দিন দশেক পরে, দুপর বেলায় ক্ল্যারিওনের পিয়ন একটা বড় খাম দিয়ে গেল। খুলে দেখি কভার সাইজের এক ঢাউস ‘স’। পেটের মাঝখানে একটা স্কোয়ারের মধ্যে লেখা সমকালীন। মনটা খুশীতে ঝলমল করে উঠলো। সঙ্গে সুভাষের চিরকুট-আনন্দ, মানিক চলে গেল, কান-উৎসবে। বলে গেছে, তোমার যতক্ষণ না কভার পছন্দ হয়, ও করে যাবে।
গেলাম সুভাষের কাছে। খামটা ফেললাম ওর টেবিলে। সুভাষ বল্লো-কী পছন্দ হয়নি? আমি বল্লাম-এর চেয়ে বিফিটিং কভার আর হয় না, ‘স’ ফর্ সমকালীন, তবে দুকালারের মত ব্লক করার পয়সা আমার নেই। সুভাষ বল্লো-তবে কী হবে? আমি বোল্লাম-কেন, মানিক ডিজাইন্ করে দিল, আর তার অন্তরঙ্গ বন্ধু সুভাষ সেন ক্ল্যারিয়নের প্রত্যেক দিন হাজার হাজার টাকার ব্লক হতে যাচ্ছে, সেই গাদায় এটা ঢুকিয়ে দিতে পারে না। সুভাষ হেসে বল্লো-আনন্দ, তুমিই রিয়েল বৈদ্য। সত্যজিৎ করলেন কভার আর ব্লক বেরিয়ে এল সুভাষ মারফত। একাদিক্রমে সেই কভার ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছাপা হয়েছে। মারা যাবার বছর দুই আগে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কারও বৌভাতে দেখা, প্যারিশ হলে। কিছু কথাবার্তা বলার পর, বলেছিলেন-অনেক কাগজের কভার করে দিয়েছি, কিন্তু সবাই একবছর পরেই চেঞ্জ করেছে, কিন্তু দেখলাম সমকালীন-ই একমাত্র পত্রিকা, বছরের পর বছর চালিয়ে গেছে, এটা আমার কাছে খুবই আনন্দের। তুমি একটা পোষ্টকার্ডে, কবে থেকে ছাপা হচ্ছে, তারিখটা জানিয়ে দিও, হয়তো কখনো কাজে লাগতে পারে, তারপর তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। এখন অবশ্য সত্যজিৎ-জায়া বিজয়া রায়, ছেলে বাবু ও পুত্রবধূ বুনির সঙ্গে দেখা হয়। বাবু অর্থাৎ সন্দীপ রায় পরিচালিত টার্গেট ছবিটি দেখে, আমার বাক্তিগত ধারণা সন্দীপ রায় ‘বাপকা বেটা’
আর এক শিল্পী-সাহিত্যিক অসাধারণ চরিত্রের লোক সুভো ঠাকুর। সুভোদার স্ত্রী আরতি বৌদি বেতার জগতে অসমীয়া সংস্করণে কাজ করতেন। তাঁর বাবা ৫৪নং গণেশ এ্যাভিনুয়ে একটি অসমীয়া পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন, বৌদি আমাদের বাড়ীতে আসতেন। মঞ্জুর সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গতা, আর ফুটফুটে সুন্দরী বাচ্চা মেয়ে ফুপুরানীকে খুবই ভালবাসতাম। যখনকার কথা বলছি, তখন সুভোদা, ডেরা গেড়েছেন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পূবদিকে রাজা সুবোধ মল্লিকের বিরাট বাড়ীটার তিন তলায়। তখন সমকালীন ছাপা হতো, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের উত্তর দিকের কোণায় মডার্ন ইণ্ডিয়া প্রেসে। বেলা দুটোয় আমিও বেরুচ্ছি প্রেস থেকে সেই সময় সুভোদাও বাড়ী ফিরছেন। আমাকে দেখে পাকড়াও করে বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। আরতিবৌদি খেতে বলায়, আমি বল্লুম আমি খেয়েই বেরিয়েছিলাম। বল্লেন-তাহলে সরবত করে দিই। দুটো আসন পাতলেন, একটায় সুভোদা বসলেন, একটায় আমি। আমাকে সরবত দিয়ে, বৌদি ভাতের থালা সাজিয়ে সুভোদার সামনে রাখলেন। আমার তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু সুভোদা শুরু না করলে, সরবতে মুখ দিতে পারছি না। বল্লাম-সুভোদা শুরু করুন। উনি আরতি বৌদিকে আর্তি বলে ডাকতেন। বল্লেন-আর্তি এসে খাইয়ে দেবে, তবে তো। আমি হতভম্ব। রুগ্ণ নয়, অসুস্থ নয়, একটা জলজ্যান্ত ধুমসো লোক, তাকে খাইয়ে দিতে হবে? সত্যিই তাই। আরতিবৌদি একটা টেবিল-স্পুন এনে, প্রত্যেকটি আইটেম আলাদা আলাদা করে খাওয়াতে লাগলেন। কোলে দুহাত রেখে, অর্ধ-নিমীলিত ভঙ্গিতে সুভোদা খেতে লাগলেন। বিস্ময়-চকিত চোখে চেয়ে চেয়ে আমি দেখেছিলাম সেই অভিনব মনোহর দৃশ্য। তেষ্টা তখন আমার উবে গেছে। আরতি বৌদির মন রাখার জন্যই সরবতটা খেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো স্বাদ পাইনি।
একদিন বিকেল তিনটের সময়ে আলখাল্লার মত পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটি সিকি ও দুয়ানী বের করে, সুভোদা আরতি বৌদিকে বলেন— আর্তি এটা ধর্, আমি ইটিলি থেকে ঘুরে আসছি। সাধারণত কোলকাতার লোকেরা, এন্টালীকে ইটিলি বলতো। আরতি বৌদিও তাই বুঝলেন। সুভোদা বৌদিকে তুই বলে সম্বোধন করতেন। রাত্রি গেল, সকাল গেল, দুপুর গেল। আরতি বৌদির দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বিকেলে ৫৪নং গনেশ এ্যআভিনুয়ে, যেখানে সুভোদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আতাউর রহমান থাকতেন, সেখানে ছুটে গেলেন। যে আতাউর রহমানের রান্নাবান্না করতো, তাকে জিজ্ঞেস করলেন-রহমান সাহেব কোথায়? ঠাকুর সাহেব, কাল থেকে বাড়ী ফেরেনি। লোকটি বলে-সে কী রহমান সাহেব আর ঠাকুর সাহেব তো কাল সন্ধের প্লেনে ইতালী চলে গেছেন। আরতি বৌদির মুখে শুনেছিলাম তিনি নাকি নিস্পন্দ হয়ে গালে হাত দিয়ে প্রায় দুঘন্টা ওখানে বসেছিলেন।
আর একবার। ময়দানের মত চওড়া পাঞ্জাবীর দুটি কোণাকে মুঠোতে নিয়ে, বুকের কাছে হাত দুটিকে তুলে এনেছেন। মধ্যে গয়নার স্তুপ। ট্যাক্সিতে উঠে, কলেজষ্ট্রীটে ভারত ফটো টাইপের মালিক অজিত গুপ্তর কাছে। তাঁর টেবিলে ঢেলে দিলেন গয়নাগুলো। ততক্ষণে অজিত গুপ্তর চক্ষু চড়কগাছ। সুভোদা বল্লেন— এগুলো নিয়ে আমাকে টাকা দিন। আঁতকে উঠে অজিত গুপ্ত বলেন-প্রথমত আমার অত টাকা নেই, আর তাছাড়া আমি গয়নাগাঁটির মধ্যে নেই। নির্বিকার মুখে, সুভোদা আবার একই কায়দায় গয়নাগুলি নিয়ে, নীচে দণ্ডায়মান ট্যাক্সিতে চেপে বড়বাজার-এ এক মণিকারের দোকানে। তাদের শো-কেসের ওপরে ঢেলে দিলেন গয়নাগুলি। বল্লেন-ওজন করুন, দাম কষুন। মালিক সেলসম্যানকে বল্লেন একটা একটা করে ওজন কর। পিছনের ঘরে গিয়ে লালবাজারে ফোন। এর পরের দৃশ্য লালবাজার। এক পুলিশ অফিসারের টেবিলে গয়নার স্তুপ। সুভোদা একটা চেয়ারে বসে। তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় যাঁর বিখ্যাত বই পলাশীর যুদ্ধ। তিনি শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র, ব্যারিষ্টার। ঠাকুর বাড়ীর জামাই মোহিনীমোহন চট্রাপাধ্যায়ের ছেলে। রাত্রি আটটায় ফোন পেলেন, তাঁকে একবার লালবাজারে আসতে হবে সুভোঠাকুরের জন্যে। তপনদা গিয়ে বল্লেন এইসব গয়না সুভোর, আমি ওদের পারিবারিক ল-ইয়ার। আজই ১১/১২ টায় আমারই মধ্যস্থতায় ওদের ভাই-এ দের মধ্যে ভাগ হয়েছে। গয়নাসুদ্ধ সুভোদাকে লালবাজার থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন তপনদা। এই বোহেমিয়ান শিল্পীকে নিয়ে কত যে গল্প লেখা যায় তার ইয়ত্তা নেই। অভিনব নয়নমনোহর এক পত্রিকা বের করেছিলেন ‘সুন্দরম্’। ওইরকম পত্রিকা এ পর্যন্ত আর বের হয়নি। অন্নদা মুন্সী ও সুভো ঠাকুরের মত এরকম আত্মভোলা শিল্পী আর কাউকে দেখিনি। আমাদের দৈনন্দিন আচার-ব্যবহারের সঙ্গে তাদের আচরণের হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই মিল ছিলো না, কিন্তু তাঁরা ছিলেন জাত শিল্পী আর দুজনেই ছিলেন অতুলনীয় অমায়িক।
আর এক বিখ্যাত কলা সমালোচক ও.সি. গাঙ্গুলী। সমকালীন বের করেছি, সৌম্যদা (সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর) বল্লেন-ওঁকে একখানা করে পাঠিও। আমি বলেছিলাম-বার্ষিক ছ- টাকা চাঁদা উনি কিছুতেই দেবেন না। সৌম্যদা বলেছিলেন-না, না পাঠিও আমি বলে দেব, উনি নিশ্চয়ই চাঁদা পাঠিয়ে দেবেন। উনি কিন্তু পাঠাননি। ১ বছর গেল, ২ বছর গেল, ৩ বছর ধরে পত্রিকা পাঠালাম। ৪র্থ বছরে বন্ধ। একদিন বিকেল ৪ টের সময়ে উনি ওয়াই.এম.সি.এ.-এর থেকে বেরুচ্ছেন। আমার বাড়ী ২৪ চৌরঙ্গী, ওয়াই.এম.সি.এ.-র নং ২৫। আমি বাড়ীর সামনে গলিটার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। উনি আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। বল্লেন- কই কাগজটা আর দেখিনাতো। বন্ধ হয়ে গেছে তো? আমি সৌম্যকে আগেই বলেছিলাম, তোমাদের এই সাহিত্য-ফাহিত্য পত্রিকা চলবে না। বন্ধ হলো তো। আমার কথাটাই মিললো। আমি নির্বাক। আমি ওঁর পাশে পাশে হাঁটছি, মুখটা বিষণ্ণ করে বল্লাম-আপনার এই প্রবীণ বয়সে, এত বড় শোকে, কী আর সান্ত্বনার কথা বলবো। উনি বল্লেন-শোক? তুমি আমার কী শোক দেখলে? আমি বল্লাম কেন, আপনার বড় ছেলেটি মারা যায়নি? উনি চেঁচিয়ে বল্লেন-কে বল্লো তোমাকে যে আমার বড় ছেলেটি মারা গেছে। আমি বল্লাম-কই আর দেখিনাতো। -দেখনি, বলে মারা গেছে। ট্যাক্সি, ট্যাক্সি, বলে চিৎকার করে একটি ধাবমান ট্যাক্সিতে উঠলেন। পরেরটা সৌম্যদার কাছে শোনা। (চলবে)