আমার চাকরির জন্য, যোগেশ জ্যাঠার চেষ্টার সঙ্গে, কাকতালীয়বৎ আর একটি ঘটনা ঘটে গেল। একদিন ওয়েলেসলি ষ্ট্রীট দিয়ে হাঁটছি প্রায় পার্কষ্ট্রীটের কাছাকাছি। এক বৃদ্ধা নানও চলেছেন। তাঁর বাঁ হাতে, এক বাস্কেট ভর্তি জিনিষপত্তর। হঠাৎ বাস্কেটটি হাত থেকে পড়ে গেল, কয়েকটা প্যাকেট ফুটপাতে। আমি তাড়াতাড়ি সেগুলো বাস্কেটে ভরে, ওঁর হাতে তুলে দিলাম। তিনি যেন সচকিত লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন। সঙ্গে চলেছি। তিনি বল্লেন — কাছেই ক্যামাক স্ট্রীটে সেরাই কেল্লার রাজার বাড়ির আউট হাউসে থাকেন। আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন — কোথায় থাকি কি করি কি নাম ইত্যাদি। আমি আমার স্বল্প ইংরেজী বিদ্যা নিয়ে আস্তে আস্তে আমার দুরবস্থার কথা বলতে থাকি। পৌছে গেলাম তাঁর আস্তানায়। দরজা খুলে তিনি আমাকে ভেতরে ডেকে নিলেন। বসতে বলেই, তিনি নিজে কফি তৈরি করে আমাকে ১ কাপ কফি ও বিস্কুট দিলেন। মনে হতে লাগলো যেন কোনো মাসী বা পিসীর বাড়িতে এসেছি। নাম জানলাম মাদার মারিয়া। জন্মস্থান অস্ট্রেলিয়া, বয়স ষাটের ওপর। বল্লেন-বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত ফ্রী থাকেন, আমি যেন মাঝে মধ্যে আসি। মাসী মনে করেই সটান এক প্রণাম ঠুকে দিলাম, পায়ে হাত দিয়ে। শশব্যস্তে উনি যেন বিগলিত হয়ে গেলেন।
সপ্তাহে ২ দিন, ৩ ঘন্টার জন্য আই বি অফিস। ১ দিন অন্তর যোগেশ জ্যাঠার কাছে, চাকরির তাগিদ দিতে যাওয়া আর উকিলদা খবর পাঠালে, যথাস্থানে পৌছে দেওয়া। বাকী সব সময় ফ্যা ফ্যা করে ঘোরা আর ইংরেজী সিনেমা দেখা। ভালো করে ইংরেজী শেখার জন্য। এখন হলো সপ্তাহে ২/৩ দিন মারিয়া মাসীর কাছে যাওয়া।
‘প্লেস সিডন গাফ’ ছিল ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দালাল প্রতিষ্ঠান। খাঁটি ইংরেজ কোম্পানী। এখানে দুজন উচ্চশিক্ষিত ডাইরেক্টর ছিলেন, সি এইচ্ হিপ, আর কর্নেল ইলিয়ট। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এঁরা দুজনেই রেসের ঘোড়ার মালিক ছিলেন। আমার ‘ঘোড়া কর ভগবান,-এ দুটি লাইন আছে,
হিপ সাহেবের টিপ দেওয়া ঘোড়া
মার খেয়ে গেল ঠায়।
মারিয়া মাসীর সঙ্গে এঁদের যোগাযোগ ছিল। মারিয়া মাসীকে, এঁরা খুবই শ্রদ্ধা করতেন। এঁরা ইংল্যাণ্ডের লেবার পার্টির সদস্য। সে জন্য ভারতীয় সোস্যালিষ্টদের সংগেও কিছুটা যোগোযোগ ছিল। মারিয়া মাসীর কাছে গেছি একদিন। সন্ধে ৬।। টায় উঠবো উঠবো করছি। দু-জন প্রৌঢ় সুদর্শন দীর্ঘদেহী সাহেব ঢুকলেন। মারিয়া মাসী পরিচয় করিয়ে দিলেন সি এইচ হিপ, কর্নেল ইলিয়ট বলে। তাঁরা হাত বাড়িয়ে দিলেন। খাঁটি সাহেবের সঙ্গে জীবনে এই প্রথম করমর্দন। বুকটা যে একটু কাঁপেনি, এটা শপথ করে বলতে পারবো না। মারিয়া মাসী বল্লেন — এই হচ্ছে আনন্দ, এর চাকরির কথাই তোমাদেরকে আমি বলেছিলাম। একে সি এস পির সদস্য, তায় সদ্য জেল ফেরত কাজেই সাহেবদের মনটা আমার প্রতি সহৃদয় ছিলো মনে হয়। হিপ্ সাহেব টুকিটাকি দু-চার কথা জিজ্ঞেস করলেন। শিক্ষিত ইংরেজের উচ্চারণ, কাজেই কথা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধাই হচ্ছিল না। মারিয়া মাসীর কাছে, একটা কাগজ চেয়ে নিয়ে, খস্খস করে লিখলেন কোম্পানীর নাম আর ঠিকানা ৬নং লায়ন্স রেঞ্জ। বল্লেন — এইটা নিয়ে কাল সকালে ১০ টার আগে আমার সঙ্গে দেখা করো। কাল থেকেই চাকরি করবে। বল্লাম — সাহেব চাকরি আমি করবো না। — তবে কি করবে? — আমি শেয়ার মার্কেটের ব্রোকার হতে চাই। মেদিনীপুর জেলে তিনজন শেয়ার মার্কেট সম্বন্ধে অভিজ্ঞ সহবন্দী ছিলেন তাদের কাছ থেকে শুনে শুনে আমার খুবই ইচ্ছে, শেয়ার মার্কেটের ব্রোকার হওয়ার। আমার কথা শুনে দুই সাহেবই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। হিপ সাহেব বল্লেন-ইয়ংম্যান, অত সহজ নয়। কয়েকজন রিচম্যান তোমার পেছনে থাকা চাই। যারা তোমার মারফত শেয়ার কেনাবেচা করবেন, তবেই ব্রোকার হতে পারবে। কিছু ট্রেনিং পেলে। কিন্তু ধনীলোক সাপোর্টার মাস্ট। আমি বল্লাম-আমার বাবার অনেক বড়লোক বন্ধু আছেন এখানে। হিপ সাহেব বল্লেন-ঠিক আছে অন্তত ৬টা চিঠি তুমি লিখিয়ে আনো যেন আমাকে এ্যাড্রেস করে, তাঁরা লিখছেন যে তুমি ব্রোকার হলেই তাঁরা তোমার মারফত শেয়ার কেনাবেচা করবেন। বল্লাম — ঠিক আছে। সাহস করে হাত বাড়িয়ে সেকহ্যাণ্ড করলাম। আর বুকটা কাঁপেনি। আমার একটা হিল্লে হচ্ছে বুঝে, মারিয়া মাসীর মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ক্যালকাটা কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর সুধীন দত্ত ও মহালক্ষ্মী কটন মিলের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ধীরেন দত্ত সি এস পির লোক ছিলেন। তাঁদের কাছে সব কথা বলতেই তাঁরা বেশ গুছিয়ে চিঠি লিখে দিলেন। গেলাম যোগেশ জ্যাঠার কাছে। সব শুনে যোগেশ জ্যাঠার সে কি উল্লাস। চল্ চল্ ভেতরে চল্। — শুনছো বীজেশের মা (প্রসঙ্গত বলি, এঁদেরই ছেলে বীজেশ সেন বিধান রায়ের আমলে মন্ত্রী ছিলেন) তোমার এই ব্যাটা তো মাত্ করে দিয়েছে। খোদ ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে সেকহ্যাণ্ড করেছে। সাহেব চাকরি করে দিয়েছিলো। করলো না। বলেছে ব্রোকার হবো। সাহেবরা ওর কথাতেই রাজী। উঃ কী দুর্ভাবনা যে ছিল। কি করে পুলিশের নজর থেকে বাঁচবে, কী করে চাকরি হবে, কী করে মতি-র (আমার বাবা) কাছে মুখ রক্ষা হবে। এই চিন্তাতেই দিন কাটছিল। যাক্ বেটা নিজের কপালগুণেই ব্যবস্থা করে নিয়েছে, আর ভাবনা নেই। জেঠিমা বল্লেন, — খেয়ে যাবি। বল্লাম — না আমাকে অনেক জায়গায় যেতে হবে। — তাই কি হয় একটা ভালো খবর আনলি একটু বস। তারপর কাছে বসিয়ে খাওয়ালেন দু-খানা মাছভাজা আর একবাটি পায়েস।
যোগেশ জ্যাঠা ৩ দিনের মধ্যে তাঁর নিজের, তাঁর বড় ভাই রমেশ সেনের ও পাঁচজন বন্ধুর মোট ৭টি চিঠি, হিপ সাহেবের নামে লিখে দিলেন। উপরন্তু আমার বাবার ও আমাদের পরিবারের সম্বন্ধে বেশ কিছু লিখে দিলেন। গেলাম হুগলী ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ধীরেন মুখার্জির কাছে, লিখে দিলেন। প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন বল্লেন — আমি তোর কিছু ক্লায়েন্ট জোগাড় করে দেবো। (সদ্য প্রয়াত্) সংগীত শিল্পী ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্রের কাছে গেলাম-সানন্দে লিখে দিলেন চিঠি। সাহেব চেয়েছিলেন ৬টি চিঠি। নিয়ে গেলাম ১১টা। হিপসাহেব খুব খুশি। বল্লেন — তুমি দুজন ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের চিঠি নিয়ে আসবে কল্পনাই করিনি। ভেরি গুড, ওয়েলডান্। ডেকে পাঠালেন জেনারেল ম্যানেজারকে, দেখেই আঁতকে উঠলাম। বুলডগের মতো চেহারা, মুখে পাইপ, চিবিয়ে কথা। হিপ সাহেব বল্লেন — ওকে ট্রেনি হিসেবে আমি নিয়েছি। ব্যবস্থা করো যাতে তাড়াতাড়ি ট্রেনিং পায়। আর মাসে ১০০-টাকা করে এ্যালাউন্স দিও। তখন মারচেন্ট ফার্মে মাইনে ছিল ২০/-আর ডিএ ২৩/-মোট -তেতাল্লিশ টাকা।
টিণ্ডেল সাহেব-কাম অন্ উইথ মি, বলে নিয়ে এলেন বড়বাবুর কাছে। টিপিক্যাল গলাবন্ধ কোট। চেয়ারে রাখা আছে পরিপাটি ভাঁজ করা চাদর। টিণ্ডেল সাহেব বড়বাবুকে বল্লেন-হিপ সাহেব একে রিক্রুট করেছে ট্রেনি হিসেবে। তুমি ব্যবস্থা কর যাতে, দিস্ বয় তাড়াতাড়ি ট্রেনিং পায়। আর হাঁ, একাউন্টটেন্টকে বলো ১০০/- করে যেন এ্যালাউন্স দেয়। বড়বাবুর হাতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল সিপি টিণ্ডেল। আমার ধড়ে প্রাণ এলো। (চলবে)