আমলাশোলের কথা মনে আছে? ২০০৪ সালে পশ্চিম মেদিনীপুর (এখন ঝাড়গ্রাম) জেলার ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন, শবর-মুন্ডা (মুড়া) অধ্যুষিত যে অখ্যাত গ্রামটি পাঁচ জন মানুষের ‘অনাহার মৃত্যু’র জন্য সংবাদপত্রের শিরোনামে চলে এসেছিল? তাই নিয়ে তৎকালীন শাসক-বিরোধীর তুমুল কাজিয়া; মৃত্যুর ‘কারণ’ নিয়ে নানা কাটাছেঁড়া। এর পর যা হয়— আমাদের চিন্তা ও চর্চা থেকে আমলাশোল নামটা ফিকে হতে হতে, একসময় প্রায় মুছে গেল।

যে ক’জন ২০০৪ সালে মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সনাতন মুড়া (৪৭) বাদে আর বাকি সব শবর— সময় শবর (৫৩), মঙ্গলী শবর (৩০), নাথু শবর (৫৫-৬০) ও শম্ভু শবর (৫০)। ২০০৪ সালের পর, কোকিলা শবরও (প্রায় ৫০) একই কারণে (‘অনাহারে’) মারা যান বলে তাঁর পুত্রবধূর দাবি, যদিও মিডিয়ায় এই নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় (২৩ আগস্ট ২০০৬) অবশ্য ২০০৪-এই ৮ জন ও ২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সংস্করণে আর এক জনের— পার্বতী শবর (৩০)— ‘অনাহার মৃত্যু’র খবর প্রকাশিত হয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আমলাশোল যান নানা উন্নয়নের বার্তা নিয়ে। এর আগে গিয়েছিলেন এক দশক আগে, ‘অনাহার’ মৃত্যু-পর্বে, বিরোধী নেত্রী হিসেবে। একদা প্রায়-অগম্য আমলাশোল পৌঁছনোর রাস্তা এখন পাকা, তবুও ধেড়ুয়া ছাড়িয়ে বেলপাহাড়ি পেরিয়ে (আমলাশোলের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছোট্ট গঞ্জ, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও আছে) শিমূলপাল, ভুলাভেদা ফরেস্ট রেঞ্জের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে অনেক কিছুই চোখে পড়বে। আমলাশোলে অধিকাংশ শবরেরই রেশন কার্ড ছিল না, রেশন দোকানও ছিল বেশ দূরে। এখন কার্ড হয়েছে, গ্রামের রেশন-দোকানে দু’টাকায় চাল পাওয়া যাচ্ছে, প্রাথমিক স্কুল চলছে, ১০০ দিনের কাজের (এনআরইজিএস) জব কার্ড ছিল না, এখন হয়েছে।

সেই আমলাশোলেই দুয়ারে রেশন নিয়ে হাজির রানীবাঁধ বিধানসভার বিধায়ক তথা খাদ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প দুয়ারে রেশন নিয়ে বুধবার সকালে বেলপাহাড়ী ব্লকের শবর গ্রাম আমলাশোলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচটি পরিবারের হাতে রেশন সামগ্রী তুলে দিলেন খাদ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডি। দেড় দশক আগে, ২০০৪ সালে এই গ্রামই অনাহারে মৃত্যুর কারণে সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছিল। অনাহারের আরেক নাম হয়ে উঠেছিল আমলাশোল। কিন্তু আজ আমলাশোল-এর অনেক পরিবর্তন। রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানুষের রুটি রুজী, অন্ন সংস্থান কি নেই বর্তমানে। জ্যোৎস্না মান্ডি বললেন, মুখ্যমন্ত্রী দুহাত ভরে ঢেলে দিয়েছেন এখানকার মানুষের উন্নয়নের জন্য নানা প্রকল্প। তাঁদের কাছে শুনছিলাম সে দিনের কথা আর আজ আরোও একবার প্রত্যক্ষ করলাম— এক সময় অনাহারের আমলাশোল এখন সত্যিই ‘মডেল গ্রাম’। জঙ্গলমহলের মেয়ে হিসাবে দুয়ারে রেশন প্রকল্পের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই পাঁচটি পরিবারের হাতে রেশন সামগ্রী তুলে দেওয়া আমার কাছে ভীষণ সৌভাগ্য ও গর্বের বিষয়।