বহু পুরস্কার প্রাপ্ত খ্যাতনামা সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের সঙ্গে পরিচয় রেডিও ষ্টেশনে গার্ষ্টিন প্লেসে। তখন নূতন আকাশবাণী ভবন হয়নি। আমার কবিতা পড়ার কথা, গিয়ে শুনলাম, গজেনদা গল্প পড়বেন। দেখা হতেই প্রণাম করে নাম বল্লাম। শুনেই বল্লেন-বাঃ বাঃ নামটা তো তোমার ফেমাস হয়ে গেছে ঘোড়া কর ভগবান-এর জন্য। শোনো কলেজষ্ট্রীটে মিত্র ঘোষ-এ এসো মাঝে মধ্যে। বল্লাম-গজেনদা, খুবই মুস্কিলে পড়েছি। গোটা পাঁচেক কবিতা এনেছি, পড়তে তো লাগবে ৭/৮ মিনিট কিন্তু আমার সময় যে ১৫ মিনিট। বল্লেন- কিছু ভেবো না, আমার তো গল্প, টেনে টেনে পড়ে, তোমার সময়টা কভার করে দেবো। সেই থেকে প্রয়াত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে যে স্নেহ, যে অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়েছি তার তুলনা নেই। তাঁর ‘কলিকাতার কাছে’ ট্রিলজি বাংলা সাহিত্যে অবিম্মরণীয় রচনা।
প্রমথনাথ বিশী ছিলেন, প্রবন্ধকার, গবেষক, কবি, ঔপন্যাসিক এবং রবীন্দ্র স্নেহধন্য। উনি আমাদের রবীন্দ্রচর্চা ভবনের সভাপতি ছিলেন। একদিন বল্লাম-বিশীদা আপনি যে সভাপতির চেয়ারটা আগলে বরাবর সভাপতি হয়ে রয়েছেন এটা কী ঠিক হচ্ছে? উত্তরে বলেছিলেন-পাছে আমার চেয়েও কোনো অযোগ্য লোক, সভাপতি হয়ে যায়, সেইজন্য সেঁটে বসে আছি, ছাড়তে পারছি না। খুবই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁর সঙ্গে মিশেছি। উনি এমপি হয়েছিলেন। মিত্র ঘোষের আড্ডায় উনিই ছিলেন, সেলফমেড সভাপতি। তাঁর মত সুপণ্ডিত অথচ সুরসিক, খুব কমই দেখা যায়। আমি মিত্র ঘোষ এ না গেলে উনি ফোন করতেন। কাব্যবিতান নামে ১টি কবিতা সংকলন, ডাঃ তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পাদনা করেছিলেন। তার ২য় সংস্করণে আমার ১টি কবিতা আছে নাম ‘ফ্রেমে আঁটা’ ছবি।
চিত্রের প্রদশনীতে গিয়ে
দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে একটি শিল্পকাজ।
হঠাৎ মনে তো হলো
নড়ছে যে ছবিটা,
কি যেন সে বলতে চায় ঠোঁটে।
খুলে নিয়ে চশমাটা
কাপড়ের খুঁট দিয়ে মুছি বারবার
আবার তাকাই।
না
স্থিরচিত্র ফ্রেমেতেই আঁটা
মনে হয় এ যুগের এ জীবনও তাই
কখনো নডে চড়ে, কখনো বা কথা কয়
অর্ধস্ফুট যন্ত্রণার কথা।
কিন্তু থাকে বেশির ভাগ অনেক সময়
বিবর্ণ চোখটি মেলে, গরুর মতন।
যেন ধ্যানী শিল্পীর কাছ থেকে নিয়ে
কোনো এক রসিক বুঝি বা
বাঁধিয়ে রেখেছে ফ্রেমে।
তলাতেই লেখা নেই শুধু-
জীবন যন্ত্রণা।
বৃথাই বড়াই করি বিংশ শতাব্দীর।।
একই সময়ে, রসরচনা ও ভিন্নধর্মী গল্প উপন্যাসের জনপ্রিয় লেখক, যাঁর স্বর্গাদপি গরীয়সী, বাংলা সাহিত্যে একটি অমর সৃষ্টি, সেই বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের আমি খুব স্নেহভাজন ছিলাম। কিন্তু একবার ভীষণ চটেছিলেন আমার ওপর। নীলাঙ্গুরীয়কে উনি ওঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা বলে মনে করতেন। গজেনদার সংগে মিত্র ঘোষ-এ একদিন বৈঠকে আলোচনার সময় আমি বলেছিলাম- এখন প্রেম সম্বন্ধে ধারণা পাল্টে গেছে। ওটা বিভূতিদার প্রথম যৌবনের ফিক্সেসন। নীলাঙ্গুরীয় টিকবে না। কিন্তু ওর স্বর্গাদপি গরীয়সী যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন টিকে থাকবে। গোর্কি বা পার্লবাকের মাদারের চেয়ে অনেক উঁচু স্তরের বই। কথায় কথায় গজেনদা একদিন ওঁকে বলেছেন-সমকালীন সম্পাদক আনন্দগোপালের এই মতামত। নীলাঙ্গুরীয় সম্বন্ধে ওইভাবে বলায়-ওঁর দুর্বল জায়গায় লেগেছে। চটে গেছেন আমার ওপর। তারপর একবার ১লা বৈশাখে মিত্র-ঘোষ-এ এসেছেন। দুপুরবেলায় আমি ঢুকতেই গজেনদা বল্লেন-এই যে আপনার ‘আসামী’ হাজির। চশমার ভেতর দিয়ে রাগত চোখে বল্লেন-তুমি এইসব বলেছা, অম্লানবদনে বল্লাম-হ্যাঁ। আপনি স্বর্গাদপি গরিয়সী পড়েছেন? গজেনদাকে উদ্দেশ করে বল্লেন-শুনুন গজেনবাবু, আমি লিখেছি আর আমাকেই বলছে কী না পড়েছেন? বল্লাম-আপনি লিখেছেন সে তো সবাই জানে। কিন্তু লেখকসত্তা ভুলে পাঠক হিসেবে কখনো পড়েছেন কী না, তাই জিজ্ঞেস করছি। ওইভাবে পডুন, তারপর আপনার নিজেরই মনে হবে স্বর্গাদপি গরীয়সীর কাছে নীলাঙ্গুরীয় কত জোলো। একবছর পরে আবার দেখা। পিঠে হাত দিয়ে বল্লেন-আনন্দগোপাল, দুইখণ্ড পড়েছি। আর একখণ্ড পড়া হয়নি, চোখে বড্ড অসুবিধা হচ্ছে। তবে তোমার সঙ্গে, এই ২ খণ্ড পড়েই ৬০% পারসেন্ট একমত। বল্লাম-আপনার তো বিদুষী নাতনিরা আছে, তাদের কাউকে দিয়ে পড়িয়ে শুনুন। বল্লেন-ঠিক আছে। মাথায় হাত ঠেকিয়ে বল্লেন ভালো থেকো। প্রণাম করলাম। আর দেখা হয় নি। চলে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই।
নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় আর রাধারানীদির সংগে ভাব ছিল। ওঁরা থাকতেন সেবক বৈদ্য ষ্ট্রীটে। পাশের বাড়ীতে ছিলেন, আমার পিসতুতো দাদা ননীগোপাল সরকার, সেজন্যই ঘনিষ্ঠতা বেশী হয়েছিল। সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শ্রীমতী ঠাকুর প্রবর্তিত বৈতানিক-এর অন্যতমা পরিচালিকা ছিলেন রাধারানীদি। তাঁর কাছে বসে কত গান শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। নৃপেনদা ছিলেন গল্পভারতীর সম্পাদক। নামী চিত্রনাট্যকার, দিলদরিয়া মেজাজের লোক। কমলা ঝরিয়া, কাছে বসিয়ে কত গান শুনিয়েছেন। উনি আমাকে ছেলে বলে ডাকতেন, আমি বোলতাম মাসী। রাসবিহারী এ্যাভিনু-য়ে আমার বৌদির বাপের বাড়ীর পাশেই ছিল ওঁর বাড়ী। বলতেন, তোর বিয়ে হলে, তোর বউকে আমার ‘এই বিছে হারটা দেবো’। হারটা ছিল বেশ মোটা। এটা ৪৫/৪৬ সালের কথা। তার কয়েকবছর পর আমার বিয়ে হয়। বল্লাম-মাসী এবার হারটা দাও। সখেদে কপাল চাপড়ে বলেছিলেন-তোর মাসী কী আর সেই মাসী আছেরে। কমলা ঝরিয়ার সবই ঝরিয়া গিয়েছে, আমার গুষ্টির গর্ভে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার আমি ভক্ত ছিলাম। প্রেমেনদা ছিলেন আপাদমস্তক রোমান্টিক। বয়সের ফারাককে পাত্তা দিতেন না। স্বনামধন্যা লীলা রায়, লীলাদি আর প্রেমেনদা, যখন রেডিওর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন আমি মাসে দুটো করে প্রোগ্রাম পেয়েছি।
আর অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে দেখলে ভয়ে সাঁটিয়ে যেতাম। এম সি সরকারের আড্ডায় প্রায় অধিকাংশ জনই বাবার বয়সী। অচিন্ত্যদা ঢুকেই বলতেন, বুঝলেন কেদারদা, আনন্দকে দেখলেই আমার ঘোড়ার কথা মনে পড়ে, আর ঘোড়া মনে এলেই হোয়াইটওয়ে ল্যাডলোর এক অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান সেলস গার্লের কথা মনে পড়ে। বলে গল্পটা বলতেন। যার শেষ কথাটা হচ্ছে-উই আর নট ডিলিং উইথ হরসেস। আমি লজ্জায় লাল হয়ে যেতাম। রঙটা তখন খুব ফর্সা ছিল তো।
পুলিনবিহারী সেন ছিলেন কোলকাতায় বিশ্বভারতীর অধ্যক্ষ। বিশ্বভারতীর অফিস তখন জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ীতে। সপ্তাহে তিনদিন যেতাম, বেলা ১টার সময়ে। তার প্রধান কারণ যত না পুলিনদা, তার চেয়ে বেশি আকষর্ণ ছিল ‘নেপাল’ এর কচুরীতে। ওই কচুরী খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো। পুলিনদা বিশ্বভারতী পত্রিকার সম্পাদক আর আমি সমকালীন-এর। রবীন্দ্রনাথ সংক্রান্ত লেখাজোখায় ভীষণ কম্পিটিশন চলতো পুলিনদার সঙ্গে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় পুত্রবধূ হেমলতা ঠাকুর শেষ বয়সে থাকতেন পুরীতে। সবাই ওঁকে বড়মা বলতো। আমার স্ত্রী মঞ্জু পুরী গিয়ে ওঁর খুব স্নেহভাজনীয়া হয়ে পড়েন। ওঁকে বলে- বড়মা, আপনি অতীতের কথা বলুন, আমি টুকে যাই, তারপর আপনাকে শুনিয়ে কারেকসন করে, আমাদের সমকালীন-এ ছাপাবো। এমনি করে মঞ্জু কয়েকটাই লেখা এনেছিলো। সমকালীন-এ বেরিয়ে গেল-’রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসর’। এই বিবাহবাসরে বালিকা হেমলতা স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্র অনুরাগী বিদগ্ধমহলে হৈ হৈ পড়ে গেল, এই এক লেখাতেই। পুলিনদার এক লাইনের পোষ্টকার্ড। ‘মেরে দিলে বাবা, এমন লেখা’। পুলিনদা বিশ্বভারতী পত্রিকায় এই লেখা রি-প্রিন্ট করিয়েছিলেন। হেমলতা ঠাকুরের গোটা তিনেক লেখা বেরোতেই, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র, যাঁরা পুলিনদার বন্ধু, তারা চেপে ধরেন পুলিনদাকে-আনন্দ এইসব লেখা জোগাড় করে ছাপছে, আর তুমি কিছুই পারছো না। পুলিনদা জ্বলে জ্বলে ওঠেন। আমাকে বলতেন-মঞ্জু কতো লেখা এনেছে তা আমাকে ঠিক করে বলবে? আমি হাসতাম। (চলবে)