নদ-নদী-পাহাড়-জঙ্গল-চা বাগান ঘেরা জলপাইগুড়ির আকাশ যেমন নীল তেমনই ঘন সবুজের আভা চারপাশে। সৌন্দর্যময় এই প্রকৃতির কোলেই অসংখ্য আদিবাসী ও জনগোষ্ঠীর বাস। এত ধরনের মানুষ ও সমাজ যেখানে, সেখানকার ইতিহাস-ভাষা-সংস্কৃতি যেমন আলাদা, তেমনই বৈচিত্রময়। সেই রীতিনীতি আদবকায়দার হাত ধরেই এ জেলার নানা প্রান্তে বহু কাল থেকেই অন্য নামে, অন্য আঙ্গিকে দুর্গা পুজো হয়ে আসছে বহুকাল ধরে।সাধারণভাবে তিনি দুর্গতিনাশিনী, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী হলেও কোথাও তিনি দেবী ঠাকুরানি, কোথাও বনদেবী, কোথাও আবার মা ভান্ডানি। নামে যেমন তিনি আলাদা, পুজোর পদ্ধতি বা নিয়মকানুনও আলাদা কিন্তু আশ্বিন মাসের দুর্গাষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত যে পুজোর আয়োজন তা সাধারণ মানুষের মিলনোত্সব।
খুব জোড়ে দৌড়োচ্ছে সময়, চারপাশ পালটাচ্ছে খুব দ্রুত। এমন কোনো কিছুর কথা বলা যাবে না যেখানে না এই পরিবর্তন ঘটছে। সমাজের রীতিনীতি থেকে পারিবারিক ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বদলে চলেছে আমাদের চোখের সামনে। এত কিছু রদবদলের পরেও বজায় আছে আমগুড়ির বসুনিয়া পরিবারে গ্রামঠাকুর পুজো বা দেবী ঠাকুরানির আরাধনা। কোনও পরিবর্তনের ছায়া কি এখানে পড়েনি? না বললে ভুল বলা হবে কিন্তু ষষ্ঠী থেকে নবমীতে যে আটপৌরে শাড়ি পরা সাধারণ গ্রাম্যবধূ রূপের দেবী প্রতিমার পুজো এই বাড়িতে শুরু হয়েছিল তার কোনও পরিবর্তন আজও ঘটেনি। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের লোকসংস্কৃতি বা আচারে হাজার পরিবর্তনের পরও অটুট রয়েছে বসুনিয়া পরিবারের দুর্গারূপ।
সমগ্র ডুয়ার্সজুড়ে ভয়ালদর্শনা থেকে মমতাময়ী, কোথাও গাত্রবর্ণ অপরাজিতা নীল রূপের দুর্গা তো কোথাও রক্তবর্ণা দেবী দুর্গার পুজো হয়। কিন্তু আটপৌরে শাড়ি পরা সাধারণ গ্রাম্যবধূ রূপের দুর্গা পুজো হয় একমাত্র জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ির বসুনিয়া পরিবারে। দুর্গতিনাশিনী দুর্গার এই রূপ আদতে এক রাজবংশী বধূর। যতদূর জানা গিয়েছে ১৮১০ সাল থেকে এই আদলের দুর্গা প্রতিমা এই পরিবারে পুজো হয়ে আসছেন। আমগুড়ির প্রাচীন বাসিন্দারাও বলেন, যুগ যুগ ধরে বসুনিয়া পরিবারের দুর্গার এমন রূপই দেখে আসছেন তাঁরা।
বসুনিয়া বাড়ির দেবী দুর্গা রূপ আসলে রাজবংশী বধূর সাজ। তাই তাঁর পরনে আটপৌরে শাড়ি। মুখের আদলে ধরা পড়ে মঙ্গোলীয় জনজাতির ছাপ। রাজবংশী সমাজে দুর্গা ‘দেবী ঠাকুরানি’ নামে পরিচিত। বসুনিয়া পরিবারেও যে দুর্গা পুজো হয় তাঁর পরিচয়ও ওই নামেই। এখানে দেবীর পরনে লাল তাঁতের শাড়ি। চোখ, নাক ও মুখের গড়ন যেন ঘরের মেয়ে। দেবীর গায়ে আটপৌরে গয়না। পুজোর আয়োজনেও তেমন কোনও আড়ম্বর নেই। মণ্ডপসজ্জাতেও খড়ের ছাউনি দেওয়া সাধারণ কুটির। তিন দিকে পাটকাঠির বেড়া। গ্রামের আর পাঁচটা সাধারণ বাড়ির মতো। কলেবরে আধুনিক হয়ে উঠলেও, রাজবংশীরা এখন দেবী দুর্গা বলতে এবং শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও ঐতিহ্যে অমলিন বসুনিয়া পরিবারে দেবী দুর্গা কিন্তু পরিচিত ‘দেবী ঠাকুরানি’ নামেই।
নামকরণের মতো তফাত রয়ে গিয়েছে দেবীর গড়ন ও সাজেও। পরণের শাড়িটিও গোড়ালির উপর পর্যন্ত। ঠিক যে ভাবে দেখা মেলে তিস্তাপারের গাঁয়ের বধূর। সাজসজ্জা থেকে তার চাউনি, ভাবভঙ্গিমাতেও ঘরের মেয়ের প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেন ঠোঁটের কোণে চেনা হাসি নিয়ে সবাইকে দেখছেন। তবে শুরুতে ওই পুজো কিরাতভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় ‘যাত্রাপুজো’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে তা পালটে হয় ‘দেবী ঠাকুরানি’র আরাধনা। বর্তমানে রাজবংশী সমাজের নতুন প্রজন্ম অবশ্য দেবী ঠাকুরানিকে দেবী দুর্গা বলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
ধনবর বসুনিয়া এই পুজোর সুচনা করেছিলেন। তিনি কোচবিহার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ময়নাগুড়ির আমগুড়ি স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। তবে তখন অরণ্যময় এই অঞ্চলে ময়নাগুড়ি নামে কোনো জায়গা ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অধিকাংশের মত, ২৬টি তালুক নিয়ে গঠিত জনবসতিপূর্ণ ময়নাগুড়ির নাম ছিল চাপগড়। ক্রমে বসুনিয়া ওই অঞ্চলের জোতদার হয়ে উঠেছিলেন। স্বপ্নাদেশ পেয়েই নাকি তিনি পুজোর আয়োজন করেছিলেন। ধনবর কোচবিহার রাজপরিবারের পুজো দেখেছিলেন। হয়তো তাই রাজবাড়ির দেবীর গায়ের রঙের ছাপ রেখেছিলেন নিজের বাড়ির প্রতিমার ক্ষেত্রেও। তবে প্রতিমার আদলে ‘দেবী ঠাকুরানি’র গড়ন ঠিক করেছিলেন নিজেই।
জলপাইগুড়ি তখনও জঙ্গলাকীর্ণ। গোড়ায় পুজো আয়োজন খুব সহজ ছিল না। চাপগড় অথবা আমগুড়ি এলাকায় ওই সময় মৃত্শিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি পাওয়া যেত না। ধনবর পুজো শুরু করার ৫৯ বছর পরে ১৮৬৯ সালের ১ জানুয়ারি জেলা সদরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই কারণে প্রথম কয়েক বছর অধুনা বাংলাদেশের রংপুর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে প্রতিমা আনতে হয়েছে। পরবর্তীতে ধনবরের ছেলে তত্কালীন ভুটান রাজার খাজাঞ্চি মুসব্বর বসুনিয়া রংপুর থেকে এক মৃত্শিল্পী পরিবারকে এনে নিজের জমিতে বসবাস করতে দেন। একই ভাবে অসম থেকে পুরোহিত এবং ঢাকি এনে বসবাসের জায়গা দেন। ওই সময় কোচবিহার এমনকি রংপুর থেকেও পুজো দেখতে প্রচুর মানুষ আমগুড়িতে ভিড় করত।
এখনও খেয়াল রাখা হয় যাতে মূর্তির আদলে সাধারণ রাজবংশী বধূর রূপ ধরা পড়ে। গাত্রবর্ণেও যেন লাল আভা থাকে। পুরোনো রীতি অনুসারে দেবীর মাথায় শোভা পায় শেয়ারা। আগেকার দিনের রাজবংশী সমাজে বিয়ের সময় কনে যে মুকুট মাথায় পরত তাকে বলা হত শেয়ারা। রাজবংশী সমাজের রীতি মেনেই দেবীর আরাধনায় আগে ‘গ্রামঠাকুর’-এর পুজো করা হয়। এই গ্রামঠাকুর হলেন শিব। নবমীর দিন রাজবংশী রীতি মেনে কৃষি উত্সব বা যাত্রাপুজোর আয়োজন করা হয়। ওই দিন লাঙল, কোদাল, কাস্তে প্রভৃতি কৃষি যন্ত্রপাতির পুজো হয়।