বরফ কিং — ফ্রেড্রিক টুডর
আটলান্টিক সমুদ্রের উপকূলের পাশের বিশাল বিশাল হ্রদগুলো শীতের সময় প্রায় জমে যেত। হ্রদের জলের বিশুদ্ধতা চার্লস লায়েল এবং মাইকেল ফ্যারাডেকে বিস্মিত করেছিল। তারা মনে করতেন ওয়েনহ্যাম হ্রদের জলের দেরি করে গলার সম্ভাব্য কারন ছিল জলে নুনের অভাব এবং বুদবুদের অনস্তিত্ব। নিউ ইংলন্ডের বরফের বিশ্বজোড়া আকর্ষণের কারন ছিল এর বিশুদ্ধতা এবং দেরি করে গলতে থাকার চরিত্র। ইংলন্ডের বাজারে বিশুদ্ধ বরফের ব্রান্ড নাম হয়ে গেল ওয়েনহ্যাম লেক।
বসন্ত আর শীতকালে উপকূলীয় হ্রদগুলো মোটা বরফের চাদরে মুড়ে যেত। ম্যাসেচুসেটস যেহেতু উচ্চ অক্ষাংশের আমেরিকিয় শহর তাই গোটা শীতকাল জুড়ে মিঠে জলের হ্রদগুলোয় মোটা বরফের আস্তরণ ঢেকে থাকত। উনবিংশ শতক জুড়ে বরফকে মুক্ত পণ্য হিসেবে বিচার করা হয়েছে। ফলে জমে যাওয়া হ্রদের কোনও মালিকানা থাকত না। প্রথমের দিকে রাষ্ট্র বরফ ব্যবসা, ব্যবসাদার নিয়ে মাথা ঘামায় নি। টিউডরের সফলতার পরে আরও আরও বেশি উদ্যোগপতি বরকের ব্যবসায় ঢূকতে থাকলে সরকার বরফ তৈরি জমির দাম বেঁধে দিল।

যদিও বরফ কেটে গ্রীষ্মকালীন দেশগুলোয় ব্যবসার উদ্দেশ্যে রপ্তানি করা তার একার ব্যবসা ছিল না, কিন্তু টুডর বস্টোনের প্রথম দিকের উদ্যমীদের মধ্যে অন্যতম। তবে তিনি বরফ নিয়ে আমেরিকার গ্রীষ্ম অঞ্চলের বাজারে ফাটকা খেলতে লাগলেও ২০ বছর ধরে তার লাভের হার বাড়ছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল যে সব দেশ অধিকাংশ সময় গরমে ডুবে থাকে, জল যেখানে সারাক্ষণই কুসুম কুসুম গরম থাকে – সে সব এলাকায় বরফ দামি ভোগ্যপণ্য হিসেবে গণ্য হয়। তিনি খুব কম সংখ্যক উচ্চআয়ের অভিজাত ধনীকে টার্গেট করার ব্যবসা নীতি তৈরি করেছিলেন। বাবা বরফকে জনগণের পণ্য হিসেবে বিক্রি করতে পরামর্শ দিলেও তিনি গ্রাহ্য করেন নি। তিনি জানতেন তার লভ্যাংশ নির্ভর করছে কত বেশি পণ্য তিনি বাজারে পৌঁছচ্ছেন এবং কত দ্রুত তিনি নতুন করে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন তার ওপর। টুডরের সমস্যা ছিল দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় বরফ গলে যাওয়া। ফলে তিনি যে পরিমান অর্থের পণ্য পাঠাতেন, ততটা পণ্য তার শেষতম বাজারে পৌঁছত না। তিনি এই সমস্যা সমাধানে হাতের কাছে পেলেন যুবা প্রযুক্তিবিদ নাথানিয়েল জে ওয়েথকে। নাথানিয়েল টুডরের সমস্যা সমাধান করলেন বরফের চাঙড়গুলো সম আকারের চৌকা করে কেটে যাতে পাশাপাশি থাকা বরফের চাঙ্গড়ে হাওয়া প্রবেশ করে গলিয়ে দিতে না পারে। ফলে জাহাজে আরও বেশি পণ্য পাঠাতে পারলেন তিনি; বাজারে পৌঁছনোর আগে বরফ সহজে গলে যেত না। এতে টুডরের লাভ বাড়ল। ওয়েথএর ধারণা ছিল টুডর তার এই অবদানের জন্যে তাঁকে ব্যবসায় অংশিদার বানাবে। কিন্তু যখন বুঝলেন টুডর তাকে ব্যবসার অংশিদার করতে ইচ্ছুক নন তিনি টূডরের ব্যবসা ছেড়ে দিলেন। এতে টুডরের সমস্যা বাড়ল। তার প্রতিযোগীরা ওয়েথের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শুরু করলেন। সে সময়ের পেটেন্ট আইনে তিনি প্রতিযোগী এবং ওয়েথের প্রযুক্তিকে নকল করা থেকে আটকাতে পারলেন না। ২৫ বছর ধরে প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করার পরে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল।
একইভাবে ১৮৩৪-এ তিনি আমেরিকাজুড়ে কফি ব্যবসায় ফাটকা খেলতে গিয়ে চরম ব্যর্থ হলেন। তার মাথায় বিপুল আড়াই লক্ষ ডলারের ঋণের বোঝা চাপল। বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব দিলেন যে তিনি নতুন করে বরফ ব্যবসায় ঢুকতে চান এবং তার শর্ত বিনিয়োগকারীরা কেউ তার ব্যবসায় মাথা গলাবেন না। তিনি দ্বিতীয়বার বরফ ব্যবসায় ঢুকলেন — এবারে আমেরিকা ছাড়িয়ে বিশ্ব বাজারে। ১৫ বছর পর তিনি সমস্ত ধার শোধ করলেন। তখন তার বয়স ৬৫। ১৮৫৫-র আগস্টে তিনি হাওড়া এবং কলকাতায় হুগলী নদীর দুপাশের বিশাল বিশাল গুদাম তৈরি করার জন্যে ৫৮০০ টাকা ব্যয় করেন। বিশ্বজোড়া প্রত্যেক বন্দরে, যেখানে তার পণ্য যেত, সে সব এলাকায় তাঁর কোম্পানির গুদামের মোট মূল্য ছিল ১০ লক্ষ ডলার।

১৮৫২-তে বরফ কিং ফ্রেড্রিক টুডর, চার্লস হেনরি মিনোকে তার অংশিদার করলেন। ১৮৬৪-তে ৮০ বছর বয়সে টুডরের মৃত্যু পর্যন্ত তার ব্যবসা দেখাশোনা করবেন। তিনি তার ব্যবসার পতন দেখে যান নি। ১৮৮০-তে বিশ্বজুড়েই ম্যাসেচুসেটসের বরফের চাহিদা শূন্যে নেমে আসে।
আমেরিকার সমুদ্র ব্যবসা বস্টন নির্ভর ছিল কারন আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকার প্রায় কিছুই বিক্রি করার ছিল না। বোস্টনে অধিকাংশ সময় পণ্য আমদানি হত, রপ্তানি নয়। তাই বোস্টন থেকে জাহাজগুলোকে বরফ নিয়েই সমুদ্রে রওনা হতে হত। সমস্যাটা কোথায় ছিল, ১৮৩৯-এর রিপোর্ট অব দ্য কমিটি এপয়েন্টেড বাই স্টেকহোল্ডার্স অব দ্য চার্লস্টাউন হোয়ার্ফ কোম্পানির সমীক্ষায় লেখা হচ্ছে Ice is taken on freight, not as the foundation of a voyage; but as an incident to the voyage. A vessel would not go to New Orleans or to Calcutta, for the purpose of carrying ice, unless she charged a fair freight. But as she is determined to go (ice or no ice), and as she frequently would go almost in ballast, so she can afford to take the ice at a low freight, provided she can start from a center ofgeneral business, such as Boston harbor. This very important circumstance rivets the ice trade to Boston harbor and greatly expands it size; because the low freight enables us to sell the ice at a low price, at its point of destination;—thereby placing it within the reach of the great mass of consumers—and thereby increasing its sale a hundred fold. বরফ ছিল জাহাজের ব্যালাস্ট। ফলে বস্টন থেকে কলকাতা আসতে যে শুল্ক লাগত, আমেরিকার অন্যান্য বন্দর থেকে আসতে সেই শুল্ক অনেক বেশি লাগত। তাই যতক্ষণ স্থাণীয়ভাবে বরফ তৈরি করা গিয়েছে, ততদিন বস্টনের বরফ ব্যবসা মনোপলি হয়ে থেকেছে। (চলবে)
দারুন। গুরুসুলভ????