প্রস্তুতি পর্ব
ওয়াইস সাহেব জানাচ্ছেন, হুগলির আইসফিল্ডে সাধারণত নভেম্বর মাস থেকেই প্রস্তুতি পর্বের কাজ শুরু হয়ে যেত, চলত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত। প্রথমে আইস ফিল্ডের বেড বানানোর কাজ হত। পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত ১২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের আয়তকার একাধিক আইস বেড তৈরি করা হত। এই মাঠের একদম নিচের স্তরে বালি আর উপরে কালো দোআঁশ মাটির স্তর থাকত। প্রথমে ফিল্ডের উপরিস্তরের দু-ফুট মাটি খুঁড়ে ফেলা হত। তারপর গর্তটি লেভেলিং করে খড়ের আঁটি বিছিয়ে দেড় ফুট উঁচু করে উপরে আলগা খড় ছড়িয়ে দেওয়া হত, যাতে মাটির নিচ থেকে উত্তাপ উপরে উঠতে না পারে। অর্থাৎ দু’ফুট গর্তের গভীরতা এখন ছ’ইঞ্চিতে পরিণত হল। এবার এই গর্ত বেশ কিছুদিনের জন্য খোলা রোদে শুকানোর জন্য ফেলে রাখা হত। এইভাবে চাষের জমির মত পাশাপাশি অনেকগুলি আইস বেড তৈরি করা হত এবং মাঝখান দিয়ে আল পথের মতো রাস্তা থাকত। আলপথের উপর কিছু দূর অন্তর বড় বড় জালা বসানো থাকত বরফ সংগ্রহের জন্য।
জল বসানো
বেড তৈরির পর, আইস বেডে খড়ের উপরে সারি দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট সরায় জল রেখে বরফ জমানোর জন্য বসানো হত। প্রায় দেড় ইঞ্চি গভীর এই সরাগুলির উপরের ডায়ামিটার ৯ ইঞ্চি আর নিচে প্রায় সাড়ে চার ইঞ্চি মত। সরার বেধ সোয়া ইঞ্চি মতো। মাটির কুঁজো বা কলসির গায়ের টেক্সচার যেমন অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত হয়, যাতে জল ঢালা মাত্রই পুরোটা আর্দ্র হয়ে ওঠে, এই সরাগুলিও হত সেরকম। ফলে সরায় ঠাণ্ডা জল ঢাললেই এগুলি আর্দ্র হয়ে উঠত। প্রতিটি বেডে ৪৫৯০টি করে সরা বসানো হত। সরা বসানোর পরে বিকেলের দিকে নিকটবর্তী জলাশয় থেকে ভিস্তি করে পরিষ্কার জল নিয়ে এসে সরাগুলি ভর্তি করা হত। কিন্তু পুকুরের জলে তৈরি বরফ সরাসরি খাওয়া যায় না বলে পরের দিকে জলাশয় থেকে নিয়ে আসা জল ফুটিয়ে নিয়ে ঠাণ্ডা করে তারপরে তা ব্যবহার করা হত। একটি বাঁশের আগায় ছোট একটি মাটির পাত্র লাগানো থাকত। এর মাধ্যমে কর্মীরা খড়ের বেডে সার দিয়ে বসানো মাটির সরাগুলিতে একের তিনভাগ অংশ জল দিয়ে পূরণ করত। অবশ্য এই জলের পরিমাণ নির্ভর করত আবহাওয়ার উপর। আবহাওয়া ভাল থাকলে এবং উত্তর থেকে উত্তর-পশ্চিমে হাওয়া বইলে বেশি পরমাণ বরফ জমার সম্ভাবনা থাকত এবং তখন প্রতিটি সরায় প্রায় আট আউন্স অর্থাৎ প্রায় ২৫০ মিলি জল পূর্ণ করা হত। তবে আবহাওয়া ভাল না থাকলে এবং ঠাণ্ডা কম থাকলে প্রতি সরায় সাধারণত দুই আউন্স (৬০ মিলি) থেকে চার আউন্স (১২০ মিলি) মত জল দেওয়া হত। বরফ জমার সবচেয়ে উপযোগী সময় ছিল ডিসেম্বরের শেষ থেকে গোটা জানুয়ারি মাস। নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসের কয়েকটি দিনে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে কিছু বরফ পাওয়া যেত।
বরফ জমানো
বিকেলের দিকে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর বরফ জমানোর জন্য জল বসিয়ে দেওয়া হত এবং কয়েকজন শ্রমিক পাহারায় থাকত। আইসফিল্ডে কাজ করা এইসব শ্রমিকদেরও আবদার নামেই ডাকা হত। তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে এবং স্থিরভাবে উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করলে মোটামুটি মাঝরাত নাগাদ সরার জলের উপরিস্তরে হালকা বরফের লেয়ার তৈরি হতে শুরু করত এবং ভোরের আগে পর্যন্ত বরফের স্তর ক্রমশ ঘন হত। শ্রমিকরা তখন খুব সাবধানে এই বরফের স্তরগুলি সংগ্রহ করে আলাদা সরায় সরিয়ে সরিয়ে এক একটি সরায় বেশ কিছু বরফের স্তর তৈরি করত। এর ফলে এই স্তরগুলি আরও ভালভাবে জমে উঠত। তবে এই ধাপে সাবধানতা ও অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে কাজ করার প্রয়োজন হত। কারণ জলে কম্পন যত কম হবে এবং জল যত স্থির হবে, বরফ জমার সম্ভাবনা তত বেশি। কোনও কোনও রাতে এক একটি সরার প্রায় ৭/১০ ভাগ জল জমে বরফ হয়ে যেত, আর কোনও কোনও প্রবল শীতের রাতে গোটা সরার পুরো জলই বরফে পরিণত হত বলেও দেখা গেছে। স্থানীয় শ্রমিকদের ভাষায় এই বরফের নাম ‘পাক্কা বরফ’। এক এক দিন গোটা সরার বাইরে ও ভিতরের সমস্তটা বরফ জমে গিয়ে এমনভাবে জমে থাকত যে সকাল সাতটায় যথেষ্ট রোদ না ওঠা পর্যন্ত সেই সরার বরফ ছাড়িয়ে আলাদা করা যেত না! ব্রিটিশ জাজ স্যার রবার্ট বার্কার তাঁর ১৭৭৫ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে এলাহাবাদের আইসফিল্ডে বরফ জমানোর একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছিলেন। সেই রিপোর্ট এবং পূর্বোক্ত হুগলির ওয়াইস সাহেবের বক্ত্যব পাশাপাশি পড়লে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আবহাওয়া একদম পারফেক্ট না হলে বরফ জমবে না। এক্ষেত্রে পারফেক্ট বলতে শুধু প্রচণ্ড শীত পড়ার কথা বলা হচ্ছে না। কারণ স্যার রবার্ট নাকি এলাহাবাদে এমন প্রচণ্ড কনকনে শীতের রাতও দেখেছেন যে রাতে একটুও বরফ জমেনি, কারণ সে রাতে প্রচণ্ড ঝোড়ো উত্তরে হাওয়া বইছিল। তাঁর মতে, স্বাভাবিকভাবে জল জমে বরফ হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সেটাই, যে রাতে মাঝারি ঠাণ্ডা থাকলেও অসুবিধা নেই, কিন্তু হাওয়া যেন স্টেডি থাকে এবং মাঝরাতের পরে খুব বেশি শিশির যেন না পড়ে। বেশি হাওয়া থাকলে জলে কম্পন বেশি হয় এবং তার ফলে বরফ জমতে চায় না বা জমা বরফ দ্রুত গলে যায়। এই একই কথার প্রতিধ্বনি ফেনি পার্কসের লেখাতেও পাওয়া যায় যেখানে তিনি ১৮৫৪ সালে কানপুরে ১১ ডিগ্রি ঠাণ্ডায় স্বাভাবিকভাবে জল জমে বরফ হতে দেখেছিলেন।

বরফ সংগ্রহ
যাই হোক, ফিরে আসি হুগলির আইসফিল্ডে। জমে যাওয়ার পরে বরফ সংগ্রহ করার পালা। বরফ সংগ্রহ করার কাজে সাধারণত মহিলা আবদার নিয়োগ করা হত। এক একটা ফিল্ডে ছয় থেকে সাতজন মহিলা অর্ধবৃত্তাকার ভোঁতা ছুড়ি দিয়ে সরা থেকে বরফ কেটে মাটির কলসিতে জমা করত। এরপর পুরুষ শ্রমিকরা সেই কলসির বরফ ঝুড়িতে ঢেলে নিত। এর ফলে অবশিষ্ট জল বেরিয়ে গিয়ে শুধু বরফের টুকরো থেকে যেত এবং এই বরফ নিয়ে গিয়ে নিকটবর্তী টেম্পোরারি আইস পিটে জমা করা হত। এই টেম্পোরারি আইস পিটটি আসলে চার ফুট ব্যাসার্ধযুক্ত ছয় ফুট গভীর একটা গর্ত, যার নিচে খড় ও মাদুর বিছানো থাকত। এর ভিতরে জমাট বরফ রেখে উপরে খড় দিয়ে ভাল করে চাপা দিয়ে রাখা হত এবং এই আইস পিটে সকালে বরফ রাখলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বরফ জমা অবস্থায় থাকত। এর পরে সন্ধ্যার দিকে সেই বরফ তুলে নিয়ে গিয়ে ১০ থেকে ১২ ফুট গভীর ও ৮ থেকে ১০ ফুট ব্যাসার্ধের অপেক্ষাকৃত বড় একটি আইস পিটে একই পদ্ধতিতে জমা করে খড় দিয়ে ঢেকে রাখা। এই আইসপিটের উপরে ও চারিপাশেও মোটা খড়ের ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখা হত। এইভাবে বরফ জমিয়ে জমিয়ে মোটা বরফের চাঁই তৈরি করা হত এবং কোনও এক সন্ধ্যায় দেশীয় মোটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে অথবা ঝুড়িতে করে উপরে-নিচে খড় ও মাদুর চাপা দিয়ে নৌকা করে সেই বরফের চাঁই কলকাতা নিয়ে যাওয়া হত। হুগলি থেকে নদীপথে প্রায় চল্লিশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে কলকাতা পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় ভোর হয়ে যেত। কলকাতা পৌঁছে নিকটবর্তী গুদামঘরে সেই বরফ জমা করা হত এবং পরের দিন সন্ধ্যায় সাহেবদের পার্টিতে সেই বরফ ব্যবহার করে মদ ও অন্যান্য পানীয় ঠাণ্ডা করা হত। বলা বাহুল্য, এই বিপুল পরিশ্রম এবং প্রচুর অপচয়ের কারণে সিজনের শুরু ও শেষের দিকে কলকাতার বাজারে হুগলির বরফের দাম হত আকাশ ছোঁয়া। ১ পাউন্ড হুগলি স্লাশের দাম হত ৪ পেন্স স্টার্লিং, যা সেকালের হিসেবে যথেষ্টই মহার্ঘ্য বস্তু এবং কেবলমাত্র উঁচু তলার রহিস সাহেবরাই এর স্বাদ নিতে পারতেন।
কোথায় ছিল হুগলির সেই বিখ্যাত আইস ফিল্ড
হুগলির ইতিহাস সংক্রান্ত মহাগ্রন্থের প্রণেতা শ্রীসুধীর কুমার মিত্র জানিয়েছেন যে, হুগলির এই বরফের কারখানা যেখানে ছিল তা “অদ্যাপি বরফ তোলার মাঠ নামে খ্যাত”। এই মাঠকে তিনি ‘নফরডাঙ্গার মাঠ’ নামেও চিহ্নিত করে গেছেন। ওয়াইস সাহেব তার রিপোর্টে জানিয়েছেন যে, মূল শহরের বাইরে কয়েক মাইল দূরে একটা উপযুক্ত ফাঁকা জায়গাকে সাহেবরা বরফ তৈরি করার জন্য বেছে নিয়েছিল। চার্লস জোসেফের ১৮৪১ সালে তৈরি করা টোপোগ্রাফিকাল সার্ভে ম্যাপে দেখা যায় যে হুগলির বেশ বড়সড় একটি জায়গাকে আইসফিল্ড হিসেবে চিহ্নিত করা আছে। এই ম্যাপ থেকে মোটামুটি যা আন্দাজ করা যায় তাতে মনে হয় যে, আজকের হুগলি স্টেশন থেকে রবীন্দ্রনগর অঞ্চলের মধ্যবর্তী জায়গায়, জিটি রোডের আশেপাশেই হুগলির বিখ্যাত আইসফিল্ডটি ছিল।
তবে রবীন্দ্রনগর থেকে হুগলি স্টেশনের মধ্যবর্তী এই বিশাল জায়গার ঠিক কোন জায়গায় এই ‘বরফ তোলার মাঠ’ বা নফরডাঙ্গার মাঠ ছিল তা বহু খুঁজেও আমাদের পক্ষে সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ওই এলাকার মানুষজন কেউ এরকম কোনও মাঠের নাম শোনেননি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এইসব অঞ্চল দীর্ঘদিন জনমানবশূন্য অবস্থায় ছিল এবং স্বাধীনতার পরে এখানে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা মানুষদের বসতি স্থাপন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলের আদি-বাসিন্দা এমন কেউ নেই যিনি এত বছরের পুরনো স্মৃতি উদ্ধার করতে পারেন। তবে স্থানীয় চা-দোকান ও বৃদ্ধদের তাসের আড্ডায় এই প্রসঙ্গে অনুসন্ধান করতে গিয়ে নিকটবর্তী সাহেব বাগান অঞ্চলের নাম উঠে এলো। তাঁদের দাবি, সাহেব বাগান নামের সাথে সাহেবদের একটা সম্পর্ক রয়েছে, যারা এই বরফ তৈরির উপায় আবিষ্কার করেছিলেন। আমাদের হুগলি হেরিটেজের এক বন্ধু আমাদের আগে জানিয়েছিলেন যে, হুগলির দেবীদাসতলায় এককালে বরফ পড়া সংক্রান্ত জনশ্রুতি রয়েছে। দেবীদাসতলা জায়গাটির খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল যে, সাহেব বাগান অঞ্চলেরই প্রাচীন নামই দেবীদাসতলা! ফলে লোকেশনটা অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে। (চলবে)