তখন রবীন্দ্র শতবর্ষ চলছে। মাথায় ঢুকলো কলেজ করতে হবে। পুড়শুড়া এলাকায় কোনো কলেজ নেই। এইসব এলাকার ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু বললেই তো হলো না। সর্বাগ্রে প্রয়োজন টাকার। টাকা কোথা থেকে আসবে? অভয় দিয়ে ডেকে পাঠালেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নিতাই চন্দ্র হাজরা। চাঁপাডাঙ্গায় তাঁর একটি ভুসিমালের গোডাউন ছিল। অমরেন্দ্রনাথ আদক কয়েকজন সঙ্গী সাথী নিয়ে অনেক আশায় বুক বেঁধে তাঁর কাছে হাজির হলেন। হলুদ, লঙ্কা, তেজপাতা এসবের বস্তায় গোডাউন ঠাসা। নিতাই বাবু একেবারে কোণার দিকের একটি শুকনো লঙ্কার বস্তা দেখিয়ে বললেন ওটা নিয়ে যাও কাজে লাগবে। সম্পর্কে শ্যালক হলেও জামাইবাবুর কাছ থেকে এ হেন রসিকতায় স্তম্ভিত অমরেন্দ্রনাথ। খানিক বিরক্ত হয়ে বস্তার দড়ি খুলে উপুর করতেই সকলে অবাক! তার ভেতর থেকে বেরোলো গোছা গোছা ১০০ টাকার নোট সবমিলিয়ে কুড়ি হাজার টাকা। সেই সময় অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে এই টাকার মূল্য অনেক। শুধু তাই নয়, চাঁপাডাঙ্গার প্রায় নিরক্ষর ব্যবসায়ী এই নিতাই চন্দ্র হাজরা মশাইয়েরই দান করা এক লপ্তে বারো বিঘা জমিতে কলেজ বাড়ির কাজ শুরু হল। তারকেশ্বর মন্দিরের মহান্ত দন্ডীস্বামীর (ঋষিকেশ আশ্রম) কাছ থেকে আশীর্বাদ এর সঙ্গে দান হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা নগদও পাওয়া গেল। অমরেন্দ্রনাথ নিজের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করলেন ১৭০০ টাকা। অমরেন্দ্রনাথ বাবুর কথায়, ‘এই কলেজকে আমি বলি মুচলেকা কলেজ। সরকারের তরফে আমাদের জানানো হয়েছিল, আর্থিক সংকট চলছে তাই কোন অর্থসাহায্য চাওয়া যাবে না। টাকা চাইবো না বলে আমাকে মুচলেকা দিতে হয়েছিল তবে কলেজের অনুমোদন পাওয়া গেল। অমরেন্দ্রনাথ-এর সঙ্গে প্রাণ কৃষ্ণ মন্ডল, আনোয়ার আলী মিদ্যা, অমিও গুপ্ত, বিনোদ মাঝি প্রমুখ শিক্ষানুরাগী মানুষ এগিয়ে এলেন প্রচার শুরু হলো জোর কদমে। একটি অভিনব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সেই সময়। চাপাডাঙ্গায় তখন প্রচুর আড়ৎ দারি ব্যবসা চলতো। অমরেন্দ্রনাথ এর অনুরোধে এখানকার ব্যবসায়ীরা ঠিক করলেন, আলু ধান ইত্যাদি কেনাবেচার উপর ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই কুইন্টাল প্রতি এক আনা করে শিক্ষাবৃত্তি হিসেবে কলেজ নির্মাণ তহবিলে দান করবেন। তখন সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের আমলে শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আবার অমরেন্দ্রনাথ কে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। রসিকতা করে বললেন, ‘তুমি কি চাঁপাডাঙ্গার গভর্নমেন্ট? শিক্ষাবৃত্তি চালু করছো যে? ১৯৭১ সালে বাণিজ্য বিভাগের জন্য সরকারি অনুমোদন পেল এই কলেজ। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে কলা বিভাগ। এভাবেই একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন হুগলির পুড়শুড়া থানার চিলাডিঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা অমরেন্দ্রনাথ আদক। তার জন্ম ১৯৪০ সালে। পরে অবশ্য তিনি পুরশুড়ায় বসবাস করেন।

পরাধীন ভারতবর্ষে বাবা এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের স্বদেশী আন্দোলনের কাজ করতে দেখেছেন। সেই আবহে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর রোগ সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর রক্তেও। ১৯১৭ সালে পুরশুড়ার শ্যামপুর গ্রামে এক জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় অমরেন্দ্রনাথ-এর দাদু মহেন্দ্রনাথ আদকের চেষ্টায় এলাকার প্রথম মিডিল স্কুল ‘খয়রাত আলি ইনস্টিটিউশন’ স্থাপিত হয়। বাবা সুবলচন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন চিলাডিঙ্গি ১ এবং চিলাডিঙ্গি ২ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি। কাকা বিষ্ণুপদ আদক পাঁচের দশকে যখন হাওড়ার উদয়নারায়নপুরে আশন্ডা আদর্শ শিক্ষা সদন স্থাপন করছেন, অমরেন্দ্র তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিতে বা সময় পেলেই কাকার সেই স্কুলে গিয়ে বিনা বেতনে ছাত্র পড়াতেন তিনি। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। নিজের সংকল্পের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যাসাগর কলেজে যখন আইএসসি পড়ছি তখন বড়বাজারে একটি কাপড়ের গোডাউনে অনেক ছাত্রের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতাম। তখনই মনে মনে সংকল্প করেছিলাম, বড় হয়ে গ্রামে গঞ্জে স্কুল কলেজ গড়ে তুলবো।’ চাঁপাডাঙ্গা রবীন্দ্র বিদ্যালয় সহ তিনি গড়ে তুলেছিলেন আরো বেশ কয়েকটি স্কুল। চিলাডিঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলাডিঙ্গি রবীন্দ্র বিদ্যাবিথী (উচ্চ মাধ্যমিক) তাদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও গোঘাটের ভগবতী বালিকা বিদ্যালয় সহ আরো বেশ কিছু বিদ্যালয়ের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
খুব সহজে এসব হয়নি। শুরু সেই ১৯৬৫ সালেই একেবারে নিজের গ্রাম থেকে। তখন চিলাডিঙ্গিতে কোন উচ্চবিদ্যালয় ছিল না। এখানকার ছাত্রদের পড়তে যেতে হতো শ্যামপুরের স্কুলে। সেই স্কুলের পরিচালন সমিতি ঠিক করলো ছাত্রদের ১০ টাকা করে ডেভেলাপমেন্ট ফি দিতে হবে। সমস্যায় পড়ল গ্রামের ছেলে মেয়েরা। একে অতদূর যাওয়া তার উপর অতগুলো টাকা ডেভেলপমেন্ট ফি দেওয়ার ক্ষমতা অনেকেরই ছিল না। অমরেন্দ্রনাথ এর মাথায় ভূত চাপলো, নিজেদের গ্রামে স্কুল খুলতে হবে। বেশ কিছু শিক্ষানুরাগী মানুষ হাত মেলালেন তাঁর সঙ্গে। এক লক্ষ ইঁট কাটিয়ে দিলেন মোহাম্মদ গনি সাহেব। আলুর ও ধানের মরশুমে মাঠে মাঠে ঘুরতে শুরু করলেন অমরেন্দ্রনাথ এর দলবল। চাষীদের কাছ থেকে আলু আর ধানের বস্তা দান হিসেবে সংগ্রহ করতে লাগলেন বিদ্যালয়ের তহবিল গঠনের জন্য। বিপুল সারা পড়ে গেল এলাকায়। সকলের সহযোগিতায় চার কামরা ঘর তৈরি হয়ে গেল কোন রকমে। ১৯৬৬ সালে এভাবেই স্থাপিত হল চিলাডিঙ্গি রবীন্দ্র বিদ্যাবীথি।

আপাদমস্তক শিক্ষানুরাগী এই মানুষটির কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়েই। চাঁপাডাঙ্গা বিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষকতার শুরু। তারপর কামারপুকুর সারদা বিদ্যামহাপীঠে অধ্যাপনা। কর্তৃপক্ষের কিছু বেয়াড়া রীতিনীতির বিষয়ে সংঘাত। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কিছু কাল নিজেদের ছাপাখানা দেখাশোনা। এই সময় ‘সমকাল’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। তারপর আবার অধ্যাপনা। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী শান্তিমোহন রায়ের আহবাহানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাধানগর রাজা রামমোহন রায় মহাবিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া। ১৯৬৬ থেকে ২০০০ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত এখানেই কাটিয়েছেন। ত ইতিহাস সম্পর্কিত গ্রন্থ পাঠক সমাজে সমাদৃত।
প্রায় ৮৩ বছরে পা দেওয়া এই প্রাণোচ্ছল মানুষটি এখনো স্বপ্ন দেখে চলেছেন, গ্রামে গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রকৃত সমাজ গড়ার দায়িত্ব নেবে, তার অসংখ্য প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ জোগাচ্ছেন নিরন্তর।
Thanks a lot Debu. Amar Babu Sir LONG LIVE–pray to God.
Hope U all r well.
* ভালবাসা জানিস সপরিবার।
* মঙ্গল প্রার্থনা করি তোর এবং পেজফোর.কম-র সকলের জন্য।
* বিনত, অশোককুমার কুণ্ডু। কলকাতা।
আন্তরিক ভালোবাসা জানাচ্ছি
অনেক ভালো কিছু তথ্য পেলাম। অনুপ্রাণিত হলাম শিক্ষানুরাগী মানুষটির কার্যকলাপ দেখে, রাজা রামমোহন রায় মহাবিদ্যালয়ে বর্তমানে পড়াচ্ছি। ওনার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে চলার চেষ্টা করবো।
লেখক আমার খুব পরিচিত, কাছের মানুষ এভাবেই লেখকের কলমে আমরা আরো অনেক তথ্য পাবো, এই আশা রাখি।
এই সংবাদ পড়ে আমি আনন্দিত এবং গর্বিত। আমি সেই আদক পরিবারের সন্তান এবং নিজের গ্রামের বিদ্যালয় চিলাডাঙ্গি রবীন্দ্র বিদ্যাবীথির সহ শিক্ষক ছিলাম তিন দশকের বেশি সময়। আমিও অবসরিত ১২ বছর আগে। পেয়েছি তাঁর স্নেহ সাহচর্য। স্যারের বয়সের হিসাবটায় কিঞ্চিৎ ভুল আছে। স্যারের বর্তমানে বয়দ ৮৬ বছর।
দেবাশীষ, তোমার লেখায় সব সময় গবেষনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এ লেখাটিতে ও অমর বাবু সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য ও গ্রাম বাংলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে ইস্কুল কলেজ স্থাপনে তাঁর উদ্যম ও শত বিপরীত পরিস্থিতিতেও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার কথা ব্যক্ত হয়েছে।রামমোহন কলেজে আমার বোন ইরা ও বন্ধু স্বপন পড়াশোনা করার সময় অমর বাবুর সাথে আলাপ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। শোভন পাঠকের সৌজন্যে অমর বাবুর দাদা কবি রবীন আদক এর সঙ্গেও পরিচিতি ঘটে।তোমার লেখাগুলি আমার কৈশোর ও যৌবনের নানা রঙের দিনগুলি ফিরিয়ে দেয়। অমর বাবুর দীর্ঘায়ু কামনা করি।তোমাকে ধন্যবাদ।
অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। অমরেন্দ্রনাথ আদক মহাশয় এর ক্লাস করার সৌভাগ্য আজকের প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের হয়নি। এখনো তিনি সক্রিয় আছেন লেখালেখির মধ্যে আছেন। কখনো কোন অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তার কথা শুনতে পারলে সবাই সমৃদ্ধ হবে। সেও এক দারুণ অভিজ্ঞতা হবে সবার জন্য। উদ্যোগ নিতেই পারো।
ধন্যবাদ। অজানা দিক আপনার মাধ্যমে জ্ঞাত হল।
Dear Debasis Seth
I was acquainted with Prof. Amamarendranath Adak when he kindly visited Jagrata Bharat temple complex at Udaynarayanpur, Howrah few years ago in his grandson’s car. Then I met him at his Kolkata residence. And I was amused to met his well educated gentle family. I have gone through his book Arambager Kalantar. It will be helpful to future researcher on Googly District. But I knew very little about his these benevolent social works. Thank you for your kind information and please convey my profound regards to Prof. Adak on my behalf.