গে তা মিশে তো যাবে না? দৈহিক সান্নিধ্য তা এনে দিতে পারে যতোটাই আস্টেপৃষ্ঠে জড়ানো থাকুক না কেন। না-মানুষের সীমা এখানেই। প্রতিভাবানদের জন্য এ আরও সত্যি। অর্থাৎ তাঁরা পরাস্ত করে কথা ও অভিপ্রায়কে।

কতো তর্ক বিতর্কের বন্যা বয়ে গেছে ইউরোপ কখনই রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করেছে কিনা! সেই ১৯১০-এ গীতাঞ্জলি বের হল, রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করলেন। ইয়েটস সেখানে কিছু সম্পাদনা করলেন। সেগুলি ঠিক কি ছিল আমি এতদিন জানতাম না। সম্প্রতি হাসান ফেরদৌসের একটি বই বেরিয়েছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথের মূল অনুবাদ একপাশে আর অপরপাশে কলাম ধরে ধরে তাঁর সংশোধিত অনুবাদ দেওয়া আছে। সেখানে বলে দেওয়া আছে যে, গোটা গীতাঞ্জলিতে সংশোধিত শব্দের সংখ্যা হল ২৪০টি। আবার সেগুলো সব বাক্য নয়, বাক্যাংশ কিংবা দুই একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে, পোস্টমডার্ন-রা বলতেই পারেন যে রবীন্দ্রনাথের মনটা কলোনিয়াল। কিন্তু লক্ষ করলে দেখি, বিদেশি দ্রব্য পুড়িয়ে ফেলা, বিদেশী পণ্য বর্জন, দৈবে বিশ্বাস করা কি হিংসার আশ্রয় নেওয়া সে গান্ধী হোক আর যেই হোক তিনি সমর্থন করতেন না। তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর ঘরে বাইরেতে, যে হাটে বিলেতি পণ্য পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সে হাটের অধিকাংশ দোকানদার মুসলিম। এরা তবে কি খেয়ে বাঁচবে? এতে কী লাভ হবে? এতেই কি ইংরেজ চলে যাবে? যখন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড হল, রবীন্দ্রনাথ বার বার চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে গিয়েছেন, এবার কংগ্রেস থেকে একটু প্রতিবাদ করুন। সম্ভবত গান্ধীর কাছেও বলেছেন। গান্ধী উপোস করা ছাড়া আর কিছু করেন নি। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাত্রি পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ পায়চারি করেছেন, শেষ পর্যন্ত স্থির সংকল্পে নাইট উপাধি বর্জন করেছেন। এ-নিয়ে তাঁর চিঠিটা পড়লে বোঝা যায় কতটা কঠিন, কতটা দৃঢ়ভাবে তিনি তাঁর কথাগুলি বলেছেন। গ্রহণ যা করব তা থেকে সরে না আসা, অথবা যা গ্রহণ করার তাকে একান্তভাবে নিজের করে নেওয়া। তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্বদেশের কলাপাত্রে বিদেশের ভোজ্য খাইব’। কিছুদিন আগে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছি ‘একবিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ’। তাতে মূলত বলতে চেয়েছি, রবীন্দ্রনাথ কী একবিংশ শতাব্দীতে কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক নন? যদি না হন তবে কেন নন? বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত -আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি এই গানটির ভিতরে ছবি আর বর্ণনা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। চোখ বন্ধ করে গাইতে থাকুন, তবে ছবির পরে ছবি আসবে, ‘বটের মূলে’, ‘নদীর কূলে’-একটানা বর্ণনা আর ছবির পর ছবি আর হৃদয় নিংড়ানো গভীর ভালবাসা। অহংকার আর গর্বে ভরা ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ নয়, ‘সার্থক জন্ম আমার/ জন্মেছি এই দেশে’। ‘কোন দেশেতে ওঠে গো চাঁদ এমন হাসি হেসে।’ কী অসাধারণ চিত্র! কিন্তু যে জাতি রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সংগীত করেছে, তার কোথাও কী এই চিত্রগুলো আছে? নদীগুলো বেঁচে কী আছে? বটের মূল, বটের ছায়া কী আছে? দেশের সেই কুমারী বা পূর্ণযুবতী প্রকৃতি কী আছে? কিচ্ছু নেই। আমরা এতভাবে নষ্ট করেছি, নষ্ট হয়েছি, বদলে গিয়েছি, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ-বদলানো আমাদের নিজেদেরই। মোটামুটিভাবে পশ্চিমি বদলানো। আমরা এটা সম্পূর্ণভাবে নিচ্ছি বা নিতে বাধ্য হচ্ছি। বর্তমানে আমেরিকা জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে না বলে, আমরা হা-হুতাশ করছি। এ কারণে খাদ্যে, পোশাকে, চলনবলনে শ্রেণিগত বৈষম্য এতটা বেড়েছে যে বলে শেষ করা যাবে না।

ঢাকায় আমরা সাঁওতাল সংস্কৃতির ছাপ খুঁজে পাব না। কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আমাদের তো দেখানো দরকার বাঙালি কী ছিল? সাঁওতাল সংস্কৃতি কেমন হয়? আমরা এখন প্রাণ থেকে বিচ্ছিন্ন, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তাহলে সমগ্র জাতি কী রবীন্দ্রনাথের সাথে ভণ্ডামি করছে? নজরুলের সাথেও করছে? নজরুলের সাথে হেফাজতের তের দফা যদি মেলাই ভয়ংকর চিত্র উঠে আসে। মেলে না কিছুই। এই জাতি বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তুর, একাত্তর পার করেছে। এ-তথ্যে তো কোনও ভুল নেই। তারপরও এ চিত্র। তাহলে রবীন্দ্রনাথ তো একদিক থেকে বাতিল হয়েই গেছেন। ব্যান্ডের গান শুনি, কণ্ঠ বলে কোনও বস্তু নেই। গভীর কণ্ঠস্বর বলে কোনও বস্তু নেই। গানের কথা বলেও কোন বস্তু নেই। যে কোনও বস্তু দিয়ে গান হতে পারে। কিছুদিন আগে বিচ্ছিরি কথা দিয়ে গান হত। আজকাল ব্যান্ডের আয়োজন মাঝে মাঝে দেখি। প্রথম কথা হচ্ছে, গান গাওয়ার আয়োজন যখন মঞ্চে হয়, তখন মনে হয় এখান থেকে কখন দৌড়ে বেরিয়ে যাব। গানের কথা, সুর নেই, কী বলছে তা নিজেই জানে না। তা-ও ঠুনকো এ-সৃষ্টি যদি নিজের হত, তবে একটা কথা ছিল। নকল সৃষ্টি। হয় তা হিন্দি মার্কা, নয়তো মার্কিন মার্কা ঋষভ চিৎকার। মার্কিনিরা কোথা থেকে নিয়েছে? জীবন থেকে নিয়েছে। আফ্রিকার প্রকৃতি থেকে ধার করেছে। আফ্রিকার জীবন থেকে নিয়েছে। স্বরটা যেন সিংহের গর্জন। তাদের জীবন তো অন্যরকম। শিকারী জীবন হওয়ায় পশু হত্যা করতে হত, লড়াই করতে হতনানান রকম আচারে তারা মগ্ন থাকত। এগুলো তাদের জীবনের অংশ।

বাংলাদেশে আজ তার শিল্পসংস্কৃতি জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুতেই পৌঁছুবে না সাধারণ মানুষের কাছে। কারণ, সাধারণ মানুষ তো তৈরি করে নিতে হয়, সেটা করে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সেটা করছে না। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আলাদা হয়ে যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত যারা তারা আলাদা। মধ্যবিত্ত যারা তারাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতি শিল্পসাহিত্য সৃষ্টি, ভোগ উপভোগ করছে। ধনিক শ্রেণি সংস্কৃতিহীন কিংবা সংস্কৃতি-স্বাধীন। এসব তাদের লাগে না।

কিন্তু এ-শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছিল ইউরোপের সামন্ত-রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। বিপ্লব করে। এরপরে পুঁজিবাদ পূর্ণ-বিকশিত হল। আমাদের এখানে বিকাশটা সেভাবে হয় নি। আমদের এখানে কাউকে দু-তিনটে টাকা দিয়ে ভোট চাওয়া যায়। ইউরোপে কী তা সম্ভব? তা নয়। তারা পৃথিবীর দেশে দেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছে, শাসন করেছে -কিন্তু নিজের দেশটাকে মোটামুটি একটা উপযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। একসময় রাশিয়াতে তলোস্তয় ছাপতে পারত না। কী করে ছাপবে? কারণ সবাই পড়তে জানে। ছাপতে গেলে রাষ্ট্রের কোষ শূন্য হয়ে যাবে। অত ছাপাবার পয়সা কোথায়? একশত ভাগ লোক শিক্ষিত এবং তলোস্তয় বোঝার মত লোকেরও অভাব নেই। তাহলে, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ কে পড়বে বা শুনবে সেটা একটা প্রশ্ন? যে নারী একসময় তানপুরায় গান করতেন, তিনি এখন নানারকম বাদ্যযন্ত্রে মগ্ন। চ্যানেলে চ্যানেলে দেখি একই গানে যে কতবার পোশাক পরির্তন করার প্রয়োজন পড়ে, তার ঠিক নেই। একবার নদীর পাড়, একবার পুকুর ঘাট, একবার বৃক্ষমূলে ঠেস দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক শুধুমাত্র সংস্কৃতিগর্বীদের উপভোগের দ্রব্য! নদীর কূল, বটের মূল দ্রুত উবে যাচ্ছে।

আমি ৫৪ সালে এ-দেশে এসেছি। তখনও কিছু ছিল। আমি বলতে পারি গ্রামের কথা, ভৈরব রূপসা কপোতাক্ষের কথা। পদ্মা যমুনা মেঘনা তো আছেই। এখন আমাদের সমাজে শোষণ তুঙ্গে উঠেছে, অন্যায়-অত্যাচার বেড়েছে, আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। এখন নদীখেকো, বালিখেকো, ভূমিখেকো, পাহাড়খেকোদের সময়। এখন যদি ঠিক পথের কথা বলতে চাই, তাহলে সাথে-সাথে আখ্যা পেয়ে যাবে যে এই যে এক গলিত-শাসিত পুরোনোপন্থী। এখন বৃথা। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ আর চলে না।

আমার মনে হয়, এই কবিই শ্রেষ্ঠ বাংলা উপন্যাসটি লিখেছেন। তা হল গোরা। তার প্রসার, ব্যাপ্তি, মানবিকতার অনন্যরূপ, সেই মাপে আমরা এখনও কিছু পাইনি। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ কেবল কবিত্ব করেছেন, আমি মানি না। তবে বর্তমানের কথা যদি বলি, তাহলে দেখবো ইউরোপের দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথের উপর পড়েছে। কিন্তু এখন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির যে জায়গায় ইউরোপ পৌঁছে গেছে, তাতে রবীন্দ্রনাথ খুব আলোচ্য হবে না। তিনি বড়জোর দূরের একটি জ্যোতিষ্ক। এটা ঘটে গেছে। সুতরাং একবিংশ শতকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শেষ কথা আমরা বলতে পারব না। এখন অনেকে তাঁকে বড় বলছে। মহান বলছে। তার পরিচয় হচ্ছে গ্রেট পোয়েট। রিডার্স ডাইজেস্ট গল্প সংকলন বেরিয়েছে, গ্রেট শর্ট স্টোরিজ অব দি ওর্য়াল্ড-সেখানে তাঁর স্থান হয়েছে। আমরা তাঁর শিক্ষাচিন্তা-সাহিত্যচিন্তা-সমাজবোধ-সংস্কৃতিচেতনা থেকে যা নিতে পারতাম তার সবটাই বর্জন করেছি। একবার সমস্ত রবীন্দ্রনাথ পড়ার জন্য সঞ্চয়িতা পড়তে শুরু করলাম। দেখলাম, এভাবে সম্ভব নয়। মহাকাব্য একটানে পড়া যায়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নয়। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আমাকে খুব টানে। কিন্তু আমি নিজে সযত্নে তাঁর পথকে ত্যাগ করেছি। আসলে কোথায় রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করব, বর্জন করব আমি এত ভাবি না। কারণ আপনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ পাঠ্য হয়ে ওঠেন । বলে দেওয়া, বা দেখিয়ে দেবার দরকার নেই। ইউরোপের দর্শন আমি কিছু পড়েছি, আধুনিক দর্শনও। কিন্তু বাতিলের মনোভাব নিয়ে কিছু কখনও পড়ি নি।

একটা গল্প বলেই শেষ করবো। হ্বিটগেনস্টাইন বিংশ শতাব্দীর এক সেরা ভাষার সীমানা নির্ধারক লজিশিয়ান। তিনি সরাসরি বার্টান্ড রাসেলের ছাত্র ছিলেন। ম্যাচিয়্যুরড হয়ে বললেন যে, ‘রাসেলকে তাঁর পুরনো চিন্তায় পেয়ে বসেছে-তিনি আর ওখান থেকে বেরুতে পারছেন না।’ হ্বিটগেনস্টাইনের চিন্তা একটা ধারায় এগুলো, মধ্যবয়সে ভিয়েনা সার্কেলের পুরনো বন্ধুদের কাছে গেলে বন্ধুরা বললো Latest logical positivism নিয়ে কিছু বলতে। তখন তিনি করলেন কী — ‘রাজা’ নাটকের একটি অংশ ইংরেজি অনুবাদে পড়ে শোনালেন — King of dark chamber থেকে তারপর আর কিছু বললেন না!

মানুষ ততটাই চিন্তা করতে পারে যেখানে তার ভাষা পৌঁছায়, যেখানে ভাষা আর যায় না ওখানে Silence — এই হল তাঁর মূল বক্তব্য। আসলে আমরা সবটাই ভাষিক, আমাদের নির্মাণটা ভাষিক, আমাদের অস্তিত্বটাও ভাষিক। ঠিক আছে? আমরা পরস্পর যে বেঁচে আছি তা আমদের ভাষা না থাকলে বুঝতে পারতাম না। বুঝতে পারলেও প্রকাশ করতে পারতাম না।

তাহলে আমাদের সীমা কোথায়? ভাষার সীমা। তারপরে আমরা আর নেই। রবীন্দ্রনাথ কী ভেবেছিলেন, ভাষাহীন কোনকিছু আছে কিনা!

ইউরোপের কোন কোন মানুষকে রবীন্দ্রনাথ এভাবে টেনেছেন। চীনে প্রচুর লেখক সে-সময়ে তাঁর অনুসারী ছিল, জাপানেও ছিল, মোট কথা যে, রবীন্দ্রনাথ হলেন সমস্ত পৃথিবীর বাসিন্দা। এর মধ্যের বিরাট একটা অংশ তাঁকে বুঝবে না, নেবেও না কোনদিন। বিরাট অংশ বুঝেও বুঝবে না। আর আমরা তো বেশির ভাগই সুখাদ্য খেয়ে অজীর্ণ হয়ে তাকে বর্জ্য হিসেবে বের করে দিতে বাধ্য হই!

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev