শ্রীমতিদি ও সৌম্যদা বারান্দায় চা খাচ্ছেন। গেট থেকেই ও.সি. গাঙ্গুলির হুঙ্কার— সৌম্য, সৌম্য, তোমার আহ্লাদেগোপাল আমাকে অপমান করেছে। সৌম্যদা অবাক হয়ে বলেন-, না, না আনন্দ ওরকম ছেলেই নয় যে আপনার মত লোককে ইনস্যল্ট করবে। ওকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন কী ব্যপারটা, কী হয়েছে। আনুপূর্বিক সব শুনে, ওঁরা হো হো করে হেসে ওঠেন। এবং বলেন-আনন্দ আমাকে জানিয়েই আপনাকে কাগজ পাঠানো বন্ধ করেছে। আমি বারংবার বলা সত্ত্বেও আপনি বার্ষিক চাঁদা পাঠাননি। ওর সঙ্গে দেখা হওয়ায় জিজ্ঞেস করেননি যে কেন কাগজটা পাঠাচ্ছে না। একবারেই বলে বসলেন-কাগজটা দেখিনা, বন্ধ হয়ে গেছে তো? সমকালীন কত কষ্ট করে চালাচ্ছে। সমকালীন ওর কাছে ছেলের মতন, কাজেই আনন্দ তার নিজস্ব স্টাইলেই উত্তর দিয়েছে। এইসব নানান ভাবে বলে ওঁকে শান্ত করেন। এক হিন্দি লেখক ‘নবনীত’ বলে একটা হিন্দি কাগজে গল্পাকারে ছেপে দিয়েছিল, লজ্জার এক শেষ। পরে অবশ্য আমি ওনার খুবই স্নেহভাজন হয়েছিলাম। বাড়িতে গেলেই রসগোল্লা খাওয়াতেন। সমকালীন-এ কয়েকটা ভালো প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ভারতবর্ষের অন্যতম প্রধান কলা সমালোচক ছিলেন ও.সি. গাঙ্গুলি।
আর একজন খ্যাতনামা ভাস্কর চিন্তামণি কর। উনি আমাদের মাষ্টারমশায় ছিলেন। ১৯৩৭ সালে যখন বীরভূম স্কুলে ফার্স্টক্লাসে উঠেছি, উনি তখন আর্ট টিচার হিসেবে যান। আমাদের কয়েকজনকে খুবই ভালোবাসতেন। উনি এখান থেকেই ফ্রান্সে যান। এবং বহুবছর পরে ফিরে প্রথমে দিল্লীতে আসেন। আমার এক বন্ধু শিশির ঘোষের সঙ্গে দিল্লীতে ওঁর দেখা হয়। ফিরে এসে বলে যে স্যার তোমার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন এবং সমকালীন চালাচ্ছো জেনে খুব খুশি হলেন। মনটা আনন্দে ভরে গিয়েছিলো- যে স্যার এতবছরেও ভোলেন নি জেনে। তারপর উনি আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে এলেন। মানে একদম প্রতিবেশী। স্যারের সংগে আবার যোগাযোগ। স্যার ফ্রান্সের তাঁর শিক্ষাকালীন নানান গল্প বলতেন। একদিন বল্লাম — স্যর, এগুলো লিখুন। স্যার আঁতকে উঠলেন। বল্লেন-ভালো বাংলা লিখতেই ভুলে গেছি। লিখলে গুরুচণ্ডালীতে ভরে যাবে। বল্লাম-স্যার আপনি লিখুন, বাংলাটা ঠিক করে নেওয়ার দায়িত্ব আমার। দেখবেন ২/১ বার লেখার পর ঠিক হয়ে গেছে। স্যার সমকালীন-এ লিখতে শুরু করলেন- ‘সান্নিধ্য’। বই বের হলো। পত্রপত্রিকায় প্রশংসিত হয়েছিল। আজ দু-বছর হলো, স্যার তাঁর ষ্টুডিয়ো এবং জীবনের যত শিল্পকর্ম, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দান করে দিয়েছেন। এখনো দেখা হলে, সেই আগেকার ছাত্রজীবনের মতই স্যার-কে প্রণাম করি। উনিও হাতটা মাথায় ঠেকান। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক আজও অমলিন।
অসিতকুমার হালদার। নন্দলাল পরিমণ্ডলের একজন বিখ্যাত শিল্পী। খুবই স্নেহ করতেন আমাকে। বছর দশেক আগে, সমকালীন-এর একটি আলমারীতে আমার অজান্তে উই লেগে যায়। বহু মূল্যবান চিঠিপত্র-জয়প্রকাশের, অচ্যুত পটবর্ধনের, রাম মনোহর লোহিয়ার, অরুণা আসফ আলীর, হেমলতা ঠাকুরের, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর, সোস্যালিষ্ট পার্টির নানান ডকুমেন্ট এবং আরও কিছুর সঙ্গে অসিতদার চিঠিগুলি।
অসিতদার সব চিঠিতেই শিল্প সম্বন্ধে অনেক কিছু জ্ঞাতব্য ছিল। হয়তো শিল্প-জিজ্ঞাসুদের কাজে লাগতে পারতো। অসিতদা, সমকালীন-এ লিখেছেন-শিল্পের মূল্য ‘৭৫ বৈশাখ’, শিল্পীর কাজ ‘৭৫ আষাঢ়’, বাংলার শিল্প-‘৭৫ ভাদ্র’, শিল্প ও শিল্পীর জাতিবিচার ‘৭৬ বৈশাখ’। তাঁর এই শিল্প সম্বন্ধীয় রচনাগুলি শিল্প-জিজ্ঞাসুদের কাজে লাগতে পারে বলে উল্লেখ করলাম। এছাড়া অসিতদা-‘সাবেকী কথা’ নাম দিয়ে ৭টি সংখ্যায় লিখেছেন। আমি যে কী করে এসব বিশিষ্ট বাক্তিদের সান্নিধ্যে এলাম এবং তাঁদের স্নেহভাজন হয়েছিলাম। এটা ভাবতে এখানো আমার মনে বিস্ময় জাগে।
আর একজন শিল্পী নিখিল বিশ্বাস। যার ছবির চাহিদা দেশে ও বিদেশে ভালো ভাবেই আছে। নিখিল অকালেই প্রয়াত। এই নিখিলকে দিয়ে পঞ্চাশের দশকে সদর ষ্ট্রীটে মিউজিয়ামের রেলিং-এ ফুটপাতে প্রদর্শনী করিয়েছিলাম। পরের বছর আমার ঘনিষ্ঠ স্নেহভাজন খ্যাতনামা শিল্পী প্রকাশ কর্মকারকে দিয়ে প্রদর্শনী। তার পরের বছর আবার নিখিল বিশ্বাস। দুজনেরই ছবি আমার ঘরেই স্তুপীকৃত থাকতো। দুপরে নিয়ে গিয়ে টাঙানো আবার রাত্রিতে খুলে আনা। ওদের সব ছবি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ফুটপাতে ছবির প্রদর্শনী এই দুজন শিল্পীরই প্রথম।
সকালকে মনে পড়ে।
ভরাট উঠোনে চিক্ চিক্ রোদ
কত যে খেলুড়ী।
আইকম্-বাইকম্, কানামাছি, লুকোচুরি,
রাজা-রানী সাজা, কিংবা কচুর বনে, শামুক কুড়ানো।
সে খেলা ফুরিয়ে গেল
বেলা হল।
হকি ও ক্রিকেট, ফুটবল ধরায় নেশা
ভলিবল, সাঁতার, সাইকেল এবং রঙিন ঘুড়ি।
বেলা বাড়ে
দুরন্ত দুপুর।
প্রজাপতি-ধরা খেলা, কিংবা পড়া
মাকড়সার জালে।
এ খেলাতো অপার বিস্ময়।
অপরাহ্নে তাস, দাবা পাশা।
সন্ধ্যায় শুরু তো হবে
ঠাকুর পুজোর এক খেলা।
তাতো হলো
কিন্তু সব খেলুড়ীরা কই।
চলে গেছে সব বুঝি ফিরে।
সূর্য ধীরে অস্ত যায়
সমুদ্রের কোলে
একলা দাঁড়িয়ে আছি, জীবনের শুন্য ময়দানে।
সত্যিই তো, কোথায় গেল আমার বাল্যজীবনের সঙ্গীরা, খেলুড়ীরা। একসঙ্গে বসে কত মধুর, কত বিচিত্র ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে ঝালিয়ে নেবো উচ্ছলিত দিনগুলির কথা, নূতন করে ভেসে উঠবে মনের মুকুরে। কিন্তু তার আর সুযোগ কই? বাল্যসঙ্গীদের কথা যদি ধরা যায়-তাহলে সত্যিই-একলা দাঁড়িয়ে আছি জীবনের শুন্য ময়দানে।
কোলকাতায় যেমন জেলে পাড়ার সঙ্ বের হয়, সিউড়িতে তেমনি সঙ্ বের হতো, ধরম্ পুজোর সময়। ১০/১১ বছর বয়স, নাগা সন্ন্যাসী সেজে পাড়ার পাড়ায় ঘুরতাম সঙ্গে জনা ছয়েক শিষ্য, হাতে তাদের কমণ্ডলু রাস্তার দুপাশে সব বাড়ীর দরজায়, মেয়েরা দেখতেন। শিষ্যরা কমণ্ডলু নিয়ে তাঁদের কাছে যেতো। তাঁরা এক পয়সা, আধ পয়সা, কমণ্ডলুতে ফেলে দিতেন। ছটা কমণ্ডলুই ভরে যেত। সেই পয়সায় আমরা হাঁড়িকুড়ি, কাঠ, চাল, ডাল, তেল কিনে, মাঠে গিয়ে পৌষালী করতাম। আরও বড় হয়েছি যখন, তখন সাজতাম, হয় পাঞ্জাবী জ্যোতিষী কিংবা বাঁদরওয়ালা। একটি ছয়-সাত বছরের ছেলেকে গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে যেতাম, ডানহাতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে। হয়তো কোনো সুন্দরী বান্ধবী, বাড়ীর মা-পিসীর সঙ্গে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্ দেখার জন্য। কাছে গিয়ে বলতাম-ই বাঁদরবেটা, ই লেড়কীতো বুঁচকি আছেরে, ইয়ার সাদী হবেক্, না হবেকলাই। বাঁদর ঘাড়টা নাড়তো অর্থাৎ হবেকলাই। দণ্ডায়মানা কাকী পিসীরা হেসে উঠতেন। বান্ধবী দীর্ঘনাসিনী, বুঁচকি অর্থাৎ খাঁদা বলায় রেগে টঙ্ হয়ে বলতো-তুই আবার বাঁদরওলা কিরে, তুই নিজেই তো একটা ধেড়ে বাঁদর-মরণ। ‘মরণ’ কথাটা বীরভূমে কথার লবজ। বিরক্তি প্রকাশ করবার জন্য ব্যবহৃত হতো।
১৬/১৭ বছর বয়স। সিউড়িতে আমাদের ছিল তরুণ সংঘ। নাট্যকার রায় বাহাদুর নির্মলশিব বন্দোপাধ্যায় ছিলেন আমাদের সভাপতি। তারাশঙ্করের লেখায় নির্মলশিবের অনেক উল্লেখ আছে। কালিন্দী নাটকেও নির্মলশিবের ছায়া। তরুণ সংঘের থিয়েটার দেখার জন্য সহরবাসী উদগ্রীব। এত ভালো অভিনয় করতো তরুণ সংঘ। আমি হোতাম হিরোইন। প্রমথ বিশীর ঋণংকৃত্বা ঘিতং পিবেৎ, মৌচাকে ঢিল ও অন্যদের স্বামী স্ত্রী, তটিনীর বিচার প্রভৃতি নাটকে নায়িকা। কোলকাতার বিখ্যাত ড্রেসার পেন্টার এমন মেকাপ দিতেন কেউ ধরতেই পারতো না যে আমি মেয়ে নই। বাড়ীতে আসুন ১৯/২০ বছরের ফটো আছে, তাহলেই কথার সত্যতাটা যাচাই করতে পারবেন। সিউড়িতে দুবার মাত্র চান্স পেয়েছিলাম পুরুষের রোলে। দুইপুরুষ-এ অরুণ আর চন্দ্রগুপ্ত-এ চাণক্য। (চলবে)