| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আম্বেদকর ভাবনা ও আজকের ভারত, নতুন শতাব্দীতে দলিত রাজনীতি (শেষ ভাগ) : আশিস চট্টোপাধ্যায়

Reporter
আশিস চট্টোপাধ্যায় / ৬৯২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২২

ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক পরে বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত হানা যায়নি। গান্ধি অস্পৃশ্যতা বিরোধী কিছু আন্দোলন করলেও তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, জাত-পাত, বর্ণব্যবস্থা নিয়ে বেশি উদ্যম দেখালে সমগ্র দেশের ভারতীয় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা ধাক্কা খাবে। তখন উচ্চ বা নিম্ন বর্ণের মানুষদের একাংশ স্বাধীনতা আন্দোলনের বাইরে চলে যেতে পারে। জাত-পাতের থেকেও বেশি শক্তি গান্ধি ব্যয় করতেন সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকিয়ে রাখতে। কিন্তু গান্ধির নিজস্ব পদ্ধতি বা কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলি ভারত ভাগ ঠেকাতে তো পারেই-নি, শেষ দিকে কার্যত ভারত-ভাগ অবশ্যম্ভাবী বলেই মেনে নিয়েছিলেন জাতীয় নেতৃবৃন্দ। জাত-পাতের সমস্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে কংগ্রেসি নেতাদের এহেন মনোভাব আম্বেদকর ও তাঁর সহযোগীদের হতাশ করেছিল। বলা ভালো, তাঁরা যার-পর-নাই ক্রুদ্ধও হয়েছিলেন। আম্বেদকর অনেক আগেই ভেবেছিলেন ও বলেছিলেন, তিনি হিন্দু হয়ে জন্মেছেন বটে, তবে হিন্দু হয়েই মরবেন না। কিন্তু পরাধীন ভারতে তিনি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। স্বাধীন ভারতে তাঁর স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখেই তিনি ও তাঁর সমর্থকরা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আগেই উল্লিখিত হয়েছে, মৃত্যুর মাত্র ক’মাস আগে আম্বেদকর ও তাঁর লক্ষ লক্ষ সমর্থক বৌদ্ধ হয়ে যান। মৃত্যুর মুহূর্তে আম্বেদকরের ধর্ম ছিল বৌদ্ধই।

কিন্তু আম্বেদকরের দেখানো পথে নিম্নবর্ণের জাগরণ তখন হয়নি। দলিতরা সাধারণ ভাবে কংগ্রেসকেই নিজেদের দল বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। একটার পর একটা নির্বাচনেও কংগ্রেস ভালো ফল করছিল। এটা হবার অন্যতম কারণ ছিল নেহরু ও ইন্দিরার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় নেতার ভাবমূর্তি, জাতীয় কংগ্রেসের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য। কিন্তু সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে কংগ্রেসের ক্ষয় শুরু হয়েছিল। ইন্দিরার প্রয়াণের পর রাজীব গান্ধি বা পরবর্তী কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীদের ভাবমূর্তি বা সাহস, কোনোটাই হয়তো নেহরু-ইন্দিরার কাছাকাছি পৌঁছয়নি। তাছাড়া সে কংগ্রেসও পাল্টে যেতে থাকে, ক্ষমতালোভ, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিকতার ছায়া ক্রমশ বড় হতে থাকে। যার ফলে দলিতদের মধ্যে নড়াচড়া, কংগ্রেস ছাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যেতে থাকে।

গত শতকের আশির দশকের প্রথম দিকে একজন মানুষের নাম প্রথম জানা যায়, তাঁর নাম কাশীরাম। ১৯৩৪ সালে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষিত দলিত মানুষটি আরও অল্প বয়স থেকেই নিজেদের সমাজের অবস্থা দেখে দুঃখিত হতেন, তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করতেন। ১৯৮১ সালে তিনি গঠন করেন দলিত শোষিত সমাজ সংঘর্ষ সমিতি, বা ইংরেজি আদ্যক্ষর অনুযায়ী DSSSS বা DS4। বছর চারেক পরে ১৯৮৪ সালে তিনি বহুজন সমাজ পার্টি বা বিএসপি গড়ে তোলেন। কাশীরাম উত্তরপ্রদেশ সহ হিন্দি বলয়ের প্রায় সব রাজ্যে, পাঞ্জাবে ও অন্যান্য অঞ্চলে নিজের চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উত্তরপ্রদেশ ছাড়া অন্য রাজ্যে তেমন সাফল্য পাননি। এর একটা কারণ এই যে, দলিতরা কোনো সমসত্ত্ব সমাজ নয়। তাদের মধ্যে রয়েছে শত শত আলাদা আলাদা জাত, যাদের আবার সামাজিক অবস্থান বিভিন্ন। এদের একত্র করতে কাশীরাম যে মূল্যবোধ ও আদর্শগত প্রচার গড়ে তুলেছিলেন, ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে সেই ধারা থেকে বিচ্যুত হবার ঘটনা ঘটতে থাকে। তাছাড়া মূল রাজনৈতিক লক্ষ্যের পরিপন্থী কাজও ওই দলকে করতে দেখা গেছে, যার ফলে তাদের আদর্শগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঠিক পরে বিজেপি সরকার পদত্যাগ করলে মুলায়ম সিংহ যাদব ও কাশীরাম হাত মেলান ও মুলায়ম মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন স্লোগান তোলা হয়েছিল, মিলে মুলায়ম কাশীরাম – হাওয়া মে উড় গিয়া জয়-শ্রী-রাম। কিন্তু মায়াবতীর মুখ্যমন্ত্রী হবার অদম্য বাসনার কাছে নতিস্বীকার করেন কাশীরাম, মুলায়ম সরকার থেকে সরে আসেন। ১৯৯৫ সালে সেই বিজেপির সহযোগিতায় মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসেছিলেন মায়াবতী। এর পরে কাশীরাম ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান, তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মায়াবতীকে বসিয়ে যান। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি নিয়ে আরও গভীর চর্চা অন্য কোনো লেখার জন্য তুলে রেখে একথা বলা যায়, ক্ষমতা ও টাকাপয়সাকে আদর্শের ওপরে স্থান দিতে গিয়ে যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাশীরাম শুরু করেছিলেন, মায়াবতী তা রক্ষা করতে পারেননি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তিনি ও তাঁর বহুজন সমাজ পার্টি ক্রমেই অতীতের ব্যাপার হয়ে পড়ছে। তবে একথা বলা ভালো, কাশীরাম আম্বেদকরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, ময়াবতীও আম্বেদকরের অনেক মূর্তি বসিয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদির গুজরাত মডেল

মোদ-ঘাঞ্চি-তেলি। হ্যা, এই জাতেই গুজরাতে নরেন্দ্র মোদির জন্ম হয়েছিল। এই জাতটিকে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে ফেলা হয়। জাতি-গত পেশা হলো তেল পেষা। যদিও তাঁর পিতা ও পরিবার দোকানদার ছিলেন বলেই মোদি জানিয়েছেন, এমনকী বালক নরেন্দ্র বাবার চা-দোকানে কাজ করেছেন বলেও জানান। নরেন্দ্রর রাজনৈতিক জীবনে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হওয়াটা খানিকটা কাকতালীয়। বছরটা ২০০১। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বর্ষীয়ান নেতা কেশুভাই প্যাটেল সম্পর্কে নানা সমালোচনা উঠেছিল। সরকার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। সে সময়ে গুজরাত বিধানসভার কয়েকটি উপনির্বাচনেও বিজাপি হারছিল। মনে রাখা দরকার, ওই পর্বে অটল বিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী, দেশে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন এনডিএ। বিজেপি-র সর্বভারতীয় নেতৃত্ব কেশুভাই প্যাটেলের বদলে কম বয়সি একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করতে চাইছিলেন। অনেক প্রার্থীর মধ্যে শিকে নরেন্দ্র মোদির ভাগ্যে ছেঁড়ে। ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর কেশুভাই-কে সরিয়ে মোদি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমরা সংক্ষেপে দেখতে পারি, মোদি তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ে দলিত প্রশ্ন কীভাবে দেখেছিলেন।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী গুজরাতে ৬.৭৪ শতাংশ দলিত। সংখ্যাটা খুব বেশি নয় বটে, তবে বেশ কিছু বিধানসভা কেন্দ্রে দলিত ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আগেই উল্লেখ করা হলো, সেসময় বিজেপির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছিল। কীভাবে তা পুনরুদ্ধার করা যাবে, এই প্রশ্ন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং মোদি সহ গুজরাত নেতৃত্বকে ভাবাচ্ছিল। সে রাজ্যে তখন বিজেপির অন্দরেও নানা সমস্যা বা উপদলীয় কাজকর্ম হচ্ছিল। এই সময়েই, মোদি মুখ্যমন্ত্রী হবার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে, ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গোধরায় ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এর পরেই ফেব্রুয়ারির শেষ দিক এবং মার্চ মাসের দিনগুলিতে গুজরাত রাজ্য জুড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়ে যায়। মুসলমানদের উপর ভয়ংকর আক্রমণের নানা বিবরণ দেশবাসী জানতে পারে। সারা দেশ থেকে মোদির পদত্যাগের দাবি ওঠে। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি দাঙ্গাকে মদত দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন অভিযোগ উঠতে থাকে। কিন্তু সারা রাজ্যে দারুণ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হয়ে যায়। মোদি পরিস্থিতিটা ঠিকঠাক বুঝতে পারেন। তিনি এপ্রিল মাসে বিজেপি নেতৃত্বের কাছে পদত্যাগের ইচ্ছে প্রকাশ করেন, কিন্তু বিজেপি নেতারা সে প্রস্তাব মানেন নি। মাত্র তিন মাস পরে নরেন্দ্র মোদি জরুরি ক্যাবিনেট বৈঠক ডেকে মন্ত্রীসভার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। রাজ্যপাল পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন, নির্বাচন কমিশনের আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওই ২০০২ সালেরই ডিসেম্বর মাসে বিধানসভার ভোট হয়। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ছিল, দাঙ্গার পরবর্তীতে বহু মানুষ তখনও ঘর ছাড়া, তাই ভোট পরে করলেই ভালো হয়। কিন্তু বিজেপি টানা চাপ দিতে থাকে তখনই নির্বাচন করার জন্য। ডিসেম্বরের ভোটে মোদি-ই সঠিক প্রমাণিত হন। ১৮২ আসনের বিধানসভায় মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ১২৭ আসন পায়, মণিনগর কেন্দ্র থেকে নরেন্দ্র নিজে বিপুল ভাবে জেতেন। ২২ ডিসেম্বর ২০০২ মোদি দ্বিতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই অভিজ্ঞতাটা, অর্থাৎ জনপ্রিয়তার ঘাটতি পূরণ করা গেল সাম্প্রদায়িক পথে, পরবর্তী কালে ধীরে ধীরে আরও পরিণত রূপ পেতে থাকে। কিন্তু আমরা দলিত প্রশ্ন নিয়ে কথা বলছি। ২০০২ সালে গুজরাতে দেখা গিয়েছিল, বর্ণহিন্দুবাদের সমর্থক বিজেপির পক্ষে বড় অংশের দলিতরাও দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তাদের প্রচুর সমর্থন বিজেপির ভোট বাক্স উপচে দিয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে রামমন্দির আন্দোলন, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ইত্যাদির বিষয়ও স্মরণে রাখা দরকার। বিজেপি নেতৃত্বের ধারণা ছিল, মুসলিম বিরোধী প্রবল হাওয়া তুলতে পারলে হিন্দু সমাজের অন্তর্নিহিত বিরোধ খানিকটা ধামাচাপা দেওয়া যাবে। রাজনীতির গতিও খানিকটে সে পথেই এগিয়েছিল, ১৯৯৬ সাল থেকেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতা দখলটা বাস্তব হয়ে ওঠে। ১৯৯৬-৯৮ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হবার পরেই বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল।

২০০১ খেতে ২০১০ পর্যন্ত দশকটিতে দলিত রাজনীতির মধ্যে দু’ধরনের গতি লক্ষ করা গেল। একদিকে উত্তরপ্রদেশে বিএসপি ভালো ফল করল, মায়াবতী ২০০৭ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পুরো পাঁচ বছর সরকার চালালেন। কিন্তু বহুজন সমাজ পার্টি বা বিএসপি উত্তরপ্রদেশের বাইরে পা রাখতে পারল না। অন্য দিকে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদের হাওয়ায় দলিতদের একটা অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও একথা খাটে। দেখা গেল, রামমন্দিরকে কেন্দ্র এবং উপলক্ষ্য করে হিন্দু জাগরণের আওয়াজ বৃহত্তর হিন্দু সমাজে পৌঁছতে পারছিল। এটার উপর ভর করেই এসেছিল ২০১৪ সাল। ২০১৪ সালের ভোট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিজেপি ভোট পায়নি কেবল মুসলমানের। অন্য সব অংশের মানুষের ভোট কম-বেশি তারা দখল করতে পেরেছিল।

সাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদ, অন্ধ পাকিস্তান বিরোধিতা, পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসিদের বিরুদ্ধে জনমত বর্ণহিন্দু, দলিত, আদিবাসী নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে পুলওয়ামা-বালাকোটের ঘটনাবলি আবার সেই রণনীতির সাফল্য ডেকে এনেছিল। পাঠক লক্ষ করুন, সদ্য হয়ে যাওয়া পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিজেপির ফলাফল তথা পাঞ্জাব বাদে অন্যত্র ভালো ফলাফল কি সেই ফরমুলার সাফল্যই দেখাচ্ছে না? বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের মতো বিশাল রাজ্যে?

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী পাঞ্জাবে দলিত মানুষ সে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩১.৯৪ শতাংশ, যেটা দেশের মধ্যে সর্বাধিক। সেখানে কিন্তু মায়াবতীর বিএসপি বা কমিউনিস্টরা একেবারেই খারাপ ফল করেছে, বলা ভালো, কোনো উপস্থিতিই নেই। সেখানে আপ দলের বিরাট জয় হয়েছে, যারা নরম হিন্দুত্বের পথেই চলছে। পাঞ্জাব প্রদেশের দলিতদের কাছে পেতে এখন আপ বেশি বেশি করে আম্বেদকরের কথা বলছে, কংগ্রেস-বিজেপির বাইরে একটা ন্যারেটিভ তৈরির উদ্দেশ্যে বিপ্লবী ভগৎ সিংহদের কথা বলছে। অথচ, দলিত, শূদ্র, আদিবাসীদের প্রকৃত উন্নয়ন কতটা করছে তারা? বলা যেতে পারে, আপ দলের থেকে এ ব্যাপারে তেমন কিছুই আশা করা যেতে পারে না, হয়ওনি।

চলতি বছরের শেষের দিকে গুজরাত ও হিমাচল প্রদেশের বিধানসভা ভোট। আগেই বলেছি, গুজরাতে দলিত জনসংখ্যা ৬.৭৪ শতাংশ। হিমাচলে ওই অংশের মানুষ ২৫.১৯ শতাংশ। হিমাচলের বিশাল দলিত মানুষেরা কোন দিকে যাবেন? হিন্দুত্ববাদের ফাঁদে যদি তাদের বড় অংশ পা দেন, তবে গুজরাত বা হিমাচলে বিজেপি ও তাদের দোসরদের জয় আসতে পারে, বিশেষ করে এই দুই রাজ্যে এখন সরকার চালাচ্ছে বিজেপি ও তাদের মিত্ররা, রাজনৈতিক প্রভাবও যথেষ্ট।

২০২৪ সালে বিধানসভা ভোট রয়েছে হরিয়ানায়। এই রাজ্যে ২০.১ শতাংশ দলিত ভোট। হরিয়ানায় বিজেপি ও তাদের মিত্রদের যথেষ্ট শক্তি এখন রয়েছে, সরকারও চালাচ্ছে। বৃহত্তর হিন্দুত্বের স্লোগান ভেঙে দলিতদের তাদের প্রকৃত স্বার্থের পাশে দাঁড় করাবার বড়সড় উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তাছাড়া ২০২৪ সালেই ভারত দখলের মহাসংগ্রাম, লোকসভা ভোট। এই পরিস্থিতিতে বিএসপি-র ভোট খুবই কম, তেমন একটা রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। কংগ্রেস দুর্বল হয়ে যাবার পরে হিন্দুত্বের নয়া পাঠাশালায় দলিতরা কতটা প্রভাবিত হয়ে থাকেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট, সাধারণ চলতি রাজনীতি দিয়ে বড় কোনো পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। চাই নতুন রাজনীতি।

একটা সমস্যা হচ্ছে, কোনো সর্বভারতীয় দল, যেমন কংগ্রেস বা কমিউনিস্টরা দলিত প্রশ্নটিকে ঠিকমতো মোকাবিলা করতে পারছে না, অন্তত এখনও পর্যন্ত। হিন্দুত্ববাদের ব্যাপক আদর্শগত প্রচারের সামনে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরকে খানিকটা দিশাহার দেখাচ্ছে। এই অবস্থাটা চলতে থাকলে আসন্ন বিধানসভা ভোট এবং লোকসভা ভোটে নতুন কোনো দিকনির্দেশ না-ও মিলতে পারে। কিন্তু শুধু ভোটের কথায় আটকে থাকলে আমাদের এই আলোচনাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজকের পুঁজিবাদ আরও হিংস্র, আগ্রাসী, সর্বব্যাপী। বিশাল বিশাল কর্পোরেট দৈত্যরা প্রায় সমস্ত মিডিয়ার মালিকানা কিনে নিচ্ছে বা প্রভাবিত করছে। সে কারণেই একটি বাংলা চ্যানেলের অ্যাংকরকে একটি টক-শো-তে বলতে শোনা যায়, আম্বানির চ্যানেলে বসে তাঁর নিন্দা করা যাবে না। প্রকৃত অবস্থাটা হলো, আম্বানি, আদানি, টাটা বা এই ধরনের কর্পোরেটদের সমালোচনা বেশ বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিজেপি-র সমালোচনার ব্যাপারটাও মূলে না ঢুকে কতগুলো সাধারণ ব্যাপার বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। চটকদারি পরিবেশনায় মানুষ সেসব খবর দেখছেন, প্রভাবিতও হচ্ছেন। সাধারণ মানুষদের একটা অংশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো মিডিয়া যা ভাবাচ্ছে, তা-ই ভাবছেন। মোদি হনুমানের মূর্তি উদ্বোধন করছেন, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবাসী দেখেও দেখছেন না। এখানেই মূল সমস্যাটা আকার পাচ্ছে।

মূল মিডিয়া বা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম থেকে বেশি আশা না করাই ভালো। ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলিতেও কড়া হস্তক্ষেপ হচ্ছে। এমনকী সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদির সাধারণ সমালোচনা করার জন্য দলিত নেতা জিগ্নেশ মেবানিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আসামের এই ঘটনায় আদালতও জিগ্নেশের পুলিশ হেফাজত দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাহলে আমরা দাঁড়াব কোথায়? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটা অত সহজ নয়। কর্পোরেট মিডিয়া নয়, এখন এগিয়ে আসতে হবে, সামাজিক মাধ্যমকে। আবার ব্যক্তিগত স্তরে সামাজিক মাধ্যমেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই পেজ-ফোর-নিউজ-এর মতো নির্ভীক ওয়েবসাইট আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে একটি ওয়েব-সাইটেই হবে না, বহু সমমতের ওয়েবসাইট, ইউ-টিউভ চ্যানেল, সামাজিক মাধ্যমের অন্যান্য রূপগুলোর মধ্যে চাই সমন্বয়, জোট বাঁধা। মনে রাখতে হবে, সামনের লড়াইটা ভারতের আত্মা বাঁচাবার সংগ্রাম, আদর্শগত, সাংগঠনিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ইত্যাদি সব দিক থেকে আক্রমণ এসেছে, প্রতিটি ফ্রন্টেই চোখে চোখ রেখে দাঁড়াতে হবে। এই লড়াইয়ে তাই প্রধান অবলম্বন হবে সত্য। সত্যের জন্য সবকিছুই ছাড়ব, কোনো কিছুর জন্য সত্য ছাড়ব না, এটাই মূলমন্ত্র। গালাগালি, ট্রোল, হুমকি, আক্রমণ, মিডিয়ার উপর হামলা, সবই হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুর সারল্যভরা সত্য চোখের সামনে ওরা দাঁড়াতে পারবে না। এই মহাভারতীয় সংগ্রামে আম্বেদকর সঙ্গে থাকবেন। (সমাপ্ত)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev