জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটার একটা ইতিবাচক দিক আছে। সময় সময় তা একটা দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আবার জাতীয়তাবাদের নামে অন্ধ জাতিবিদ্বেষ এবং যুদ্ধবাদ দেশকে আদতে পিছিয়ে দেয়। তার চোখ শুধুই মানুষের অধিকারকে খর্ব করার দিকে। সাম্প্রতিক সময়ে এর বহু নমুনা আমরা আমাদের দেশে দেখেছি। এবার তার প্রতিফলন দেখা গেল মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। আমেরিকার নির্বাচনে এবার ট্রাম্পের পক্ষে যতটা ভোট পড়বে বলে আশা করা গিয়েছিল, তার থেকেও অনেক বেশি ভোট পড়েছে তার দিকে। আমেরিকা শুধু আমেরিকানদের জন্য এমনই একটা জিগিরকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তা তাকে ডিভিডেন্ট দিয়েছে। ট্র্যাশ ন্যাশানালিজমের জিগির তুলে অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন ট্রাম্প, যা তাকে শেষ অবধি লড়াইয়ে রেখেছে। বাইডেনের জয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পেরেছেন তিনি। ট্রাম্প এখনও তার বকবকম চালিয়ে যেতে পারছেন। তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে।
আমেরিকার ভোট ভারত আর আমেরিকাকে যেন একটা বিন্দুতে মিলিয়ে দিল। এখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদের তাস খেলুড়েরা বহু মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাদের পাশে জড়ো করতে পেরেছেন। যদিও সমবেত মানুষদের তাতে কোন মঙ্গল হয়নি। অন্যদিকে এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা গেল হাস্যকর ও ভুলভাল কথাবার্তা বলায় রেকর্ড সৃষ্টিকারী ট্রাম্প এর পিছনে রয়েছে ‘হোয়াইট ট্র্যাশ’দের গোটা অংশটা। এই সমর্থনের জোরেই লড়াইয়ে টিঁকে রয়েছেন ট্রাম্প। সমানতালে ট্রাম্পেট বাজাচ্ছেন তিনি। করোনার মৃত্যুমিছিল অব্যাহত যে দেশের প্রেসিডেন্ট বলেন, মাস্কের দরকার নেই তার পিছনেও জুটে গেল বহু মানুষ! আমেরিকার ভোট অন্ধ ও একইসঙ্গে রদ্দি জাতীয়তাবাদের এক নজির সৃষ্টি করলো। মুছে যাওয়ার মত কাজ করেও এই বাজারে ৪৮% ভোট পেল রিপাবলিকানরা। এ এক বিপজ্জনক প্রবণতা!
এটা পরিষ্কার যে ট্রাম্পের সিগনেচার রেস পলিটিক্সের ফাঁদে পড়ে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে আমেরিকা। যার নিট ফল দাঁড়ালো বাইডেন জিতেও কোন লাভ হল না। কারণ, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের ধুয়ে মুছে দিয়েছে রিপাবলিকানরা। সবার নজর এখন মার্কিন কংগ্রেসের দিকে। সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।
মার্কিন মুলুকে উগ্র জাতীয়তাবাদ কথাটাকে কনজারভেটিজম হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়। নিজেদের বিপক্ষে যে কোন মতবাদ এবং কাজকে এরা দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এবারের ভোটের ফল দেখে ট্রাম্পসঙ্গী ‘প্রতিবাদী’ উকিলের দলও অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। মিশিগানে এবং নেভাডায় বাইডেন কিছুটা এগিয়ে যেতেই ট্রাম্পের মামলাবাজ ব্যাটেলিয়ান হৈচৈ শুরু করে দিয়েছেন। মিশিগান এবং উইসকনসিনে হারের মুখে ফের ভোট গোনার দাবি তুলেছেন ট্রাম্প।
আশার কথা এই যে এত কিছুর পরেও ধীর গতির কচ্ছপের মত গুটি গুটি পায়ে জয়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন বাইডেন। যুক্তিবাদী ও গণতন্ত্রের পূজারি মানুষের অধিকাংশই তার সঙ্গে আছেন। এই লেখার সময় অবধি পেনিসিলভ্যানিয়াতে বাইডেন আপাতত পিছিয়ে থাকলেও এখনও ওই রাজ্যে অজস্র কাউন্টির ভোট গণনা বাকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাজ্যে শেষ হাসি হাসবেন বাইডেন।
শুধু ভাবাচ্ছে ট্র্যাশ ন্যাশানালিজমের উত্থান। ভারত হোক বা আমেরিকা যা শেষ বিচারে দেশ-জাতি-সভ্যতা সবকিছুকেই পিছিয়ে দেয়।