২১ অগষ্ট। একটা মিলিটারী গাড়ি দাঁড়িয়েছিল ঠিক আমাদের বাড়ির সামনে। গাড়িতে একজন পুলিশ অফিসার। সাহুবাবু সাহস করে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে রাস্তায় নেমে পুলিশ অফিসারকে কি যেন বল্লেন। পুলিশ অফিসার, দুজন মিলিটারীকে সঙ্গে নিয়ে সাহুবাবুর বাড়িতে এসে সেই মুসলমান ভদ্রলোককে গাড়িতে তুললেন। গাড়ি ছাড়ার আগে, সাহুবাবুকে জড়িয়ে ধরে, সেই মুসলমান ভদ্রলোকের কি কান্না। কাঁদতে কাঁদতে বলছেন — আল্লার কাছে আমি কিছুই চাইবো না, শুধু দোয়া মাঙব — আল্লা কিছুই চাই না — শুধু সাহুবাবুকে ভালো রেখো। কোনো কোনো রাত্রিতে ঘুম ভেঙে, শুনতে পাই এক বিধ্বস্ত বৃদ্ধের করুণ কান্না — আল্লা সাহুবাবুকে ভালো রাখো।
আমাদের মাথায় খেলছে, পুলিশ অফিসারকে তো আমাদের বিষ্টুদার কথা বলতে হয়। আমি ও দ্বারকেশ এগিয়ে গিয়ে, পুলিশ অফিসারকে বিষ্টুদার কথা বল্লাম। শুনে পুলিশ অফিসার বল্লেন — হায়াত খাঁ লেনে? ৮০ পারসেন্ট মুসলমানের বাড়ি, ওরা বেঁচে থাকতেই পারে না। আমরা যুগপৎ অফিসারের পায়ে হাত দিয়ে বল্লাম — স্যর একবার চলুন। আমাদের বড় কষ্ট হচ্ছে ওদের বাড়ির থেকে আনা নুন, স্যর এখনও খাচ্ছি। কী মনে হলো পুলিশ অফিসার বল্লেন-কোন বাড়িতে তোমরা থাকো। দেখিয়ে দিলাম। বল্লেন — নীচে ধারে কাছে কোথাও থাকো ১ ঘণ্টা পরে আসছি। সত্যিই এলেন। আমরা গাড়িতে উঠলাম। গোরা পল্টনদের পাশে বসে বুকটা থর থর করে কাঁপছে। কারণটা হচ্ছে এই ভয়াবহ, বীভৎস দাঙ্গা দেখে শরীর মন খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
হায়াত খাঁ লেন। বিষ্টুদার বাড়ি। ভেজানো দরজা, ঠেলতেই খুলে গেল। ঘর খাঁ খাঁ করছে। পুলিশ অফিসার বল্লেন — আমি তো আগেই বলেছিলাম ভাই, ওরা বেঁচে থাকতে পারে না। আমরা সজোরে কেঁদে উঠলাম। বাইরে সবাই বেরিয়ে এলাম। মিলিটারী দেখেই সব বাড়ির দরজা জানলা বন্ধ। শুধু ৩/৪টে বাড়ি আগে এক বৃদ্ধ মুসলমান ও জনা তিন ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধ আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে বল্লেন — বিষ্টুবাবুকে খুঁজছেন? আসুন। বলে পুলিশ অফিসারকে নিয়ে এলেন একেবারে ঘরের ভিতরে, সঙ্গে আমরাও। ঘরে ঢুকে দেখি, বিষ্টুদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। অমন সুন্দর চেহারাটা। কিন্তু এখন দেখে লাগছে এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক সৌম্যদর্শনা বৃদ্ধা। কোলে বিষ্টুদার বাচ্চা মেয়েটা আর হাত ধরে আছে বিষ্টুদার ছেলে। পিছনে বিবর্ণ বৌদি। পুলিশ অফিসার হতবাক। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ যেন চমক ভেঙে, একটি কথাই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো — মাইজী আদাব। আমরা সজল চোখে প্রণাম করলাম তাঁকে ও বৃদ্ধকে।
এই ভয়াবহ দাঙ্গার মধ্যে যেমন দেখলাম এক উজ্জ্বল মহাপ্রাণ সাহুবাবুকে। তেমন দেখলাম প্রশান্ত মহাসাগরের মত গভীর মমতায় ভরা এই মুসলমান দম্পতিকে। সবসময়ে কিছু না কিছু মানুষের মত মানুষ থাকে, তাই তাদের জন্যই হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’ এখনো বাসযোগ্য।
বীরভূম জেলা স্কুলে, আমাদের হেডমাষ্টার ছিলেন, আলি সাহেব। গুরুমা খুব ভালোবাসতেন। প্রায়ই গুরুমার কাছে যেতাম একবার না একবার। গুরুমার বোন ছিল একটি। খুবই সুন্দরী। আমারই বয়সী। হয়ত সেই কারণেই, খুব ভাব আমাদের সঙ্গে। আমি তখন ফার্স্টক্লাসে পড়ি। আমাকে ডাকতো আনন্দবাজার বলে। তাই আমিও তাকে ডাকতাম বসুমতী বলে। বসুমতীর সঙ্গে খুবই সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। পরের বছর ম্যাট্রিক পাশ করে সিউড়ি ছেড়েছি। ৩/৪ বছর পরে শুনেছিলাম, মাষ্টারমশাই বদলি হয়ে বহরমপুরে গেছেন আর বিয়ে হয়ে গেছে আমার বাল্য বান্ধবী বসুমতীর।
এদিকে ১৬ই অগষ্টের পর পাঁচ সপ্তাহ কেটে গেছে। দাঙ্গা স্তিমিত। কিন্তু শুনতে পাওয়া যায় এখানে ওখানে চোরা গোপ্তা চলেছে। দোকান পাট খোলে কিন্তু সন্ধ্যার আগেই বন্ধ বয়ে যায়। বহু দোকান, বিশেষ করে মধ্য কোলকাতা অগ্নিদগ্ধ। লোকে রাস্তায় চলে সাবধান হয়ে। পিয়ন চিঠি বিলি করছে পুলিশ সঙ্গে নিয়ে। একটা চিঠি পেলাম। বহরমপুর থেকে মাষ্টারমশাই লিখেছেন। বসুমতীর খবরের জন্য খুবই উৎকণ্ঠিত। বেনেপুকুরে শ্বশুরবাড়ি। মিক্সড পাড়া, সেজন্য বেশ চিন্তিত। যদি কোন খবর আমি দিতে পারি, তাহলে তাঁরা নিশ্চিন্ত হন।
আমার বাল্যবান্ধবী বিপন্না। একবার মনের মধ্যে সিভালরি জেগে উঠছে, পর মুহর্তেই স্তিমিত। এইরকম করে ৩/৪ দিন কাটলো। বেড়ে গেছে মনের ছটফটানি। শিভালরি চাগিয়ে উঠলো। যা হয় হবে, বলে বেরিয়ে পড়লাম, বসুমতীর মুখটা মনে করে। শিয়ালদার মোড়ে এসে, ডান ফুটপাথ ধরে দোকানের গা ঘেঁষে ঘেঁষে, কোন না কোন লোকের পাশাপাশি হেঁটে, পোঁছলাম বেনেপুকুরে বসুমতীর ঠিকানায়। বেল টিপলাম, এক বৃদ্ধা একটু ফাঁক করে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে চাই। বল্লাম-বসুমতীকে। দেখলাম শুনেই উনি হকচকিয়ে গেলেন। বল্লেন-কাকে? তখন আমি বল্লাম-আমার মাষ্টারমশাই আলি সাহেব চিঠি দিয়েছেন, আমাকে থামিয়ে দিয়ে বল্লেন-ভেতরে এসো। বসুমতী ভেতরের ঘর থেকে শাশুড়ি কার সঙ্গে কথা বলছে শুনে বাইরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোলকাতার এই পরিস্থিতিতে আমাকে দেখতে পেয়ে, আনন্দে বিস্ময়ে তার চোখ দুটি সজল হয়ে উঠেছে। শাশুড়ির মুখে বিরক্তি। ভাবছেন এ আবার কী। চিঠিটা দিলাম। বসুমতী পড়ে শাশুড়িকে দিল। তারপর অবস্থাটা বুঝে গড়গড়িয়ে শাশুড়িকে ছোটবেলা থেকে আরম্ভ করে সবকথা বল্লো, আরও বল্লে-ও আমার নিজের ভাই-এর চেয়ে বেশি। শাশুড়ি প্রসন্ন হলেন, হাত ধরে বল্লেন-বস বাবা, আমি তো জানিনি তুমি ওর ভাই। সোফায় বসিয়ে আমার হাতটা ধরে বলতে লাগলেন-তুমি তো খুব ডানপিটে ছেলে, এই অবস্থায় কেউ আসে। আমার ছেলে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে কাজ করে। বলে, বাইরে দাঙ্গা থামলেও, এখানে ওখানে ২৫/৩০টা খুন রোজই হচ্ছে। বসুমতীকে বল্লেন এখন খাওয়াও দাওয়াও ভাইকে। আমি তো ওকে ছাড়তে পারবো না। ছেলে আসুক ওকে পৌছানোর ব্যবস্থা করুক তারপর। চা খাওয়া গল্প ণ্ডজব চলছে। ওঁকে সাহুবাবু আর মুসলমান দম্পতির কথা বললাম। শুনে হাত দুটো কপালে তুলে বল্লেন-আল্লা মেহেরবান। রাত ৮টায় পুলিশের গাড়ীতে চাপলাম। ভাই যখন বোনের বাড়ী থেকে আসে, সেই সময় বোন যেমন তাকিয়ে থাকে সজল চোখে। আসবার সময় বসুমতীর চোখও ছিল তেমনি অশ্রুসজল।
গান্ধীজি এসেছেন। মিটিং লেক ময়দানে। লোহিয়ার নেতৃত্বে আমরা কয়েকজন পার্শ্বচর। রোষ্টামে ঠিক কায়দা করে গান্ধীজির পিছনে জায়গা করে নিয়েছি। গান্ধীজি পিছনে ডান হাত রেখে, একটু হেলিয়ে বসেছেন। আমি আর নিজেকে রুখতে পারছি না। মেদিনীপুর জেলে, একটু আধটু হাত দেখতে শিখেছিলাম। শর্মাজী বলে এক গান্ধীবাদীর কাছে। সামনে গান্ধীজির হাত একটু ছুঁয়েছি কী ছুইনি। বুকে কাঁপন ধরে গেল। আচার্য নরেন্দ্র দেও, জে পি, অচ্যুত, লোহিয়া, অরুণা আসফ আলী তাঁদের হাত ধরেছি। বুক তো কাঁপেনি। রবীন্দ্রনাথের কাছে বসে থেকেছি কতদিন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছি। সিউড়িতে যখন এসেছিলেন পার্শ্বচর ছিলাম, কই বুক তো কাঁপেনি। সামনে গান্ধীজির হাত। সৌভাগ্য রেখা করকোষ্ঠী থেকে মধ্যমা পর্যন্ত প্রসারিত। এই রকম একই রেখা দেখেছিলাম, জয়প্রকাশ নারায়ণের হাতে। লোহিয়া চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো, এই আনন্দ কিয়া করতা হ্যায়। একজন কমরেড্ হাত তুলে দেখিয়ে ইশারা করে বল্লো। লোহিয়া আমাকে ওখান থেকে হটিয়ে রোষ্টামের সিড়ির কাছে বসিয়ে দিলো। (চলবে)