আনন্দদার সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলবো না। আনন্দদাকে প্রায় লোক ভুলেই গেছে। আনন্দদা, আনন্দদা। দ্বিতীয় খুঁজে পাওয়া খুব মুস্কিল। আনন্দদাকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। লিখব ধীরে ধীরে। এরকম দিল খোলা মানুষের দেখা পাওয়া সত্যি খুব মুস্কিল। আনন্দদার এই লেখাটা সকলকে পড়ার অনুরোধ করবো। কিছু প্রশ্ন থাকলে করবেন, আমি তার উত্তর দেবার যথাযথ চেষ্টা করবো। — জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়।
অগষ্ট আন্দোলনে সশ্রম কারাবাস। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে মেয়াদঅন্তে বেরিয়ে সিউড়ি। কিছুদিন পরেই কার্যকারণে আসতে হল কোলকাতা। জীবনে এই প্রথম কোলকাতায় আসা। তখন আমার বয়স বাইশ। বছরটা ১৯৪৪ সাল।
বৃহম্পতিবার কি শুক্রবার হবে। মেট্রোয় সিনেমা দেখে, পৌনে একটায় বেরিয়ে ধর্মতলার মোড়ে, চৌরঙ্গী কাফের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। ওপার থেকে তিনটে লোক নিকাল গিয়া নিকাল গিয়া, বলে ছুটতে ছুটতে আসছে। একজন আমাকে মারলো এক ধাক্কা। পড়ে গেলাম। পরণে ছিল গেরুয়া পায়জামা আর সাদা পাঞ্জাবী। তিনজন ভদ্রলোক আমাকে তুলে বল্লেন- কি হে ছোকরা, লেগেছে নাকি। বল্লাম-দেখুন না, কি অসভ্য লোক ফুটপাথের উপর ছুটছে, হাঁটুর কাছে আমার পায়জামাটা ফেঁসে গেল। তাঁরা বল্লেন-তা বাবা কি করবে বল, আজ তো রেসের বই বেরিয়েছে, ওরা এইরকম ছুটতে ছুটতে পার্ক ষ্ট্রীট পর্যন্ত যাবে। বল্লাম- রেসের বই, সে আবার কি? বল্লেন-সে কি গড়ের মাঠে অত বড় রেসকোর্সটা দেখনি? বল্লাম-না। -তুমি কি নতুন কোলকাতায় এসেছো? বল্লাম-হ্যাঁ সবে জেল থেকে বেরিয়ে, এই প্রথম কোলকাতায় এসেছি। -জেলে? চমকে উঠলেন তিনজনেই। একজন বল্লেন- অগষ্ট আন্দোলনে? তিনি হয়ত আমার খদ্দরের পায়জামা পাঞ্জাবী লক্ষ্য করে থাকবেন। বল্লাম-হ্যাঁ। -কোথায় ছিলে? -মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। সঙ্গে সঙ্গে ওঁরা হাত ধরে আমাকে চৌরঙ্গী কাফেতে ঢুকিয়ে, চেয়ারে বসালেন। একজন বল্লেন-ওহে একটা কবিরাজী কাটলেট দাও। আর একজন বল্লেন-ওই সঙ্গে একটা ফিশ চপও। আমি বল্লাম-না, না আমি ওসব খাবো না। তাঁরা সমস্বরে বল্লেন-তাই কি হয়? খেতেই হবে তোমাকে কিছু। আমি বল্লাম-আমি চিনি দিয়ে মাখন মাখানো টোষ্ট খাবো। একজন ভুরু কুঁচকে বল্লেন- কবিরাজী কাটলেট না খেয়ে মাখন টোষ্ট? তাঁরা তো জানেন না, যে ছোটবেলায় সিউড়িতে আমরা হলদেটে এই সলিড মাখন খাইনি। সকালবেলায় বড় ১টি থালায়, মার্বেলের মত সাদা সাদা ননীর নরম গোল্লা-’মাখন লেবে গো মাখন’ বলে ফেরি করত। মায়ের কাছে ১টা পয়সা নিয়ে, দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে কিনে খেতাম। কোলকাতায় এসে এই চিনি দিয়ে মাখন মাখানো টোষ্ট খেয়ে, মনে হত যেন অমৃত।
টোষ্ট খাচ্ছি। আর ওঁরা জিজ্ঞেস করছেন সব জেলের কথা, কি খেতে দিত। কি ভাবে অত্যাচার করতো। এক এক ওয়ার্ডে কতজন থাকতাম। জেলে ডাণ্ডা-বেড়ী পরানোর দরুণ তখনো আমার পায়ে দাগ ছিল। সেটা দেখে, মনে হলো আমার প্রতি ওঁরা সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠেছেন।
তারপরেই আরম্ভ করলেন-ঘোড়া। ঘোড়ার কথা। -জানো বাবা, একটা একটা ঘোড়ার দাম তিন থেকে চার লাখ টাকা। এমনি ঘোড়া নয়। রেসের জন্য ট্রেন্ড ঘোড়ার। ডাক্তার দেখছে সব সময়। মালিশ করার লোক আছে। আস্তাবল তো নয় যেন রাজকক্ষ। নাদি জানো, নাদি? ওজন হয়। আজকে যদি ২/১ আউন্স কম বেশি হয়, তবে তিনটে ডাক্তার ছুটে আসে। জকি কাকে বলে, টিপস কি, বেটিং কাকে বলে। অফিসিয়াল বুকি ছাড়া, সারা কোলকাতায় নন্ অফিসিয়াল বুকি ছড়িয়ে আছে। যাদেরকে ঘোড়ার জুয়াড়ী বলা হয়। এঁদের কাছে চার আনা থেকে শুরু করে, বহু টাকার রেস খেলা যায়। পার্ক ষ্ট্রীটে দেখবে, একটা বিরাট বাড়ি আছে-গলষ্টোন ম্যানসন। ওই গলষ্টোন সাহেব রেস খেলেই ওই বাড়ি করেছিল, আবার ওই রেস খেলেই সর্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি বেচতে হয়। কত বড়লোক, গরীব হয়ে গেছে। কত গরীব হয়েছে বড়লোক। কত স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এই রেস খেলা নিয়ে। দু ঘণ্টা ধরে তাঁরা ঘোড়া দিয়ে আমার মগজ ধোলাই করলেন। মনে হতে লাগলো, আমি যেন ঘোড়াময় হয়ে গেছি, আর আমার আশে পাশে শুধু ঘোড়ার পায়ের ক্ষুর ধ্বনি। এরি মধ্যে একজন কিন্তু চেয়ারে পা-টা তুলে, কোন লোক যেমন মাঝে মাঝে বলেন-’হরি হে কৃপা কর’ তিনিও একই টোনে মাঝে মধ্যে বলে চলেছেন-’রাজার ছেলে হে, রাজার ছেলে’। উঠলাম। তাঁরা বল্লেন-বাবা, আমরা বৃহস্পতি থেকে শনি, বেলা ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত এখানেই থাকি। মাঝে মধ্যে এসো।
রাস্তায় ধর্মতলা ষ্ট্রীট দিয়ে হাঁটছি। মাথায় শুধু ঘোড়া। ঘোড়া ছুটছে, লাফাচ্ছে। আমি যেন ঘোড়ার পিঠে জকি হয়ে বসে আছি। কিংবা রেসে আমিও লক্ষ লক্ষ টাকা পেয়ে গলষ্টোন সাহেবের চেয়েও বড় বাড়ি করেছি। সুন্দরী মেয়েদের হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে আমাকে বিয়ে করার জন্য। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে প্রত্যাখ্যান করেই চলেছি, পছন্দ আর হয় না। ঘোড়া আমার মাথায় কত আজগুবি কল্পনাই না গড়ে তুলছে।
এদিকে চোখে দেখছি ব্যাফল ওয়াল। রাস্তায় জীর্ণ কংকালসার নরনারী। একটু খেতে- পাবার জন্য কোনরকমে হাতদুটি জোড় করে কাতরাচ্ছে। বাচ্ছাগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে-যেন ক’টি হাড়ের ওপর একটি ফিনফিনে চামড়ার ফতুয়া পরে আছে। নগ্ন উলঙ্গ। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের জের তখনও চলছে। মাথায় ঘোড়া আর চোখে মর্মান্তিক এই সকরুণ দৃশ্য। বিভোর বিহ্বল হয়ে বউবাজারের ডেরায় এলাম। এসেই বসলাম কাগজ-কলম নিয়ে- আচমকাই, অজান্তে, কোনো পূর্বভাবনা ছাড়াই হাত দিয়ে বেরিয়ে এলো, আমার জীবনের মস্ত বড় এক টার্নিং পয়েন্টের কবিতা-
মানব জীবন, খোঁড়া করে প্রভু
ঘোড়া কর ভগবান,
বেতো ঘোড়া নয়, ছ্যাক্ড়া টানিয়া
আবার যাইবে প্রাণ।
***
রেসকোর্সের ইপ্সিত ঘোড়া
করে মোরে ছেড়ে দিও,
তোমা চেয়ে বেশি ভক্ত জুটিবে
শনিবারে দেখে নিও।
***
প্রতি শনিবারে, মোর লাগি হবে
উদ্দাম, জনরোল,
গ্রীবাটি বাঁকায়ে নূতন ঢংএতে
শুনিব সে কলরোল।
***
এমনিতো কেউ ফিরে নাহি চাহে
কুঁচকায়নাকো চোখ,
রজত-শায়ক ছুড়িবে তখন
খালি করে নির্মোক।
***
আমার পূজারী পাইনাকো খুঁজে
আশেপাশে চারিধারে
রেস ঘোড়া হলে, আমারে জপিয়া
কত লোক যাবে মরে।
***
সপ্তাহ ধরি, ফিস ফিস করি
হবে কত কানাকানি,
আমারই জন্য, ডুয়েল লড়িয়া
ফাটাইবে মাথা জানি।
***
মোর কথা কত রাখিবে গোপনে
শুনিতে না পায় মাছি,
আমার সহিসে, রাজার দুলালও
করিবে আমড়া-গাছি।
***
মোর ফ্যান্সিতে হবে গৃহছাড়া
সেই তো আমার দাম,
তুমি যে গো কেন, বুঝিয়া বোঝনা
কেন বিধি হও বাম।
***
বাইশ বছর মানব জীবন
কাটায়ে দেখিনু প্রভু,
কিছু নেই এতে শুকনো ছিব্ড়ে
রস পাই নাই কভু।
***
টানাটানি আর ধকলেতে হায়
ধুক, ধুক করে প্রাণ,
মানব জীবন, খোঁড়া করে প্রভু
ঘোড়া কর ভগবান।
***
পরের দিনই পাঠিয়ে দিলাম সচিত্র ভারতে। সচিত্র ভারত ছিলো রঙ্গ, ব্যঙ্গ, হাস্যরস, কৌতুক কার্টুনের চালু পত্রিকা। বেরিয়ে গেল তিন সপ্তাহ পরে। এক লেখাতেই খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, পরিচিতি। দিন দশেক পরে ১০/-টাকার একটি মনি অর্ডার। আর সম্পাদক প্রবোধ সমাদ্দারের একটি চিঠি। সম্বোধন। -শ্রদ্ধেয় আনন্দগোপাল বাবু। চিঠি পড়ে, আমার আর হাসি থামে না। জীবনে ওরকম চিঠি এই বাইশ বছর বয়সে। হেসে হেসে কূল কিনারা পাই না। (চলবে)
জ্যোতি’দা, আপনার দৌলতে অনেক দিন পর আবার আনন্দ বাবুর লেখাটা পড়লাম। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।