এর আগে পড়তে যাবার অছিলায় গিয়েছিলুম পাটনায়। পড়াশুনা বিশেষ এগোয়নি। মুখ্যুই থেকে গেছি। সেখানে পরিচয় হয়েছিল, প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক রামবৃক্ষ বেণীপুরী আর সতীনাথ ভাদুড়ীর সংগে। তিনি তখন সাহিত্যিক হননি। পূর্ণিয়ায় থাকেন। এরা দুজনেই ছিলেন সিএসপি অর্থাৎ কংগ্রেস সোসালিষ্ট পার্টির সদস্য। বেণীপুরীজী একদিন জয়প্রকাশ নারায়ণের কাছে নিয়ে গেলেন। দীর্ঘদেহী, সুপুরুষ, সোস্যালিষ্ট নেতা। প্রণাম করতেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তখন হিন্দি বুঝতে পারি, ভালো বলতে পারি না। সোজা সাপটা বাংলাতেই তাঁর কথার উত্তর দিয়েছিলাম। অভিনব ব্যাপার এই যে-প্রথম থেকেই জেপি আমাকে নিজের ছোট ভায়ের মতো করে নিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে জেপি কোলকাতায় এসেছেন অথচ ২৪ চৌরঙ্গীতে আমার এই ভাঙাচোরা ভাড়াটে বাড়ীতে আসেননি, এমন দিন প্রায় নেই বল্লেই চলে। জেপি-র স্ত্রী প্রভাবতীদেবীকে আমরা ভাবী বোলতাম, জেপি-র সঙ্গে আসতেন। কখনও কখনও তাঁর মা কোলকাতায় এলে, তাঁকেও আনতেন। তিনি আবার তামাক খেতেন। আমাকে টিকে ও তামাক মজুদ রাখতে হতো। তাঁরা আমার স্ত্রী মঞ্জুকে খুবই ভালবাসতেন। জেপি কোলকাতায় এলে, আমি তাঁর সেক্রেটারীর কাজ করতুম। জেপি সাধারণত এ্পয়েন্টমেন্ট করতেন আমার এখানে, নিরিবিলি বলে। ফলে তখনকার বহু তাবড় তাবড় লোক এসছেন আমার এই ভাড়াটে বাড়িতে। শান্তিপ্রসাদ জৈন, এল এন বিড়লা, রামেশ্বর তাঁতিয়া, প্রভুদয়াল দাবড়ীওয়ালা, রামবিলাস হুরকত প্রভৃতি বিগ্ বিজনেস ম্যান। তাছাডা জেপির সঙ্গে কত লোকের বাডিতেও গেছি। তাঁদের সঙ্গে দহরম মহরম হয়েছিল খুব। তখন যদি ব্যবসায় নেমে যেতাম। তাহলে এঁদের সহায়তায় একজন বড় ‘বেওসায়ী’ হয়ে যেতাম। কিন্তু জেপি লাগাম ধরে রাখায় ‘বেওসায়ী’ আর হয়ে উঠতে পারিনি। হবার লোভ যে ছিল না, তা সর্বাংশে ঠিক নয়।
সোস্যালিষ্ট পার্টির কোনো কোনো সাব কমিটির মিটিং কোলকাতায় হলে, আসতেন অচ্যুত পটবর্দ্ধন, জেপি, অশোক মেহতা, রামমনোহর লোহিয়া, জেনারেল সেক্রেটারী প্রেম ভাসিন, গঙ্গাশরণ সিং, অরুণা আসফ আলী, উড়িষ্যার সুরেন দ্বিবেদী। তখন আমি ২৪ চৌরঙ্গীর দোতলায় থাকতাম। সেখানে ১টা হলঘর আছে। মিটিং সেখানেই হতো। মিটিং-এর পর যখন কফি খাওয়া ও গল্প গুজব হতো, জেপি প্রায় বোলতেন,-আনন্দ্ ওই ভারি ভারি দেশ নেতার গল্পটা বলো তো।
ব্যাপারটা হয়েছিল কি, জেপি একবার সিউড়ি শহরে জনসভা করতে গিয়েছিলেন। তিনিই একমাত্র বক্তা ছিলেন। স্থানীয় এক প্রবীণ উকিল ছিলেন সভাপতি। সিউড়ির পরে যে বড় গ্রাম, তার নাম কড়িধ্যা, চলতি কথায় কড্ডে। তার পরের গ্রাম কালিপুর। কালিপুরের এক ছোকরা মিটিং শুনতে এসে সন্ধে বেলায় ফিরে যাচ্ছিল কড্ডের ভেতর দিয়ে। এক জায়গায় কয়েকজন মুরুব্বি তামাক খেতে খেতে আগুন পোয়াচ্ছিলেন। ছোকরাকে পাশ দিয়ে যেতে দেখে এক মুরুবিব বললেন-ওই গুপাল, বাবা কোথায় গেইছিলে? -এই জিঠা, গেইছিলাম সিউড়িতে, সব ভারি ভারি দেশ নেতারা এয়েছিলেন, তাদের বক্তিমে শুনতে গেইছিলাম।
— হেই দেখ, আমরাও শুনেছিলাম, সব দেশ নেতারা আসবেন, কিন্তু বাবা যেতে লারলাম। তা বাবা কে কে দেশনেতা এয়েছিলেন।
— সি জিঠা, কাল বিয়েন বিলাই বলবো। আজ তো রাত হুঁয়ে গেইছে।
— না বাবা বল, বল। নাতো পেটটো সারারাত উমরি গুমরি করবে।
— তা জিঠা জয়বাবু এয়েছিলেন, প্রকাশবাবু এয়েছিলেন, নারায়ণবাবু এয়েছিলেন।
শুনে সবাই হো হো করে হাসতেন। অচ্যুত পটবর্দ্ধন ও অশোক মেটা বাংলা বুঝতেন — কিন্তু বলতে পারতেন না। এঁরা সবাই বাংলা জানতেন। আর অরুণা আসফ আলি অর্থাৎ রিনিদিতো, রবীন্দ্র-দৌহিত্রী নন্দিতা কৃপালনীর জেঠতুতা দিদি। এই প্রসঙ্গে বলি কংগ্রেস নেতা আসফ আলি প্রথমে আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন, কিন্তু কিছুদিন পরে তাঁকে উড়িষ্যার গভর্নর করা হয়। সেইসময় রিনিদি কোলকাতায় এসেছেন। সোসালিষ্ট পাটির সেক্রেটারি শক্তি বোস ও আমি রিনিদিকে চেপে ধরলাম যে অন্তত তিনদিন আমরা যেন গভর্নরস হাউসে থাকতে পারি। রিনিদি ব্যবস্থা করে দেন। আসফ আলি সাহব আমাদের খুব সাদরে অভ্যর্থনা করেন। স্ত্রীর পার্টির ছেলে, কাজেই সর্ম্পকটা তো শালা-ভগ্নীপতির। একটা গাড়ি দিয়ে এক অফিসারকে নিযুক্ত করে দেন আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। কিন্তু কড়া করে বলেছিলেন লাঞ্চ আর ডিনার টাইমে যেন ঠিক সময়ে উপস্থিত থাকি। বলেছিলেন, রিনি আমাকে বারংবার বলে গেছে তোমার ব্রাদার-ইন-ল রা যেন লাঞ্চ আর ডিনারটা তোমার সংগেই খায়। মহানন্দে রাজকীয় আতিথেয়তায় তিনদিন কেটেছিল। জেপি-র সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় আমিও সি এস পি-র কর্মী হোলাম। কিন্তু সেইসময় বয়স না হওয়ার দরুণ ১৯৪০-এ সদস্যপদ পেয়েছিলাম।
সিউড়ি জেলে ছিলাম রাজার হালে। জেলার, জেল ডাক্তার এঁরা সপরিবারে ছিলেন, বাবার পেশেন্ট। তাই জেলারকাকী, জেল-ডাক্তার কাকী এটা ওটা আমার জন্যে পাঠাতেন। এমন কি হেড জমাদার-কখনো আধখানা পাকাকলা, এক টুকরো শশা, ২/৩ কোয়া কমলালেবু, কিংবা খানিকটা মিছরির টুকরো লুকিয়ে আমাকে খাওয়াতো, আর বলতো-কবরেজবাবা দিখা করতে আইলে, তখুন বলিস যে জমাদার দাদা, আমাকে ই সব খিলাই। কিন্তু সকালে লাপসি দিলে খেতে পারতাম না-বমি বমি লাগতো। আমাদের পাশেই ছিল উঁচু দেওয়াল। ও পাশে জেনানা ওয়ার্ড। সেখানে ছিলেন নন্দিতা কৃপালনী বুড়িদি, রানী চন্দ। নন্দিতা কৃপালনী, রবীন্দ্র-দুহিতা মীরা দেবীর কন্যা। ও ধার থেকে একটা বিরাট চওড়া ড্রেন বেরিয়ে আমাদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতর দিয়ে গেছে। ময়লা জলের ড্রেন নয়।
একদিন দেওয়ালের ধারে, ড্রেনের মুখে মাথা ঝুকিয়ে ডাকলাম-বুড়িদি, ও বুড়িদি বলে। শুনতে পেয়ে বুড়িদিও ড্রেনের মুখে এসে জিজ্ঞেস করলেন-কে? বল্লাম-আমি আনন্দ।- কি বলছো? বল্লাম-বুড়িদি আমি লাপসি খেতে পারছি না, বমি বমি লাগে। সেই বিকেল পাঁচটায় খেতে দেয়। তারপর সারারাত যায়, সকালে লাপসি না খেলে, সেই বেলা বারটা এই উনিশ ঘণ্টা না খেয়ে আমার কান্না পায়। বল্লেন-দাঁড়াও। কিছুক্ষণ পরে একটা বড়সড় পেঁয়াজ, ড্রেনের ভেতর ছুঁড়ে দিলেন। বল্লেন-পেয়েছো। এবার খোসাটা ছাড়াও। ছাড়ালাম, বল্লেন-আবার ছাড়াও, ছাড়ালাম। বল্লেন-আবার ছাড়াও, তিনবার ছাড়াতেই পেঁয়াজ মারবেলের মত হয়ে গেল। বল্লাম-বুড়িদি, এ যে মারবেল হয়ে গেল, আর ছাড়াতে বলো না, তাহলে হাতে আর কিছু থাকবে না। বল্লেন-ঠিক আছে, একবার দাঁতে একটুকরো কেটে লাপসি মুখে দেবে। পরের বার লাপসি মুখে দিয়ে পেঁয়াজটা শুঁকবে। এমনি করে দেখবে আর বমি বমি লাগবে না। বুড়িদির দয়াতেই লাপসি ভোজনযোগ্য হলো। আর বেঁচে গেলাম ক্ষুন্নিবৃত্তি থেকে। বুড়িদির সঙ্গে রানীদি ছিলেন। রানী চন্দ। রানীদি ছিলেন প্রখ্যাতনামা শিল্পী মুকুল দে-র বোন। মুকলদার স্ত্রী বীণাদিও একজন বিদূষী মহিলা, রামমোহনের প্রপৌত্রী-রবীন্দ্র স্নেহধন্যা। রানীদির স্বামী ছিলেন অনিল চন্দ। অনিল চন্দ প্রথমে বিশ্বভারতীর প্রিন্সিপাল পরে রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারী। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। এই অনিলদার একটা ঘটনা বলে না নিলে হয়তো ভুলে যাবো। (চলবে)