পশ্চিমবঙ্গের জাতপাতের শিকল আছে? নাকি এই বঙ্গে তা কোনও কালেই ছিল না। রাজ্যে ভোটের আবহ তৈরি হতেই দলিত বাড়িতে বড়ো মাপের রাজনীতিকদের পাত পেড়ে খাওয়ার দৃশ্য দেখে প্রশ্নটা মনে জাগছে। বছর কুড়ি আগে দৈনিক সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল জেলায় জেলায় স্কুলে উচ্চবর্ণের ছেলে-মেয়েরা নিম্নবর্ণের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে একপাতে বসে মিড ডে মিল খেতে চাইছে না। উচ্চবর্ণের অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের এমনটাই শেখাচ্ছেন। এই খবরে বিচলিত হয়ে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বাঁকুড়ায় গিয়েছিলেন। কি হচ্ছে তা নিজের চোখে দেখতে। সেই যাত্রায় আমি এবং আর এক সাংবাদিক প্রসূণ আচার্য বিমান বসুর সঙ্গী হয়েছিলাম। বাঁকুড়ায় গিয়ে আমরা তেমন কিছুই দেখতে পাইনি। উল্টে দেখেছিলাম একটি বড়ো সরকারি স্কুলের মাঠে বিমান বসু সব বর্ণের পড়ুয়া এবং তাঁদের অভিভাবকদের সঙ্গে পাত পেড়ে খেলেন, আমরা দুই সাংবাদিকও দুপুরের সেই পঙক্তি ভোজনে ছিলাম। তার মানে এই নয় যে, বঙ্গে কোথাও জাতপাতের ছুঁতমার্গ নেই। ২০ বছর আগের এই কথা মনে করার কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিকদের দলিত পরিবারে গিয়ো পাত পেড়ে খাওয়ায়। এইভোজ রাজনীতিতে মানুষের ভোট ঝোলায় আসবে কিনা তা জানা নেই। তবে দলিতদের বে-আব্রু অবস্থাটা যে ঢাকা পড়বে না তা বলাই যায়।
দলিতদের সামাজিক অবস্থান বদলের লড়াই প্রতিপক্ষের জমিতে দাঁড়িয়ে শুরু করেছিলেন বি.আর.আম্বেদকর। যার ফলে এই প্রশ্নে মহত্মা গান্ধীর সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে। বিদেশের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুরি ভুরি ডিগ্রী নিয়ে ১৯১৭ সালে বরোদায় ফেরেন অতি মেধাবী আম্বেদকর। বরোদায় ফিরে তিনি দেখেন অছ্যুৎ শব্দটা তাঁর শরীরে জন্মদাগ হয়ে বসে আছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতি বদলাতে গিয়ে আম্বেদকর বুঝেছিলেন হিন্দু ধর্ম থেকে জাতপাত শিকড় শুদ্ধ উপড়ে না ফেলতে পারলে সমস্যা ঘুঁচবে না। তাই আম্বেদকর কলম ধরেছিলেন, লিখেছিলেন, অ্যানহিলেশন অফ কাস্ট। অস্পৃশ্যতা দূর করায় গান্ধীজির লড়াই জাড়ি থাকলেও বর্ণাশ্রমের পক্ষেই ছিলেন বাপু। তাই অ্যানহিলেশন অফ কাস্ট প্রকাশিত হতেই তিনি আম্বেদকরের বিপরীত মেরুতে চলে যান। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই প্রশ্নে গান্ধী বিরোধিতা থেকে সরে আসেননি আম্বেদকর। তারপরে দেশে অনেক বড়ো বড়ো পরিবর্তন হয়েছে। এ রাজ্যে ও রাজ্যে দলিত বা তফশিলি জাতি থেকে উঠে আসা কোনও কোনও রাজনীতিবিদ ক্ষমতার শীর্ষে বসেছেন। তফশিলি জাতি উপজাতির জন্যে সংরক্ষন চালু হয়েছে। মন্ডল বনাম কমন্ডূলের দ্বন্দ্ব ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছে, অনেক আইন-কানুন তৈরি হয়েছে। কিন্তু দলিত বা নিম্নবর্গের মানুষের অবস্থার বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয় নি।
সাচার কমিটির রিপোর্ট বলছে অর্থনৈতিক পিরামিডের একেবারে নিচের তলাতেই রয়ে গিয়েছেন দলিত ও আদিবাসীরা। এমনকি অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়েরও নিচে তাঁদের অবস্থান। উন্নয়নমুখী ভারতে খনি, বাঁধ ও অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরিতে দলিত আদিবাসীরাই বে-ঘর হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। শহর শহরাঞ্চলে নির্মাণ শিল্পে কম মজুরিতে কাজ জোটানোই এদের ভবিতব্য। দেশের মোট দলিত জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই ভূমিহীন। শুধুমাত্র একটি সরকারি দফতরেই দলিতরা সংখ্যাগুরু। কারণ সরকারি দফতরে ৯০ শতাংশ সাফাই কর্মী দলিত। তাদের কাজ রাস্তা পরিষ্কার করা, ম্যানহোল থেকে নোংরা তোলা, নর্দমা পরিষ্কার করা এবং শৌচালয় পরিষ্কার করা। মানব দেহের বর্জ তারাই পরিষ্কার করেন। শৌচালয়ের বর্জ পদার্থ যে দলিতরা পরিষ্কার করেন তাদের ৯০ শতাংশই মহিলা। যদিও বেআইনি তবু ভারতীয় রেলে মানব দেহের বর্জ এরাই পরিষ্কার করেন। ভারতীয় রেলের দেশ জুড়ে ৬৫ হাজার কি.মি রেলপথে প্রতিদিন ১৪,৩০০ ট্রেন চলাচল করে। প্রায় ৩ কোটি যাত্রী প্রতিদিন যাতায়াত করেন। ট্রেনের ১,৭২,০০০ শৌচালয় সম্প্রতি বায়োটয়লেটে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনও বহু সাফাই কর্মী শৌচালয় পরিষ্কারের কাজ করেন। যদিও প্রহিবিশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার্স এন্ড দেয়ার রিহ্যাবিলিটেশন বিল ২০১২ সালে লোকসভায় পাশ হয় এবং ২০১৩ সালে রাজ্যসভায় পাশ হয়।
এই রাজ্যেও শতাধিক বছর ধরে কলকাতা কর্পোরেশন বা সরকারি হাসপাতালে সাফাইকর্মী মানেই চামাড়, মুচি, হাঁড়ি, ডোম, হেলা সম্প্রদায়ের মানুষ। কলকাতার নিম্নবর্ণের মজুরদের বস্তিগুলি প্রায় সবকটাই হিন্দু বস্তি থেকে একটু তফাতে। এছাড়াও চামড়ার কাজ, মরা পোড়ান, জঞ্জাল সাফাই-এর মতো কাজ তাঁরাই করেন। তবে এই শ্রমিকরা এখানে খুশি যে তাঁদের উচ্ছেদের ভয় নেই। পুরসভা এলাকায় ঠিকা টেনেন্সি আইনের জন্য বস্তির জমির মালিকানা সরকারের হাতে। তাই ভারতবর্ষের কয়েকটি প্রদেশে যে ভয় তাঁদের তারা করে ফেরে সেই উচ্ছেদের খাঁড়া এখানে তাঁদের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এ রাজ্যে কমপয়সায় জীবন চালান যায়। বরং হাতের কাছেই পুরসভার শৌচাগার, বিনাখরচায় জল। অন্য অনেক রাজ্যের মতো এখানে জাতিবিদ্বেষের হিংসায় তাদের জীবন বা মানসম্ভ্রম খোয়াতে হয় না। বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস দুই আমলেই সরকারের দাবি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি জাতিবিদ্বেষের ঊর্ধে। এই অবস্থায় ভোট মরশুমে আদিবাসী বা দলিত পরিবারে ভোজ রাজনীতিতে অনেকে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। যাঁদের বাড়িতে রাজনীতিকরা পাত পেরে খেয়ে আসছেন তারাও কিছুটা বিভ্রমে পরছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বলছে এই পরিবারগুলি জানিয়েছে রাজনীতিকদের পাত পেরে খাওয়ায় তাঁদের কি লাভ হবে তাঁরা জানেন না। এমনকি ঘরে আসা হেভিওয়েট অতিথিদের কাছে নিজেদের চাওয়া-পাওয়াটুকু খুলে বলার সুযোগও তাঁদের হয়নি।