এবারকার মতো রাজ্যসভার শেষ অধিবেশন। রাষ্ট্রপতি মহোদয়া ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণের উত্তরে সাংসদদের ভাষণ। শুনলাম সাংসদ সুখেন্দুসুন্দর রায়ের ছাব্বিশ মিনিটের ভাষণ। চমকিত হলাম একটু। সুখেন্দুবাবু ধীরস্থির, শান্ত মানুষ। অনেকে আছেন, বয়েসের কথা মনে না রেখে যুবাসুলভ শৌর্য দেখান। সুখেন্দুবাবু সে রকম নন। নিজের সীমার বাইরে তিনি পা ফেলেন না। কিন্তু তাঁর ভাষণে এ কি দেখলাম! হ্যাঁ, ভাষণের মধ্যে মানুষটাকে দেখাও যায়। দেখলাম, সুখেন্দুবাবুর ভেতরে উত্তেজনা। কিছুটা ক্রোধ। কথায় ধারালো ব্যঙ্গের রেশ।
এখন অমৃতকাল চলছে। সবই অমৃতময় হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি মহোদয়া তাঁর ভাষণে না কি দশবার ‘অমৃত’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। এতে আপত্তি সুখেন্দুবাবুর। তাঁর অভিমত দেশের মুষ্টিমেয় মানুষ অমৃত পান করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পান করছে হলাহল, বা জহর, বা বিষ। জেনে-শুনে বিষ পান কি না কে জানে! সুখেন্দুবাবু পৌরাণিক কাহিনি ভুলে গেছেন না-কি! গুটিকয় দেবতা অমৃতের ভাগ পেয়েছিলেন। তেমনি সত্তাধারী কয়েকজন স্বাভাবিক নিয়মে অমৃত ভক্ষণ করেছেন। এতে এতো রেগে যাবার কি আছে!
লোকসভা টিভির দৌলতে দেখতে পেলাম সুখেন্দুবাবুর হাতে একতাড়া কাগজ। সে কাগজ আসলে প্রমাণপত্র। তিনি নানা সংস্থার সমীক্ষা থেকে প্রমাণ করতে চান যে দেশে এখন চরম বৈষম্য, কর্মসংস্থানের বিরাট অভাব, চাষিদের দুর্দশা, আর এসব নিয়ে নিরন্তর জুমলা করা শাসকের স্বভাব — ‘What is particularly worrying India’s case is that economic inequality is being added to a society that is already fractured along the lines of caste, religion, region and gender,’
বুঝুন ব্যাপারখানা! শুধু অর্থনীতি নয়, ভারতে ধর্মে-ধর্মে, নারী-পুরুষে, রাজ্যে-রাজ্যে বিভাজনের খেলা। বর্তমান শাসকের আমলে সে বিভাজন উত্তালজলধিতরঙ্গের রূপ নিয়েছে। একের পর এক আইন আসছে, সংসদে আলোচনা না করে অথবা গায়ের জোরে, অথবা কৌশলে সেসব আইন সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেন লাগ ভেলকি লাগ। এই যেমন ‘ন্যায়সংহিতা’, যাকে সুখেন্দুবাবু ‘অন্যায়সংহিতা’ বলে উল্লেখ করলেন। এত বড় কথা! ভয় নেই কি সুখেন্দুবাবুর! জানেন না তিনি ‘আরবান নকশাল’ অথবা ‘টুকরা টুকরা গ্যাং’-এর কথা! দেখেন নি তিনি সমালোচকদের, প্রতিবাদীদের জব্দ করার আয়োজন! ভয় না করে সুখেন্দুবাবু ইঙ্গিতে এজেন্সি দিয়ে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করারও সমালোচনা করলেন, আর রাষ্ট্রপতি মহোদয়ার ভাষণে সেসব না থাকার জন্য প্রকাশ করলেন ক্ষোভ। আছ্ছা বলুন তো, কি করবেন রাষ্ট্রপতি! তাঁর কি সত্যিকারের আছে কোন স্বতন্ত্র সত্তা! সব আমলেই তিনি সরকারেরই শরীরের অঙ্গ নয় কি! স্বতন্ত্র সত্তা থাকলে সরকারপক্ষের একজন যখন আদিবাসীদের বিরুদ্ধে কুকথা বললেন, কিংবা এক আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রীকে বাগে আনতে না পেরে যখন জেলের ঘানি টানানোর ব্যবস্থা করলেন সত্তাধারীরা, রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠায় যখন তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হল না আদিবাসী বলে, — তখন তিনি প্রতিবাদ করতে পারতেন।
সুখেন্দুবাবু অমৃতকাল আনয়নকারী সরকারকে জার্মানির হিটলারের সঙ্গে তুলনা করলেন। তাঁর দলের এক সাংসদ ভারতে কিভাবে ফ্যাসিবাদ আসছে সে কথা বলে অনেক হাততালি কুড়িয়েছিলেন দেশে-বিদেশে। কিন্তু কি হল তাঁর পরিণতি? সুখেন্দুবাবু কি সেকথা ভুলে গেলেন? আরে মশাই, সব ক্ষমতা করায়ত্ত না করলে অভাগা দেশের হইবে কি? সেটা যদি ফ্যাসিবাদ হয় হোক না। কিন্তু হিটলার কি অমৃতকাল আনতে পেরেছিলেন? না পারেন নি। বোধহয় অমৃতকালের এমন উদাত্ত প্রতিশ্রুতিও দিতে পারেন নি। এই প্রতিশ্রুতির রস খেয়েও তো বেঁচে আছে দেশের মানুষ।
শেষের দিকে সুখেন্দুবাবু রবীন্দ্রনাথের ‘দীনদান; কবিতাটি উল্লেখ করেছিলেন রামমন্দির প্রসঙ্গে। সে কবিতায় রাজা চমকপ্রদ মন্দির নির্মাণ করে মুল্যবান ধাতুর দেববিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মন্দিরের পূজারী জানালেন ‘সে মন্দিরে দেব নাই’, কেননা সে মন্দির রাজার অহংকারেই পরিপূর্ণ। সুখেন্দুবাবু যে রাজা বলতে পূজ্যপাদ চৌকিদার মোদিমশায়কে ইঙ্গিত করেছেন, সে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু সুখেন্দুবাবু কি চম্পত রাইদের কথা জানেন না? তাঁরা বলে দিয়েছেন, মোদিমশাই স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। তাই রামের বদলে রামমন্দিরে মোদি যদি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে অন্যায়টা কোথায়?
সুখেন্দুবাবু বাঙালি। সুখেন্দুবাবু রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন। তাই তাঁকে বলি : রাগ করে শরীরকে কষ্ট দেবেন না। আবার রবীন্দ্রনাথের এই গানটা শুনুন। ভুলে যান ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ে’র কথা, ভুলে যান ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’র কথা, ভুলে যান ‘গরম ভাত ও ভূতের গল্পের’ কথা। দেখুন আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। অনন্ত গগনে দিবস-রজনী কত অমৃতরস ঊথলি যায়, হৃদয় প্রসারি চারি দিকে দেখ চাহি, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ…
দেশের মা-ভাই-বোন সব, অমৃতকাল চলছে, তোমরা অমৃতদৃষ্টি লাভ করো। মনে রেখো আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। চারিদিকে উথলে উঠছে অমৃতরস। হৃদয় প্রসারিত করো একবার। অমৃতকালের স্রষ্টাদের কাছে প্রণত হও, বলো উদাত্তকণ্ঠে … হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।