ব্যস হিরো বনে গেলাম। এর আগে ১৯৩২-এ বারো বছর বয়সে বাবা এবং বাবার কংগ্রেসী বন্ধুরা আমাদের মাথায় গান্ধীটুপি পরিয়ে, মদ, গাঁজা ও আফিঙ-এর দোকানে পিকেটিং করতে পাঠাতেন। চৌরাস্তার মোড়ে, গাঁজা, আফিঙ-এর দোকান।
পাশে তিনটে বড় বড় মিষ্টির দোকান। পুলিশ সাহেব ছিলেন, নামটা খুব সম্ভবত মিঃ হারবার্ট। খাঁটি ইংরেজ। হাতে একটা দেড় হাত লম্বা বেত। তার ডগায় দুটো গোল গোল চামড়ার চাকতি লাগানো। মারলেই পত্ পত্ শব্দ হতো। ১২টা নাগাদ এসেই হেড কনষ্টেবলকে বলতেন-বাচ্চা লোগকো দুকান মে লে যাও, মিঠাই খিলাও। আমরা ধড়ফড় করে দোকানে হাজির হোতাম। আর সাহেব সেই বেতটা নিয়ে নিজের পায়েই পত্ পত্ করে মারতো-আর বলতো, গাঁজার দোকানের সামনে পায়চারী করতে করতে-বাচ্চা লোগ টিফিন করনে গিয়া। এখন কেহ গাঁজা, আফিং কিনিবে না। বড়দের কাছে শুনেছিলাম সাহেবের দুটি ছেলেই অল্পবয়সে মারা যায়- সেইজন্যই সাহেব ছেলেদের অত ভালোবাসতেন।
হিরো তো বনে গেলাম। ফল হলো প্রবীণদের স্নেহ ভালবাসা পেলাম। জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানকে দলবল মিলে বল্লাম-রাস্তার ধারের শুকনো গাছণ্ডলো যদি আমাদের দেন-তাহলে আমরা মড়া পোড়াবার জন্য, গাছ কেটে কারও বাড়ীতে মজুদ করে রাখবো। গরীব যারা কেউ কাঠ কিনতে পারবে না, তাদেরকে দেবো। গরীব ভিখিরী মারা গেলে আমরা পুড়িয়ে আসবো। তাঁরা সানন্দে সম্মতি দিয়ে ছিলেন। এই রকমে আটটা বিশাল গাছ কেটে আমরা কাঠের পাহাড় বানিয়েছিলাম।
সিউড়িতে হিরোইন সেজেছি কিন্তু কোলকাতায় এসে প্রায় কুড়ি বছর অভিনয় করেছি অল ইণ্ডিয়া রেডিওতে। পরিচালক ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, শ্রীধর ভট্টাচার্য, মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরেনদার খুবই স্নেহভাজন ছিলাম। বড় পার্ট এবং ভালো চরিত্রের পার্ট দিতেন। ৬দিন রিহার্সেলে যেতে হতো। প্রথম প্রথম পেতাম ১৫ টাকা, উন্নীত হোলাম ২৫ টাকায়। পবিত্র সেন বলে একজন ছিলেন এইচ.এম.ভি.-তে কাজ করতেন। একদিন পবিত্র সেন আমাকে বল্লেন-আনন্দ, তুমি একটি ইডিয়ট। রাজার পার্ট করলেও ২৫ টাকা আর সৈনিকের পার্ট করলেও ২৫ টাকা। অথচ বড় পার্ট নিলে ৬দিন রিহার্সেলে আসতে হবে। ছোট পার্ট-এ একদিন এলেই চলবে। বল্লাম-বীরেনদা বড় পার্ট দিয়ে দেন যে। পবিত্র সেন বল্লেন- আরে বেকুব, যেদিন প্রথম রিহার্সেলের ডেট পড়বে, সেদিন ১ ঘন্টা দেরীতে এসো। সব বড় পার্ট দেখবে বিলি হয়ে গেছে। খুচরো পার্ট পড়ে আছে। পবিত্র সেনের কথা অনুযায়ী চলছি। একদিন বুদ্ধদেব-এর ওপরে একটা ১ ঘন্টার বই। রাত ১০ টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। শ্রমণা হয়েছেন কল্যাণী মুখার্জি সাহিত্যিক সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের প্রথমা স্ত্রী। প্রথম অঙ্কেই শ্রমণা কল্যাণী বল্লেন- ‘বুদ্ধ আমাদেরকে অপমান করেছে। আমরা ওঁকে উপবেশনের জন্য আসন দেবো না’। আমি শ্রমণ। আমি বল্লাম- ‘আমরাও না’। এই ‘আমরাও না’ বলে ২৫ টাকার চেক নিয়ে বেরিয়ে এলাম। কল্যাণী ট্যাক্সি করে আসছিলেন, আমায় তুলে নিয়ে বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিলেন। ঘরে এসে খেতে খেতেই নাটকের শেষটুকু এবং কারা কারা অভিনয় করছেন শুনলাম। আমার নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রী বললেন-উঃ কত বড় অভিনেতা।
আর একবার জাতীয় নাটক। শীতকাল রাত ১০ টা থেকে ১১টা। বীরেনদা পরিচালক। ঐতিহাসিক বই। সবাইকে পার্ট দেবার পরেও দুটো পার্ট বেঁচে রয়েছে। যাদের দূরে বাড়ী তাদেরকে বীরেনদা ১ম আর ২য় অঙ্কেই ঢুকিয়েছেন। এদিকে আমি পার্ট পেয়ে গেছি ১ম অঙ্কেই। মিত্রপক্ষের দুর্গাধিপতি। মনে মনে খুব খুশি। শীতের রাত। হয়ে গেলেই কেটে পড়বো। বীরেনদা কাছাকাছি বাড়ী এরকম অভিনেতা খুঁজে পাচ্ছে না। বল্লেন-আমি নাম ডেকে যাবো, যাদের দূরে বাড়ী তারা বলবে ‘দূরে বাড়ী’ বীরেনদা অনেকবারই আমার বাড়ীতে এসেছেন। নাম ডাকছেন, ডাকছেন, এসেছে আমার নাম। বলেছি-দূরে বাড়ী। শুনে বীরেনদা তাকালেন। কলম রাখলেন, এক টিপ নস্যি নিলেন। তারপর হুঙ্কার ছেড়ে বল্লেন-বাঁদরামো হচ্ছে আমার সংগে। এখান থেকে ষ্টোন থ্রো দূরে বাড়ী, আর বলা হচ্ছে দূরে বাড়ী। ৩য় অঙ্কের শেষদিকে আর একটা পার্ট, শত্রুপক্ষের দুর্গাধিপতি। এ পার্ট তোমার। চেক নিয়ে বেরুতে বেরুতে রাত্রি ১১।। টা জানুয়ারী মাস। হেঁটেই বাড়ী এসেছিলাম। টাক্সি খরচ করিনি। তরতাজা তরুণ ছিলাম তো।
৪৬/৪৭ সালে তারাশঙ্করদার একটা বই সিনেমা হবার কথা চলছে। সাধারণতঃ সিনেমাতে দক্ষিণ ২৪ পরগণার কথ্য ভাষা-ই চালু তারাশঙ্করদার ইচ্ছে, অধিকাংশ ছোটখাটো পার্টগুলি বীরভূমের ছেলেরাই করুক। তাহলে বই অনুযায়ী বীরভূমের উচ্চারণ ঠিকমত হবে। কলকাতায় আমাদের কালচারাল লীডার ছিল ব্রহ্মগাপাল মিত্র। সিটি কমার্শিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ। সিউড়িতে মা ছিলেন, জমিদার-কন্যা ষোড়শীবালা মিত্র। বৃদ্ধাবস্থাতেও স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী। রাশভারী। সিউড়ির স্থায়ী বাসিন্দাদের স্ত্রী-রা অর্থাৎ আমার মা এবং পাড়ায় পাড়ায় কাকীমা জেঠিরা ওকে সমীহ করে চলতেন। আমরা ঠাকমা বোলতাম। তারাশঙ্করদা, ব্রহ্মদাকে বল্লেন-বীরভূমের যে সব ছেলেরা কোলকাতায় আছে তাদের মধ্যে যারা ভালো অভিনয় করে, তাদেরকে একদিন জড়ো কর। আমি মিট্ করবো। তাই হলো, আমাদের কয়েকজনকে সিলেক্ট করলেন। আমরা আনন্দে উদ্বেলিত। সিনেমায় নামছি উল্লাস আর ধরে না। সিউড়ির যে সব ছেলে পার্ট পায়নি, তারা সিউড়ি গিয়ে চাউর করে দিল ব্রহ্মদার নেতৃত্বে অমুক অমুক সিনেমায় নামছে। দাপুটে ঠাকমার কানেও পৌঁছে গেল সুখবরটি’। ব্রহ্মদার ডাকনাম ছিল “খুকু”। দিন কয়েক পরে এক মর্মঘাতী পোষ্টকার্ড এলো ব্রহ্মদার কাছে-কল্যাণীয়েষু খুকু, শুনিলাম কলিকাতায় ‘বেবুশ্যে’দের লইয়া -তোমরা ‘থ্যাঁটার’ করিবার মনস্থ করিয়াছ। এখানকার বৌমাদের সকলকে ডাকাইয়া মতামত লইয়াছি। সকলেই আমার সঙ্গে একমত। তোমাদের কলিকাতায় থাকিবার কোনোই প্রয়োজন নাই। কয়েকদিনের মধ্যেই সব কিছু গুছাইয়া কলিকাতার পাট তুলিয়া, সিউড়ি ফিরিয়া আসিবে। তারাশঙ্করদা চিঠি দেখে বল্লেন-সর্বনাশ, জ্যেঠাইমা ক্ষেপেছেন। জীবনে তাহলে আর সিউড়ি যেতে পারবো না। তোমাদেরকে আর দরকার নেই ভাই। উল্লাসের ‘বেলুন’ চুপসে গেল। সিনেমায় নামা আর হলো না।
রফি আহমেদ কিদোয়াই, ডাঃ সম্পুর্ণানন্দ ও উত্তরপ্রদেশের আরও অনেক নেতা কংগ্রেস সোস্যালিষ্ট পাটির প্রথম দিকে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পরে তাঁরা কংগ্রেসেই থেকে যান। কিন্তু ‘কিদোয়াই’ সাহেবের সংগে জয়প্রকাশ নারায়ণ, অচ্যুত পটবর্দ্ধন প্রভৃতির হৃদ্যতা অটুট ছিলো। ১৯৪৯/৫০ সালে, টেলিফোন আর চাঁদ পাওয়া প্রায় একই পর্যায়ের ছিলো। তখন রফি আহমেদ কিদোয়াই কেন্দ্রে মিনিষ্টার। আমি তখন থাকি ২৪ চৌরঙ্গী রোডের দোতালায়। খোঁজ পরিষদ সংলগ্ন ফ্ল্যাটে। জেপি কোলকাতায় এসেছেন, উঠেছেন এক মারোয়াড়ী বন্ধুর বাড়ীতে। সন্ধ্যাবেলায়, আমাকে বল্লেন-রফিসাহেব এসেছেন, কাল সকাল নটায় ওঁকে মিট করবো তোমার বাড়ীতে। উনি মিনিষ্টার তো কাজেই ওখানে মিট করার অসুবিধা আছে। ১০ টাকা দিয়ে বল্লেন, কফি আর ভালো বিস্কুট রাখবে। এরই দিন দশেক আগে, জওহরলালের স্নেহের পাত্রী, কংগ্রেস নেত্রী, মৃদুলা সারাভাই যিনি খ্যাতনামা বিক্রম সারাভাই-এর বোন, খোঁজ পরিষদের একটি রুম নিয়ে অফিস করেছেন। বিরাট ইংরেজী নাম, মনে নেই, মোদ্দা কথাটা হলো, পাকিস্তানের নির্যাতিতা হিন্দু মহিলাদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন। উনি আমাকে আবার সেটার অফিস সেক্রেটারী করেছেন। দিল্লী গেছেন টাকাকড়ি জোগাড় করতে। পরের দিন যথা সময়ে রফি সাহেব ও জেপি এলেন। মাখন বলে একটি ছেলে আমার রান্নাবান্না করতো। ও টোষ্ট, বিস্কুট, কলা, মাখনের বাটি এনে টেবিলে রাখলো, তারপর কফি আনলো। ওঁরা কথাবার্তা বলছেন। আমি দূরে বসে কাগজ পড়ছি। ইতিমধ্যে জেপি রফি সাহেবকে মৃদুলাদির সংগঠনের কথা বলেছেন। আনন্দ আনন্দ বলে জেপি ডাকলেন, বল্লেন- এখানে কোনো টেলিফোন নেই। আমি বল্লাম-আমিতো আপনাকে কত আগেই বলেছিলাম এখানে একটা টেলিফোন থাকলে কত সুবিধা হয়। মৃদুলাদি বলে গেছেন, এসে চেষ্টা করবেন। রফিসাহেব একটা কাগজ চাইলেন। লিখলেন বড়বড় অক্ষরে রফি আহমেদ কিদওয়াই, কাগজটা আমার হাতে দিয়ে বল্লেন-কাল সকাল দশটায় জেনারেল ম্যানেজারের কাছে নিয়ে যাবে। যাবার সময় জেপি বল্লেন-কোলকাতায় এলে সব ব্যাপারে আনন্দ আমাকে সাহায্য করে। জানো, ও পোয়েট এবং জার্নালিষ্ট। রফিসাহেব বল্লেন-পোয়েট্রি আমি ভালবাসি আর জার্নালিষ্টদের পছন্দ করি। (চলবে)