দাঙ্গা স্তিমিত হয়ে এসেছে। ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হয়েছে। কিন্তু আমি পড়ে গেলাম মুস্কিলে। নাখোদা মসজিদের কাছাকাছি ছিল বিষেণদয়াল দয়ারামের বাড়ী। দাঙ্গার সময় তার বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো। শেয়ার, বই, খাতাপত্তর সব পুড়ে ছারখার। আমার ব্রোকারীর দরুণ তখন পাওনা বাকী ১৫,০০০ হাজার টাকা কোম্পানীর কাছে। সর্বস্বান্ত বিষেণদয়ালজী আমার হাত দুটো ধরে বলেছিলেন — আনন্দ ফির হাম কারবার করনে সেকেগা তো, তুমহারা রূপেয়া পয়সা হাম সব চুকা দেগা। অফিসে যে সব আনডেলিভারড শেয়ার পড়েছিল, সেগুলো ব্রাকারদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। আমি বেশ কিছু মার্টিন বার্ন ও বি আই সির শেয়ার পেয়েছিলাম। আমার মা বিন্দুবাসিনী দেবী ১৯৫৭-এর মার্চে মারা যান। বিষেণদয়ালজী খবর পেয়ে সেসময় ১,০০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে সব কিছু ঠিক হতে থাকলো। কিন্তু লোকের মনে দাঙ্গার আতঙ্কগ্রস্ত স্মৃতি থাকলো জেগে। মনুষ্যত্বহীন ভয়াবহ দাঙ্গা। আর ৪৭-এর ১৫ই অগষ্ট দেশকে ভাগ করে খণ্ডিত স্বাধীনতা এলো। মনটা যে খুব থই থই করে উঠেছিল তা নয়। খণ্ডিত বাংলা। উপরন্তু দেখলাম, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর যে সব আমলারা অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল তাদের পদোন্নতি। মেদিনীপুরে ৭২টি মেয়ের ওপরে কালেকটিভ রেপ’ যে মহকুমা হাকিমের সময়ে হয়েছিল, তিনি স্বাধীনতার পর উঁচু পদ পেতে পেতে রাষ্ট্রসংঘের পদস্থ প্রতিনিধি।
ইতিমধ্যে স্বাধীনতার আগে ৪৭-এর মার্চে আমার বাবা প্রয়াত হয়েছেন। আমার বাবা ছিলেন পরম বৈষ্ণব। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। ঠিক্ আমার দাদামণির যথাযথ উত্তরসূরী। ১৯২০/২১ সালে জেলা কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। খ্যাতনামা কবিরাজ। বাবাও অনেক বৈষ্ণব পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখতেন। বাবার আপন অগ্রজের মতই ছিলেন-সৌম্যদর্শন, জনপ্রিয় খ্যাতনামা ডাক্তার শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জেলা কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, জেলা কংগ্রেসের সভাপতি। স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রাক্তন এম এল এ। এই জেঠামশায়ের কাছে অতুলনীয় পুত্রাধিক স্নেহ আদর, ভালবাসা ও প্রশ্রয় পেয়েছি আমার বাবা এঁরই নির্দেশ মত কংগ্রেসের কাজকর্ম করতেন। ইনিও জেলে শতাধিক কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলি আমি ভালো করে কপি করেছিলাম। ১৯৩০ সালে সিউড়ি জেলে উনি দুর্গাপূজা করেন। পরের বছর থেকে ওই কাঠামোতেই সিউড়ি শহরে সুরু হয় সর্বজনীন দুর্গোৎসব। এ পূজা এখনো চলছে এঁরই মধ্যমপুত্র তিরিশের দশকে বীরভূম ডাকলুট মামলায় আসামী ছিলেন। আর তৃতীয় পুত্র ৪২’-এর অগষ্ট আন্দোলনে, কারাদণ্ড ভোগ করেন। আমি বাবার কোনো গুণেরই অধিকারী হতে পারিনি। তাই সেই দুঃখে প্রবীণ বয়সে নির্লজ্জ’ বলে একটা কবিতা লিখেছিলাম।
বাবার চারটে জামাতেই বছর কাটতো।
আর একটা জুতোতেই এক সাল।
আমার সাতাশটা জামা
ছ–জোড়া চপ্পল
তবু মনে হয় এত কম কেন?
ভোগ্যপণ্য যা ব্যবহার করছি
বাবা কেন–বাবার বাবাও স্বপ্নে দেখেনি,
তবু তৃপ্তি নেই
তবু মনে হয় এত কম কেন?
বাবার সঞ্চয় ছিল না
আমার সঞ্চিত টাকা আছে
তবুও বাবার মুখে হাসি লেগে থাকতো
সদা সর্বদাই
কিন্তু আমার মুখে হাসি নেই কেন?
বাবা তাঁর সামান্য সম্বলেই
অতিথির আপ্যায়নে, প্রাণোচ্ছল হতেন।
আর আমার,
অতিথির নামেই জর আসে একশ পাঁচ ডিগ্রি।
পয়সার অভাব নেই।
তবে আমার প্রাণ নেই কেন?
কারণ তাঁরা ছিলেন মনুষ্যত্বে পরিপূর্ণ গোটা মানুষ।
আর আমরা
স্বার্থপর, লোভী, বিবেকবর্জিত
মনুষ্যত্বহীন বামন।
নির্লজ্জের মত, তবু আমরা
পিতৃপরিচয় দিয়ে থাকি—
উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করতে করতে।
আমি বাবার কোনো গুণের অধিকারী না হতে পারলে কী হবে। সে হয়েছে আমার দুইদাদা, গৌরাঙ্গগোপাল ও গোবিন্দগোপাল। তাঁরা দু-জনেই গবেষক ও প্রবন্ধকার। দুজনেরই নামীদামী অনেক গ্রন্থ আছে বড়দার বই-বিদেশীয় ভারত বিদ্যাপথিক, স্বদেশীয় ভারত বিদ্যাসাধক, প্রাচীন ভারতের পথ পরিচয়, চীন ভারত-ভারত চীন পরিব্রাজক, সাংবাদিক কেশরী হরিশচন্দ্র, Indology and Its Emitent Western Savants প্রভৃতি আরও অনেক বই। মেজদার বই-তবাকত-ই-নাশিরী, তাইমুরের আত্মজীবনী, সাঁওতাল ও সাঁওতাল বিদ্রোহ, পীঠস্থানের দেশ বীরভূম প্রভৃতি। মেজদা ছিলেন আজন্ম ব্রহ্মচারী। সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সকলে মিলে তাঁকে সিউড়ি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান করে দিয়েছিলো। সিউড়িতে তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে। এঁরা হচ্ছেন, পণ্ডিত, সাত্তিক প্রকৃতির, ধর্মভীরু নিপাট ভদ্রলোক। আর আমি শুধু জন্মসূত্র, এঁদের ভাই।
জেপি ও রামমনোহর লোহিয়া বল্লেন, কোলকাতা থেকে ১টা কাগজ বের করতে হবে। আরম্ভ হলো উদ্যোগ। সাতজন সোস্যালিষ্ট মিলে একটা কোম্পানী করা হলো। সমাজবাণী লিমিটেড। পার্টনার হলেন, মনোরঞ্জন গুহ, তিনি তখন আনন্দবাজারে কাজ করতেন। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রীর ছেলে ক্ষেমেন্দ্রমোহন, তিনি ছিলেন হিন্দুস্থান স্ট্যাণ্ডার্ডে। কানাইলাল সরকার তিনিও আনন্দবাজারে। এঁর বাবা ডাঃ সরসীলাল সরকার রবীন্দ্র সমালোচনা গ্রন্থ লিখেছিলেন রবীন্দ্র কাব্যে ত্রয়ী’। শক্তিরঞ্জন বসু সোস্যালিষ্ট পার্টির একজন প্রাদেশিক নেতা। নন্দ মিশ্র তখন ছিলেন সোসালিষ্ট পার্টির কলিকাতা জেলা কমিটির সম্পাদক। কানাইলাল চট্টোপাধ্যায় এবং সর্বকনিষ্ঠ আমি এই আনন্দগোপাল। মহালক্ষ্মী কটন্ মিল ও ক্যালকাটা কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের কর্ণধার হেমেন দত্তদের ছিল দৈনিক কৃষক পত্রিকা। বের হতো ৩৪নং ক্রীক রো থেকে। তাঁদের কাছ থেকে আমরা কিনলাম দৈনিক কৃষক পত্রিকা ১৯৪৭-এ।
রিপোটিং, ম্যানেজারী এবং রাত্রিতে কাগজ ছাপার দায়িত্ব। দাপিয়ে কাজ করতাম। বোম্বে গেলাম আমি আর শক্তি বোস। ভালোই বিজ্ঞাপন জোগাড় হলো। লোকসান কমে এলো। শেয়ার মার্কেটের কাজ ওই দুপুরটুকু। ক্লায়েন্টদের কাছে যাওয়া হয় না, টেলিফোনে যেটুকু হয়। মেতে উঠলাম কাগজ নিয়ে। ১৯৪৮-এর ৩০শে জানুয়ারী। টেলিপ্রিন্টারে খবর আসছে ধাপে ধাপে। নাথুরামের ৩টি গুলি। মহাত্মাজীর জীবনাবসান। দুঃখ হলেও, মনে খুবই চিন্তা কী করে আমরা অন্য কাগজের থেকে আলাদারকম নিউজ করতে পারবো। কংকরদা (ক্ষেমেন্দ্রমোহন সেন) আর আমি দুজনেই টেলিপ্রিন্টারের সামনে বসে। হঠাৎ মাথায় এলো টেলিপ্রিন্টারে যে ভাবে ধাপে ধাপে গান্ধীজির মৃত্যুর সংবাদ আসছে সেইটাকে অ্যাজ ইট্-ইজ ছেপে দিলে কেমন হয়। কংকরদা শুনে পিঠ চাপড়ে বল্লো-ঠিক বলেছো। প্রথম পেজে ওটা দিয়ে বাকী সব পাতা সাদা। অ্যাঁ দারুণ হবে না? আমি বল্লাম-তাতো হলো? কিন্তু রাত দুটোর মধ্যে ১টা ফুল পেজ ব্লক কে করে দেবে, পয়সা তো নেই। জীপ চালিয়ে আমি, আর কংকরদা চলে গেলাম ব্লক মেকারের বাড়ী। আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীটে। বাইরের দিকে ব্লক মেকিং-এর কারখানা। যাঁর কোম্পানী তাঁর নাম কাঞ্চনদা। আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন। কিন্তু হলে হবে কী, বেশ মোটারকমের কয়েকটা বিল বাকী আমাদের কাছে। শত চেষ্টা করেও আদায় করতে পারছেন না। বল্লাম কংকরদাকে। কংকরদা বল্লেন-কাঞ্চনদা তোমাকে দারুণ ভালবাসে। বেগতিক দেখলে সটান পায়ে পড়ে যেও। কাঞ্চনদার ঘুম ভাঙিয়ে আমাদের প্ল্যানটা বল্লাম। গম্ভীর মুখে কাঞ্চনদা বল্লেন-ইম্পসিব্যল। মামদোবাজী পেয়েছো। এতটাকা বাকী, একটা পয়সা দিয়ে হাত উপুড় করেছো? তারপর আবার ফুলপেজের ব্লক। তোমাদের সঙ্গে আমার কোনো সর্ম্পক নেই। কংকরদার নির্দেশমত, সটান পা জড়িয়ে ধরলাম। আরে করছো কি, ছাড়ো ছাড়ো। -হ্যাঁ কাঞ্চনদা এই কান মলছি। আপনার পয়সা শোধ না করে আর আসবো না। এটা করে দিন। আমাদের ছোট কাগজ। এই প্ল্যানেই আমরা সবাই-কে টেক্কা দিতে পারবো। -আচ্ছা, আচ্ছা পা ছাড়ো, করে দিচ্ছি এবারের মত। কিন্তু প্রমিসটা মনে থাকে যেন। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। পরের দিন কৃষক পত্রিকা নিয়ে লোকের মধ্যে হৈচে। সে সময় যেদিনের কাগজটা আমরা গান্ধী সংখ্যা করেছিলাম, সেই সংখ্যাটি জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগী আয়োজিত ইডেন উদ্যানে জাতীয় মেলায় প্রদর্শনীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। সাংবাদিকতার লাইনে আমার নাম হয়ে গেল। আনন্দবাজারের স্বাধীনতা সংগ্রামী সুরেশচন্দ্র মজুমদারের আরও ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন হয়ে গেলাম। (চলবে)