দেখতে দেখতে কয়েক মাস কেটে গেল। টিণ্ডেল সাহেব ফাইনাল পরীক্ষা নিলেন। পরের দিন হিপ সাহেব ডাকলেন, শেয়ার সংক্রান্ত কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। সঠিক উত্তর শুনে খুশি। ইতিমধ্যে নৃপেন কাকা, হিপ্ সাহেবের ঘরে ঢুকলেন। কথাবার্তা চলছে। আমি শুনলাম, নৃপেন কাকা সাহেবকে বলছেন — ইট উইল বি ডান। নিয়ম ছিল প্রত্যেক ব্রোকার ফার্ম দরকার পড়লে ছ-মাস অন্তর ১টা কার্ড পাবে। যাতে তাদের ফার্মে তারা ব্রোকার রাখতে পারে। তবে রেট ছিলো ১০০০০/-টাকা। পরে শুনেছিলাম হিপ্ সাহেব বিষেণদয়াল দয়ারামকে বলেছিল, টাকাটার গ্যারেন্টার থাকবে হিপ সাহেব। এবং ব্রোকারীর দরুণ যতদিন ফার্মে আমার নামে দশ হাজার টাকা জমা না পড়ে, ততদিন আমি কোনো টাকা পাব না, শুধু ১০০/- টাকা হাতখরচ বাদে। নৃপেন কাকা ও হিপ সাহেবের সহযোগিতায়, আমি একটা সহায় সম্বলহীন মফস্বলের কোয়ার্টার শিক্ষিত ২৪ বছরের ছেলে ব্রোকার হয়ে গেলাম কোলকাতা ষ্টক একসচেঞ্জের। এটা জীবনের আর একটা টার্নিং পয়েন্ট।
হিপ্ সাহেব বলেছিলেন প্রত্যেকদিন সকাল ৯টায় অফিসে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে। আমাকে টিপস্ দেবেন, এবং তৎপরতার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের যেন জানাতে পারি। প্লেস সিডনের টিপস মানে অব্যর্থ। জমে উঠলো আমার ব্রোকারী। প্রায় ৩ মাসে জমে গেল দশ হাজার টাকা। শোধ হল ঋণ। হিপ্ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। এই প্রথম হিপ্ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেকহ্যান্ড করলেন। হাসিমুখে বল্লেন — ওয়েল ডান্ আনন্দ, আই অ্যাম ভেরী হ্যাপি। ইলিয়ট সাহেব, হ্যারিসন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে, ঢুকলাম টিণ্ডেল সাহেবের ঘরে — মে আই কামিন স্যর বলে। মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে বেশ চেঁচিয়েই বল্লেন — হ্যালো আনন্দ কাম অন্ কাম অন্, কনগ্রাচুলেশনস। টিণ্ডেল সাহেবের মুখে প্রথম হাসি দেখলাম। বসতে বললেন। না বসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাজার হোক আমার শিক্ষক তো। বিনোদ পিসেমশাই কাজ শেখাতেন এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্টে। সবাই ভাবতো নিজের লোক তো, উঁচুতে তুলবে তাই ওভাবে কাজ শেখাচ্ছে। কিন্তু যখন চলে এলাম এবং ব্রোকার হোলাম অনেকেই খুব বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু আমার বন্ধু বলু আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠেছিল, অবশ্য জলও দেখতে পেয়েছিলাম ওর চোখে। যোগেন জ্যাঠা, ধীরেন মুখার্জি অনেক ক্লায়েন্ট জুটিয়ে দিলেন, রমরমিয়ে ব্রোকারী চলছে, চলছে কবিতা লেখা আর সোস্যালিষ্ট পার্টির কাজ।
এসে গেল ১৯৪৬ এর ভয়াল ভয়ঙ্কর দিন। সে দিন গুলোর কথা, লিনচ্ করতে দেখা — কী বীভৎস, কী বেদনাময়। এখনও রাত্রিতে ঘুম ঘোরে মনে এসে গেলে, এখনও ৫২ বছর পরেও শিহরিত হয়ে ঘুম ভেঙে যায়। উঠে ২/৩ গ্লাস জল খেতে হয়। ঘন্টাখানেক বসে থাকি বিছানায় নিঃসাড়ে। তখন বউবাজার ও শিয়ালদার মোড়ের কাছে চোরা বাজারের লাগোয়া একটা বাড়ির তিনতলায় থাকি। তখন নুনেরও রেশন ছিল। আমাদের নুন ফুরিয়ে গেছে। তাই দাদার বন্ধু ব্রহ্মগোপাল মিত্রের ভাইপো দ্বারকেশ ও আমি সকাল ৮টায় নুন আনতে গেলাম, বিষ্টুদার বাড়িতে। তিনিও সিউড়ির লোক। থাকতেন, শিয়ালদার কাছাকাছি শান্তিনিকেতন বোর্ডিং হাউসের সামনে হায়াত খাঁ লেনে। আমরা যেতেই বৌদি চা খাবার দিয়েছেন, প্রায় দশটা বাজে। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দেখি শান্তিনিকেতন বোর্ডিং-এর নীচে পানের দোকান থেকে সোডার বোতল নিয়ে ছোঁড়াছুড়ি হচ্ছে। আমরা বৈঠকখানা লেনে ঢুকতে গেলাম, সেখানে মারপিট। আমরা গুটি গুটি পায়ে সব দিকে তাকিয়ে আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীটে পৌছালাম-সেখান থেকে শ্রদ্ধানন্দ পার্ক। আবার আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীট ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বউবাজার। দোকান পাট বন্ধ। রাস্তা শুনশান, শুধু গলির মোড়গুলিতে জটলা। ঐটুকু রাস্তা। কিন্তু বাড়ি পৌছাতে আমাদের লাগলো ১ ঘণ্টা। ছাতে উঠে দেখি, শিয়ালদার মোড়ে কয়েকটা লাশ পড়ে আছে। শিয়ালদার মোড়ে হাতে হাতে সবুজ পতাকা। চিৎকার আল্লা হো আকবর। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। আর এদিকে চোরাবাজারের মাঝ বরাবর শয়ে শয়ে লোক। বেরিয়ে এসেছে আশেপাশের সব গলি থেকে। মুখে চিৎকার বন্দে মাতরম্। সেই সময় আমাদের মুখের দিকে তাকালে দেখতে পেত দুটি ছোকরার মুখ আমসি-মার্কা হয়ে গেছে ভয়ে-তরাসে।
গোটা পাড়া একাত্মা হয়ে গেছে কয়েক ঘন্টায়। সারা রাত্রি আল্লা হো আকবর আর বন্দে মাতরম্। দেখছি দূরে দূরে আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়া। এক এক পাড়ায় পুড়ছে এক এক ধরণের বস্তি। পাড়ার ছোকরারা ইতিমধ্যেই বহু ইট তুলে ফেলেছে আমাদের ছাতে। বাড়িটা চোরাবাজারের গায়ে। এবং শিয়ালদার মোড় থেকে ডান ফুটপাত ধরে, আমাদের বাড়িটাই উঁচু। পরের দিন সকাল থেকে দেখলাম শুধু খুন আর খুন। ছাত থেকে দেখলাম বহুবাজার ষ্ট্রীটে এমবি সরকারের দোকানের সামনে এক ভিখিরিকে কী ভাবে একটি একটি করে হাত পা কেটে কেটে লিনচ্ করলো। পুলিশ বা মিলিটারী বলে কোনো কিছু নেই। যে বাড়ির চাল ডাল ফুরিয়েছে অন্য বাড়ি থেকে তাদের চাল ডাল সরবরাহ করা হচ্ছে। রাত্রি জেগে ছোকরাদের চোখ লাল, চেহারা উগ্র। শিয়ালদার থেকে শুরু করে দু-পাশের দেকানগুলো লুঠ হচ্ছে। ঠিকমত সাইনবোর্ড দেখে এক এক পক্ষ দোকানণ্ডলো লুঠ করছে। জিনিষগুলো নিয়ে যাচ্ছে যেন দাম মিটিয়ে ক্যাশমেমো নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসছে।
১৬, ১৭, ১৮ তিনদিন এই চলছে। কত লোক যে মরেছে। কত পরিবার আশ্রয় হারিয়েছে এই তিনদিনে আমার তা জানা নেই। ১৯ তারিখ দুপরে আমাদের পাড়ায় এলো মিলিটারী গাড়ি, প্রত্যেক গাড়িতে একজন পুলিশ অফিসার। ছুঁড়তে লাগলো টিয়ার গ্যাস। রাস্তা ফাঁকা। তখন ছুঁডতে লাগলো সব ছাত লক্ষ্য করে। একটা এসে পড়লো আমাদের ছাতে। এক বালতি জল নিয়ে ঢালতে গিয়ে পড়ে গেলাম মুখ থুবড়ে একেবাবে টিয়ার গ্যাসের শেলটার ওপরে। মরি আর কি। দ্বারকেশ তাড়াতাড়ি আমার পা দুটো ধরে, ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে এলো সিড়ির ধারে। তারপর চোখে মুখে জল দিয়ে আমাকে ধাতস্থ করে। টিয়ার গ্যাসের অভিজ্ঞতা তাও জীবনে প্রথম।
আমরা কেবলই ভাবছি, বিষ্টুদাদের কথা। তাঁরা কি বেঁচে আছেন? কিন্তু পাড়া ছেড়ে যাবার সাহসও নেই। কেবলি চিন্তা। একদিকে যেমন দেখেছি অমানুষী পৈশাচিক উল্লাস। মনুষ্যত্বের অধঃপতিত অবমাননা। তেমন দেখলাম মানুষের মত মানুষ। যাঁরা সম্প্রদায় হিসেবে মাথা গুণে গুণে, মানুষ মনে করার লোক নন। গোটা মানুষ। ঋজু মানুষ। ম্যান নয় হিউম্যান।
আমাদের পিছনের বাড়িতে থাকতেন সাহুবাবু। শুনেছিলাম তিনি ছিলেন খ্যাতনাম্নী অভিনেত্রী ও তারকা কঙ্কাবতী দেবী ও চন্দ্রাবতী দেবীর বাবা। জানালায় দাঁড়িয়ে, নীচে চোরাবাজারের এক মুসলমান দোকানদারের সঙ্গে তার বন্ধুতু প্রায় ৩০ বছরের। ভদ্রলোক দোকানেই থাকতেন। ১৬ই অগষ্ট রাত্রিতে দড়িতে টুল বেঁধে বাড়ির লোকদের সহায়তায় অনেক কষ্টে ওপরে তুলে তাঁকে আশ্রয় দেন। ১৮ তারিখ সকালেই পাড়ার ছোকরারা জানতে পেরে, ছোরা ছুরি কাটারী নিয়ে হাজির। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ১টা সরু প্যাসেজ, শেষপ্রান্তে সাহুবাবুর বাড়ি। ছেলেরা হুমকি দিচ্ছে সাহুবাবুকে, যে তাদের হাতে ওই মুসলমান ভদ্রলোককে ছেড়ে দিতে হবে। সাহুবাবু অটল, অনড়। তাঁর চোখে দেখেছিলাম এক উদ্ভাসিত আলো। গলার শিরা দপদপ্ করছে মনের জোরে। — ও ভগবানকে ডাকে আল্লা বলে, আমি বলি হরি। শুধু মুখের কথায় এইটুকু তফাৎ। আর কিছু নয়। আমাকে যিনি করেছেন, তাকেও তিনিই তৈরী করেছেন। তাছাড়া আমার ৩০ বছরের বন্ধু। আমাকে না মেরে, তোমরা ওঁর গায়ে হাত দিতে পারবে না। বাহ্যিকে তিনি হিন্দু। কিন্তু আমি দেখেছিলাম, জাতপাতের ধার ধারেন না, এমন একজন অসাম্প্রদায়িক বিবেকবান মহৎ মানুষকে। (চলবে)