হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সংগে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সুধীরচন্দ্র সরকার। প্রণাম করতে না করতেই আহ্লাদে আটখানা হয়েছিলাম। উরিব্বাস ইনিই লিখেছেন ‘যকের ধন’ যা ২০/২৫ বার পড়া হয়ে গেছে। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ছিলেন দীর্ঘদেহী, সুদর্শন। ওঁর বই ‘চালিয়াৎ চন্দর’ স্কুলের প্রাইজে অনেক বার পেয়েছি। ওঁকে সৌরীনদা বলতাম, আবার ওঁর ছেলেকে বলতাম রমিদা। যাঁর ভালনাম সৌম্যেন মুখোপাধ্যায় নিউ থিয়েটার্সের নাম করা বই ‘প্রিয় বান্ধবীর’ পরিচালক। আর কন্যা অগ্রগণ্যা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী খ্যাতনাম্নী সুচিত্রা মিত্র।
নরেন দেব ছিলেন দীর্ঘদেহী। রসিক ও সুপরুষ। তাঁর ছিল মোম লাগানো একজোড়া গোঁফ, দেখবার মত। ক্যালকাটা কেমিক্যালের প্রচার অধিকর্তা ছিলেন। মেঘদূত ও ওমর খৈয়াঁম অনুবাদ করে খুব নাম করেছিলেন। সহধর্মিনী রাধারানী দেবীও সুলেখিকা ছিলেন। এঁদের মেয়ে খ্যাতনাম্নী অধ্যাপিকা ও সুলেখিকা নবনীতা দেব সেন। নরেনদা, স্ত্রী রাধারানীদেবীর সঙ্গে মিলে, দুজনে একটি কাব্য সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন। নাম ‘কাব্য দীপালি’। এর ২য় সংস্করণে ‘ছোঁয়া’ নামে আমার একটি কবিতা।
তোমার মনের রেলগাড়ী
একটু সময় ছুঁয়ে, আমার ষ্টেশন গেল ছাড়ি।
সব কিছু নিয়ে
অবাক বিস্ময়ে
চেয়ে দেখি শুধু
পিছনের লাল আলো
আর—
প্রান্তরের বুকফাটা ‘ধূ ধূ’।
গ্রন্থভুক্ত করেছিলেন।
একদিন দুপরে এমসি সরকার-এ বসে আছি আমার পার্টির এক সিনিয়ার দাদার মেয়ে ঢুকেছে চলন্তিকা কিনতে। হবি তো হ সেইসময় কেদারদা, মাখনদার সংগে বসে আছেন রাজশেখর বোসও। মেয়েটি আমাকে দেখে বল্লো — ওমা, আনন্দকাকু তুমি এখানে। মা তোমাকে ক’দিন গরু খোঁজা খুঁজছে। আমি বল্লাম-তাই নাকি? তোর মামাদের খুঁজলে তো কবেই পেয়ে যেতেন। মেয়ে বল্লো-ওমা, খুঁজছে তোমাকে, তাহলে মামাদেরকে খুঁজতে যাবে কোন দুঃখে? -না খোঁজার প্রসেসটার কথা বলছি। যে প্রসেস-এ তোর মা খুঁজছেন, তাতে তো তোর মামারাই সহজপ্রাপ্য, তাই নয় কি? -ও তার মানে তুমি আমার মামাদের গরু বলছো? দাঁড়াও, আজই আমি দিদাকে বলবো যে আনন্দকাকু তোমার ছেলেদের গরু বলেছে। আর দিদার কাছে ৪টে করে রাজভোগ খাওয়া তোমার বের করবো। বল্লাম-দিদাকে বলবি, মানে গোমাতাকে। চেঁচিয়ে উঠলো কন্যে-আনন্দকাকু তুমি এবার যাচ্ছেতাই বলছো, দিদাকে আজই আমি গিয়ে সব বলবো, বলবো তোমাকেও গোমাতা বলেছে, বল্লাম-আমি নই, আমি নই। ইনিই হচ্ছেন রাজশেখর দাদু, যাঁর চলন্তিকা তুই কিনতে এসেছিস্। ইনিই চলন্তিকায় লিখেছেন গোমাতা মানে গরুদের মা। প্রণাম কর এঁকে, আর দিদার কাছে এই রাজশেখর দাদুর নামেই কমপ্লেন করিস। সবাই হেসে উঠলেন। কেদারদা বল্লেন-ওয়েল সেড আনন্দ।
কলেজষ্ট্রীটের আর একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছো সেই বছর যে বছর আশাপূর্ণাদি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন। গজেনদা, গজেন্দ্রকুমার মিত্র কয়েকজনের নাম দিয়ে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন, মহাবোধি সোসাইটি হলে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল আনন্দসন্ধ্যা। পরিপূর্ণ সভাগৃহ। আমরা কয়েকজন বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মিত্র ঘোষের ভানুবাবু, এখন কথা সাহিত্যের সম্পাদক, আমাকে দেখতে পেয়ে বল্লেন-আনন্দদা বিশীদা আপনাকে খুঁজছেন। বিশীদা মানে প্রমথনাথ বিশী, তিনিই ছিলেন সেদিনের সভাপতি। মহাবোধি সোসাইটির করিডোর পেরিয়ে, ডায়াসের পিছনে গিয়ে মাথাটা বাড়াতেই, মাথার চুলটা টেনে, চাপা স্বরে বললেন-উঠে এসো। আর পারছি না। বেশ কয়েকজন বক্তার বলা হয়েছে। তখনও একজন বলছেন। বিশীদা চাপা স্বরে বলে যাচ্ছেন-সবারই বক্তৃতা যেন, মেডিক্যাল কলেজের টেবিলে শবদেহ পড়ে আছে। প্রফেসর ডিসেকসন্ করছেন, আর ছাত্রদের বোঝাচ্ছেন। আশাপূর্ণা, তাঁর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতিতে’ এই চরিত্র এইরকম করেছেন। বকুল কথায়, ওইরকম করেছেন, ঘ্যানর ঘ্যানর শব ব্যবচ্ছেদ সমালোচনা। বিশীদা খুবই ছটফটে লোক ছিলেন। নিজে গবেষক, প্রবন্ধকার। কাজেই আর স্থির থাকতে পারছিলেন না। বল্লেন- গজেনবাবু, এরপরে ‘আনন্দ’র নামটা এ্যানাউন্স করে দিন। যাঃ বাবা এই বিদগ্ধদের সমাবেশে আমি কী বলবো? –না, বিশীদা, না আপনার পায়ে পড়ি, বলতে না বলতেই গজেনদা ততক্ষণে মাইক-এ বলছেন-সমকালীন সম্পাদক কবি আনন্দগোপাল এবার কিছু বলবেন। থতমত খেয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ালাম। পা দুটো থর থর করে কাঁপছে। নমস্কার করে শুরু করলাম। আপনারা ভাবছেন বক্তাদের লিষ্টিতে আমারও বুঝি নাম ছিল। মোটেই তা নয়। এতজন বক্তার মধ্যে একজনও বদ্যির নাম পেলেন? অথচ আজকে যাকে নিয়ে আনন্দসন্ধ্যা সেই শ্রদ্ধেয়া আশাপূর্ণাদি একজন কুলীন বদ্যি। তাই বিশীদার হাতে পায়ে ধরে আমি বলতে উঠেছি। আমার ঠাকুরদা কেন, তারও আগে থেকে বাংলা সাহিত্যের জমিদারীর সব পত্তনিগুলিই, বামুনরা কব্জা করে রেখেছিলেন। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তিন বাঁড়ুয্যে বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক, সতীনাথ ভাদুড়ী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবত্তী এমন কী ইদানীং কালে শঙ্কর, সুনীল, শীর্ষেন্দু কত নাম আর করবো? কায়েতরা সুবিধা করতে পারছে না। তাঁরা কিন্তু ভীষণ চালাক। সোজা পথে কিছু হচ্ছে না দেখে একটু ঘুর পথে কব্জা করলেন সাহিত্য প্রকাশের মিডিয়াগুলি। অর্থাৎ খবরের কাগজ, মাসিকপত্র, সাপ্তাহিক এবং প্রকাশন সংস্থাগুলি। এই দেখুন সামনেই বসে আছেন, দেশ ও আনন্দবাজার পত্রিকার কর্ণধার অশোককুমার সরকার। অমৃতবাজার ও যুগান্তরের কর্ণধার তুষারকান্তি ঘোষ। তাছাড়া পাবলিশার্স কোম্পানী-আনন্দ পাবলিশার্স, মিত্র ঘোষ, এম সি সরকার, দেজ, বেঙ্গল পাবলিশার্স নামী দামী প্রায় সব প্রকাশক কোম্পানী কায়েতদের। বেকায়দা বুঝে বামুনরা কিছু কিছু পত্তনি কায়েতদের ছাড়লেন। প্রাইজ পেলেন-প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল মিত্র, সন্তোষ ঘোষ প্রভৃতি। কিন্তু বদ্যিদের বেলায় বামুনকায়েত একজোট কিছুতেই কিছু ছাড়তে চায়না। তাই আজ আমি নিখিল বিশ্ব বৈদ্য সমাজের তরফ থেকে, বলতে না বলতেই যষ্টীমধু সম্পাদক কুমারেশ ঘোষ চেঁচিয়ে বলে উঠেছেন-হ্যাঁ বাবা আনন্দগোপাল তোমরা নিখিল বিশ্ব হয়ে গেলে। বল্লাম-ওই দেখুন ঠাট্টা হাসি আরম্ভ হয়েছে। কিন্তু বলতে পারেন, চীনের বিপ্লব কে করেছে? ডাঃ সান ইয়াত সেন, গিনেস বুক অব্ ওয়ার্ল্ডে এখন পযর্ন্ত বেষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে, কার নাম আছে ইংল্যান্ডের সোরেন সেন, কঙ্গো, কাতাঙ্গা এইসব আফ্রিকার দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন অমুক সেন, তমুক সেন সেখানে বিপ্লব করছে। আমাদের সংগঠন নিখিল বিশ্ব নয়তো কী। তাই আমি আশাপূর্ণাদিকে নিখিল বিশ্ব বৈদ্য সমাজের তরফ থেকে বলতে চাই, তিনি যে বাংলা সাহিত্যের জমিদারী থেকে একটি পত্তনি বদ্যিদের-কে উপহার দিলেন, তারজন্য সমাজের প্রত্যেকেই খুশী। হলসুদ্ধ সবাই হাসছে। তারপর সোনায় সোহাগার মত হলো কী, আশাপূর্ণাদির সামনের মাইকের মুখটা খোলা ছিল। আশাপূর্ণাদি স্বগতোক্তি করেছেন-আনন্দ বেশ বলেছে। হল ফেটে পড়লো হাসির উল্লাসে। বিশীদা বোধহয় আমার আগের প্রায় সব বক্তাদের ওই ডিসেকসন্ করার ঢঙে বলাতে তিতিবিরক্ত হয়েছিলেন, তাই ডাক পড়েছিল আমার। বিশীদা, উঠে বল্লেন-কয়েকশ সভায় আমি সভাপতিত্ব করেছি কিন্তু কোনো জায়গাতেই ঝোপ বুঝে কোপ মারার মত জাত প্রতিষ্ঠার কথা শুনিনি। যাইহোক আনন্দভাষণের পর আজ আনন্দ সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি। (চলবে)