শরৎ-এর সকালে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, দেখে মনে হয় সত্যি তো এ জীবন পদ্ম পাতায় জলের মতো। দেখতে দেখতে ৭০-এর সেই রাগী যুবক ৭৭-এ পৌঁছে গেলেন। এ-ও সত্যি! হ্যাঁ, এ বছর ১১ অক্টোবর অমিতাভ বচ্চনের ৭৫ বছর পূর্তি হচ্ছে। এখনও তো তাঁর সেই রাগী যুবকের ইমেজ আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে এক সময় ছিল, এক পর্দার সিনেমা হল, সেখানে অমিতাভের ছবি রিলিজ মানেই অন্তত পাঁচ সপ্তাহ। যে সব চলতো না সেগুলোই চার-পাঁচ সপ্তাহ ধরে দেখা যেত। আর বাম্পার হিট ছবি তো মাসের পর মাস।
১৯৬৮-৬৯ নাগাদ অমিতাভ বচ্চন কলকাতায় এলেন। এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেছেন, সেই সময়ের কলকাতার কথা। ট্রামে চড়া, গড়ের মাঠে বিকেলের বাতাস সেবন কিংবা গরম গরম কচুরি খাওয়া—এসব নানা গল্প শুনিয়েছেন বিগ-বি। বলেছেন, তখন ভেবেছিলাম ভালো কথা বলতে পারলে আর দেখতে ভালো হলে যুবকদের কাজের অভাব হয় না। বিশেষ করে কলকাতার মতো শহরে। তাঁর বাবা বিখ্যাত হিন্দি কবি হরিবংশ রাই বচ্চন এবং মা তেজি বচ্চন দুজনেই তাঁদের কম বয়সে জোরকদমে পা মিলিয়েছিলেন গণনাট্য আন্দোলনের শিল্পী-কর্মীদের সঙ্গে। তাঁদের পারিবারিক উপাধি শ্রীবাস্তব। এলাহাবাদের উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ। বাবুপট্টি নামক গ্রামের আদি বাসিন্দা এই শ্রীবাস্তব পরিবার। বামপন্থী আন্দোলনের হাওয়ায় শ্রীবাস্তব পদবি ত্যাগ করে বচ্চন পদবি ধারণ করেন হরিবংশ রাই। বচ্চন বলে আদৌ পদবি হয় কি না সে বিষয়টিই পরিষ্কার নয়। বড়ো ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব—তখন তো বহু ঘরেই এমন অনেক মানুষ ছিলেন যাঁদের আবেগ উসকে দিলেই শোনা যেত বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয়…।
কলকাতায় বন্দর অঞ্চলে চাকরিও করছিলেন অমিতাভ। ইতিমধ্যেই ১৯৬৯-এ মৃণাল সেনের ছবি ভুবন সোম-এ ভয়েস ওভার দিলেন। সেই সঙ্গে ছবিতে অভিনয়ও চলছে। ১৯৭১ সালে খাজা আহমেদ আব্বাসের ‘সাত হিন্দুস্থান’ ছবিতে লিড রোল করলেন অমিতাভ। উল্লেখ্য, খাজা আহমেদ আব্বাসও গণনাট্য আন্দোলনের এক জন বড়ো ব্যক্তিত্ব। কিন্তু অমিতাভের স্টারডমের বিষয়টা ঘটেছিল ১৯৭২-৭৩ নাগাদ। ‘জঞ্জির’ ফিল্মে সেই রাগী তরুণ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেশ জোড়া সাড়া ফেললো। এর আগে ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর অভিনয়। রাজেশ খান্না ছিলেন সে সময় সুপারস্টার। আনন্দ ছবির পর থেকে ধীরে ধীরে এই স্টারডমের ব্যাপারটা বদলাতে শুরু করলো।
হিন্দি ছবির দর্শক আগে দেখেছেন নায়ক হিসেবে দীলিপকুমার, শাম্মি কাপুর, দেবানন্দ, রাজেশ খান্না এঁদের। এই সময়ের গানেও মেলোডির প্রভাব বেশি। প্রায়শই শোনা যায় রাগপ্রধান গান। বৈজু বাওয়ারার মতো সংগীতময় ছবিও তখন তৈরি হতো। হইহুল্লোড়ে ভরা গানও কম হতো না, কিন্তু সে সময় গানের সুরগুলি কিন্তু ছবির বিষয়কে অনেকটাই দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছে। ভেবে দেখুন আনন্দ ছবির সেই গানটি — ‘জিন্দেগি ক্যায়সি এক পেহেলি হ্যায়’ — সলিল চৌধুরির সুরে মান্না দে-র কণ্ঠে সেই বিষাদ সমুদ্রের বালুকাবেলায় ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা নামে আর দৃশ্যটি শেষ হয়। এই ট্রিটমেন্ট বদলে গেলো। নায়ক ভিলেনকে জব্দ করেই ছাড়ছেন না, রীতিমতো ভিলেনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে লড়াই করছেন। প্রায় সব ছবিতে নায়ক-ভিলেন দ্বন্দ্বযুদ্ধ হচ্ছে। নায়কের শরীর, তাঁর শারীরিক শক্তির প্রদর্শন বা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ক্ষমতা এই সব ছবির বড়ো আকর্ষণ। ১৯৭৫ সালে অমিতাভের দুটি ছবিতে অমিতাভের মৃত্যুদৃশ্য দেখানো হলো। একটি ‘শোলে’ অপরটি ‘দিওয়ার’। অথচ দুটি ছবির সাফল্য গগনচুম্বী। শোলে ছবিটি তো সর্বকালের একটি কাল্ট ছবি। এভাবেই এগিয়েছেন অমিতাভ।
তাঁর বয়স বেড়েছে। কখনও মনে হয়েছে এবার বুঝি অন্তরালে যাওয়ার পালা শুরু হলো। হঠাৎই ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র মতো টিভি শো করে দেশ কাঁপিয়ে নতুন ছবি ‘বুডঢা হ্যোগা তেরা বাপ’ ছবিতে দর্শককে হাসিয়ে মাত করেছেন। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘লাস্ট লিয়ার’ ছবিতেও সম্পূর্ণ নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কলকাতা চলচিত্র উৎসবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহ্বানে পর পর কয়েক বার যোগ দিয়ে তাঁর চমৎকার বক্তব্য পেশ করে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিগ-বি। তিনি সুস্থ শরীরে শতায়ু হোন, এটাই সারা ভারতবাসীর প্রার্থনা।