সংসারের কী বিচিত্রলীলা। বছর ৩০-এর মধ্যে দেখলাম ওই সচ্ছল মামার বাড়ীর জমিদারী, বাগান, পুকর সব চৌপাট। অত সচ্ছল পরিবার, পরিণত হলো এক সাধারণ গেরস্ত পরিবারে। আর আমার দাদামণির তিন ছেলে বড় হয়ে, রোজগার করে ভোল পালটে দিয়েছে।
১৯৫৭ সালের মার্চ মাস। মার্কাস স্কোয়ারে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন চলছে। আমি তার অন্যতম প্রধান পাণ্ডা। খবর পেলাম, মা অসুস্থ, সিউড়ি গেলাম। মন পড়ে আছে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে। মায়ের কাছে একদিন থেকে, মা-কে একটু ভালো দেখে চলে এলাম। দুদিন পরে রাত্রিতে ফোন এলো মেজদার, মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
সকালের ট্রেনে চেপে সিউড়ি পৌছালাম। বেলা দুটোর সময়। সৎকার হয়ে গেছে। মনে প্রচণ্ড অনুশোচনা, মায়ের শেষ সময়ে মায়ের মুখটা দেখতে পেলাম না। এরপর মেরাপ বাঁধা কালচারের সংগে যত সম্পর্ক ছিলো সব ছেড়ে দিয়েছিলাম। শ্রাদ্ধশান্তি চুকে যাওয়ার পর ফিরে এলাম। কিন্তু সর্বক্ষণ সেই একই অনুশোচনা, মায়ের মুখটি আমি দেখতে পেলাম না। একদিন রাত্রিতে শুয়ে আছি। মনের চোখে দেখছি, মায়ের বিভিন্ন বয়সের মুখ। হঠাৎ সব মিলিয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠলো মায়ের উজ্জ্বল মুখ। উঠে কাগজ কলম নিয়ে বসলাম, হাত দিয়ে বেরিয়ে এলো ‘মায়ের মুখ’।
জীবনের জটিলতা নিয়ে
অনেক দুরেই আছি মা-র কাছ হতে
বহুদিন থেকে।
টেলিগ্রাম পেয়েই গেলাম
মৃতমুখ দেখিনি মায়ের
সৎকার হয়ে গেছে পৌছানোর আগে
আপনার সত্তা দিয়ে, যে আমার মা
আমাকে দিয়েছে প্রাণ,
প্রাণহীন সেই মা-র মুখ
দেখিনিতো আমি।
বিক্ষুধ্ব হয়েছে মন অনুশোচনায়
ছিলাম না কেন আমি মায়ের কাছেতে।
মধ্যাহ্নে মাথায় সুর্য
জৈবিক বাঁচার তাগিদে
যস্ত্রণার কাতরানি নিয়ে
যখনই ভেবেছি মা-র কথা
তখনই ভেসেছে চোখে উজ্জলিত মা-র মুখখানি।
যে মুখের পরিপূর্ণতায়
উধাও হয়েছে ক্লান্তি যত।
সেই মুখ আজও দেখি, সেই হাসি পথ বলে দেয়
মা আমার প্রাণোচ্ছলা আজও এই প্রাণে।
মৃত মুখ দেখিনি মায়ের।
দুচারজন বন্ধু বান্ধব এবং আত্মীয় আছে, যাঁরা তাদের মায়ের শেষ সময়ে ছিলেন না। তাঁরা বলেছেন, এ কবিতা তাঁরা মাঝে মধ্যে পড়েন এবং খুবই সান্ত্বনা পান। আমার লেখা কবিতা পড়ে কেউ কেউ সান্ত্বনা পান বা পেয়েছেন, এ আমার সৌভাগ্য এবং এ সৌভাগ্য আমার মায়েরই দান। আমার বৌদিও ছিলেন। নিপাট ভালো মানুষ। প্রয়োজন অতিরিক্ত কোনো কথাই বলতেন না। আমার দুটো সিরিয়াস ও দুটো স্যাটায়ার কবিতার বই বেরিয়েছে বৌদি কিন্তু নির্বাক থেকেছেন বই গুলি সম্বন্ধে। কিন্তু ‘মায়ের মুখ’ বেরুনোর পরে, শুধু মাত্র এক লাইনে একটি মন্তব্য করেছিলেন-আনন্দ এবার সত্যি বড় হয়েছো বৌদির এই কমেন্ট আমার জীবনে এক মস্ত বড় সার্টিফিকেট। কেউ খুঁচিয়ে কিছু বললে আমার খুব রাগ হয়ে যায়। কিন্তু খোঁচানোর কুফল আর সুফল দুই-ই আছে। কুফল হচ্ছে মেজাজ গরম হওয়া, ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া। আর সুফল? এই খোঁচানোর জন্যই দুজনের কাছে দুটি কবিতা আর একজনের খোঁচানোতে গোটা একটা ব্যঙ্গ কবিতার বই?
বিদাসাগর কলেজের গলিটার মুখে একটি পুস্তক প্রকাশনী। নাম বুকল্যান্ড। মালিক জানকীনাথ বসু, হৃদয়বান লোক। ওখানে অনেক প্রবন্ধকার ও গবেষকের আনাগোনা। আড্ডা হতো, একটু উচ্চ চিন্তার। একদিন জানকীদার কাছে বসে আছি। এসে ঢুকলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু। যিনি বিবেকানন্দ, নিবেদিতার ওপরে নানান গ্রন্থ লিখে, রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলকে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ আসনে বসিয়েছেন। ঢুকেই, আমাকে দেখে বল্লেন — এই যে রামকৃষ্ণবিদ্বেষী কবি আনন্দগোপাল, একটি কবিতা দেন না নিবেদিতার ওপর। নিবেদিতা শতবার্ষিকীতে একটি স্মারক গ্রন্থ বের হবে। লেখা জোগাড়ের দায়িত্ব বর্তেছে আমার ওপর। জানকীদা বল্লেন — একী, তুমি এইরকম খোঁচা দিয়ে আনন্দকে বল্লে কেন? শঙ্করীপ্রসাদ হেসে বল্লেন — উনি তো আমাদের গুরু ভগ্নীর স্বামী, সেই সর্ম্পকেই ওই ভাবে বল্লাম। লিখে ফেল্লাম সঙ্গে সঙ্গে ‘মহাজন’, নাম দিয়ে কবিতা।
বিদেশের শ্বেতশুভ্রা মোমবাতি এক
এখানে পুড়ছে আমি দেখি।
কারণ একটি শুধু —
আমার তোমার আর তাদের মনের
সংসার যদি বা কিছু আলোকিত হয়।
অতিক্রান্ত যুগ শেষে
আমি দেখি,
শ্বেতশুভ্রা, সেই মোমবাতি, নিঃশেষিত হয়ে গেছে
আমারই স্বদেশে আত্মার আত্মীয় রূপে।
কিন্তু আমি।
এ যুগে এসেও-আমি কী পেরেছি আজও
বিচ্ছুরিত সে আলোর-মর্মস্পর্শী হতে?
হিসেবের খাতা খুলে দেখি
বংশ পরম্পরা-এখনো হয়নি শোধ
সে বকেয়া-ঋণ।
শ্বেতশুভ্রা নিবেদিতা, মহীয়সী মহাজন আজও।
নিবেদিতা, স্মারক গ্রন্থে প্রকাশিত হলো। রেডিওতে এই কবিতাটি একবার পড়েছিলাম।
বেরিয়ে আসার সময় সুলেখিকা কবিতা সিংহ জিজ্ঞেস করেছিলেন-আনন্দদা, বিদেশের শ্বেতশুভ্রা মোমবাতি’ এই সুন্দর উপমাটি আপনার মনে এলো কী করে ? বলেছিলাম — জানিনাতো ভাই, তবে বিশিষ্ট একজনের খোঁচানোতে বেরিয়েছিল এইটুকু জানি।
আর একবার পাথুরেঘাটার মল্লিক বাড়ীর ছেলে, কবি রমেন মল্লিক এলেন। বল্লেন — আনন্দদা, ১০০ বছর আগে ঠাকুর রামকৃষ্ণ আমাদের বাড়ীতে এসেছিলেন এবং ভাব সমাধি হয়েছিল। এই উপলক্ষে একটি স্মারক গ্রন্থ বের করছি। স্বামী লোকেশ্বরানন্দজী এবং অনেক কবি সাহিত্যিক-ই লেখা দিয়েছেন, আমার ইচ্ছে-আপনি একটি কবিতা লিখুন। সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রী ঝেঁঝ্কিয়ে উঠলেন-ভাই রমেন, কেন ওকে বলেছো ? জানো তো আমদের বিরোধী মতের লোক, ওকে বলো না। স্ত্রীর মধুর বাক্য শুনে তৎক্ষণাৎ একটা কাগজ নিয়ে ওদের সামনেই লিখলাম-
পাঁকে কাদায় মুখ ডুবিয়ে
জীবনটা যে কাটাস রে
ঠাকুর ঠাকুর মুখেই করিস
নয়কো ঠাকুর সহজ রে।
সত্যি যদি চাস পেতে তুই
মনটাকে কর ‘মাঠ-পুকুর’,
ভালবাসায় সহজ হয়ে
আসবে নেমে তোর ঠাকুর।
রমেনের হাতে দিলাম। রমেন কবিতাটি পড়ে হতবাক। কিছুক্ষণ ফ্যাল ফাল করে তাকিয়ে রইলো। বল্লো-সঙ্গে সঙ্গে লিখে দিলেন এই কবিতা, আর এই রকমের, তাছাড়া কথামৃত-তে ‘মাঠ-পুকুর’ কথাটাতো আছে।
আগেই লিখেছিলাম খোঁচানোর কুফল ও সুফল দুই-ই আছে। সেইরকম এক কনিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধুর খোঁচানোতে একটা কবিতা নয়, বেরিয়েছিল অনেকগুলি কবিতা এবং সেগুলি নিয়ে বের হয়েছিল ব্যঙ্গকাব্যগ্রন্থ ‘সেই আমি সাংবাদিক’।
কয়েকজন সাংবাদিক মিলে পাঁচের দশকের শেষ দিকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছিলেন। ‘দর্পণ’। অধ্যাপক ব্রজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম সম্পাদক। অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে অমিতাভ চৌধুরী (নিরপেক্ষ) ও ছিলেন একজন প্রধান উদ্যোগী। বেশ জমাটি সংবাদ বের হতো। জমে গিয়েছিল পত্রিকাটি। কয়েকবছর পর সম্পাদক হন, হীরেন বসু। দর্পণের অফিসটি তখন উঠে এসেছে মেট্রোপলিটন বিল্ডিং-এ। যাতায়াতের পথেই পড়ে, প্রায়ই বসি হীরেনের কাছে গিয়ে। হীরেন ব্যঙ্গ কবিতা লেখার জন্য অনুরোধ করে। বছর কেটে যায়। হীরেন খুবই স্নেহভাজন, কিন্তু হঠাৎ একদিন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বল্লো-যাই বলুন আনন্দদা, আপনার মুরোদ খতম। আর আপনি স্যাটায়ার কবিতা লিখতে পারবেন না। পারলে এত বলার পর কবেই লিখে ফেলতেন। আর আপনার মুরোদে কুলোবে না। পরের দিন দিয়ে এলাম কবিতা- সেই আমি সাংবাদিক।
‘কুকুড়ে কামড়ালে সেটা হয় না সংবাদ’’
কামড়ায় মানুষ যদি কুকুরে-
সংবাদের মূলসূত্র; এই ভাষ্য নিয়ে
সংবাদ সংগ্রহ করি সকালে দুপুরে।
সেই আমি সাংবাদিক-মালিককে আমার
অর্বাচীন যদি কোনো কুকুর কামড়ায়
আমার কলম বেয়ে হবে তা রিপোর্ট
প্রকাশিব জানি নির্দ্বিধায়।
রাস্তায় ধুঁকছে শুয়ে, ভিক্ষা-অন্নে তাও পড়ে ফাঁকি
ভাবছো এ সংবাদ হবে বুঝি,
আমাদের আজও চেনো নাই-এ লোক পকেট কাটে যদি
‘সংবাদ’ হবে সোজাসুজি
পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যকে, গ্রাহ্য আমরা করি না মোটেই
সভাগৃহে সে সময় পরিহাস করি,
মালিকের ‘ভাইপো’ কিংবা ‘মামা’ কেউ উঠিলে মঞ্চেতে
শশব্যস্তে নোটবই ধরি।
অকালে মরেছে, শিশু, জোটে নাই পিটুলি গোলা-ও
কেবা রাখে খোঁজ তার, কেবা টানে জের,
কালোবাজারীর ঘরে রিপোর্টিং-এ যাই
গণ্যমান্য আসিবেন সেথা, নিমন্ত্রণ অন্নপ্রাশনের।
খাঁটিরা বেপাত্তা আজ, ভেজালের রামরাজ্য চলে
আমাদের রিপোর্টিং-এ নামোল্লেখ নেই,
বিজ্ঞাপনী জালে-বদ্ধ মালিকের সাথে
শ্মশান-সংগীত গেয়ে, নাচি ধেই ধেই।
আমাদের যায়নাকো কেনা-নিন্দুকের এ উক্তিতে
রেখো না বিশ্বাস, পরিবেশ চাই রমণীয়,
কি রিভিয়ু? ছায়াছবি, বই কিংবা চিত্রপ্রদর্শনী
নিভৃতে আমাকে ডেকো প্রিয়।
রাস্তার সাক্ষাতে অকস্মাৎ কিংবা টেলিফোনে
খবর যেটাই দাও, ছাপা হবে নাকো,
ঔৎসুক্য তোমার যদি জোটবদ্ধ সে সংবাদে থাকে
চৌরঙ্গীর হোটেলেতে ডাকো।
লম্বা-চওড়া বহুকথা আমাদের জন্যে আছে তোলা
এ পথ ত্যাগের পথ, ‘এ পথে নির্ভীক যোদ্ধা চলে’,
ঠেকে কিংবা দেখে বন্ধু, তুমি আজ শেখো
কুকথা অনেক লোকে বলে।
গালভরা সাংবাদিক নাম, সেই নামে নামাবলী দিয়ে
মশা-কে কামান দিয়ে বধি,
নয়-কে হয়-তো করি ‘হয়’ কে ‘নয় ছয়’
বিপুলা এ পৃথী বন্ধু, কাল নিরবধি।
(চলবে)