কয়েকদিন পরে ক্লাবে গিয়ে শুনলেন, এখানে খুব ভালো জুতো তৈরী হয়, আর দামও খুব সস্তা। এবং টেঁকে অনেকদিন। একদিন বাজারে একটা জুতোর দোকানে ঢুকলেন। হাকিম-কে দেখে দোকানদার তো গদ গদ। ছেলেকে বল্লো-চা নিয়ে আয়। চা-এলো। হাকিম চা খেলেন। তারপর দোকানদার বল্লো-হুজুর একবার বগলটা তুলুন। মুনসেফ ভ্যাবাচ্যাকা। ভাবলেন বগল তুলতে বলছে কেন? কী আর করেন, তুললেন বগলটা। দোকানী ছেলেকে বল্লো-ফিতেটা দে। বগলটা মাপলো, ছেলেকে বল্লো- লেখ সওয়া তিন ‘জ’। হুজুর বাঁ বগলটা। মাপার পর দোকানী বল্লো-ঠিক আছে হুজুর, সাত দিন পরে, আমার ছেলে কোয়ার্টারে গিয়ে জুতো দিয়ে আসবে। হতভম্ব মুনসেফ্ আর্তকণ্ঠে বললেন-সে কী পায়ের মাপ নিলেন না? দোকানী মুচকি হেসে বল্লো-পায়ের মাপ আর কী নেবো হুজুর, জুতো এখানে পরবেন কোথায়? সব তো খানাখন্দ, জলা, ওতো বগলেই রাখতে হবে। আবার ডান বগলটা ভেড়ে গেলে বাঁ বগলে রাখবেন বলে সেটার মাপও নিয়ে রেখেছি। সবাই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। প্রফুল্লদার মুখ খুব গম্ভীর। ভাবলাম এই রে প্রফুল্লদা হয়তো সিরিয়াসলি চটে গেলেন। তাড়াতাড়ি বল্লাম-প্রফুল্লদা, বীরভূম নিয়েও একটা গপ্পো আছে বলি? প্রফুল্লদা ঘাড় নাড়লেন।
শুরু করলাম। —সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে কিউল প্যাসেঞ্জার ছেড়েছে। একটা কামরায় দুটি ছেলে পাশাপাশি বসে। একজন হুগলীর আর একজন বীরভূমের। দুটি ছোকরার নানান কথাবার্তা হতে হতে, শুরু হলো, কোন জেলার লোক বাড়িয়ে কথা বলতে পারে অর্থাৎ একজাজারেসন করে। দুজনেই চেঁচাচ্ছে, আমাদের জেলা বলে এবং উত্তেজিত হয়ে উঠছে। কামরায় বসা এক মাতববর বল্লেন-বাবা সকল, এরপর তো হাতাহাতি শুরু করবে। তার চেয়ে তোমরা একে একে কথা বল, আমরা পাঁচজন শুনে রায় দেবো, কোন জেলার লোক বাড়িয়ে কথা বলতে পারে। টস হলো। টসে বীরভূম জেলার ছেলেটি জিতেছে, সেই আগে কথা বলবে। থাই-এর ওপর থাবড়া মেরে, ছেলেটি বল্লো-আমাদের জেলায় একবার এক ভদ্রলোক। যেই না বলা, দড়াম করে হুগলীর ছেলেটা ওর পায়ে পড়ে বল্লো-কী বললে ভাই, শা-লা বীরভূম জেলায় ‘ভদ্রলোক’? তুমিই জিতেছো। আমাদের জেলার লোক অত বাড়িয়ে বলতে পারবে না। সবাই হেসে উঠলেন, সেইসঙ্গে প্রফুল্লদার মুখটা হাসিতে প্রফুল্লময় হয়ে উঠলো। হাঁপ ছেড়ে ভাবলাম, যাক বাঁচা গেল। প্রফুল্লদা বল্লেন-তুখোড় ছেলে আছো বাবা, আরামবাগ সম্বন্ধে বলে আমাকে খোঁচালে, তারপর নিজের জেলাকে খুচিয়ে আমাকে ঠাণ্ডা করে দিলে, বাহাদুরী আছে। আরে আমি তোমাকে দেখলেই ওইসব বলি। সেকী সত্যিই? বীরভূম একটা ছোট্ট জেলা কিন্তু দেখ দেকিনি, পাঁচ পাঁচটা পীঠস্থান। জয়দেব, চণ্ডীদাস, নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থান। আর রবীন্দ্রনাথ তো জীবনের একাশি বছরের মধ্যে পঞ্চাশ বছর তো বীরভূমেই কাটালেন। যা বল্লে, এগুলো লিখে ফ্যাল, ভাল রসরচনা হবে। ১৯৫৩/৫৪ সাল হবে। আমি তখন সচিত্র সাপ্তাহিকের সম্পাদক। একটা সংখ্যায় বেশ গুছিয়ে ‘আরামবাগের জুতো’ নাম দিয়ে ছেপেছিলাম। প্রফুল্লদা তখন মন্ত্রী। একদিন কোয়ার্টারে গিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। বল্লেন-কয়েকবছর পরে লিখলে। তোমার গপ্পোটা ২/৪ জনকে বলেছিলাম, কিন্তু তোমার মতো করে বলতে পারিনি। ভালোই হলো, এবার এটা পড়তে দেবো। প্রণাম করলাম। বল্লেন-অনেকদিন দেখিনি তোমাকে, মাঝে মধ্যে দেখা দিও।
সশস্ত্র সহিংস ঘটনার জেরে, পান্নালাল দাশগুপ্ত জেলে। জে.পি. কোলকাতায় দুবার এসে, দুবারই ওঁর সঙ্গে জেলে দেখা করলেন। ওঁর সঙ্গে আলোচনা করে বুঝলেন যে উনি মতবাদের দিক থেকে সম্পূর্ণ পালটে গেছেন, এখন গান্ধীপন্থায় বিশ্বাসী। কিছুদিন পরে এসে প্রফুল্লদার সংগে দেখা করেন, সংগে আমিও ছিলাম। আমাকে দেখে বল্লেন-আরে, আনন্দ যে অনেক দিন পর। জেপি পান্নালালদার কথা ওঁকে বলে, বল্লেন-ওঁকে ছাড়ার ব্যবস্থা করুন। উনি তো সংগঠন মূলক কাজ-ই করবেন, অন্তত সেই এরিয়াটার উপকার হবে। আপনি ডাঃ রায়কে বলুন। প্রফুল্লদা বল্লেন-তুমি ডাঃ রায়কে বলো, তুমি বললে কথাটার গুরুত্ব অনেক বেশী হবে। জে.পি. বিধান রায়কে বলা মাত্রই ডাঃ রায় জে.পি.-কে নাকি বলেছিলেন-তুমি গ্যারান্টী দিচ্ছ তো? আমায় লিখে দাও, যে পান্নালালকে তুমি সর্বোদয়ের কাজে লাগিয়ে রাখবে। জে.পি. হেসে বলেছিলেন, ওই রকম করে গ্যারান্টী দেওয়া যায় নাকি? অবশ্য পরে ডাঃ রায় জে.পি-র অনুরোধে পান্নালালদার মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। পান্নালালদা মুক্তি পেয়ে বীরভূম জেলাকেই তাঁর কর্মক্ষেত্র রূপে বেছে নেন। এবং গঠনমুলক কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেন। ৯৫ পেরিয়ে গেছেন, কিন্তু এই বার্দ্ধক্যেও তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরাম নেই। (এই লেখাটা লিখেছিলাম ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৮, পান্নালালদার দেহান্ত হয় ১২ই জানুয়ারী ১৯৯৯)।
আগে সচিত্র সাপ্তাহিকের কথা লিখেছি আমি তখন সম্পাদক। সচিত্র ভারতের মতই ছিল-বঙ্গ ব্যঙ্গ কৌতুকের পত্রিকা। সাহিত্যিক ভবানী মুখোপাধ্যায়, বিশেষ করে অনুবাদ সাহিত্যে খ্যাতনামা। আমাকে খুবই ভালবাসতেন। সপ্তাহে অন্তত ৩দিন আসতেন এবং লেখা ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। একদিন এসেছেন, হাতে এক মস্তবড় বাজারের থলি। বল্লাম-ভবানীদা কী ব্যাপার? কী আছে এতে? বল্লেন-পৃথিবীর সবচেয়ে যে প্রোলেতারিয়েত, তিনিই আছেন রোল করা অবস্থায়। বুঝতে পারলে না, পাপোষ। এতো তো ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছো, লিখতে পারো পাপোষ কে নিয়ে। তবেই বুঝবো বাহাদুর। ভবানীদার কথা রেখেছিলাম। লিখেছিলাম, ‘আমি অল্প মূল্যে কেনা’। এবং ওই নামে বই-ও বেরিয়েছিল। ভবানীদা উচ্ছ্সিত প্রশংসা করেছিলেন, শুধু তাই নয় ৫/৬টি সাহিত্য সভায় নিজে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন।
পদদলিতের জীবনের কথা
শুনিবার অবসর,
ভালো করে জানি, নেই তোমাদের
হও না আপন পর
তবু আমি আজ মাইকের মুখে
বলে যাবো কথা, যত আছে বুকে
সাগরেতে শুয়ে মোটেই আমি যে
শিশিরে করি না ডর।
—
ধর্মতলার গৃহকোণ হতে
মুদ্রামান্যে আনি,
ঘরের বাহিরে বিছিয়ে রেখেছো
আমার এই দেহখানি।
লাঞ্ছনা আর শত অপমান
দেহমন মোর করে খান্খান্
প্রাণ যদি থাকে, কান দিয়ে শোনো
আমার বেদনা বাণী।
তাগাদায় এসে তোমারি দুয়ারে
তোমার-ই পাওনাদার
মোর বুক মাঝে, জুতো ঠুকে ঠুকে
ছেড়ে গেছে হুঙ্কার।
আঁখি জলে আমি ভেসে গেছি হায়
কেইবা তা দেখে, কার বয়ে যায়
অপমান যেন রাবণের চিতা
বুকে জলে অনিবার।
—
তোমার মেয়ের প্রেমিকেরা এসে
বর্ষা-বাদলে ভিজে
চুপসানো চটি মুখে ঘসে যবে
দেখোনিকো তুমি নিজে।
দশসেরী কেউ লঙবুট পরে
মোর বুকে খুলে, তারপর ঘরে
ঢুকেছে যখন মারোনিকো চড়
অদ্ভূত সেই চিজ’-এ
—
লাই পেয়ে পেয়ে, তোমার কুকুর
নবার খাঞ্জাখাঁই।
দাঁত দিয়ে কাটে, এত আবদেরে
বুকের পাঁজরটা-ই
বলিনাকো কিছু মুখ বুজি সহি
তাই ভগবান বড় দুখে কহি,
এ পোড়াকপালে নেই-কিগো সুখ
এমনিভাগ্যটাই।
—
না হয় হোলাম-পাপোষ-ই আমি
অল্প মূল্যে কেনা,
তাই বলে কিগো ‘ফোর ফ্রন্টে- তে
কভু মোরে আনবে না
এক ঘেয়ে সেই গৎ-বাঁধা দিন
চৌকাঠ পাশে ভঙ্গিবিহীন
চিৎ হয়ে পড়ে, কড়িকাঠ গোণা
কত ‘কাঠ’ হলো চেনা,
না-হয় হোলাম পাপোষ-ই আমি
অল্প মুল্যে কেনা।
প্রভাত ঘোষ, সুনীল রায়চৌধুরী ও প্রবীর দাশগুপ্ত এই তিনজন সচিত্র সাপ্তাহিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সচিত্র ভারতের সহযোগী সস্পাদক রাধেশ রায় প্রথমে সম্পাদক হন। ৩ মাস পরে উনি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি সম্পাদক হই। এখানেই খ্যাতনামা কার্টুনিষ্ট চণ্ডী লাহিড়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়। এখানো চণ্ডী আমার স্নেহভাজন, আপনজন। আর মহাশ্বেতাদেবী (গুপ্ত) ও তাঁর মেয়ে খ্যাতনাম্নী অভিনেত্রী অনুভা গুপ্তর সঙ্গে পরিচয় হয়। সাহিত্যিক সরিৎশেখর মজুমদার যিনি আজও আমার হিতৈষী এবং শুভানুধ্যায়ী তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এইখানেই। (চলবে)