এই গানটি রেডিও এবং রেকর্ডে খুব শোনা যেত। গানটির সুরকার নাকি রবীন্দ্রনাথ নন। কিন্তু পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া সুরটিকে কবিগুরু অনুমোদন দিয়েছিলেন। স্নান করবার সময় হেঁড়ে গলায় গানটা প্রায়ই গাইতাম। সুরটা মোটমুটি বজায় রেখে ট্রানস্লেশন করে গাইলাম।
End of day, land of sleep
Putting veil that shadow
Charm me and charm my heart.
বিয়ের পর আমার স্ত্রী, কয়েক বছরই সেন্ট ক্যাথিড্রালচার্চে ২৫শে ডিসেম্বর নিয়ে যেতেন, ওখানে ক্যারল শুনতাম। গান গাইতে গাইতে মাথায় খেলেছিল-একে ইংরেজ কবি, তাই আবার খ্রীষ্টান সেইজন্য হার্ট কথাটিকে ক্যারল-ষ্টাইলে গেয়েছিলাম-হা…..র্ট। আমার ভাগ্য ভালো যে স্পেনডার সাহেব, ইংরেজীতে অনূদিত জর্জ বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীত শোনেননি, নয়তো আমাকে জুতোপেটা করতেন।
সমকালীন-এর সম্পাদক, ম্যানেজার, বিজ্ঞাপন-অধিকর্তা, টাইপিষ্ট, প্রুফরীডার বিল কালেক্টার পিয়ন ইত্যাদি সব কাজই করতাম একলা। একবছরে ১২টি সংখ্যা বের করে, সঙ্গে নিয়ে এক প্রখ্যাত কেমিকাল কোম্পানীর অধিকর্তার কাছে গেছি। স্লিপ দিয়েছি। ডেকে পাঠালেন। নমস্কার করে তাঁর টেবিলে ১২টি সংখ্যা রেখে বল্লাম-সাহিত্য পত্রিকা টেকে না। ‘কয়েক মাস’ বেরিয়েই বন্ধ হয়ে যায়। আমি ১২টি সংখ্যা বের করে, বৈশাখ মাসের জন্য একটা বিজ্ঞাপন দেবেন, এই আশা নিয়ে এসেছি। জিজ্ঞেস করলেন-কী কাগজ? বল্লাম-সমকালীন। হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন-স-ম-কা-লী-ন। ব্যাঙের ছাতার মতো ৫০০ কাগজ, বনধ করে দিন। হতভম্ব আমি। বিজ্ঞাপন দেবেন না-সেটা বল্লেই পারতেন, তা না বলে বন্ধ করে দিতে বলছেন কাগজ। খুবই বিনত হয়ে বল্লাম-ঠিক আছে, আপনি বলছেন, আমি বন্ধ করে দেবো। কিন্তু আমার একটা নিবেদন ছিল। চশমাটা খুললেন, একটা ডুফোল্ড মোটা পার্কার পেনে লিখছিলেন, সেটা বন্ধ করে টেবিলে রাখলেন। তারপর গুরু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন- কী নিবেদন? বল্লাম-স্মিথ ষ্ট্যানিষ্ট্রিট, বেঙ্গল কেমিক্যাল, মে এ্যাণ্ড বেকার প্রভৃতি, পমেটমস্ বলুন, মেডিসিন বলুন, সবই তো দিচ্ছিল, এদের পেছন পেছন আপনি আবার একটা কোস্পানী করতে গেলেন কেন? চশমাটা পড়লেন। টেবিলে ৪/৫ টা ধেড়ে কোলা ব্যাঙকে এক করলে যেমন হয়, সেই রকমের ১টা কলিংবেল। থাবড়া মারলেন তাতে, আওয়াজ হলো ঘঙ্ ঘঙ্। বেয়ারা এলো, বল্লেন-অমুককে ডেকে দাও। ভাবলাম নিশ্চয়ই দারওয়ানকে ডেকে পাঠালেন, এবার আমার ঘাড় ধরে বের করে দিতে বলবেন। খুব ভয় ধরে গেল। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছি। উনি কাজ করতে লাগলেন। ৫/৭ মিনিট পরে একজন আসতেই তাঁকে বল্লেন-এই ছোকরাকে ১ পেজ বিজ্ঞাপন দিয়ে দিন, আর ব্লকটাও হাতে হাতে দিয়ে দেবেন। সেই ভদ্রলোক আমাকে বল্লেন-আসুন আমার সঙ্গে। আমিও যেতে উদ্যত। উনি বল্লেন-শোনো বাবা, জুন মাসের মাঝামাঝি একবার এসো। সেই সময় আমাদের বাজেট হয় চেষ্টা করবো, তোমার একটা বন্দোবস্ত করার। হাঁফছেড়ে বাঁচলাম। যতদিন বেঁচেছিলেন, বিজ্ঞাপন পেয়েছিলাম।
এইচ.সি. মিত্র ছিলেন, ব্রিটিশফার্ম শ’ওয়ালসের উচ্চপদস্থ অফিসার। এইচসি মিত্রকে রাঙা কাকা বোলতাম। আত্মীয়ের মত সস্পর্ক। শ’ওয়ালসের বছরে ৪টে করে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। একদিন গিয়ে খুব কাঁচুমাচু হয়ে বল্লাম-রাঙাকাকা আর ২/১টা বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করে না দিলে, বড্ড অসুবিধা হচ্ছে। কাকা বল্লেন-ব্যাটা বদমাশ, আমাকে পাকা কলা পেয়েছো? ৪টে যে বিজ্ঞাপন পাও, ষ্টেটস্ম্যান ছাড়া অন্য কাগজে বের হয়? আর একটু কাকুতি মিনতি করায় রাঙাকাকা একটু নরম হয়ে বল্লেন-দ্যাখ্ বেটা, আমাদের ওয়াইন- ডিপার্টমেন্টে, এক নূতন আইরিশ সাহেব এসেছে, তোর সংগে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। তাপ্পি তুপ্পি মেরে যদি ম্যানেজ করতে পারিস। বল্লাম-রাঙাকাকা, নূতন সাহেব, কথাই হয়তো বুঝতে পারবো না। রাঙাকাকা বল্লেন-তুই বেটা চালু আছিস ঠিক বুঝতে পারবি। এই না বলে, সেই সাহেবের ঘরে ঢুকে বল্লেন-আমার নেফিউ, একটা পত্রিকা বের করে তোমার সঙ্গে বিজ্ঞাপনের কথা বলতে এসেছে। এই বলে সাহেবকে একটা বো’ করে, রাঙাকাকা স্মার্টলি বেরিয়ে গেল।
সাহেব জিজ্ঞেস করলো-হোয়াটস্ দ্য নেম অব দ্য জার্নাল। বল্লাম- বেগ ইয়োর পারডন স্যর। আবার বলায় বুঝলাম কাগজের নাম জিজ্ঞেস করছে। বল্লাম- সমকালীন। -হোয়াট ইট মিনস্। বল্লাম-কনটেম্পোরারী। ইন ইংলিশ। একটা কাগজে সাহেব লিখলো। বল্লাম-নো স্যর, সমকালীন মিনস্ কনটেম্পোরারী। ইন্ ইংলিশ। সাহেব বল্লেন-হোয়াটস্ দা ল্যাংগোয়েজ। বেগ ইউর পারডন স্যর বলে বুঝতে হলো। বল্লাম-বেঙ্গলী। তারপর বোল্লাম-সার হ্যাভ ইউ হার্ড দি নেম অব্ নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথ টেগোর। সাহেব বল্লেন-নো। বল্লাম-থ্যাঙ্ক ইউ স্যর, হিজ মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ। তারপর সাহেব এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে, বেগ ইয়োর পারডন সার বলি, আর আন্দাজে উত্তর দিই। একবার যেন মনে হলো, সাহেব জানতে চাইছেন কী এতে ছাপা হয়। বল্লাম-আমরা তো সবে স্বাধীনতা পেয়েছি। আমাদের লিটারেচার এখনো ডেভেলাপ করেনি, আমরা সব সেক্সপীয়ার, বাইরন, শেলী, এলিয়ট, ফ্রয়েড্ ইত্যাদির লেখা, অনুবাদ করে ছাপি। সাহেব বল্ল-নাইস্ নাইস্। বেগ ইয়োর বলতে হয়নি, এটা পষ্ট বুঝেছিলাম। প্রায় আধঘন্টা পর সাহেব বল্লো-সরি কান্ট হেল্প। বেগ ইয়োর পারডন স্যর বলে এটাও বুঝতে হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি বল্লাম-তুমি কী জানো? স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আমাকে কারারুদ্ধ করেছিলো। আর জানো কী, ছাত্র জীবনে কার লেখা আমাদেরকে স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। আইরিশ নেতা ডি ভালেরার। আর তুমি আইরিশমান হয়ে, টুক সো মাচ্ অব্ মাই টাইম, আর এখন বলছো, সরি কান্ট হেল্প। মনে হলো সাহেব যেন বোম্কে গেছে। বল্লো-হোয়াট্স্ দ্য রেট। অনেক কষ্টে বুঝলাম, বিজ্ঞাপনের রেট জানতে চাইছে। রেট কার্ড দিলাম। হাফ পেজের তলায় একটা লাল দাগ টেনে কী যেন লিখলো, বল্লো-গো টু খামার। ঘাবড়ে গেলাম খামার কোথায় রে বাবা। দুবার বেগ ইওর পারডন স্যার বলে খামারের আগের দুটো কথা বুঝতে পারলাম, ডি.জে. কিমার। সাহব কিমারকে খামার বলছে। নমস্কার নয়, একটা স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে এলাম। রাঙাকাকার ঘরে ঢুকে সব বল্লাম। খুব খুশী হলেন। -বস্ বেটা, একটা আনকোরা সাহেবকে কাত করেছিস। স্যান্ডুইচ্ আর কাটলেট খেয়ে যা।
পরের দিন ফোন এলো সুভায সেনের। বল্লেন-আনন্দগোপাল একবার আসবে, তোমাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গেলাম বিকেলের দিকে। সুভাষের ঘরে। দুজন একজিকিউটিভ সেখানে বসে আছে। সুভাষ বল্লো-কী বাপার বল তো? শ ওয়ালশে কয়েকদিন হলো এক নূতন সাহেব এসেছে। আর ষ্টেটস্মান ছাড়া ‘জনি ওয়াকার’-এর বিজ্ঞাপন নিয়মিত কোথাও বের হয় না। আর সমকালীন-এ কী না ১২টা বিজ্ঞাপন? একটু আলোকপাত করবে, কী করে ম্যানেজ করলে বাবা। আমি উল্লসিত হয়ে বললাম ১২টা হাফ পেজ পেয়েছি বুঝে গেছি। তিনজনেই বলে উঠ্লো কী বুঝেছো? বল্লাম-নূতন সাহেব এসেছে বলছো। সে দেখলো শুধু ষ্টেটস্ম্যানেই বিজ্ঞাপন যায়। তার ইচ্ছে হয়েছে আর একটা কাগজে দিতে। ষ্টেটস্ম্যান ‘এস’ দিয়ে। সাহেবের মাথায় ঢুকছে ‘স’ দিয়ে নাম হলে, ষ্টেটস্ম্যানের সমতুল্য না হোক কাছাকাছি হবে নিশ্চয়ই। পত্র পত্রিকার বই ঘেঁটে দেখলো সমকালীনওতো ‘এস’ দিয়ে। কাজেই দিয়ে দিয়েছে। সবাই হেসে উঠ্লো। সুভাষ বল্লো-ওয়েল সেড্। তারপরে আনুপূর্বিক পুরো ঘটনাটা বলায়, তিনজনের সে কী হাসি। চেপে ধরলাম তিনজনকে- বাঃ বেশ হাসলে, এনজয় করলে এ্যাট্ মাই এক্সপেন্স, তা হবে না, আমার এক পেজ কম পড়ছে সামনের মাসে, একটা বিজ্ঞাপন দিতেই হবে। তিনজনে সানন্দে একমত হয়ে সিডিউল ছাড়া আরও এক পেজ বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। (চলবে)