বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের মত এত বিরাট প্রতিষ্ঠান, ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয় ছিলো না। ১৫,০০০ হাজার সদস্য। ১৫ দিন ধরে অনুষ্ঠান। মহম্মদ আলী পার্ক। তারপর মার্কাস স্কোয়ার তাতেও অকুলান। আসতে হলো ময়দানে। কিন্তু বঙ্গসংস্কৃতির প্ল্যান হয়েছিল, বড় বিচিত্রভাবে। আমার চৌরঙ্গীতে একটা চালা ঘর আছে। বৃষ্টির দিনে সেখানে বসে চা, মুড়ি খুবই উপভোগ্য। একদিন মদনদা, মদন বন্দ্যোপাধায়, যিনি এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি লিখেছিলেন, এসেছেন। জমিয়ে তেলেভাজা মুড়ি খাওয়া হচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে। কথাবার্তা হচ্ছে। হঠাৎ মদনদা বল্লো-আনন্দ, আর ভাল্ লাগছে না। বল্লাম শরীর খারাপ নাকি? -না না, শরীর খারাপ নয়। বল্লে তুমি আবার চটে যাবে। তোমার তো আবার শান্তিনিকেতনী ঢঙ্ আছে। হেসে বল্লাম-আরে বলোই না ব্যাপারট্য কি? মদনদা বল্লো-এই আমাদের রবীন্দ্র সম্মেলনের কথা বলছি। সেই একই গান, নৃত্যনাট্য না হয় নাটক। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বক্তৃতার কচকচানি। বছরের পর বছর আর কী ভালো লাগে। তাই বলছিলাম, অন্যকিছু করলে হয় না। এই ধর তোমাদের বীরভূমে রাঁয়বেশে, লেটো, তরজা, ঝুমুর বাউল আছে, তেমনি সব জেলাতেই কিছু না কিছু আছে। সে সব আনলে হয় না? আমি বল্লাম-সে তো বিরাট ব্যাপার। অত লোক আনা, তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা এতো অনেক টাকার দরকার। তাছাড়া পরিমল-এর (পরিমল চন্দ্র) মাথায় ঢোকাতে না পারলে এ সম্ভবই হবে না। পরিমল ছিলেন খুব ভালো সংগঠক এবং কয়েকটি ইয়ং ছেলে তার খুব অনুগত ছিলো। ফিঙে পাখির মতো পরিমলের পিছনে লেগে রইলাম। পরিমল রাজী হলো। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। ২৪ চৌরঙ্গীতে মিটিং হলো। অতুল গুপ্তকে সভাপতি করে তৈরী হলো কমিটি। নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনের সেই একই টিম্। ১৩৬০ সনে শুরু হলো বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন। নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলন ও বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন-বাঙালীর সাংস্কৃতিক জীবনে এক অনন্যপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ইতিবৃত্ত লিখতে গেলে, একলা সম্ভব নয়। এই দুটির প্রথম দিকের সংগঠকদের মধ্যে, যাঁরা আগাগোড়া ইতিহাসটা জানেন প্রথম থেকেই, তাঁদের মধ্যে এখনো সুস্থ শরীরে বেঁচে আছেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য ও সুহৃদ রুদ্র এঁরাও প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। এঁরা যদি লেখেন তবেই সম্ভব।
মনীষী প্রাজ্ঞ এবং খ্যাতনামা আইন বিশারদ ছিলেন, অতুলচন্দ্র গুপ্ত। ওঁকে সমকালীন-এ লেখার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। একদিন ১টা চিঠি পেলাম। ‘সবিনয় নিবেদন, সমকালীন-এর জন্য একটি লেখা তৈরী করেছি। কিন্তু লেখাটা পেন্সিলে কাজেই এমন কাউকে পাঠাবেন, যিনি লেখাটা আমার সামনে পড়ে নেবেন’। রবিবার ১০টা নাগাদ রাসবিহারী এভিনুয়ের বাড়ীতে হাজির হলাম, একটু ক্ষুণ্ণ মনেই। বারান্দায় পরিচারককে দিয়ে তেল মাখাচ্ছিলেন সেই সময়। গেলেই রসগোল্লা খাওয়াতেন, পরিচারককে আনতে বললেন। খুবই ক্ষুব্ধ কষ্ঠে বললাম-আপনি আমার সঙ্গে খুবই আপত্তিজনক ব্যবহার করেছেন। আমাকে ‘আপনি’ বলে চিঠি দিয়েছেন। আমার মনে খুবই লেগেছে। আমি রসগোল্লা খাবো না, বলে চিঠিটা বের করলাম। একটু হেসে বল্লেন-চিঠিটা ওলটাও তো। কী লেখা আছে পড়ো। বল্লাম-লেখা আছে, সম্পাদক সমকালীন : ২৪ চৌরঙ্গী রোড, কলিকাতা। আনন্দগোপাল লেখা নেই তো। বল্লাম-আজ্ঞে না। -তবে, সম্পাদকের একটা সম্মান আছে তো? আমি অতুল গুপ্ত হই আর যেই হই, এখানে তো লেখক। সেদিন ওঁর কাছেই শিখেছিলাম-‘বিনয়ের জন্য কোনো পয়সা খরচ করতে হয় না’। লেখাটা ছাপা হলো-‘ডায়লেক্টিস্’। বহু চিঠি এসেছিলো। বাংলা ভাষায় ৮ পাতার মধ্যে ওই কঠিন বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা মনীষী অতুল গুপ্তের পক্ষেই সম্ভব। লেখাটি আবার এক সংখ্যায় ছাপতে হয়েছিল।
কমলদা। কমলকুমার মজুমদার একজন মননশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর পরিচিতির পরিধি বহুবিস্তৃত। তাঁর সম্বন্ধে কত গল্প না প্রচলিত। সুবর্ণরেখার ইন্দ্রনাথ মজুমদারের সহযোগিতায় এবং উদ্যোগে প্রকাশিত ‘অঙ্ক ভাবনা’ বলে একটি পত্রিকা তখন সম্পাদনা করছেন কমলদা। কলেজষ্ট্রীটে ‘কথাশিল্প’-তে অফিস। একদিন বেলা ৪টের সময় গেছি। কমলদা রয়েছেন। আমাকে দেখে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দিতে লাগলেন। শালা, সমকালীন-এ নিজে লিখে আমার নাম দিয়ে ছাপছো। শালা, তোমাকে আমি দেখে নেবো। আমি বল্লাম-কমলদা আজ তো দেখছি সোজা খালাসীটোলা থেকে এসেছো। খালাসীটোলা হচ্ছে বিখ্যাত পানশালা, অবশ্য দেশী মদের। কাল বা পরশু সোজা এখানে আসবে? বল্লেন গম্ভীর গলায়-পরশু আসবো। চারটে খাতা। পেনসিলে লেখা, নিয়ে গেছি। কমলদা এসেই-আরে আনন্দগোপাল যে, মঞ্জু ভালো আছে? একেবারে অন্য কমলদা। কমলদার কথায় কান না দিয়ে খাতা ৪টে হাতে দিলাম। দেখেই কমলদা বল্লো-আরে এতো আমারই খাতা রে। আমি বল্লাম-এই খাতাগুলি কয়েকবছর আগে আমাকে দিয়ে বলেছিলে-অশোক মিত্রর (আই.সি.এস্.) সঙ্গে তোদের বীরভূমে গিয়ে অনেকদিন ছিলাম। মাটির কাজ নিয়ে এই সব নোট নিয়েছি, দেখিস এগুলো নিয়ে কিছু দাঁড় করাতে পারিস কিনা। তোমার লেখাগুলো এডিটিং করে গুছিয়ে মৃৎশিল্প নাম দিয়ে ৪টে সংখ্যায় ছেপে, কী অন্যায়টা করেছি যে তুমি পরশু অশ্লীল, কুশ্লীল ভাষায় সবার সামনে আমাকে গালাগাল দিলে। -আরে ছাড়, তোদের মত কয়েকটা বাহাদুর ছেলে আছে বলেই না কোলকাতাটা ভালো লাগে। তারপর কমলদা নিজ থেকেই চেষ্টা করে সমকালীন-এর ১৪টা গ্রাহক করে দিয়েছিলেন।
১৯৫৩-তে শুরু করি সমকালীন। তখন আমি সচিত্র সাপ্তাহিকের সম্পাদক। ১৯৫২ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময়, সোস্যালিষ্ট পার্টি, সৌম্যদার আর.সি.পি.আই. ও লীলাদির নেতৃত্বাধীন সুভাষবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক নিয়ে একটা ফ্রন্ট হয়েছিল। ফলে সৌম্যদা ও লীলাদির (রায়) সঙ্গে খুবই নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন কনটেমপোরারী রাইটার্স এসোসিয়েসনের সদস্য। এঁদের দুজনকে সস্পাদক করে সমকালীন প্রকাশিত হতো। পরিচালক হিসেবে আমার নাম ছাপা হতো। নারায়ণ চৌধুরী কিছুদিন পর ওঁর নাম বাদ দিতে বললেন। ছাপা হতে লাগলো যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আনন্দগোপাল সেনগুপ্তর নাম। বছর পাঁচেক চলার পর, বিজ্ঞাপনদাতারা মনে করত, এটা রাজনেতিক পত্রিকা। সৌম্যদার নাম থাকায় বিজ্ঞাপন পাওয়া মুস্কিল হয়ে গেল। বল্লাম সৌম্যদাকে। সৌম্যদা বল্লেন-আমি তো তোমাকে প্রথমেই আমার নাম দিতে বারণ করেছিলাম। লোকে আমাকে লেখক সাহিত্যিক হিসেবে মনেই করে না, তারা আমার রাজনৈতিক দিকটাই দেখে। আমার নাম বাদ দিয়ে দাও।
পঞ্চাশের দশকে কবি ষ্টিফেন স্পেনডার এসেছেন, কলকাতায়। আমাদের খোঁজ পরিষদে বক্তৃতা করার জন্য, আমরাও তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। অধ্যাপক অতীন বোস, কবিকে সংগে করে নিয়ে এলেন। কথা ছিল বত্তৃতার পর, নীচে সমকালীন-এর ঘরে এনে তাঁকে চিড়ের নাডু, মুড়ির নাডু, কদমা, বাতাসা, নারকেল, নাডু, পিঠে, এই সব বাঙালী খাবার টেষ্ট করানো হবে। বত্তৃতার পর যথারীতি তাঁকে ‘সমকালীন’ অফিসে নিচের তলায় আনা হলো। মোট আমরা ৭/৮ জন আছি তারমধ্যে যতদূর মনে পড়ছে খ্যাতনামা কার্টুনিষ্ট চণ্ডী লাহিড়ীও উপস্থিত ছিলেন। কবিকে টেষ্ট করানা হচ্ছে খাবারগুলি, অতীনদা প্রত্যেকটি খাবারের গুণাগুণ ও তৈরীর বাখ্যা করে দিচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তায় ‘রবীন্দ্রনাথ’ এসে গেল। আর ‘রবীন্দ্রনাথ’ এসে গেলে, রবীন্দ্রসংগীত আসবে না, তাই হয় নাকি?
হঠাৎ অতীনদা ইংরেজীতে বল্লেন-আনন্দ তুমি তো রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শী ইংরেজীতে ট্রানস্লেশন করে একটা সুর শুনিয়ে দাও না? উঃ অতীনদা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ অধ্যাপক হয়ে, কী গ্যাসটাই না আমাকে দিলেন। গানের ‘গ’ জানিনা, আর আমাকেই অনুরোধ সাহেবকে গান শুনিয়ে দাও। এদিকে সাহেব তখন আমাকে বলছে-প্লিজ, প্লিজ। খ্যাতনামা ইংরেজ কবি আমাকে গান গাইতে অনুরোধ করছে-লজ্জায় মরে যচ্ছি। কী আর করি। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের একটি গান, পঙ্কজ মল্লিকের, গাওয়া —
দিনের শেষে ঘুমের দেশে
ঘোমটা পরা ওই ছায়ায়
ভুলালোরে ভুলালো মোর প্রাণ।
(চলবে)