বড়বাবু জিজ্ঞেস করলেন-কি নাম। বল্লাম। — বাড়ী কোথায়? সিউড়ি। সিউড়ি শুনেই উনি উচকিত হলেন, আগেই জেনেছেন আমার টাইটেল সেনগুপ্ত। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন — বাবার নাম কি?-কবিরাজ মতিলাল সেনগুপ্ত। — আরে আমি তোমার বিনোদ পিসেমশায়। তুমি তখন জেলে, আমরা সপরিবারে কোলকাতা থেকে পালিয়ে কয়েকমাস সিউড়িতে ছিলাম। মতিদা-ই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কবে ছাড়া পেলে। দাঁড়াও, দাঁড়াও বলে ফোন তুললেন-কে নেপেন, আরে শোনো সিউড়ির মতিদার ছোট ছেলেটা, যার জেল হয়েছিল, ছাড়া পেয়ে কোলকাতায় এসেছে। আমার সামনে বসে। টিণ্ডেল আমাকে এসে বল্লো, হিপ সাহেব ট্রেনি হিসেবে ওকে নিয়েছে যত তাড়াতাড়ি পারো ট্রেনিং দাও। কোথায় উঠেছে তা জানিনা। সে ব্যবস্থা করা যাবে, হয় তোমার কাছে, নয় আমার কাছে। তাহলে পাঁচটার পর এসে ওকে নিয়ে যাও। কাল আমি তোমার দিদির কাছে নিয়ে যাবো। এরপর বিনোদ পিসেমশাই ফিসফিস করে, আমাকে বল্লেন — তুমি যে ট্রেনি এটা কাউকে বলো না। অনেকে হিংসে করবে, বাগড়া দেবে। যেন তুমিও চাকরি করছো এইভাবে চলবে। আর কক্ষনো যেন মুখ দিয়ে ১০০/-টাকা পাওয়ার কথা না বের হয়।
একই বলে কপাল। কী বিচিত্র যোগাযোগ। আমার দাদামণি পরম বৈষ্ণব কীর্তিচন্দ্র সেনগুপ্তর শ্বশুরবাড়ির সবাই গয়াতে সেটেলড করেছিলেন। দাদামণি বেশ কয়েক বছর অবস্থাপন্ন শ্বশুরবাড়িতে বসেছিলেন। আমার দাদামণি ছিলেন সাধারণ গেরস্ত। মোটামুটি চলে যায়, এই অবস্থা আর কি। অবস্থা মোটামুটি ছিল বলে দাদামণি সাধারণ মানুষ ছিলেন না। অসাধারণ মানুষ ছিলেন। গৌরবর্ণ, দীর্ঘদেহী, বৈষ্ণবশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য, সংস্কৃতে অশেষ ব্যুতপত্তি এবং নামকরা কীর্তনীয়া ও কবি। খ্যাতনামা সংগীত শিল্পী হিসেবে ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্রের কীর্তনে অনুরাগ দাদামণির জন্যেই। এই ধীরেন মিত্রের কাকা গয়ার খ্যাতনামা ব্যবহারজীবী উপেন মিত্র, সিভিল সার্জেন দীননাথ স্যান্নাল, ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ অমিয় স্যান্ন্যালের বাবা। সরকারী উকিল চারুচন্দ্র বসু এঁরা ছিলেন দাদামনির অন্তরঙ্গ বন্ধু।
এই চারুচন্দ্র বসুর ছেলে নৃপেন বসু কোলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকার ছিলেন। এই পারিবারিক সূত্রেই নৃপেন বোস কাকা আর তাঁর ভগিনীপতি বিনোদ ঘোষ পিসেমশাই।
আগেই বলেছি, একেই বলে কপাল। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জেলে গেলাম, আবার জেল থেকে বেরিয়ে আর এক ব্রিটিশের স্নেহধন্য হয়ে শেয়ার মার্কেটে ট্রেনি হোলাম। উপরন্তু অফিসের বড়বাবু হয়ে গেলেন পিসেমশাই। একেবারে সোনায় সোহাগা। অফিসে সবার সঙ্গে ভাব হয়েছিল। বিশেষ করে আমারই বয়সী একটা ছেলে নাম বলু। জহর গাঙ্গুলীর অনুকরণ করে কথাবার্তা বলতো, সবসময় আমাকে আগলে আগলে রাখতো যাতে বাজে কারো পাল্লায় না পড়ি। একজনেরও বিরুপতা ছিল না আমার প্রতি। শুধু বৃহস্পতিবার ছাড়া বাকি ৫ দিন হৈ হৈ করে কাটতো। প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বুকটা ধড়ফড় করতো, কারণ বিকেল পাঁচটার পর টিণ্ডেল সাহেবের ঘরে যেতে হতো, কি কি শিখলাম তার জবাবদিহি করতে। যেটুকু শিখতাম, গড় গড় করে প্রথমেই বলে দিতাম। বুলডগের মত চোহারা মুখে পাইপ, চিবিয়ে কথা, অর্দ্ধেক কথা তো বুঝতেই পারতাম না। আন্দাজে, ইয়েস সার, নো স্যর বলে চালাতাম।
অফিসের পর চলে যেতাম কলেজ ষ্ট্রীট মার্কেটের দোতালায়। তখন সিএসপি ব্যানড্। সেজন্য কংগ্রেস সোসালিষ্ট মেনস্ এ্যাসোসিয়েশন নাম দিয়ে, হুমায়ুন কবীরের সভাপতিত্বে প্রাদেশিক সংগঠন চলছে। রাত্রিতে লিখতাম সচিত্র ভারতের জন্য ব্যঙ্গ কবিতা, অন্যান্য কাগজের জন্য সিরিয়াস লেখা।
অফিসে এক কালো ফিরিঙ্গি সাহেব, টেলিফোন অপারেটর ছিলেন-নাম ষ্টিফেন্স। ডাকতাম টিপুদা বলে। মধ্যবয়সী, রসিক লোক। একদিন অফিসের পর বল্লাম — টিপুদা একটা লাইন দেবে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলবো। বন্ধু অশোককে চাইছিলাম, ধরেছে ওর বোন আরতি। এটা ওটা কথার পর বল্লাম — একটা গান শোনাও না। একটু গাঁই গুই করে আরতি গাইছে — মন না রাঙায়ে, কাপড় রাঙালে, কি ভুল করিলে যোগী, আমি কি ছাই জানি, টেলিফোন বোর্ডে বসে, টিপুদাও গান শুনছে। টেলিফোন ছাড়তেই টিপুদা চেঁচিয়ে ডাকলেন — কাম অন মাই ডিয়ার বয়। কি গার্ল ফ্রেণ্ড গান গেয়ে শোনালো, গুড্ গুড্। জীবনে এই প্রথম গার্ল ফ্রেণ্ড কথাটা শুনলাম। আঁতকে উঠলাম। নিশ্চয়ই খুব খারাপ কথা, খারাপ ব্যাপার। অনুনয় বিনয় করে ভীত কণ্ঠে বললাম — টিপুদা বিশ্বাস করো গার্ল ফ্রেণ্ড নয়। আমার বন্ধু অশোকের বোন। ওর বাবা সিউড়িতে এস ডি ও ছিলেন। টিপুদা হাসতে হাসতে বললেন-ঘাবড়াও মাত আই উইল নট টেল এনি বডি। যতদিন অফিসে ছিলাম, হাজার দরকার থাকলেও টিপুদার কাছে টেলিফোন লাইন চাইনি।
আর একজন অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মহিলা মিস্ মান। হিপ সাহেবের ষ্টেনো। দীর্ঘাঙ্গিনী, সুগঠিত দেহ সুষমা, খুব ভালো বাস্কেটবল খেলতেন। টিমের কাপ্তেন ছিলেন। আমাকে খুব ভালবাসতেন। যেদিন ওঁর খেলা থাকতো আমাকে ট্যাক্সি করে মাঠে নিয়ে যেতেন, আই সি আই অফিসের উল্টো দিকে। খেলার শেষে পার্কস্ট্রীটের কোনো রোস্তোঁরায়। এমনি করে পার্কস্ট্রীটের সবকটা ভালো রেস্তোরাঁ ঘোরা হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ঘোরা হয়েছিল নামী দামী সব হোটেলগুলোও। কোষ্ঠীতে আছে, আমি নাকি লগনচাঁদা। তা না হলে, একটা মফস্বলের ছেলে কোলকাতায় আসতে না আসতে নামী দামী রেস্তোরাঁ আর হোটেলগুলোতে রাউণ্ড মেরে দিলাম বারেবারেই। ভুলে যাবেন না তখনও ব্রিটিশ আমল।
সব জেলার কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড ছিল। সেই ডিরেক্টার বোর্ডের মিটিং হত কোলকাতায়। এবং রীতি ছিল, এক এক জন ডিরেক্টার পালাক্রমে, হোটেলে লাঞ্চ খাওয়াবেন। আমার পিতৃবন্ধু সিউড়ির ক্ষিতীশচন্দ্র মিত্র একজন ডাইরেক্টার ছিলেন। তাঁর সেবার পালা। উনি ফিরপোতে (পেলেটি) রাজভবনের উল্টোদিকে, লাঞ্চে আমাকে যেতে বল্লেন। সে কি বিপুল রকমারি খাবার, শুনলাম চার্জ তিনটাকা বারো আনা। সবাই প্রবীণ, বেশী খেতে পারলেন না। আমি কিন্তু গোগ্রাসে টেনে খেয়েছিলাম। সবাই খুব খুশি। বল্লেন — যাক্ বেটা আনন্দ, কিছুটা দাম উশুল করেছে। তাঁরা ঠিক করলেন, সব পার্টিতেই আনন্দর স্টান্ডিং নেমন্তন্ন। ফলে সেই আমলে আমার ঘোরা হতে লাগলো গ্রেট ইষ্টার্ন, গ্রান্ড, ফিরপো প্রভৃতি বড় হোটেলগুলো।
অফিসে আর একজন ছিলেন, মোহনবাগানের প্রাক্তন প্লেয়ার রবি দত্ত। আমাকে ভালবাসতেন খুব। টিফিনে বাইরে নিয়ে গিয়ে খুব খাওয়াতেন। আমাকে নিজের পয়সায় টিফিন প্রায় খেতেই হতো না। আর ছিলেন মিঃ হ্যারিসন, একজন ডাইরেক্টার। বৃদ্ধ, ডানপা-টা টেনে টেনে চলতেন। হাতে লাঠি। প্রায় আলিপুরে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতেন, বুড়ি মিসেস হ্যারিসনকে আন্টি বলতাম। ডিনার খাইয়ে, ড্রাইভারকে বলতেন, এসপ্লানেডে পৌছে দিয়ে এসো। (চলবে)