একজন জীবন্ত প্রবাদপুরুষ ছিলেন দাদাঠাকুর। মুর্শিদাবাদ জেলায় রঘুনাথগঞ্জে তাঁর বাড়ী ছিল। সাহিত্যের গুণাগুণের নবরস আছে। তার মধ্যে হাস্যরস অন্যতম প্রধান। আবার হাস্যরসের মধ্যে বিভাগ আছে-যেমন, ব্যঙ্গ, কৌতুক, রসিকতা, তির্যকতা প্রভৃতি। ব্যাকরণগত গোটা হাস্যরসটাই ছিল দাদাঠাকুরের মগজে ঠাসা। আর ছিলো অফুরন্ত স্বদেশপ্রেম। ইংরেজ শাসকের শত ভ্রূকুটিও তাঁকে টলাতে পারেনি। চাবুকের মত কাগজ বের করতেন, নাম ‘বিদূষক’। লেখক দাদাঠাকুর। সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে চান-দাদাঠাকুর। বেল টিপে পিয়ন কিংবা কম্পোজিটারকে ডাকলেন-দাদাঠাকুর। আবার কোলকাতায় কাগজ বিক্রির জন্য, হকারের হাতে তুলে দেবেন, সে হাতদুটিও দাদাঠাকুরের। অর্থাৎ বিদূষকের আপাদমস্তক দাদাঠাকুর। এহেন প্রবাদপুরুষকে ছাত্র জীবনেই কয়েকবার দেখেছিলাম।
বীরভূম জেলা স্কুলে পড়ি। ব্রতচারী প্রবর্তক গুরুসদয় দত্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। পদাধিকার বলে জেলা স্কুলে সেক্রেটারী তিনি। আমরা কয়েকজন তাঁর প্রবর্তিত ব্রতচারীর প্রথম পাশ করা দল। তিনি ছিলেন আমাদের গুরুজী। আমরা শ্লোগান দিতাম ‘ওয়া গুরুজীকী ফতে। রায়বেঁশে, সাঁওতাল নাচ, কাঠিনাচ, ঝুমুর, সারি, ঝারি সবই শিখেছিলাম। এবং ছুটি ছাটায় তাঁর সঙ্গে গিয়ে আমরা জেলার বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ব্রতচারীর শিক্ষাদান করতাম। গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে ডোবাগুলিতে কচুরীপানা, ডুরুলি এসব তুলতাম ওঁরই রচিত গান গেয়ে গেয়ে। জেলার বিভিন্ন মেলায় গিয়ে ব্রতচারী নৃত্য প্রদর্শন করতাম। গুরুসদয় দত্ত, দাদাঠাকুরকে খুব ভালোবাসতেন এবং মাঝেমধ্যে সিউড়িতে আহ্বান করতেন। এই সঙ্গে সাহিত্যক শৈলজানন্দর বাবাকেও। তিনি ছিলেন শখের ম্যাজিসিয়ান। এখানে ওখানে বৈঠক হতো। বৈঠকে সিউড়ির প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানাতেন গুরুসদয় দত্ত। আমরা কয়েকজন পেটোয়া ব্রতচারীও হাজির থাকতাম। দাদাঠাকুরের কথায় সবাই খুব হাসতেন। রস উপলব্ধি করতে না পারলেও সবাই হাসছে দেখে আমরাও হাসতাম। কিন্তু এখনো স্মৃতিতে ভাসছে খ্যাতনামা সাহিত্যিক শৈলজানন্দের বাবার ম্যাজিক। একটা থেলো হুঁকোকে মুখে লাগিয়ে তামাক খাচ্ছে, ভুরুক ভুরুক শব্দ হচ্ছে। ধোয়া বেরুচ্ছে। কিন্তু হাত দুটি নীচে নামানো। বৈঠক শেষে, আমরা দৌড়ে গিয়ে দাদাঠাকুরকে নয়, গুরুজীকে নয়, প্রণাম করতাম ওঁকে, বিস্ময় বিমূঢ় মন নিয়ে।
এহেন দাদাঠাকুরকে একদিন চার ঘন্টা পাশে বসে ঘরোয়া পরিবেশে এবং ৩০/৪০ মিনিট রাস্তায় পাশে যেতে যেতে পেয়েছিলাম। আমার এক আত্মীয় নরেন্দ্রকুমার মিত্র। এঁদের বাড়ী কৃষ্ণনগর। এঁর বাবা কাকাদের সংগে দাদাঠাকুরের খুবই অন্তরঙ্গতা ছিল, একেবারে পারিবারিক পর্যায়ে। নরেন্দ্রকুমার পোর্টের অফিসার ছিলেন। খিদিরপুর ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকে ওর কোয়ার্টার। একদিন রাত্রে আমাকে ফোন করলেন-আনন্দ কাল সকাল ১১টার আগে চলে এসো, এখানেই খাবে। দাদাঠাকুর আসবেন। ফোন পাওয়ার পর থেকে সময় যেন আর কাটে না। কখন রাত পোয়াবে, কখন সেখানে যাবো? দশটার আগে পৌছে গেছি। ১১টা নাগাদ এলেন দাদাঠাকুর। তারপর কবিতা, ছড়া, গান, কৌতুক, কথায় কথায় ‘পান্’। মনে হচ্ছিল, একটি স্নেহভাজন পরিবারকে পেয়ে দাদাঠাকুর যেন নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছিলেন। তারপর খাওয়াদাওয়ার মাঝেও চলতে লাগলো, খাবার নিয়ে দাদাঠাকুরের কৌতুকী বাক্যের নির্ঝরণ। ৩টে বাজলো। দাদাঠাকুর উঠবেন। নরেন্দ্রকুমার বল্লেন-আনন্দ, দাদাঠাকুরকে তুমি একটু এগিয়ে দাও। আমি তো একপায়ে খাড়া। এতো মহা সৌভাগ্য, শুধু দাদাঠাকুর আর আমি। নেমে এলাম দোতালা থেকে। সামনেই ট্রামডিপো। দাদাঠাকুর ভ্রূক্ষেপ করলেন না, ফুটপাত ধরে এগিয়ে চলেছেন। নানান্ কথা বলে চলেছেন। হাসতে হাসতে সঙ্গে চলেছি।
ওমা ‘রেসকোর্স’ এসে গেল। ভাবছি কী ব্যাপার, দাদাঠাকুর যে বাসেও উঠছেন না। আত্মীয় বাড়ীতে জামাই-খাওয়া খেয়েছি। একটু রেষ্ট হলে ভালো হতো। বল্লাম-দাদাঠাকুর বাসগুলো যে চলে যাচ্ছে। দাদাঠাকুরের উত্তর-তুমি একটি মহামূর্খ, বাসে কী আর এমনি করে গপ্পো করা যাবে? এই তো বেশ দুজনে কেমন গপ্পো করতে করতে যাচ্ছি। এসে গেলাম রাজভবন, সেটা ছাড়িয়ে আবার ডেড্ লেটার অফিস। এখন নাম পালটে হয়েছে আরএলও অর্থাৎ রিটার্ন লেটার অফিস। দাদাঠাকুর দাঁড়ালেন, বল্লেন-ভাই তোমার তো এই কাছেই চৌরঙ্গীতে বাসা। এবার তুমি ফিরে যাও। প্রণাম করলাম। এই প্রবাদপুরুষের সঙ্গে ৪০ মিঃ কাটানো এবং খিদিরপুর থেকে ডালহৌসী ৪০ মিঃ পাশে পাশে হাঁটা। এত সৌভাগ্য আমার কপালেও ছিল।
সোস্যালিষ্ট পার্টি আর নেপালের নেপাল কংগ্রেস ছিলো হরিহর আত্মা। সোস্যালিষ্ট পার্টির মতই পলিসি ষ্টেটমেন্ট ছিলো নেপাল কংগ্রেসের। তাছাড়া নেপাল কংগ্রেসের বহু নেতা, উপনেতা ছাত্রজীবনে সোস্যালিষ্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং জেলেও গেছেন। যেমন সিউড়িতে নেপালী ছেলে রুদ্রপ্রসাদ গিরি আমারই সংগে জেলে ছিল। বিশ্বেশ্বর কৈরালা যিনি পরে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন, এই সূত্রেই তাঁর সংগে ঘনিষ্ঠতা হয়। তাছাড়া বিশ্বেশ্বর কৈরালা, জয়প্রকাশ ও লোহিয়ার অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। আমাদের পার্টিতে ভোলা চট্টোপাধ্যায় ছিল অসমসাহসী, ডানপিটে। নেপাল কংগ্রেসের সঙ্গে রানাশাহীর লড়াই চলছে। জেপি আর রাম মনোহর লোহিয়া ভোলাকে পাঠালেন বার্মা। অস্ত্রশস্ত্র আনতে। ভারত সরকার রাজনেতিক কারণে ডাইরেক্ট কিছু করতে পারে না। সোসালিষ্ট পার্টি আর নেপাল কংগ্রেস হরিহর আত্মা। কাজেই সোস্যালিষ্টরা এই সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে। ভোলা বার্মায় ৩ বার গিয়ে অনেক কিছু নিয়ে এলো। সরকার অনবগত ছিলো না। কিছু অস্ত্র আমার কাছেও মজুদ থাকতো, সেগুলি বিশ্বেশ্বর কৈরালা, এখান থেকেই পাটনা হয়ে নেপালে নিয়ে যেতেন। যদি কোনদিন গোছগাছের জন্য রাত্রিতে থাকতে হতো, আমার কাছেই থেকে যেতেন। আমার ছিল ক্যাম্প খাট। উনি আমার চেয়েও বেশ কয়েক ইঞ্চ লম্বা ছিলেন। ক্যাম্পখাটে ওঁর বিছানা করে দিতাম। আমি শুতাম মাটিতে ক্যাম্পখাটে শুয়ে, ওঁর পা দুটো খানিকটা বেরিয়ে থাকতো। বলতেন আনন্দ আমি নীচে শোবো, তুমি খাটে শোও। বলতাম-তাই কী হয়। তুমি হলে অনারেবল গেষ্ট, তাছাড়া নেপালের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। মাটি আমি ছাড়তে পারি না। তুমি পা একটু ণ্ডটিয়ে শোও। সবসময় হাসিখুশি ভাব, লেখাপড়ায় দারুণ আর বিশ্ব ইতিহাস সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। আমাদের পার্টির কয়েকজন, ভোলা চ্যাটার্জির সঙ্গে নেপালে বনে জঙ্গলে লড়াই-এ নেপালী কংগ্রেসীর পাশে ছিল। পঞ্চাশের দশকে নেপালের আন্দোলন নিয়ে ভোলা চ্যাটার্জির লেখা একটি তথ্যমূলক ভালো বই আছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে তাম্রপত্র পেয়েছি, কিন্তু পেনসন পাবার জন্য আবেদনই করিনি। সরকার আবেদনের শেষ দিন ঘোষণা করেছে। ঠিক তার আগের দিন গেছি কবি গোপাল ভৌমিকের কাছে। উনি তখন ডাইরেক্টার অব ইনফর্মেশন এ্যাণ্ড পাবলিসিটি। সমকালীন-এর বিজ্ঞাপনের জন্য গোপালদার কাছে যেতেই হয়, সেদিনও গেছি। গোপালদা আমাকে ঠিক ছোট ভাই-এর মত ভালবাসতেন। গোপালদার ঘরে ঢুকতেই গোপালদা বল্লেন-উপবিষ্ট দুইজন বৃদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামীকে উদ্দেশ্য করে-এই তো একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনসনের জন্য এ্যাপ্লাই করলো না। তাঁরা আমাকে বল্লেন-কেন ভাই এ্যাপ্লাই করনি কেন? এতো কোনো রাজনেতিক পার্টি দিচ্ছে না, সরকার দিচ্ছে। আমি বল্লাম-আমি তো মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে ছিলাম, সেখান যেতে হবে, তাদিকে ধরাধরি করে সার্টিফিকেট নিতে হবে। আর এখনকার সরকারী কর্মচারীদের যা ব্যবহার, ভাবলেই কোনো কিছু করতে ইচ্ছে হয় না। গোপালদা ধম্কে উঠলেন-সে কী জেল সার্টিফিকেটের জন্যই অ্যাপ্লাই করো নি, একথা তো তুমি আজ পর্যন্ত বলো নি। দাঁড়াও, দাঁড়াও। ফোন করলেন হোম ডিপার্ঢমেন্টের জয়েন্ট সেক্রেটারী জেএন ব্যানার্জিকে। গোপালদার কথা তো শুনতেই পাচ্ছিলাম, মিঃ বানার্জি কী বললেন, শুনলাম গোপালদার কাছে। গোপালদা বল্লেন-আমার এক কনিষ্ঠ বন্ধু কবি ও সমকালীন সম্পাদক আনন্দগোপাল, জেল রেকর্ডের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে পেনসনের জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারেনি। কালই লাষ্ট ডেট্। আপনি কী একটু সাহায্য করতে পারেন। উত্তরে মিঃ ব্যানার্জি বলেন-সমকালীন সম্পাদক, দারুণ কাগজ। জেলা মাজিষ্ট্রেট হয়ে জেলায় জেলায় ঘুরতাম। কাগজওয়ালাকে বলে দিতাম সমকালীন আমার চাই। আমার ঘরে মশায় সব বাঁধানো সেট আছে। কোথায় উনি? গোপালদা বলেন-এই তো আমার সামনে বসে আছে। -পাঠিয়ে দিন, পাঠিয়ে দিন, আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। (চলবে)