আমেরিকার স্বাধীনতার পরে আমেরিকার প্রাক্তন ইওরোপিয় শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা উপবিশিক ভারতে মূলত বাংলার সঙ্গে কাজ করেছেন। পলাশীর পরে বাংলা/ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করা খুব বেশি ঐতিহাসিক ইন্দো-আমেরিকিয় ব্যবসা নিয়ে বিশদে আলোচনা করেন নি; নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ বা অমলেশ ত্রিপাঠি বিষয়টাকে ছুঁয়েগেছেন মাত্র। আরও বড় সমস্যা হল আমেরিকা-বাংলার মধ্যে যে বরফের ব্যবসা সিপাহিযুদ্ধের এক দশকের কিছু সময় পরেও চলেছে, সে তথ্য বাঙলা তথা ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে খুব বেশি উল্লিখিত হয়নি। অধিকাংশ গবেষণা উদ্যমের প্রাবল্য ব্যয় হয়েছে ইওরোপ বিশেষ করে ইংলন্ড মেট্রোপলিটনের সঙ্গে ব্যবসা আদান-প্রদান, পুঁজি নিবেশ বুঝতে। এই প্রবন্ধে আমরা ১৮০০ শতকের প্রথম দশক থেকে সিপাহি যুদ্ধের পরের কয়েক দশক ধরে চলা বাংলা-আমেরিকার প্রায় অনালোচিত বরফ ব্যবসার গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করব।

আবদারখানা
মাথায় রাখতে হবে নানা পণ্যের মতই দক্ষিণ এশিয়ায় বরফের ব্যবহার ইওরোপিয়দের এ অঞ্চলে আসার বহু আগে থেকেই হচ্ছে। সুলতানি আমল হয়ে মুঘল আমলে শাহী রান্নাঘর বা অভিজাতদের খানাপিনায় বরফের ব্যবহার খুব ব্যতিক্রম ছিল না। সুলতানি আমলের দিল্লিতে বরফ আসত সিমলার কাছে কাঁসুলির ‘চুরি চাঁদনি কি ধার’ আজকের চুরধার পিক নামে একটি পাহাড় চূড়ার বরফ থেকে। এই শিখরটা সারা বছর বরফে ঢাকা থাকত। সেখান থেকে বরফ কেটে দিল্লির সুলতানের জন্য বয়ে নিয়ে যাওয়া হত। মুঘল আমলেও একই সূত্র থেকে বরফ আসত। সম্রাট আকবরের হেঁসেলে হিমালয় থেকে বরফ বয়ে নিয়ে আসা হত! সম্রাট আকবর ছিলেন অসামান্য উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরীতে জানিয়েছেন সম্রাট আকবর সল্টপিটার বা সোরার সাহায্যে জল ঠাণ্ডা করার পদ্ধতি ভারতে চালু করেন। আর এই সোরার মাধ্যমে জল ঠাণ্ডা করার জন্য মুঘল রসুইঘরের কর্মচারীদের নাম ছিল ‘আবদার। একটি বড় পাত্রে কিছুটা জল ও তিন চার টুকরো সল্টপিটার বা সোরা রেখে তার মধ্যে ছোট ছোট জলের পাত্রে গঙ্গাজল রাখা হত। এরপর সারা রাত ধরে বসে বসে সেই বড় পাত্রটিকে নাড়িয়ে নাড়িয়ে বরফ-শীতল পানীয় জল তৈরি করা হত। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভাল, হুমায়ূন, আকবর, জাহাঙ্গির, শাহজাহান, ঔরঙ্গজেবসহ প্রায় সব মুঘল সম্রাট দৈনন্দিনের জল এবং অন্যান্য পানীয় পান করার জন্য গঙ্গাজলই ব্যবহার করতেন।
লগে লগে কলকাতায় ব্রিটিশ রাজধানী তৈরি হল মুর্শিদাবাদের পতনের পরেই। হুগলী হেরিটেজ নামক একটি ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারছি আমেরিকার ব্যবসায়ী ফ্রেডরিক টুডর বস্টন থেকে কলকাতায় বরফ আনার আগেই মুঘলদের অনুসরণে কলকাতায় বরফের ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই পর্বটা হুগলী হেরিটেজ ওয়েবসাইট থেকে বড় উদ্ধৃত করি। কারন টুডর উপনিবেশিক কলকাতায় বরফ মার্কেটিং করার আগেই বাংলায় বরফের একটা বড় বাজার তৈরি করেছিল হুগলীতে তৈরি বরফ যা হুগলী বরফ নামে ইতিহাসে উল্লিখিত হয়েছে।

দেবীদাসতলাতেই বরফ পড়ত
“তবে সোরার সাহায্যে আবদারদের ঠাণ্ডা জল তৈরি আর বস্টন থেকে ট্যুডরের জাহাজে করে বরফ নিয়ে আসার মাঝখানে একটা বড়সড় অধ্যায় রয়েছে, যেখানে হুগলি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
হুগলিতে বরফ!
মহেন্দ্র নাথ দত্ত তাঁর ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’ বইতে লিখেছিলেন, “আমাদের পাড়ার বৃদ্ধ মধু মুখুজ্যের নিকট শুনিতাম যে হুগলীতে গুঁড়ি গুঁড়ি বরফ পড়িত। খড়ের চালার উপর সকালবেলা যেন চুন ছড়াইয়া দিয়া গিয়াছে, এইরূপ তিনি বাল্যকালে দেখিয়াছিলেন এবং খড় বিছিয়ে সরাতে জল দিয়া ফাঁকে রাখিলে তাহা বরফ হইয়া যাইত। তবে আমাদের বাল্যকালে বরফ পড়া দেখি নাই।…” এটুকু পড়ে অনেকেরই মনে হতে পারে যে মহেন্দ্র দত্তর পাড়ার বৃদ্ধ মধু মুকুজ্জে হয়ত বা তাঁকে ছেলেমানুষ পেয়ে গুলগল্প দিয়েছিলেন। কিন্তু হুগলিতে ঠিক সিকিম বা সিমলার মত বরফ না পড়লেও, প্রচণ্ড শীতে জল জমে বরফ হয়ে যাওয়া ও তা থেকে ব্রিটিশদের বরফের কারখানা তৈরির একটা ইতিহাস রয়েছে। ১৭৮৭ সালে কলকাতায় ব্রিটিশদের একটা পার্টিতে পানীয় ঠাণ্ডা রাখার জন্য বরফের ব্যবহার হয়েছিল বলে জানা যায়। এই প্রসঙ্গে সেই বছরেই ক্যালকাটা গেজেটে লেখা হয়, “The ice it is presumed, must have come from the well-known ice-field at Hooghly, the only one known to have existed in the lower province.” অর্থাৎ, সেদিনের ওই পার্টিতে যে বরফ ব্যবহার করা হয়েছিল তা হুগলির আইস ফিল্ড থেকেই সাপ্লাই করা হয়েছিল, যা গোটা দক্ষিণ বঙ্গের একমাত্র পরিচিত আইস ফিল্ড।

মুঘল আমলে সোরা দিয়ে জল ঠাণ্ডা করার পাত্র
যদিও এই বরফ ঠিক আজকের ফ্রিজে জমানো কঠিন বরফ নয়, বরং আধ-জমাট বাঁধা জল ও বরফের একটা থকথকে মিশ্রণ। যে কারণে সাহেব মহলে এই বরফ ‘হুগলি স্লাশ’ (Hooghly Slush) নামে পরিচিত ছিল। তবে বরফের চরিত্র যাই হোক, তা একমাত্র হুগলিতেই পাওয়া যেত। হুগলির আগে কলকাতা ও শ্রীরামপুরে এই প্রাকৃতিক বরফ কল তৈরি করার প্রচেষ্টা হলেও, তা সফল হয়নি। হুগলিতে যে পরিমাণ বরফ উৎপন্ন হত, দক্ষিণ বাংলায় তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। এর কারণ হুগলির ভৌগলিক অবস্থান। দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে উঁচু শহর হুগলি বঙ্গোপসাগরের নোনা জলের প্রভাব থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত। উপরন্তু শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে গঙ্গানদীর উপর দিয়ে বয়ে আসা শীতের উত্তরে-হাওয়ার প্রভাবে আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগে হুগলিতে জমিয়ে ঠাণ্ডা পড়ত। পুরনো রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, আইস ফিল্ডটি যে জায়গায় ছিল তার পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ তিনদিক ছিল জনবসতিহীন এবং প্রচুর গাছপালায় পরিপূর্ণ।
হুগলি আইসফিল্ড
১৮৩০ সালে হুগলিতে নিযুক্ত সিভিল সার্জেন ডক্টর টমাস অ্যালেকজান্ডার ওয়াইজ হুগলির আইসফিল্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করেন। সেই রিপোর্ট থেকে এই আইসফিল্ডের বর্ণনা, কার্য পদ্ধতি, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, নিয়মিত রেকর্ড করা আবহাওয়া ইত্যাদি নানা বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য পাওয়া যায়। (চলবে)
কভার ছবি : ছবিটা উপনিবেশিক আমলে এলাহাবাদে বরফ তৈরির কাঠামো। একইভাবে হুগলীতে বরফ তৈরি করা হত।