খোঁজ পরিষদ সংলগ্ন ফ্ল্যাট আমার ডেরা। একদিন রবিবার সকালে শ্রদ্ধেয় মাষ্টারমশাই সত্যেন বোস এসে হাজির। বল্লেন-কফি খাওয়া। একটা ইজি-চেয়ারে, ফতুয়াটা খুলে গা এলিয়ে দিলেন। এই ইজি চেয়ারে বসেছেন,-অচ্যুত পটবর্দ্ধন, লোহিয়া, জয়প্রকাশ, অরুণা আসফ আলী, বিশ্বেশ্বর কৈরালা যিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, লেডী রানু, বিপ্লবী ত্রৈলোক্য মহারাজ, কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়, মাখনলাল সেন, সৌম্যেন ঠাকুর, লীলা রায় প্রভৃতি দিকপালেরা। ইজি চেয়ারটি এখনো আছে। সকালে উঠে, সেটার হাতলে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করি তারপর এতে বসে খবরের কাগজ পড়ি। এখনো অনেক খ্যাতনামা-ই এসে বসেন এই ইজিচেয়ারটার।
মাষ্টারমশায় আমাকে অনেক কথা বলতেন। ওঁর বাবা-মার কথা, ছেলেবেলার কথা। রকমারি রান্নার কথা, কচুতে-পটলে কিংবা ফুলকপি-কচুতে কী রেসিপি দিলে অমৃত স্বাদ হয়। কিন্তু ভুলেও অঙ্ক কিংবা বিজ্ঞানের কথা বলতেন না। কারণ ভাল করেই জানতেন এই দুটি ব্যাপারে আনন্দের মাথাটা কী বিপুল পরিমাণে মোটা। ঘন্টাখানেক কেটেছে। কফি খাওয়া শেষ। ইতিমধ্যে এলো রাজ্যপালের এডিকং। স্যালুট ঠুকে বল্লেন-স্যর বাড়ীতে গিয়েছিলাম, ওঁরা বল্লেন, আপনি এখানে। স্যর, হিজ একসেলেন্সি (তখন তাই বলার রেওয়াজ ছিল) আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। গাড়ী এনেছি। মাষ্টারমশায় বল্লেন-তুমি যাও, আমি পরে যাচ্ছি। এডিকং চলে যাওয়ার মিনিট ১৫ পরে বল্লেন-চল্ যাওয়া যাক। রাস্তায় এসে বল্লাম-একটা ট্যাক্সি ডাকি? বল্লেন-না সকাল থেকেই মনটা বেরিয়ে পড়ি বেরিয়ে পড়ি করছিল, তাই তো তোর কাছে চলে এলাম। চল এই সবুজ মাঠটুকু হাঁটতে হাঁটতে যাই। সামনেই মনোহর দাস তড়াগ, বলতে কী, চৌরঙ্গী, তখন ছিল সত্যিই মনোহর। ওই উদোম শরীরে, ভুড়ি নিয়ে হেলতে দুলতে চলেছেন-আর বলছেন-কী কী করলে খোঁজ পরিষদকে একটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়। মনুমেন্টের পাশ দিয়ে এসপ্ল্যানেড ম্যানসনের গা ঘেঁষে পৌঁছালাম লাটভবনের উত্তর দিকের গেটে। পুলিশ অফিসাররা এগিয়ে এসে নমস্কার করলো। বল্লাম-মাষ্টার মশায়, এবার ফতুয়াটা পরে নিন। বল্লেন-যাঁর কাছে যাচ্ছি, তাঁর কাছে আমার ফতুয়া পরার দরকার নেই। তর্ক করে বল্লাম- সে কী, মাষ্টারমশায়, উনি গভর্নর, ডেকোরাম বলে তো একটা কথা আছে। ঘাড়টা কাত করে, আমার দিকে ড্যাব্ ড্যাব্ করে চেয়ে বল্লেন-তা হলে বলছিস। তবে দে পরিয়ে। দু হাত প্রসারিত করে দিলেন। পুলিশদের সামনে, রাজভবনের গেটে বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে আমি ফতুয়া পরাচ্ছি। দৃশ্যটা ভেবে নিন্ একবার। জগৎজোড়া খ্যাতি, কিন্তু বাচ্চা ছেলের মত সরল সাদা-মাটা। আমার জীবনে এ অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। আমার শাশুড়ির মামাতো, পিসতুতো, খুড়তুতো, মাসতুতো বোন অনেকগুলি। আমার বিয়ের পর জানলাম, মাষ্টারমশায়ও একজন মাসশ্বশুর। এতদিন তুই বলে আসছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তুমি বলতে শুরু করলেন। একদিন চেপে ধরলাম। -স্যর কী অন্যায় করেছি যে, তুই না বলে ইদানীং তুমি বলা শুরু করেছেন। ‘খুব’ গম্ভীর মুখে বল্লেন-তাই কী হয়, জামাই বলে কথা। জামাই-এর একটা সম্মান আছে তো? কয়েকটা বেড়াল ছিল ওঁর। হয়ত চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন, ভুঁড়ির ওপর, একটা প্রিয় বেড়াল বসে আছে। আর বেহালা বাজাতেন অপূর্ব।
১৯৪৮-এ সোস্যালিষ্ট পার্টির প্রাদেশিক সম্মেলনে, আমার দুটি লাভ হয়েছিল। আরএসপি থেকে ত্রৈলোক্য মহারাজ, রবি সেনের নেতৃত্বে একটা গ্রুপ বেরিয়ে এসে, সোস্যালিষ্ট পার্টিতে যোগ দেয়। আমার প্রথম লাভ ত্রৈলোক্য মহারাজ ও রবি সেনের মত খ্যাতনামা বিপ্লবীদের স্নেহভাজন হওয়া। মহারাজের বিখ্যাত বই ‘জেলে ত্রিশ বছর’। মহারাজ কিন্তু ওজনে ভারী নেতাদের মত, পূর্বপাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসেননি। ওইখান থেকেই মাঝে মধ্যে কোলকাতা আসতেন। বীর বিপ্লবীদের মতই গদীয়ান ছিলেন ওখানে। পাবলিশার্স এমসি সরকার-এর কর্ণধার ছিলেন, সুধীরচন্দ্র সরকার। পৌরাণিক অভিধান, বিবিধার্থ অভিধান, আমার দেশ আমার কাল ইতাদি বই-এর রচয়িতা তিনি। আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। পরে এঁরই পুত্র সুপ্রিয় সরকারের সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গতা হয়।
এমসি সরকারে বসতো আড্ডা। দুপুর থেকে দোকান বন্ধ হওয়া পর্যন্ত বিরামহীন। আড্ডার কথায় পরে আসছি। আগে মহারাজের কথাটা বলে নি। কোলকাতায় এলে, বিপ্লবী রবি সেনের সঙ্গে মহারাজও মাঝে মধ্যে এই আড্ডায় আসতেন। প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বড় ছেলে ছিলো কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়। অক্সফোর্ডের কেমেষ্ট্রির গ্র্যাজুয়েট। পরে প্রবাসী ও মডার্নরিভিয়ু-র সম্পাদক হন। খদ্দরের ধূতি পাঞ্জাবী পরিহিত এরকম সুদর্শন বাঙালী খুবই বিরল ছিল। ওঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন খ্যাতনামা বিপ্লবী ও সাংবাদিক মাখনলাল সেন। উনি আনন্দবাজারে ছিলেন। পরে ‘ভারত’ নাম দিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকা বের করেন। ১৯৪২ সালে গ্রেপ্তার হন। ইংরেজ সরকার ‘ভারত’ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয় যখন সাংবাদিকতার ক্লাস সুরু করে তখন মাখনদা ও কেদারদা সেখানকার অধ্যাপক হন। মাখনদার একমাত্র কন্যা হলেন-সন্ন্যাসিনী বেদপ্রাণা। একদিন কেদারদা বল্লেন-এখানে তো রোববার বন্ধ, চলুন কোন কোন রোববার ‘আনন্দ’র সমকালীন-এ বসা যাক্। মহারাজ বল্লেন-আমার একটা কন্ডিশন আছে। আনন্দকে চিড়ে দই খাওয়াতে হবে আমাকে। রবিদা খিচিয়ে উঠে বল্লেন-বুড়া হইছি বইলা, চিড়া, দই খাইতে পারুম না? তা হইবো না, আমরা হক্কলে খাইমু। মহারাজ কোলকাতায় এলে, মাখনদা, কেদারদা, রবিদা আসতেন সমকালীন অফিসে, মহানন্দে মজা করে খেতেন চিঁড়ে দই। এই রকম বার তিনেক এসেছেন। বয়সে আমি ছিলাম পুত্রবৎ। তাই মাঝে মধ্যে ভাবি, আমার নাম আনন্দগোপাল না হয়ে, হওয়া উচিত ছিল- বরকত আলী অর্থাৎ সৌভাগ্যবান।
এমসি সরকারের আড্ডায় যাঁরা আসতেন প্রায় অনেকেই পিতৃতুল্য। কিন্তু ‘ঘোড়া কর ভগবান’, লিখে খ্যাতি পেয়েছি। জয়প্রকাশ নারায়ণের ঘনিষ্ঠ সহচর। উপরন্তু প্রবন্ধ পত্রিকা সমকালীন। কাজেই কনিষ্ঠ হলেও পংক্তিভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সকলেই স্নেহের চোখে দেখতেন। কতজন শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, গবেষক প্রবন্ধকারের সংগে যে আমার পরিচয় হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আসতেন অমৃতবাজার পত্রিকা ও যুগান্তরের কর্ণধার তুষারকান্তি ঘোষ। সুরসিক, রসিয়ে কত বিচিত্র রকমের গল্প বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। জংলীদা যার ভালো নাম প্রভাত গঙ্গোপাধ্যায়। ভারত পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং এরই মা ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী প্রথম বিলেত ফেরৎ লেডী ডাক্তার। আসতেন চিত্র পরিচালক ও মহাস্থবির জাতকের লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। দেখলেই বলতেন, কোবরেজের ছেলে, কোথা গরু, গরুর দুধ, গেরস্থ ঘরে গরুর উপকারিতা এই সব লিখবে, তা নয় ছুটল ঘোড়ার পিছনে, ঘোড়া নিয়ে কবিতা। পকেট থেকে বের করতেন একটা বড় আমলকী। বলতেন-রোজ একটু করে কেটে খাবে। বাকীটা ন্যাকড়ায় ভিজিয়ে রাখবে। বুদ্ধি হবে, তারপর গরুর সম্বন্ধে লিখে আমাকে জানাবে। মালকোচা মেরে কাপড় পড়তেন। বলিষ্ঠ চেহারা। ওস্তাদ গল্প বলিয়ে। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতো। অনেক গল্পে এমন আদিরস থাকতো যে ওইসব সিনিয়ারদের সামনে লজ্জায় পড়ে যেতাম। খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক ছিলেন। অল্প বয়সেই, ওঁর পরিচালিত ‘দেনাপাওনা’ দেখেছিলাম, যাতে উমাশশী আর দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে, তাঁর রচিত ‘মহাস্থবির জাতক’। (চলবে)