শাক্ত ভবানীশঙ্করের ষষ্ঠপুরুষ নিত্যানন্দ বিষ্ণুপুরে সোনামুখী আচার্য প্রভুর কাছে, বিখ্যাত পণ্ডিত তিনি, পরমবৈষ্ণব, তাঁর কাছে বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ফিরে আসেন নিজ গৃহে। জ্ঞাতি গোষ্ঠীর মধ্যে নিত্যানন্দ সর্বজনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ছিলেন। একদিন গোষ্ঠীর সবাইকে জড়ো করে বলেন—‘ভ’ অর্থে পুরুষ আর বাণী অর্থে প্রকৃতি। রাধাকৃষ্ণ, শিবদুর্গার অর্থই হলো ভবানী।
শোন শোন বৎস সব সাবধান হইয়া
অপূর্ব বৈষ্ণব তত্ত্ব কহি বিবরিয়া,
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্
কলৌ নাস্তেব নাস্তেব গতিরন্যথা
* * * * * * * * * * * * * *
হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
এই শ্লোক নামাবলী হয় মহামন্ত্র
ষোল নাম বত্রিশ অক্ষর এই তন্ত্র।
দিবারাত্র লবে নাম খাইতে শুইতে
ইহার মহিমা বেদে নাহি পারে দিতে।
শাক্তমতাবলম্বী পরিবারের রূপান্তরণ ঘটে গেল। পড়লো গিয়ে বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের অগাধ অনন্ত বারিতে যেখানে থেকে আর উত্তরণ নেই। পাঁঠার পরিবর্তে এলো পরমান্ন, মৎস্যের বদলে মালপো। নামে রুচি, জীবে দয়া বৈষ্ণব সেবন। মটো হয়ে গেল গোটা পরিবারের। কীর্তন, নামসংকীর্তন, হরিনাম আর হরিবোলের লহর এসে পূর্ণতা পেল বংশানুক্রমে একাদশ পুরুষ বৈষ্ণবাচার্য কবি কীর্তিচন্দ্র—এ। দাদামণি সব ধর্মশাস্ত্র আমাদের ব্যাখ্যা করে বোঝাতেন। নাতিনাতনিদের শেখালেন খোল বাজনা আর কীর্তন। কাকারা, পিসিরা, আমরা নাতি নাতনি এবং গ্রামের আত্মীয়—স্বজনরা ভবানী মন্দিরে, দাদামণির সংগে আবৃত্তি—কীর্তনে মাতোয়ারা হয়ে যেতাম। বৈষ্ণব চূড়ামণি কীর্তিচন্দ্রের ভাবাবেগে প্রেমোন্মাদ নৃত্য এখনো চোখের সামনে ভাসে।
ভবানীপুরের কাছেই তাঁতিপাড়া গ্রাম। তসরের জন্য বিখ্যাত। এইখানে মধ্য—যৌবনের প্রথমেই কবি বিজয়লাল চট্রাপাধ্যায়ের ভাই মিহিরলাল চট্রাপাধায় সংগঠন মূলক কাজের একটি সেন্টার করেন। পরে তিনি জেলার অন্যতম কংগ্রেস নেতা এবং গণপরিষদের নির্বাচিত সদস্য হন। এই সেন্টারেই বার দুয়েক এসেছিলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ। একবার বেশ কিছুদিন ছিলেন। হয়তো সেইসময় তাঁর অন্তরালে থাকার প্রয়োজন ছিল। রাজেন্দ্রপ্রসাদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই পাটনা থেকে,আমাদের ‘ভাবী’ প্রভাবতী দেবী, জয়প্রকাশ নারায়ণের পত্নী আমাকে পাটনা যাবার জন্য লিখলেন। উপলক্ষ মহিলা চরকা সমিতির উদ্বোধন। উদ্বোধন করবেন বাবুজী, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ। রাজেন্দ্রপ্রসাদকে সবাই বাবুজী বলতেন। ছাপরার (বিহার) নামজাদা উকিল ছিলেন মহেশপ্রসাদ, প্রভাবতী দেবীর বাবা। বিহারে তিনিই প্রথম গান্ধীজির আহ্বানে আন্দোলনে যোগ দেন। রাজেন্দ্রপ্রসাদের ওকালতি জীবনের সহচর ছিলেন। এই মহেশপ্রসাদের বড় মেয়ের সংগে রাজেন্দ্রপ্রসাদের বড় ছেলে মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদের বিয়ে হয়। কিন্তু প্রভাবতীদেবীর দিদি বেশিদিন বাঁচেননি। প্রভাবতী দেবীকে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসতেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ। জেপি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যান এবং বেশ কয়েকবছর ওঁকে ওখানে থাকতে হয়। তখন রাজেন্দ্রপ্রসাদ ‘ভাবী’—কে সঙ্গে নিয়ে সবরমতী আশ্রমে গান্ধীজির কাছে রেখে আসেন। ছবিতে দেখেছেন, গান্ধীজি দুটি মেয়ের কাঁধে হাত রেখে চলেছেন। এই মধ্যে প্রায়ই ছবিতে রয়েছেন আমাদের ‘ভাবী’ প্রভাবতী দেবী।
একদিনের জন্য চলে গেলাম পাটনা। সকালে পোঁছেছি। রাজেন্দ্রপ্রসাদ আসবেন ১১টায়। ১২টায় উদ্বোধন। ১টায় লাঞ্চ। ৪টেতে ফিরে যাবেন রাষ্ট্রপতি। সবাই চলে গেছে। রইলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদের বাড়ীর লোকজন ও জেপি—র ঘনিষ্ঠ কয়েকজন। তার মধ্যে সোস্যালিষ্ট গঙ্গাশরণ সিং ও সর্বভারতীয় কৃষক নেতা রামনন্দন মিশ্র। যিনি কাশীর রাজার শ্যালক ছিলেন এবং যিনি সর্বপ্রথম ১৯৩৭ সালে সরকারকে তাঁর জমিদারী সমর্পণ করে ছিলেন। আর একটা ঘরে খাবেন রাষ্ট্রপতির সিকিউরিটির অফিসাররা।
ভাবী খাবার আয়োজনের তদারকি করছেন। পাশে আমি। একটা করে বড় পিঁড়ি বসবার জন্য, সামনে রাখা আরেকটি পিঁড়ি যাতে থালি রাখা হবে। ভাবীকে জিজ্ঞেস করলাম— ভাবী বাবুজীর দুইপাশে কে কে বসবেন—কিঁউ এক সাইড্ মে আপকা জেপি আউর দুসরা সাইডমে মেরা জিজাজী অর্থাৎ মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ। হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল—ওঃ আজ যদি রাষ্ট্রপতির পাশে বসে খেতাম, তাহলে ডায়রীতে লিখে রাখার মত হতো। জানিনা ভাবী কখন জেপি-র কানে আমার ওই হালকা করে বলা কথাটি তুলে দিয়েছেন। বাবুজী, জেপি, মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ, গঙ্গাশরণ সিং, রামনন্দন মিশ্র সব খাবার ঘরটায় এলেন। রাজেন্দ্রপ্রসাদ বসেছেন। জেপি হাত দেখিয়ে মৃত্যুঞ্জয়প্রসাদকে একটা আসন ছেড়ে বসতে বলে, আমাকে বল্লেন—ওটায় বসো অর্থাৎ রাজেন্দ্রপ্রসাদের ডান পাশে। খুশিতে ডগমগ হয় হৃদপিণ্ডের স্পন্দন একটু বেড়ে গেল। আমাকে দেখিয়ে জেপি বল্লেন—আনন্দ শুধু আমার পার্টি কমরেড্ নয়, আমার নিজের ভায়ের মত। ও কবি, শিল্পী, স্যাটায়ারিষ্ট এবং সাংবাদিকও। কোলকাতায় থাকে, প্রভাবতী আসতে বলেছে তাই একদিনের জন্য এসেছে। প্রভাবতী এবং প্রভাবতীর মা ওকে খুব ভালবাসে। উনি মৃদুমন্দ হাসছিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হিন্দিতে নয়, বাংলায়—বাবা কী করেন। বল্লাম—বাবা কবিরাজ ছিলেন। —তুমি কবিরাজ হলে না কেন? —আজ্ঞে, সংস্কৃতে খুবই কাঁচা ছিলাম, সেইজন্যে বাবা আমাকে কবিরাজী পড়ালেন না। — তুমি ওষুধ পত্তর কিছু জানো? —হ্যাঁ জানি, দ্রাক্ষারিষ্ট, চ্যবনপ্রাশ, এসব তৈরী করতে বাবাকে আমরাও সাহায্য করতাম। —তাই নাকি? দ্রাক্ষারিষ্টের প্রধান উপাদান কী? বল্লাম—মনাক্কা। —আর চ্যবনপ্রাশে? বল্লাম—আমলকী। শুনে খুশি হয়ে বল্লেন—জানো আয়ুর্বেদকে রিভাইভ করবার খুবই ইচ্ছে আমার, কিন্তু জওহরলাল ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়ার ভীষণ ভক্ত। ইতিমধ্যে ভাজি পড়ে গেছে, আসছে গরম গরম ঘি মাখানো রুটি। যাবার সময় প্রণাম করলাম। জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের বাড়ী কোথায়?—বীরভূমে। শুনে বল্লেন—সে কী, আমি তো তাঁতিপাড়ায় মিহিরবাবুর কাছে ছিলাম কিছুদিন। একটু হেসে বল্লাম সেটা আমরা সবাই জানি।
তাঁতি পাড়ায় যখন এসে গেছি, তখন সিউড়ির দুটি মজার ঘটনা বলে নিই। সিউড়িতে আমার এক পিতৃবন্ধু ছিলেন। ক্ষিতীশ কাকা। জমিদার মানুষ। খুব মোটাসোটা। গোলগাল, নাদুসনুদুস ফর্সা চেহারা। ১৯৫১/৫২ সাল হবে, সিউড়ি গেছি। বিকেলবেলায় ওঁর বাড়ীর সামনে দিয়ে যাচ্ছি। উনি কয়েকজনের সঙ্গে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলাম—কাকাবাবু ভালো আছেন? তার আগে দেখেছিলাম, বেশ হেসে হেসেই কথা বলছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করতেই খুবই গম্ভীর মুখে বল্লেন—আমি তো ভালো আছি বাবা কিন্তু আমার চিন্তা তোর জন্যে। —কেন কী হলো কাকাবাবু?— শুনলাম, তুই নাকি কোলকাতায় কবিতা করছিস। কবিতা লিখিছিস না বলে বল্লেন কবিতা করছিস। চুপ করে আছি। বল্লেন—করিস না, কবিতা করিস না। জানিস না, কাশিম বাজারে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর ওখানে কী হয়েছিল। মহারাজার পাঁচজন বড় অফিসার ছিল। ললিতবাবু, শ্যামাপদবাবু, নবীনবাবু, বামাপদবাবু আর মদনবাবু কেউ ছিলেন ল অফিসার কেউ শাসনবিভাগ এই সব আর কী। আর মদনবাবু ছিলেন ট্রেজারার। খুব চুরি—চাপাটি চলছে। মহারাজা ব্যাতিব্যস্ত। কিছুতেই চুরি বন্ধ করতে পারছেন না। মহারাজা এক কবিকে রেখেছিলেন। আউট হাউসে থাকে, খায়—দায়, আর মাঝে মধ্যে কবিতা লিখে মহারাজাকে শোনায়। একদিন বিকেলে মহারাজা বাগানে বসে আছেন, দেখলেন কবিকে কয়েকজন ধরে ধরে নিয়ে এলো। কপালে ফেটি বাঁধা, রক্তের ছোপ লেগে আছে জামাকাপড় ছিন্নভিন্ন। কবি কাঁদতে কাঁদতে একেবারে মহারাজের পায়ে উপুড় হয়ে পড়লো। কাঁদতে কাঁদতে বলছে—মহারাজ আমাকে বাঁচান। মহারাজ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—কী হয়েছে, কী হয়েছে, তোমার এই অবস্থা কে করলো? ক্রন্দনরত কবির উক্তি—মহারাজ, মদনবাবু আমাকে বাগে পেয়ে, আড়ংধোলাই দিয়ে সারপিঠে করে দিয়েছে। —কেন আড়ংধোলাই দিলো কেন, কী করেছিলে তুমি? —মহারাজ আমি কবিতা করেছিলাম। —কবিতা করেছিলে? কী এমন কবিতা, যাতে তোমার এই অবস্থা করে দিল। —মহারাজ, আমি কবিতা করেছিলাম—
মহারাজাকে ঘেরেছে পাঁচ বানরে,
ললতে, বামা, নবনে, শ্যামা, মদনা চোরা ভাণ্ডারে।
তাই মদনবাবু বাগে পেয়ে আমার এই হাল করে ছাড়লেন। এটা বলে ক্ষিতীশকাকা বল্লেন—তাই বলছি বাপ, বাইরে থাকিস, কবিতা করিস না। নয়তো শুনবো তোরও কোনদিন ওই অবস্থা হয়েছে। তাঁর গাম্ভীর্যের মুখোস খসে গিয়ে তখন হো হো হাসি। (চলবে)