আর দ্বিতীয়বার। দুঁদে আইসিএস এস. এন. রায় তখন চীফ্ সেক্রেটারী। খুবই সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ ছিলেন। খুবই ভালবাসতেন। আমরা যা কিছু করেছি-যেমন ভারতীয় ললিত কলা কেন্দ্র, সমকালীন সাহিত্য কেন্দ্র, নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিতা সম্মেলন প্রভৃতি সবেতেই সাহায্য করতেন। এমন কী যখন ‘সমকালীন’ বের করি তখন ওঁর ভাই রণজিত রায় বাটা কোম্পানীর বিজ্ঞাপন অধিকর্তা ছিলেন। রণজিতদাকে বলেছিলেন-আনন্দকে একটু হেলপ করিস। রণজিতদা বছরে ৬টা করে বিজ্ঞাপন দিতেন। সেই সময় সিউড়িতে আমার ছোট বোনের মেয়ে চন্দ্রলেখার পোলিও হওয়ার দরুণ, আমার বাবার চিকিৎসায় অনেক ভালো হওয়া সত্ত্বেও, পায়ের ডিফেক্টটা কিছুতেই সারছিল না। এদিকে বাবা মারা গেছেন, ৩/৪ বছর কেটে গেছে। অনেকদিন থেকে নানান্জনের মুখে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের অলৌকিক চিকিৎসার কথা শুনি। সকলেই বলেন-ধন্বন্তরী। সত্যেনদাকে একদিন ভাগ্নীর কথা বলে, বল্লাম-ডাঃ রায়কে দিয়ে একটা প্রেসক্রিপসন করিয়ে দিন না। সত্যেনদা বল্লেন-ঠিক আছে। কিছুদিন পর ফের দেখা হয়েছে। ভাগ্নীর কথা স্মরণ করালাম, বল্লেন-পরশু রবিবার বেলা ৯টার সময়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ডাঃ রায়ের বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে থেকো। নির্দিষ্ট দিনে এবং যথা সময়ে সত্যেনদা এসে, আমাকে বসার ঘরে অপেক্ষা করতে বললেন। আধঘন্টা বাদে এক বেয়ারা এসে আমাকে নিয়ে গেল। কম্পিত বুকে ঢুকলাম। সত্যেনদা দাঁড়িয়েছিলেন বল্লেন-স্যর এর কথাই বলছিলাম। ডাঃ রায় বল্লেন-বাপার কী? সব বলায়, উনি শুনে বল্লেন-রুগী কই? বল্লাম-আমার বোন কিছুতেই কোলকাতা আসতে চায়না, আপনি যদি দয়া করে একটা প্রেসক্রিপসন করে দেন। সত্যেনদার দিকে ফিরে বল্লেন-কী হে সত্যেন, তাই আবার হয় নাকি? ‘পোলিও রুগী’, চিকিৎসায় কতটা উন্নতি হয়েছে কীসে আটকাচ্ছে, একবার চোখে না দেখে প্রেস্ক্রিপসন করা যায় নাকি? তোমাদের বাড়ী কোথায়। বললাম- সিউড়িতে। কিন্তু আমি এখানেই থাকি। উনি বল্লেন-ঠিক আছে, তুমি সত্যেনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। সিউড়িতে প্রোগ্রাম পড়লে সার্কিট হাউসে থাকবো তো, তুমি গিয়ে তোমার ভাগ্নীকে নিয়ে আসবে, আমি দেখে দেবো। খুবই সহৃদয়তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তা সত্ত্বেও প্রণাম করে, বাইরে বেরিয়ে এসে মনে হচ্ছিল, যেন জ্যান্ত বাঘের সামনে এতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম।
আমরা পাঁচজন বন্ধু সত্যেনদাকে বলেছিলাম, প্রতি বছর রাস্তায় গাছ লাগানো হয়, কিন্তু জলের অভাবে মরে যায়। আবার লাগানো হয়, আবার মরে। আপনি যদি করপোরেশনের জলের গাড়ী ঠিক করে দেন-তাহলে আমরা রোজ সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত ধর্মতলা থেকে লোয়ার সার্কুলার পর্যন্ত চৌরঙ্গী রোডের দুপাশে জল দেবো। গাছগুলি বাঁচবে। বছর বছর লাগানোর ঝামেলা থাকবে না। এবং ‘পাবলিক মানি’-ও বাঁচবে। অপচয় বন্ধ হবে তা ছাড়া আমাদের বিশ্বাস, আমাদের দেখাদেখি বিভিন্ন পাড়ার ছেলেরা তখন নিজেদের বাড়ী থেকে জল এনে, বাড়ীর সামনের লাগানো গাছটায় জল দেবে। সত্যেনদা বল্লেন-গুড্ আইডিয়া। আমি মাথুরকে বলে দিচ্ছি, ওর সঙ্গে দেখা কর। পি.এস. মাথুর তখন ডাইরেক্টার অব্ ইন্ফরমেশন এ্যাণ্ড পাবলিক রিলেসনস মাথুরদার সংগে আমার আগের থেকেই ঘনিষ্ঠতা। যেতেই উনিও বল্লেন-‘গুড্ আইডিয়া’। চীফ্ সেক্রেটারী ওঁকে সব বলেছেন। কিন্তু উনি কী বুঝেছেন সেটা জানতেও পারলাম না। ফোন তুলে পূর্তবিভাগের অধিকর্তা শচীন ব্যাণ্ডো-কে বল্লেন-স্যর ৫টি ছেলে আপনার সংগে দেখা করবে, চীফ্ সেক্রেটারী বলেছেন কী সব গাছ-সংক্রান্ত ব্যাপারে। উনি এমনিতে শচীন বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু ব্যাণ্ডো সাহেব নামেই পরিচিত ছিলেন। প্রচণ্ড সোস্যাল কানেকশন ছিল। এখন ওঁর ৯৪/৯৫ বয়স হলো। মোটামুটি সুস্থ আছেন।
দিন সাতেক পর কাজ কামাই করে, আবার ব্যাণ্ডো সাহেবের কাছে। উনি গাছ আর জল এই কথা দুটোই শুনেছেন। খস্ খস্ করে দুলাইনের ১টা চিঠি লিখে দিলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিনটেণ্ডেন্ট-কে। এক রবিবারে শিবপুরে তাঁর কোয়ার্টারে। সব শুনে উনি বল্লেন-গাছ যত চাও, দিতে পারি কিন্তু জল আমি কোথায় পাবো, তোমাদের মেয়রের কাছে যেতে হবে। চেয়েছিলাম গাছে জল দিতে সেটা যে কী করে ‘গাছ’, হয়ে গেল, বুঝতেই পারছি না। যাইহোক উনি কিন্তু কাবাব-পরোটা খাইয়েছিলেন। তিনচারদিন ঘোরাঘুরির পর একদিন মেয়রকে ধরতে পারলাম। উনি বল্লেন চৌরঙ্গীর ফুটপাত তো, ফোর্টের আণ্ডারে। দেখি কী করা যায়। দিন সাতেক পরে এসো। কী জানি ইনিও কী বুঝেছিলেন। আমরা হয়তো চৌরঙ্গীতে বন মহোৎসব করতে চাইছি কিংবা বিরাট এক সরোবর খুঁড়তে। কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে গেল। গেটের বাইরে এসে, গেটে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করে শপথ করেছিলাম-সমাজসেবী সংগঠনের সদস্য থাকবো, কিন্তু উদ্যোগী হয়ে সমাজসেবার প্লান করবো না। গাছে জল দিতে গিয়ে গোটা প্লানটাই জলবৎ হয়ে গেল।
ডাঃ রায়ের কথা লিখতে গিয়ে, প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কথা এসে গেল। প্রফুল্লদার সংগে ঘনিষ্ঠতা হয়, ২৪ পরগণা জেলা কংগ্রেসের অফিসে, মৌলালীর মোড়ে। প্রফুল্লদা প্রায়ই ওখানে আসতেন। ১৯৪৭-এর আগের থেকেই অতুল্য ঘোষ, হুগলী ব্যাঙ্কের ধীরেন মুখার্জি, ও প্রফুল্লদা খুব চেষ্টা চালাচ্ছেন কংগ্রেসের মধ্যে হুগলী গ্রুপ’-কে চাঙ্গা করার জন্য। বীরভূম কংগ্রেসে মিহিরলাল চট্টোপাধ্যায় গণপরিষদের সদস্য, প্রফুল্ল ঘোষের ডান হাত ছিলেন। মিহিরদাকে ‘কবজা’ করতে পারলে গোটা বীরভূম জেলা কংগ্রেসকে ‘হুগলীগ্রুপ’-এর মধ্যে আনতে পারবেন। তাই প্রফুল্লদা বারে বারেই সিউড়ি যেতেন। একদিন বসে আছেন ২৪ পরগণা জেলা কংগ্রেস অফিসে। বেশ খোস মেজাজে গল্প করছেন। আমি ঢুকতেই বললেন—এই যে এসে গেছে বীরভূমের ছেলে। জানো এদের কালচার বলে কোন জিনিষ নেই। সব সাঁওতালী কালচার। কলাই-এর ডাল, পোস্ত আর কচু-ডিংলের তরকারি, এই হলো ওদের ‘সব চেয়ে ভালো ডিস’। আর জানো ৫/৭ সের পাকা রুইমাছ ধরেছে তো কী করবে জানো? তেতুল দিয়ে টক। ৫/৭ দিন ধরে পচিয়ে পচিয়ে খাবে। রুক্ষ জায়গা, শুধু ধুলো আর ধুলো। বীরভূম সম্বন্ধে আরও নিন্দে-মন্দ করে, বেশ খুশ মেজাজেই এমনভাব নিয়ে থামলেন, যেন আরামবাগের মত জায়গা ভূ-ভারতে নেই। আরামবাগকেই কেন্দ্র করে প্রফুল্লদার সংগঠন। প্রচুর কাজ করেছেন। ওঁর নাম-ই হয়ে গিয়েছিল-আরামবাগের গান্ধী। আর আরামবাগকে নিয়ে প্রফুল্লদার খুব গর্ব। আমি ভাবছি, সবার সামনে তো আচ্ছা করে ঠুকে দিলেন, বীরভূম-কে। কী করা যায়, কী করা যায়। তারপর বল্লাম প্রফুল্লদা, আরামবাগ সম্বন্ধে একটা গল্প আছে, জানেন কী? -কী গপ্পো?
সুরু করলাম। সিউড়িতে এক মুনসেফ্ কোর্টে বসে আছেন, পিয়ন একটা চিঠি দিলো। সেরেস্তাদার দেখলো, চিঠি পড়তে পড়তে মুনসেফ কাঁদছেন। চোখের জল মুছছেন। উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-হুজুর, বাড়ীর থেকে কোনো খারাপ খবর এসেছে? -না না আমার বদলির চিঠি এসেছে। সেরেস্তাদার বল্লো-তা হুজুর ৩ বছর হয়ে গেল এখানে, বদলির চিঠি তো আসবেই। -না, না, তারজন্য নয়। বীরভূমে এসেছি একটা খর সৌন্দর্যের দেশ, ইষ্টবেঙ্গলে বদলি করলে সেটা হলো জলের দেশ তার রূপও আলাদা। আর আমাকে বদলি করলো কী না আ-রা-ম-বা-গে। একটা জলো প্যাচ্প্যাচে জায়গা, গরম, মশা, রাস্তায় চলা দায় প্রতি পদে পদে খানাখন্দ। যাইহোক মুনসেফ্ তো গেলেন আরামবাগ। পরের দিন একটা রিকশায় চেপে কোর্টে যাচ্ছেন। রাস্তায় অনেক জায়গায় খানা-খন্দ জলে ভর্তি। রিকশা থেকে নেমে নেমে সেগুলো পার হন, জুতো খুলে, প্যান্টে কিছু কিছু কাদার ছিটেও লাগে। কোর্টের শেষে পিয়নকে জিজ্ঞেস করলেন-হ্যাঁ হে এতো দেখছি রোজ ৪ আনা করে রিকশা ভাড়া দিতে দিতে তো ফতুর হয়ে যাবো। আর ধোপার খরচও তো খুব হবে। সস্তায় কিছু হয়না? পিয়ন, মাথা চুল্কে বল্লো-সস্তায় আর কী হুজুর, এই ১০ পয়সা দিয়ে একটা গামছা কিনবেন, সেটা পরে জোলো জায়গা খানাখন্দ গুলো পেরোবেন তারপর জামাটামা পরে নেবেন। শুনেই তো মুনসেফের আক্কেল গুরুম। ব্যাটাকে জিজ্ঞেস করলাম, সস্তায় কনভেন্স কী, বলে কি না গামছা। কী জায়গারে বাবা। (চলবে)