পর পর কবিতা। হীরেনকে ছুটতে হতো বেলগাছিয়ায়, খ্যাতনামা কার্টুনিষ্ট চণ্ডী লাহিড়ীর কাছে, কার্টুন আঁকাবার জন্য। বেলগাছিয়া যেতে যেতে হীরেনের হাঁফ ধরে গিয়েছিল। অবস্থা হয়েছিল ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। এ কবিতা পড়ে, খ্যাতনামা সাংবাদিক বন্ধুরা খুব চটে গিয়েছিলেন। ব্যঙ্গ তখন-ই সার্থক ও রসমণ্ডিত হয়, যখন নিজেকে টার্গেট করে লেখা হয়। তাঁরা আর এটা খেয়াল করেনি যে আনন্দগোপালও একজন সাংবাদিক। ‘দৈনিক কৃষক পত্রিকা’, ‘সচিত্র সাপ্তাহিক’ এবং প্রবন্ধের মাসিকপত্র ‘সমকালীন’ নিয়ে-ই যার জীবন কাটলো। আর চটেছিলেন আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপন অধিকর্তা কানাইলাল সরকার।
খাঁটিরা বেপাত্তা আজ, ভেজালের রামরাজ্য চলে
আমাদের রিপোর্টিং-এ নামোল্লেখ নেই,
বিজ্ঞাপনী জালে-বদ্ধ মালিকের সাথে
শ্মশান-সংগীত গেয়ে নাচি ধেই ধেই।
এই প্যারাটা পড়ে। খুব গম্ভীর মুখে আমাকে বলেছিলেন-আনন্দ, এটা লিখে কী খুব ভালো করলে? শুধু তাই নয়, সাময়িকভাবে কথা বলাও বন্ধ করেছিলেন।
আনন্দবাজারে কাজ করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামী হরসুন্দর চক্রবর্তী চাঁটগাতে ছিল বাড়ী। এতদিন এখানে থাকা সত্ত্বেও কথাবার্তা একেবারে পুরো চাঁটগাইয়া। আনন্দবাজারের সম্পাদক অশোককুমার সরকারের পিএ ছিলেন। মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় আমাদের বাড়ী আসতেন। অমায়িক মহৎপ্রাণ লোক। মঞ্জু চিরকালই পাতলা, ছিপছিপে। বিয়ের পর আমার এক ঢাকাইয়া বন্ধু বলেছিলো-হালা আনন্দ, কী এক হোগলা মার্কা মাইয়া বিয়া করলি। হরসুন্দরদা প্রায়ই বলতেন চাঁটগাইয়া ভাষায়-এমনিতে কি আর মোটা হওয়া যায়। স্বাস্থ্যচর্চা করতে হয়। বাড়ীর সামনেই ময়দান। ভোরে উঠে একটু ঘুরে আসতে পারো না। যথারীতি বলটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে মঞ্জু। বল্লো-হরসুন্দরদা, আমি তো খুবই ভোরে উঠি। কিন্তু ও উঠ্তে চায় না। আমি তাহলে যাবো কার সঙ্গে। হরসুন্দরদা বল্লেন-আমি তো পাঁচটায় উঠে, তোমাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে ভিক্টোরিয়ায় যাই। কাল থেকে আমিই তোমাকে ডেকে নিয়ে যাবো। মনে হলো, মঞ্জুর মুখের হাসিটা যেন কেমন কেমন হয়ে গেল। পরের দিন ভোর পাঁচটায়, হরসুন্দরদার ম-ন-জু, ম-ন-জু বলে ডাক। মঞ্জু তো অনেক কষ্টে উঠে, রেডি হতে হতেই আধঘন্টা পার। এতে হরসুন্দরদা খুবই বিরক্ত। গজর গজর করতে লাগলেন। একদম রেডি হয়ে থাকবে, ডাকলেই বেরিয়ে আসবে। একদিন দুদিন তিনদিন মঞ্জুতো কোনোরকমে প্রাতঃভ্রমণে গেল। চতুর্থদিন ভোরে হরসুন্দরদার যথারীতি ডাক ম-ন-জু, ম-ন-জু। আমার ঘুম ভেঙে গেছে, আমিও বলছি মঞ্জু ওঠো, হরসুন্দরদা ডাকছেন। কে শোনে কার কথা, মঞ্জু যেন মরে গেছে। হরসুন্দরদার কন্টিনুয়াস ম-ন-জু, ম-ন-জু হাঁক শুনে বিল্ডিং এর দারওয়ান, পিয়নরা সব উঠে এসেছে। ভেবেছে কোনো বিপদ হয়েছে বুঝি। হরসুন্দরদা আরও কিছুক্ষণ ম-ন-জু, ম-ন-জু হাঁক পেড়ে ডিসগাষ্টেড্ হয়ে গজর গজর করতে করতে চলে গেলেন-হঃ এরা আবার শরীরচর্চা করবে, বলে কিনা আমি তো ভোরেই উঠি। হরসুন্দরদা ‘ভোরে’ আর কোনদিন মঞ্জুকে ডাকতে আসেন নি।
মঞ্জু চিরকালই ভ্রমণবিলাসিনী। বিয়ের পর পরই একদিন আমাকে বল্লো-চলো গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ান দেখে আসি। এমনিতেই লেখাপড়ায় আমি মাঠো। তারপর ভূগোলে তো মাষ্টার। ‘ভূ’ লিখতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই ‘ভু’ লিখে ফেলি। কোথায়রে জায়গাটা বাবা। কিছুতেই ধরতে পারছি না। একটু পোজ নিয়ে বলি, তা জায়গাটা ঠিক কোথায়? উত্তরে মঞ্জু বলে- কেন জাননা, আমেরিকায়, অত বড় নদী শুকিয়ে গিয়ে, কী শোভন সুন্দর মাইলের পর মাইল ‘গর্জের’ রূপ নিয়েছে। সারা পৃথিবীর কত লোক দেখতে যায়। পৃথিবীর লোকসংখ্যা কত তা জানা ছিল না। এবং এও জানা ছিল না যে সারা পৃথিবীর কত লোক দেখতে গেছে। যাঁরা দেখতে গেছেন, মানস চক্ষে তাঁদের মধ্যে পরিচিত তো দূরের কথা, আমার জানা কাউকে মনে করতে পারলাম না যিনি আমাকে বলেছেন যে তাঁর অমুক পরিচিত লোক গ্র্যান্ড ক্যানিয়ান দেখে এসেছেন। তখন আমার আর্থিক অবস্থা অনুসারে চাঁদ আর গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ান দূর অস্ত। স্ত্রী খুবই ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু কী করা যাবে, আমার সাধ থাকলেও সাধ্য করায়ত্ত ছিল না।
কয়েকবছর পরে মঞ্জু বল্লো-চলো পিন্ডারী গ্লেসিয়ার ঘুরে আসি। গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ান আমেরিকায়, ভাবলাম এটা নিশ্চয়ই সুইজারল্যাণ্ডে হবে। আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় ইউরোপে? মঞ্জু বল্লো-না, না কিছুতো জানো না, এইখানে এইখানে। হাতটা এমনভাবে দেখালো, মনে হলো যেন বর্দ্ধমানের পাশেই। সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম। তিনজন সঙ্গী জুটলো বিমল, বিষ্ণু সিউড়ির। কোলকাতার মোহিনী পাল। আর বেদানন্দ মুখোপাধ্যায়, যে আমার অনুজ-প্রতিম। এঁরও বাড়ী সিউড়ি, থাকেন কোলকাতায়। ডাক নাম মন্টু। নির্দিষ্ট দিনে ‘বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে হাওড়া ষ্টেশনে যাত্রা শুরু। পরে শুনেছিলাম উত্তর প্রদেশে পিন্ডারী হিমবাহ। মঞ্জু প্রচুর খাবার দাবার নিয়ে এসেছে। মনটা খুঁতখুঁত করলেও খাবারের প্রাচুর্য দেখে উৎফুল্ল হোলাম। ভাবলাম, এই তো কাল সন্ধ্যায় পৌছে যাবো কাঠগুদাম। ব্যস্ আশে পাশেই পিণ্ডারী গ্লেসিয়ার, কিসের ঝামেলা। কাঠগুদামে নেমে বিমলদাকে একটু আড়ালে ডেকে বল্লাম-কাছেই তো পিণ্ডারী গ্লেসিয়ার। বিমলদা র্খিচিয়ে উঠ্লেন, বল্লেন-তোকে আনাটাই ভুল হয়েছে। পাগল হলি নাকি? এখান থেকে বাসে আলমোড়া, সেখানে রাতটা থেকে পরদিন বাসে চেপে বাগেশ্বর। একরাত সেখানে থেকে, পরের দিন কাপকোট। তারপরের দিন ভোরবেলায় হাঁটা শুরু। যেতে পাঁচদিন। আমার যে এই চলতে গেলেই মাথা ঘোরে, এটা বোধহয় বিমলদার কাছ থেকে শোনার পরই শুরু হয়েছিল। ছোটবেলায় একটা যাত্রা দেখেছিলাম, গদা হাতে যমরাজ, একজনকে বলছে-‘পলাইবি কোথারে পামর’। এ হাওড়া ষ্টেশন নয়, যে ঝুটমুট রাগ দেখিয়ে কেটে পড়বো। তারপর মনে সাহস এনে প্রাচীন প্রবাদবাক্যটি আওড়াতে আওড়াতে বাসের অভিমুখে-‘পড়েছি যবনের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে’। আলমোড়ায় সন্ধে হয়ে যাওয়ায় কিছুই দেখা হলো না। পরের দিন, বাগেশ্বরের পান্থশালা। প্রত্যেকটি খাটিয়াতে কৌরবদের অক্ষৌহিণীর মত ছারপোকা। চাটাই পেতে শোবার পরও, আসছে সার বেঁধে। সারারাত্রি ভজগৌরাঙ্গ স্মর গৌরাঙ্গ, করেই কাটলো। জীবনে অত ছারপোকা একসঙ্গে দেখার সৌভাগ্য ওই একবারই হয়েছিল।
নির্দিষ্ট দিনে কাপকোটে বাস দাঁড়ালো বিকেল বেলায়। কয়েকটি অতি ক্ষুদ্র দোকান। বাঁপাশে বিশাল নদী। দড়ির ঝুলন্ত সেতু। মনটা মুষড়ে গেল। বিমলদাকে বল্লাম-এই তো মেরে কেটে ৫/৬টি দোকান, আমরা থাকবো কোথায়? ডিএল রায়ের নাটকে যেমন গায়ক ডান হাত সামনে প্রসারিত করে গাইতো, ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে, কী সঙ্গীত ভেসে আসে’। ঠিক ওই ষ্টাইলে, ডান হাত প্রসারিত করে বিমলদা বল্লো-ওই পাহাড়ী বেগবতী নদী দেখছিস্, আর ওই ঝুলন্ত সেতু, ওটা পার হয়ে যেতে হবে ওধারে। ওখানেই ডাকবাংলো।
চা খেয়ে ঝুলন্ত সেতুর মুখে। সামনে গাইড্ দেওয়ান সিং, তারপর আমরা পাঁচজন। পিছনে পাঁচজন পোর্টার। বাস থেকে নেমে মঞ্জু সব গাইড্ পোর্টার ঠিক করে ফেলেছিল। নীচে পাহাড়ী নদী। উত্তাল তরঙ্গ নিয়ে পাথরে ধাক্কা মারতে মারতে চলেছে। কী তার গর্জন। দোদুল দোলায় দুলতে দুলতে চলেছি। ওপারে পা ঠেকিয়ে, মনে হল ধড়ে বুঝি প্রাণটা ফিরে এলো। পোর্টারের সাহায্যে বেডিং খুলে মঞ্জু বিছানা পেতে দিল। শুয়ে পড়লাম। রাত্রিতে ঘুম ভেঙে গেল বিমলদার ডাকে- এই ভু্টু ওঠ্ গুছিয়ে নে, এবার বেরুতে হবে। প্রচণ্ড শীত, কোমরটা কাঁপছে হি হি করে। বিছানা গোটানো, বোঁচকা বুঁচকি বাঁধা। আবার সেই- ‘দোলে শ্যাম ঝুলনায়।’ ঝুলতে ঝুলতে সেতু পেরিয়ে কাপকোটের ছোট্ট বাজারে পৌঁছালাম ভোররাত্রি পাঁচটায়। একটা চাল্লা ঘরে কেটলিতে জল ফুটছে। এগিয়ে গিয়ে বল্লাম-ভাই চা হোগা? -দেতা হ্যায় জারা ঠাহরিয়ে। মিনিট পনের লেগে গেল তার চা তৈরী করতে। ততক্ষণে আমার মনে হচ্ছে কোমরটা আর নেই। কেঁপে কেঁপে বোধহয় প্যারালেসিস হয়ে গেছে। চা পেয়ে গরম গরম খেলাম। আউর এক গ্লাস দেগা ভাই। দিলো। সেটা খেয়ে-আউর এক গ্লাস ভাই সাব। পরপর ৩ গ্লাস চা খেয়ে মনে হলো-না কোমরটা ঠিক জায়গাতেই আছে। আর হি হি টাও কমে গেছে। (চলবে)