এর আগে লিখেছি, মহান শিল্পী নন্দলাল আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁর বড় মেয়ে গৌরীদি ও গৌরীদির স্বামী সন্তোষদাও খুব ভালবাসতেন। নন্দলাল আমাকে ১৬টা স্কেচ দিয়েছিলেন ছোট ছোট। মুখে খুব বাঘ মারতাম। আর নিজেকে ভাবতাম খুবই বুদ্ধিমান। এইবার বুঝবেন, আমি কত গাধা, কত বেকুব। একদিন স্কেচগুলো নিয়ে সুরেশ মজুমদারের সুবাদে তাঁর ভাগনের ব্লক মেকিং কারখানায় নিয়ে গেলাম, পয়সা লাগবেনা এই ভরসায়, কর্নওয়ালিশ ষ্ট্রীটে। ভাগনে বললেন-সাতদিন পরে এসো। যথা সময়ে গিয়ে ব্লকগুলি নিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে এলাম, পাছে পয়সার কথা ওঠে।
নানান্ কাগজে লিখছি। পত্রিকার লোককে বলি, নন্দলালের স্কেচ চাই। তারা তো লাফিয়ে ওঠে। বলি-ব্লকটা কিন্তু ঠিক ফেরত দিতে হবে। আমার তখন ধারণা, ব্লক হয়ে গেছে, ভাবনা কী? যতই ছাপবো ততবারই ছবি পাবো। বছর তিনেক কেটে গেছে। ততদিনে, কাগজ, প্রিন্টিং সম্বন্ধে জ্ঞান হয়েছে, পেন্টিং এর গুরুত্ব বুঝতে শিখেছি। জানতে পেরেছি, নন্দলাল মহান শিল্পী। টনক নড়লো। দৌড়ে গেলাম সুরেশ মজুমদার মশায়ের ভাগনের কাছে। শুনে বল্লেন-সে কী নন্দলালের অরিজিনাল স্কেচ গুলি নিয়ে যাওনি? সবাই ব্লক করতে এসে অরিজিনাল গুলোই তো আগে নেয়। বল্লাম-বিনা পয়সার ব্লক তো লজ্জা লাগছিলো, আর নিজেকে কেমন ভিখিরি, ভিখিরি মনে হচ্ছিল, অত বুঝিনি, তাই তাড়াতাড়ি কেটে পড়েছিলাম।
উনি বল্লেন-সর্বনাশ। প্রত্যেকবার বিশ্বকর্মা পূজোর আগে জমাদার সব কাগজপত্র ঝেঁটিয়ে সাফ করে দেয়, তোমার মত এরকম জন্ম-বেকুব আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। উঃ নন্দলালের ষোল, ষোলটা স্কেচ। আর আনন্দলোপাল বলে নিজের নাম জাহির করো না। এবার থেকে বলো, তোমার নাম গাধাগোপাল। আর দেখো, আনন্দবাজারে কানাইদা বা কঙ্করদার কানে যেন না যায়। তাহলেই মামাধনের অর্থাৎ সুরেশচন্দ্র মজুমদারের কানে উঠবে। উনি জানলে তোমাকে ‘জুতো পেটা’ করবেন। উঃ নন্দলালের এতগুলো স্কেচ। যাও, যাও আমার সামনে আর ক্যাবলা কার্তিকের মত দাঁড়িয়ে থেকো না। এখন বুঝতে পারি, আমারই হাত দিয়ে নন্দলালের এতগুলি স্কেচ নষ্ট হয়েছিল। মরে গেলেও এ অনুশোচনা আমার যাবার নয়।
আরও শুনুন। এতো গেল মহান শিল্পী নন্দলাল বসুর কথা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! সুধাকান্ত রায়চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব। তাঁর বোনের বিয়ে হয়েছিল সিউড়িতে। সেইসূত্রে সুধাকান্তদার বড়ছেলে ‘সৌম্যর সঙ্গে ছোট থেকেই খুবই বন্ধুত্ব। সুধাকান্তদা ১টা থেকে ২টোর মধ্যে বাড়ী যেতেন খাবার জন্য। সৌম্য-র ডিউটি পড়তো দরকার পড়লে হুকুম তামিল করার। ৩৮/৩৯ সাল। ২/১দিনের, জন্য যখন-ই শান্তিনিকেতন গেছি সৌম্যও আমাকে সঙ্গে নিত। রবীন্দ্রনাথ ভেতরে। বাইরে বারান্দায় মোড়ায় বসে উঠতি যৌবনে গুজর গুজর ফিসির ফিসির করে গল্প করতাম। তাছাড়া ১৯৪০-এ রবীন্দ্রনাথ গেছেন সিউড়িতে বড়বাগানের মেলার উদ্বোধন করতে। ব্রহ্মগোপাল মিত্রের নেতৃত্বে তরুণসংঘের আমরা দশজন ছিলাম পার্শ্বচর। কিন্তু কে রবীন্দ্রনাথ? দাদুর মতন আর কি? ঋষির মত চেহারা। পড়ার বই-এ কবিতা আছে। দ্যাটস মাচ। যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিন্তায় মননে সর্বব্যাপী হয়ে বিরাজমান। যিনি বিশ্ববরেণ্য। মহামানব। অথচ কচি খোকা ছিলাম না। তখন বয়স ১৮/১৯ কিন্তু তখন কোটিতে গুটিক ছাড়া বাঙালীরাও ছিল আমারই মত রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে অজ্ঞ। তখন সবে ‘কাননবালা’ (সে সময় দেবী হননি) ও পঙ্কজ মল্লিক সুরু করেছে রবীন্দ্রসংগীত। প্রয়াত হবার পরই বাঙালীর কাছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ‘রবি’ হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জনগণমন অধিনায়ক। সে সময় আমার অজ্ঞতার আর দোষ কী।
দৈনিক কৃষক চলছে ভালোই। ডেফিসিট অনেক কমে গেছে। খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ করছি। হয়ত ট্রেনে চেপে চলে গেছি দক্ষিণ ২৪ পরগণার শেষ ষ্টেশন লক্ষ্মীকান্তপুর। সেখানে প্রাচীন ৮৫-৯০ বয়সের এমন পুরুষ কিংবা রমণীর কাছে বসে, তাঁর বাল্যজীবনের কথা, বিবাহিত জীবনের কথা, তদানীন্তন সামাজিক জীবনের কথা শুনে গুছিয়ে লিখেছি। কিংবা রিক্সাওলা নয়ত ঠেলাওয়ালার কাছে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা কাহিনী। জেলে কামার কুমোরের কথা, শান্তিনিকেতনের প্রবীণ অধ্যাপক কিংবা পাঠশালার শিক্ষকের অভিজ্ঞতার কথা। লেখাগুলি প্রশংসিত হতো। আমার চেষ্টা থাকতো, আমার লেখায় অন্য কাগজে যে সব খবর থাকে না, সেই গুলিকে কভার করার।
কিন্তু কথায় বলে-শিরে কৈল সর্পাঘাত তাগা বাঁধিবি কোথা? ১৯৪৩ সালে মন্বন্তর, ৪৬-এ দাঙ্গা। ৪৭-এ দেশ ভাগ, খণ্ডিত স্বাধীনতা, খণ্ডিত বাংলা। স্বাধীনতা যেন বাঙালীর জীবনে অভিশাপ হয়ে নেমে এল-লক্ষ লক্ষ শরনার্থী। বাংলাদেশ থেকে গুটি নয়। এলো কোটি লোক, এখনো আসছে আরও-জনারণ্যে টালমাটাল কলকাতা শহর। সোনায় সোহাগার মত ফেল করলো ১৪টি বাঙালী ব্যাঙ্ক। শেয়ার মার্কেট বিধ্বস্ত। বহু হাজার মধ্যবিত্ত পরিবারে অন্ধকার নেমে এলো। পচিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থা টালমাটাল।
আমরা একটা মিলি মেশিন কিনেছিলাম। যাতে আরও বেশী কাগজ ছাপতে পারি। ক্যালকাটা কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের কাছে, হাইপোথিকেট করা ছিল ৩৫ হাজার টাকা শোধ হয়েছে। ৫০০০ টাকা বাকী। নভেম্বরে শোধ দেওয়ার কথা। হাইকোর্ট ব্যাঙ্কের সম্পত্তি ধরে নিয়ে সিল করে দিল প্রেস। মধ্যবিত্ত ঘরের একছেলের শেয়ার মার্কেটের রোজগারের টাকা সমেত—আশা-আকাঙ্ক্ষা-উদ্দীপনা-স্বপ্ন সব শেষ।
এসেই তো ঝড়, চলে গেল সব নিয়ে
টিনের চালা, ঘেরা টোপের দরমাটা,
বাঁশের বেডা
লাউ মাচা ও
তুলসীগাছের মঞ্চকে।
নিভিয়ে দিল এক নিমেষে প্রথমেই
একটি ফুঁয়ে সলতে–জ্বলা তেলপ্রদীপ
অন্ধকারে
নীরব–কাঁদা সার হল
খুজি এখন জলের কুঁজো কী দিয়ে?
আমাদের দৈনিক কৃষক কাগজ বন্ধ হয়ে গেল। কৃষক কাগজ বন্ধ হওয়ার পর জেপি ও রামমনোহর লোহিয়ার চেষ্টায় তৈরী হলো একটি রিসার্চ সেন্টার। নাম হল-খোঁজ পরিষদ। ২৪ চৌরঙ্গী রোডে। রিসার্চ ডাইরেক্টর ছিলেন বৈজ্ঞানিক সত্যেন বোস, ডঃ দ্বারিক ঘোষ, অর্থনীতিবিদ অমিয় দাশগুপ্ত। বউবাজার ষ্ট্রীট ছেড়ে এসেছিলাম কয়েক মাসের জন্য, মারিয়া মাসী অষ্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ায় তাঁর ক্যামাক ষ্ট্রীটের বাড়ীতে। তারপর এলাম ৩৪ নং ক্রীক রো তে। তারপর এলাম ২৪ চৌরঙ্গী রোডে ১৯৪৮ সালে। বিগত ৫০ বছর এখানেই আছি গত পঞ্চাশ বছর আনন্দগোপালের ড্রেস (খদ্দরের পায়জামা-পাঞ্জাবী) আর অ্যাড্রেস একই রয়েছে।
জে.পি ১৯৪৯-এ কোনো সময় একটা চিঠিতে লিখলেন মার্টিন বার্ন ও ইণ্ডিয়ান আয়রন এণ্ড স্টীলের কর্ণধার স্যর বীরেনের সংগে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে। স্যর বীরেন মঙ্গল ও শুক্রবার মার্টিন বার্নে বসতেন। এক মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় গেলাম। শ্লিপে লিখলাম-ফ্রম জয়প্রকাশ নারায়ণ। কাজেই কোনো অসুবিধা হলো না, ডেকে পাঠালেন। জীবনে ওইরকম অফিসে কখনও যাইনি, পা গুলো কার্পেটে ডুবে যেতে লাগলো। বল্লাম- জে.পি-র কথা। উনি জিজ্ঞেস করলেন-হোয়াট ফর্। বল্লাম-আমি জানি না। উনি বল্লেন- ঠিক আছে আমি তো সপ্তাহে দুদিন আসি। বল্লাম-অন্ততঃ দিন পনের পরে একটা ডেট্ দিন, আমি তো চিঠি লিখে জেপি-কে জানাবো। -ঠিক আছে বলে, ডায়রী দেখে প্রায় দিন আঠারো পরে একটা ডেট্ দিলেন। হ্যারিংটন ষ্ট্রীটের বাড়ীতে সকালে ব্রেকফাষ্টে। ভদ্রতা করে বল্লেন-তুমিও এসো।
যথা সময়ে জে.পি-র সঙ্গে আমিও গেছি। জে.পি বল্লেন-খোঁজ পরিষদের কথা, গবেষণার কথা, দুটি বই-এর কাজ অনেক এগিয়েছে, গবেষকদের কিছু টাকা দিতে হবে আর বই দুটো ছাপতে গেলেও টাকার দরকার। অথচ যা টাকা জোগাড় হয়েছিল, তা ফুরিয়ে গেছে। তাই আপনার কাছে কিছু সাহায্য চাই। স্যর বীরেন সব শুনে খুব খুশি। বল্লেন- চা-টা আগে শেষ করা যাক। রানুদি অর্থাৎ লেডী রানু মুখার্জির সঙ্গে তো আগেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সেই থেকে গত ৫০ বছর ধরে রানুদি আমাকে স্নেহভাজন বন্ধু হিসেবেই দেখে আসছেন। সার বীরেন তখনকার দিনে ৪০,০০০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন খোঁজ পরিষদের জন্য। দু-বছরে আমাদের গবেষকদের ২টি বই বেরিয়ে গেল- ‘ডলার প্রবলেম-ডি ভ্যালুয়েশন’ ও ‘কোল ইন্ ইণ্ডিয়া’। বিশেষ করে ‘কোল্ ইন ইণ্ডিয়া’, ভারত সরকারের কাছে উচ্চ প্রশংসা পেয়েছিল। (চলবে)